আমাদের অনেকেই স্যারকে চেনেন একজন দ্বীনদার মানুষ হিসেবে, যিনি তাবলিগের ময়দানে সময় দিয়েছেন, ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও দ্বীনের পথে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন এবং লম্বা লম্বা বয়ানের মাধ্যমে মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু এই পরিচয় স্যারের প্রকৃত সত্তার কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশ। স্যার ছিলেন শুধু বয়ানের মানুষ নন; বরং তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যার প্রতিটি কথা, প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি সিদ্ধান্তে নববী আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যেত।
স্যারের দাওয়াত কেবল ভাষায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল একটি চলমান দাওয়াত। তিনি যা বলতেন, তা নিজে পালন করতেন; আর যা পালন করতেন, তা-ই মানুষকে বলতেন। তার জীবনে ‘বয়ান’ ও ‘আমল’, এর মধ্যে কোনো ফাঁক ছিল না। স্যারের দৃষ্টিতে দ্বীন ছিল না কেবল আচার-অনুষ্ঠান; বরং ছিল হৃদয়ের পরিশুদ্ধি, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, সত্যিকারের দ্বীনদার হতে হলে কেবল বড় বড় বয়ান নয়, বরং এমন একটি ‘পাক দ্বীল’ প্রয়োজন যা ভয় এবং লোভ থেকে মুক্ত।
স্যারের ব্যক্তিত্বের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, নিয়তের শুদ্ধতার উপর অসাধারণ গুরুত্ব। তিনি বারবার স্মরণ করিয়ে দিতেন, কোনো কাজের বাহ্যিক রূপ যতই সুন্দর হোক, যদি অন্তরের উদ্দেশ্য শুদ্ধ না হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি তিনি শুধু তত্ত্ব হিসেবে বলেননি; বরং জীবনের বাস্তব ঘটনাগুলোর মাধ্যমে স্পষ্ট করে তুলেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে দ্বীন মানে শুধু সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ নয়; বরং সঠিক নিয়ত নিয়ে সেই পদ্ধতিকে জীবনে বাস্তবায়ন করা।
স্যারের আধ্যাত্মিক দর্শনে ‘পদ্ধতি’র চেয়ে ‘নিয়ত’ ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন ইস্তিখারা করে পদের বা অর্থের নেশায় দৌড়ায়, তখন স্যার ধরিয়ে দিতেন যে-ইচ্ছার উৎস যদি পঙ্কিল হয়, তবে পবিত্র পদ্ধতির প্রলেপ দিয়ে তাকে জায়েজ করা যায় না। তিনি মানুষের অন্তরের সুপ্ত বাসনাকে চিনে ফেলতেন এবং খুব মৃদু ভাষায় অথচ গভীরভাবে নফসকে শাসন করতেন। তাঁর সান্নিধ্য মানেই ছিল নিজের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা দুনিয়াবি লোভের ব্যবচ্ছেদ করা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর দায়িত্ববোধ (জিম্মাদারি) ও জবাবদিহিতার অনুভূতি। তিনি বোঝাতেন, যে কোনো দায়িত্ব, ছোট হোক বা বড়, আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার সাথে সম্পৃক্ত। এই অনুভূতি তাঁর কথায় যেমন ছিল, তেমনি তাঁর আচরণেও প্রকাশ পেত। তিনি মানুষের ভেতরে এমন মানসিকতা তৈরি করতে চাইতেন, যেখানে দায়িত্বকে কেবল দায়িত্ব নয়, বরং একটি আমানত হিসেবে দেখা হয়।
স্যারের জীবনের আরেকটি উজ্জ্বল দিক ছিল, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও সহানুভূতি। তিনি শুধু দ্বীনি কাজের কাঠামো নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন না; বরং মানুষের ব্যক্তিগত কষ্ট, অসুস্থতা, পারিবারিক অবস্থা, এসব বিষয়েও আন্তরিকভাবে খোঁজখবর নিতেন। তাঁর কাছে একজন অসুস্থ সাথীর পাশে বসে সময় দেওয়াও ছিল দ্বীনের অংশ। তিনি দেখিয়েছেন, দ্বীন শুধু মসজিদ বা ময়দানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর মধ্যেই এর আসল সৌন্দর্য।
স্যারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল, আত্মশুদ্ধি ও আখলাকের প্রতি গুরুত্ব। তিনি বোঝাতেন, দাওয়াতের মেহনত শুধু বাহ্যিক কার্যক্রম নয়; বরং নিজের চরিত্র, আচরণ ও লেনদেনকে সংশোধন করার নাম। অন্যের হক আদায় করা, দুর্বলের সাথে নম্র ব্যবহার করা, নিজের ভেতরের লোভ ও ভয় দূর করা, এসবকে তিনি দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো তাঁর আমলের প্রতি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি জানতেন, সবার পক্ষে বড় বড় আমল করা সম্ভব নয়। তাই তিনি মানুষকে ছোট কিন্তু নিয়মিত আমলের দিকে উৎসাহিত করতেন, যেমন ঘুমানোর আগে চার রাকাত নামাজ পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, নিয়মিত দোয়া করা ইত্যাদি। এই সহজ আমলগুলোর মাধ্যমেই তিনি মানুষের জীবনে দ্বীনের একটি স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেয়েছেন।
স্যারের শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, ‘মালুমাত’ (তথ্য) ও ‘ইলম’ (জ্ঞান), এর পার্থক্য। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বর্তমান যুগে মানুষ তথ্যকেই জ্ঞান মনে করছে। অথচ তাঁর দৃষ্টিতে প্রকৃত ইলম হলো সেই জ্ঞান, যা অন্তরে প্রভাব ফেলে, আমলের দিকে পরিচালিত করে এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরি করে। এই উপলব্ধিই তাঁর দাওয়াতের একটি কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল।
এছাড়াও, স্যারের জীবনে নম্রতা ও বিনয় ছিল অত্যন্ত লক্ষণীয়। তিনি কখনো নিজের মর্যাদা প্রকাশ করতেন না; বরং সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন। শিশুদের সাথে শিশুর মতো, বয়স্কদের সাথে আপনজনের মতো মিশে যেতেন। তাঁর এই স্বভাব মানুষকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করত এবং দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা জাগাত।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, স্যারের পুরো জীবনটাই ছিল এক ধরনের নীরব শিক্ষা। তিনি শুধু বাগ্মী বক্তা ছিলেন না; বরং ছিলেন ‘হাল’- এর মানুষ, প্রায়োগিক সুন্নতের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। অনেক সময় তিনি কথা না বলেও শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর একটি নীরবতা, একটি দৃষ্টিভঙ্গি, একটি প্রতিক্রিয়া, এসবই মানুষের অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
স্যারের জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, আকিদাগত স্বচ্ছতা, প্রথাগত ভক্তির ঊর্ধ্বে সত্যের মাপকাঠি। আমরা অনেক সময় মুরুব্বি বা পীর-মাশায়েখদের ভক্তি করতে গিয়ে তাঁদের ‘নিষ্পাপ’ বা ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করি। স্যার এই অতিভক্তির মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন। তিনি অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে শরিয়তের মাপকাঠিতে সত্যকে গ্রহণ করার শিক্ষা দিয়েছেন। ব্যক্তিপূজার প্রবণতার বিরুদ্ধে তাঁর এই অবস্থান ছিল সময়োপযোগী ও দৃষ্টান্তমূলক।
বর্তমান লৌকিকতার যুগে মানুষ সামান্য দান করেই নিজের নাম পাথরে খোদাই করতে চায়। কিন্তু স্যারের ব্যক্তিজীবন ছিল এর ঠিক বিপরীত। বড় অংকের অনুদানও তিনি ‘আব্দুল্লাহ’, অর্থাৎ ‘আল্লাহর বান্দা’ নাম দিয়ে দিতেন। তিনি কেবল নিজের নামই গোপন করেননি, বরং তিনি যাকে দিয়ে দান পাঠাতেন, তার কাছেও কখনো রসিদ বা হিসেব চাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, দাতা যখন আল্লাহকে খুশি করতে চান, তখন সৃষ্টির কাছে স্বীকৃতির কোনো প্রয়োজন নেই।
আমরা অনেকেই ইবাদত বা আমলের বরকতে ব্যক্তিগত বিপদ থেকে বেঁচে যাওয়াকে অনেক বড় ‘কেরামতি’ মনে করি। কুষ্টিয়ার সেই ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনার কারগুজারী আমাদের চোখের পর্দা খুলে দেয়। নিজের রক্ষা পাওয়ার চেয়ে অন্য বিপন্ন মানুষের জন্য তাঁর হৃদয়ে যে হাহাকার ছিল, তা প্রমাণ করে তিনি ইসলামের রূহ বা আত্মাকে ধারণ করেছিলেন। তাঁর কাছে ইমানের দাবি কেবল তসবিহ পাঠে নয়, বরং আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিলীন করার মধ্যে নিহিত ছিল।
যারা তাঁকে কেবল একজন ‘মুবাল্লিগ’ হিসেবে দেখেন, তারা তাঁর বাহ্যিক দিকটুকুই দেখেন। আর যারা তার বয়ানগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়বেন শুনবেন, তাঁর মালফুজাতগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন, তারা খুঁজে পাবেন, একটি জীবন্ত দ্বীনি হৃদয়, এক নির্লোভ, নিরহংকার, আল্লাহমুখী এক ব্যক্তিত্ব, যার কাছে দুনিয়া ছিল তুচ্ছ, আখিরাত ছিল চিরস্থায়ী সত্য।
আমাদের সমাজে ‘তাবলিগওয়ালা’ বলতে অনেক সময় একটি সীমিত চিত্র কল্পনা করা হয়, যেন কেবল মসজিদকেন্দ্রিক বা আনুষ্ঠানিক দ্বীনি কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু অধ্যাপক ড. মুশফিক আহমদ রহমতুল্লাহি এর সান্নিধ্যে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা জানেন যে তিনি কেবল ‘বয়ানের মানুষ’ ছিলেন না; বরং তাঁর প্রতিটি ওঠা-বসা, রাগ-অনুরাগ এবং নিরবতাও ছিল রাসূলুল্লাহ-এর অনুসরণের এক নীরব ইশতেহার।