মালফুযাত
Volume 4
মালফুযাত ৩০১–৪০০
🎤 ৩০১
স্যার একবার বলেন, সময় ও পরিস্থিতি আমার কাছে কী দাবি করছে, সেটাকে চিনতে পারার নামই হলো এলেম। স্যার বোঝাতেন, মালুমাত- অনেক তথ্য জানাটাই শুধু এলেম নয়; বরং প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহ আমার কাছে কী চান, সেটি বুঝতে পারাই প্রকৃত এলেম। প্রসঙ্গ আলোচনায় স্যার হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির কথা বলেন। তিনি ছিলেন বড় আলেম এবং পীর। অনেক ছাত্র তার কাছে পড়াশোনা করত এবং লোকেরা তার সোহবতে আধ্যাত্মিক উপকার পেত। সেই সময় মেওয়াতের মুসলমানদের মধ্যে দ্বীনি জ্ঞান খুব কম ছিল, নামাজ, আকিদা ও মৌলিক ইসলামী আমল বড় দুর্বল ছিল। তিনি মাদরাসার ব্যস্ততা ও ব্যক্তিগত তরিকতের কাজ রেখে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনি দাওয়াত শুরু করেন। বড় আলেম ছিলেন, উচ্চস্তরের দরস বা খানকাহি কার্যক্রম রেখে সাধারণ অশিক্ষিত মুসলমানদের মাঝে দাওয়াতের কাজ শুরু করেন; সময়ের দাবিকে তিনি চিনেছিলেন। স্যার বলতেন, এটাকেই বলা হয় এলেম, সময়ের তাকাজা চিনতে পারা। স্যার উদাহরণ দেন হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহমাতুল্লাহি আলাইহির জীবন থেকে। তিনি মদিনা মুনাওয়ারায় দীর্ঘদিন ধরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজার নিকটে বসে বুখারী শরীফের দরস দিতেন। এতো বড় মর্যাদাপূর্ণ কাজ এবং পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থানে বসে দ্বীনের শিক্ষা দেওয়া। কিন্তু যখন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলো এবং মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভবিষ্যৎ সংকটে পড়ল, তখন তিনি সেই মর্যাদাপূর্ণ স্থান ছেড়ে ও মর্যাদাপূর্ণ কাজ ছেড়ে হিন্দুস্তানে এলেন। বুখারী শরীফের দরস ফেলে করছেন রাজনৈতিক আন্দোলন; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজার নিকটে বসা ফেলে বসে বৈঠক করছেন হিন্দুদের সাথে হিন্দুস্থানে। স্যার বলতেন এটাকে বলে এলম, এখন এই মুহূর্তের দাবি কি সেটাকে চেনা, কোন সময়ে তার জন্য কোন কাজটি সবচেয়ে বেশি জরুরি, তা বুঝতে পারা। স্যার আরও একটি ঐতিহাসিক ঘটনার উদাহরণ দেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার সময় লক্ষ লক্ষ মুসলমানের সামনে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছিল- তারা কি সবকিছু ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যাবে, নাকি নিজেদের ভূমিতে থেকে যাবে? অনেকে আতঙ্কে ঘরবাড়ি, সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে রওনা হচ্ছিল। সে সময় তিনজন বড় আলেম, হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মাওলানা আব্দুল কাদের রায়পুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত মাওলানা জাকারিয়া সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজেদের মধ্যে পরামর্শে বসলেন। প্রশ্ন ছিল- এই কঠিন সময়ে উম্মতের জন্য তাদের করণীয় কী? তাদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা সুযোগ ছিল। কেউ তাদের পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল, আবার কেউ তাদের জন্য সৌদি আরব নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিচ্ছিল। কিন্তু তারা পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনজন নিজেদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলেন আমরা এই সময়ে মুসলমানদের এই হাল দেখে ভারত বর্ষ ত্যাগ করবো না, ভারতেই থেকে যাব, অথচ তাদের জন্য উত্তম আমন্ত্রণ ছিল, তাদের জন্য উত্তম এন্তেজাম ছিল, পৃথক সুযোগ ছিল। স্যার বলতেন সেই সিদ্ধান্ত ছিল তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, আর তাতে কি হল লক্ষ লক্ষ মুসলমান লক্ষ লক্ষ পরিবার ওই গৃহহীন অবস্থায় গৃহহারা অবস্থা থেকে নিরাপদ হয়ে গেল লক্ষ লক্ষ মুসলমানের জীবন হেফাজত হয়ে গেল, সেই সময় উম্মতের পাশে থাকা তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ তারা বুঝেছিলেন। স্যার বলতেন উনারা ছিলেন এলেমওয়ালা, উনারা ছিলেন জিকিরওয়ালা।
🎤 ৩০২
স্যার বলতেন, আল্লাহ পাক দ্বীনের মেহনতকে ব্যবসার সাথে তুলনা করেছেন। ব্যবসার স্বভাবই হলো তা বাড়ানো। প্রকৃত ব্যবসায়ী তার পুঁজি পুরোপুরি কাজে লাগায়, ব্যবসা সম্প্রসারণের চিন্তা করে। যদি কেউ পুঁজি থাকা সত্ত্বেও ব্যবসা না বাড়ায়, তবে সে প্রকৃত অর্থে ব্যবসায়ী নয়। স্যার বলতেন, আমাদের পুঁজি হলো আমাদের সময়। আল্লাহ আমাদের যে সময়, সুযোগ ও সামর্থ্য দিয়েছেন সেটাই আমাদের মূলধন। কিন্তু শয়তান চায়, এই মূলধন যেন দ্বীনের ময়দানে পুরোপুরি ও উত্তমভাবে ব্যবহার না হয়। তিনি বলতেন, সময়ের এই মূলধন যদি দ্বীনের ময়দানে পূর্ণভাবে ব্যবহার না হয়, তবে তা অন্য ময়দানে খরচ হয়ে যাবে। পরিবার কিছু নেবে, বিনোদন কিছু নেবে, মিডিয়া কিছু নেবে, দুনিয়াবি ব্যস্ততা কিছু নেবে, কিন্তু সময় ফাঁকা থাকবে না। মূলধন খরচ হবেই; প্রশ্ন হলো, কোথায় খরচ হচ্ছে? কারও সময়, শক্তি ও সামর্থ্য যদি বেশি হয়, কিন্তু সে যদি সামান্য কাজেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে, তবে তার আসল সামর্থ্য অপচয় হয়। শয়তান মানুষকে বুঝায়, “তুমি তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছ, একবার চিল্লা দিয়েছ, গাস্ত করো, মানুষ তো তোমাকে দিনদার বলেই চেনে, এর বেশি আর কী দরকার?” এইভাবে শয়তান মানুষকে তার পূর্ণ মূলধন দ্বীনের কাজে ব্যবহার করতে দেয় না। স্যার উদাহরণ দিতেন কারও কাছে যদি ১০০ টাকা পুঁজি থাকে, সে ছোট ব্যবসা করবে; মোড়ে বসে বাদাম বিক্রি করবে, ট্রেনে ফেরি করবে, তার পুঁজির সাথে সেটাই মানানসই। কিন্তু যদি কারও পুঁজি ১০০ কোটি টাকা হয়, আর তাকে যদি দেখা যায় রাস্তার মোড়ে পানের দোকান নিয়ে বসে আছে, তাহলে বোঝা যাবে সে আসলে ঐ পান দোকানী না, সে তার পুঁজির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবসা করছে না। পুঁজি যত বড়, ব্যবসার পরিসরও তত বড় হতে হয়। বড় পুঁজিকে ছোট গণ্ডিতে আটকে রাখলে তার সঠিক ব্যবহার হয় না। স্যার বোঝাতেন, দ্বীনের কাজ এমনভাবে হবে যেন এটা আমার নিজের ব্যবসা। কেবল সওয়াবের হিসাবের জন্য নয়, কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন হিসেবে নয়; বরং দায়িত্ববোধ থেকে, নিজের পূর্ণ সামর্থ্য দিয়ে। স্যার বলতেন, যে ব্যক্তি দ্বীনের কাজকে নিজের ব্যবসা বানিয়েছে, সে তার সময়ের পূর্ণ ও উত্তম ব্যবহার নিয়ে চিন্তিত থাকবে।
🎤 ৩০৩
স্যার একবার বলেন, দ্বীনি কাজের ভিত হলো আস্থা। তাই এমন কোনো কথা বা আচরণ করা উচিত নয় যা অযথা মানুষের আস্থা ভেঙে দেয়, নেতৃস্থানীয় বড়দের সম্পর্কে সাধারণের খারাপ ধারণা সৃষ্টি হয়। কিন্তু যখন কোনো ভুল প্রবণতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে তা পুরো কাজের ক্ষতি করছে, দ্বীনি মেহনতকে নষ্ট করছে, তখন নীরব থাকা সমাধান নয়। তখন দায়িত্ববোধের সঙ্গে সত্যকে সামনে আনা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা জরুরি হয়ে পড়ে। স্যার বলেন, কখনো কখনো সত্য কথা বলা বা ভুল সংশোধনের চেষ্টা করলে কিছু তাৎক্ষণিক অস্বস্তি বা সমস্যা তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি বড় ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা চিন্তা করে সাহসের সঙ্গে সংশোধনের পথে এগোতে হয়। এই ভারসাম্যই হলো দ্বীনি কাজের একটি সূক্ষ্ম দায়িত্ব।
🎤 ৩০৪
নব্বইয়ের দশকে কখনো কখনো স্যার কাকরাইলে অল্প কিছু পুরানা সাথীকে নিয়ে বসে তাবলীগের কাজে দেখা দেওয়া কিছু ভুল প্রবণতা ও মেজাজের খেলাফ অবস্থা সম্পর্কে সতর্কতামূলক আলোচনা করতেন। উদ্দেশ্য ছিল দ্বীনি মেহনতের সঠিক মেজাজের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা। একদিন এ ধরনের এক আলোচনায় মাহফুজুর রহমান ভাই স্যারকে বললেন, “যে কারণে কাজের মেজাজ নষ্ট হচ্ছে এবং যারা এভাবে কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তাদের ব্যাপার যদি আপনি প্রকাশ্যে বলে দেন, তাহলে সবাই সতর্ক হতে পারবে।” স্যার বললেন, “না, এভাবে প্রকাশ করলে ক্ষতি বেশি হবে।” জিজ্ঞেস করা হলো, “ক্ষতি কি এই কারণে যে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে?” স্যার বললেন, “হ্যাঁ, আস্থার ওপরেই তো কাজ চলে। মানুষ আস্থা থাকার কারণেই তাবলীগে আসে। যদি মুরুব্বিদের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে কাজের বড় ক্ষতি হবে।” অনেক বছর পরে, জীবনের শেষ দিকে স্যার যখন বিভিন্ন ভুল প্রবণতা ও কিছু মুরুব্বির ত্রুটির কথা সাথীদের সামনে প্রকাশ্যে আনতে শুরু করলেন, তখন একদিন তাকে সেই পুরোনো কথাটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো। বলা হলো, “স্যার, একসময় আপনি বলেছিলেন এসব প্রকাশ করলে আস্থা নষ্ট হবে।” স্যার তখন বললেন, “হ্যাঁ, তখন সেই অবস্থায় প্রকাশ করলে ক্ষতি বেশি হতো। কিন্তু এখন যদি প্রকাশ না করা হয়, তাহলে যে ক্ষতি হবে তা প্রকাশ করলে যে ক্ষতি হবে তার চেয়ে অনেক বেশি হবে।” তারপর স্যার একটি উদাহরণ দিলেন, ধরো একজন মেয়ের এমন একটি রোগ হয়েছে, যা চিকিৎসা করালে প্রকাশ হয়ে যাবে। আর রোগ প্রকাশ হয়ে গেলে তার বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি এই ভয়েই চিকিৎসা না করানো হয়, তাহলে রোগ বাড়তে বাড়তে একসময় তার মৃত্যুও হতে পারে। তখন কী করবে? সাময়িক ক্ষতির ভয়ে চিকিৎসা না করিয়ে মৃত্যুর দিকে যাবে, নাকি কিছু ক্ষতির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা করিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবে?
🎤 ৩০৫
স্যার বলেন, কোনো দায়িত্বকে শুধু তার সাধারণ কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করা ঠিক নয়। দায়িত্বের প্রকৃত অর্থ হলো, সময় ও পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া। স্যার উদাহরণ দিয়ে বোঝান, সন্তান প্রতিপালন করা পিতা-মাতার দায়িত্ব। সাধারণ অবস্থায় তাকে স্কুল বা মাদ্রাসায় পাঠানো, খাওয়ানো-পড়ানো, এগুলো প্রতিপালনের অংশ। কিন্তু সন্তান অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, পরীক্ষা করানো, চিকিৎসা করানো, এটাও সেই প্রতিপালনেরই অংশ। তখন যদি কেউ বলে, “পড়াশোনা বন্ধ করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছ কেন?” তা তো অর্থহীন কথা। তেমনি একজন ব্যবসায়ীর মূল কাজ দোকান খোলা রাখা ও বেচাকেনা করা। কিন্তু যদি বন্যা এসে দোকানে পানি ঢোকার আশঙ্কা হয়, তখন দোকান বন্ধ করে মালপত্র সরিয়ে নেওয়াই হবে ব্যবসার সঠিক সিদ্ধান্ত। ওই মুহূর্তে দোকান বন্ধ করাও ব্যবসারই অংশ হয়ে যায়। তিনি বলেন, দায়িত্বশীল মানুষ কখনো নিজের দায়িত্বের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকতে পারে না। দায়িত্বের জায়গায় উদাসীন থাকা সঠিক মনোভাব নয়। কেউ যদি শোনে তার সন্তান চুরি করেছে, আর সে বলে, “তাতে আমার কী?”- তাহলে সবাই বিস্মিত হবে। কারণ দায়িত্বশীল মানুষ নিজের দায়িত্বের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকতে পারে না। স্যার বলেন- দায়ী কে? দ্বীনের মেহনতকারী কে? উম্মত কে? যে ব্যক্তি নিজেকে উম্মতের দায়িত্বশীল মনে করে, সে দ্বীনের কাজের ক্ষতির ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকতে পারে না। যদি দ্বীনের কাজের ভেতরে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা ক্ষতির কারণ দেখা যায়, তাহলে মানুষকে সতর্ক করা, সত্য স্পষ্ট করা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা, এটিও দ্বীনের কাজেরই অংশ। স্যার বলতেন, দ্বীনের কাজ শুধু কিছু নির্দিষ্ট আমলে সীমাবদ্ধ নয়। দ্বীনের কাজকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করা, ভুলের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করা এবং প্রয়োজন হলে তার মোকাবেলার চেষ্টা করা, এগুলোও দাওয়াতের কাজেরই অংশ, দ্বীনের মেহনতেরই অংশ। স্যার বলেন, যেখানে দ্বীনের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেখানে নীরব থাকা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। সত্য স্পষ্ট করা এবং মানুষকে সতর্ক করা- এটিও দ্বীনের খেদমতেরই অংশ। এটি দ্বীনের কাজের বাইরে নয়; বরং দ্বীনের কাজকে হেফাজত করারই একটি দিক।
🎤 ৩০৬
স্যার বলেন, সব নেক কাজ সব সময় সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে মুহূর্তে যে কাজটি সবচেয়ে জরুরি, সময় ও পরিস্থিতির দাবি বুঝে সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়াটাই প্রকৃত এলেম। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, দোকানে চুরি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ব্যবসায়ী নাইটগার্ড রাখে। নাইটগার্ড রাখা ব্যবসারই অংশ। কৃষক ধান চাষ করলে জমিতে পোকা ধরলে কীটনাশক ছিটায়, এটাও চাষাবাদেরই অংশ। একজন বাবা তার সন্তানকে পড়াশোনা করাচ্ছে; হঠাৎ যদি সন্তান অসুস্থ হয়ে যায়, তখন তাকে মাদ্রাসায় পাঠানো নয়, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াটাই তখন বড় কাজ। ওই মুহূর্তে চিকিৎসাই হয়ে যায় প্রধান দায়িত্ব। স্যার বোঝাতেন, প্রতিটি কাজেরই একটি নির্দিষ্ট সময় ও অগ্রাধিকার থাকে। যে মুহূর্তে যে কাজটি সবচেয়ে জরুরি- সেটিই তখন বড় কাজ। দ্বীনের ভাষায় এটাকেই বলা হয় হালের তাকাযা, সময়ের দাবি। স্যার বোঝান, দায়িত্বের জায়গায় উদাসীন থাকা বা প্রয়োজনের সময় চুপ করে থাকা কখনো প্রকৃত দ্বীনদারির লক্ষণ নয়। যেমন সন্তান অসুস্থ অথচ তাকে জোর করে পড়াশোনায় বসিয়ে রাখা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়; বরং তার চিকিৎসা করাই তখন সঠিক কাজ। তেমনি দ্বীনের ময়দানেও আমাকে বুঝতে হবে- এই মুহূর্তে আল্লাহ আমার কাছে কী চান।
🎤 ৩০৭
এক হজের সফরে একটি এজেন্সির সঙ্গে ৪৫ দিনের প্যাকেজে চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী মক্কা শরীফে ২০ দিন এবং মদিনা শরীফে ২৫ দিন থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য ব্যবস্থার দায়িত্ব এজেন্সির উপরই থাকবে-এ রকম স্পষ্ট কথা ছিল। মদিনা শরীফে দশ দিন থাকার পর হঠাৎ এজেন্সির মালিক জানালেন, তার অন্যান্য হাজীদের মত আমাদের প্যাকেজ ও নাকি শেষ হয়ে গেছে। মদিনাতে সে দশ দিনের বেশি থাকা খাবার ব্যবস্থা করতে পারবে না, এখন থেকে আমাদের নিজ দায়িত্বে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হল যে তাঁর সঙ্গে তো ২৫ দিন মদিনায় রাখার চুক্তি হয়েছে। সে অনুযায়ী বাকি ১৫ দিনের ব্যবস্থাও তো তাঁরই দায়িত্বে পড়ে। কিন্তু তিনি কিছুতেই তা মানতে রাজি হলেন না। বরং তিনি একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় শিল্প উপদেষ্টা ছিলেন, সেই প্রভাবের একটা ভাবও তার আচরণে ছিল। সেই প্রভাবের দাপটে তিনি আমাদের কোনো অনুরোধই গ্রহণ করলেন না, এমনকি আমাদের কথা শুনতেও চাইছিলেন না। উল্টো তিনি স্যারের কাছে এসে বললেন, “স্যার, আপনার সাথীদেরকে বোঝান যেন তারা বিষয়টা মেনে নেয়।” তখন স্যার তাকে শান্তভাবে বললেন, “না, এটা তো আপনি নিজেরাই চুক্তি করেছেন। এখন কেন আপনি সেই চুক্তি ভঙ্গ করবেন?” কিন্তু তারপরেও তিনি কোনো গুরুত্ব দিলেন না। বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলেন। পরিস্থিতি দেখে স্যার আমাদের বললেন, “তোমরা একটি লিখিত দরখাস্ত বাংলাদেশ হজ মিশনে জমা দাও। অন্যায় হলে তার প্রতিকার চাওয়া উচিত।” স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী দরখাস্ত করা হলো। কিছুক্ষণ পর হজ মিশন থেকে ওই এজেন্সির মালিককে ফোন করে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয় যে হাজিদের সঙ্গে প্রতারণা করলে তার লাইসেন্স পর্যন্ত বাতিল হয়ে যেতে পারে। এরপর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেল। তিনি নিজেই আমাদের কাছে এসে অনুরোধ করতে লাগলেন যেন অভিযোগটি তুলে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বাকি ১৫ দিনের জন্য থাকার-খাওয়ার সব ব্যবস্থাও করে দিলেন। পরে স্যার বললেন, “হজের এজেন্সিগুলোর মধ্যে অনেকেই হাজিদের সরলতা দেখে সুযোগ নিতে চায়। যদি কেউ অন্যায় করে আর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সে আরো সাহস পায়। এজাতীয় অন্যায়ের ক্ষেত্রে সঠিক জায়গায় কথা বলা দরকার। এতে শুধু নিজের অধিকারই রক্ষা হয় না, ভবিষ্যতে অন্য হাজিরাও হয়রানি থেকে বাঁচে।”
🎤 ৩০৮
হাসান হাবিব ভাই বলছিলেন, একবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এক জোর শেষে খানার আয়োজন ছিল। অনেক ছাত্র একসাথে বসে খানা খাচ্ছিল। সেই সময় তিনি স্যারের সাথে এক প্লেটে বসে খানা খাওয়ার সুযোগ পান। ভাই বলেন, আমি লক্ষ্য করছিলাম, খেদমতের সাথীরা স্যারের প্লেটের প্রতি আলাদা কোনো খেয়াল রাখে কি না। সাধারণত দেখা যায়, কোনো মুরুব্বী বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি থাকলে পরিবেশনকারীরা একটু বেশি যত্ন করে; ভালো অংশটা, ভালো গোস্ত, এক চামচ বেশি গোস্ত, মাছের মাথা বা বিশেষ তরকারি আগে এনে দেয়। কখনো ফল বা ভালো খাবারটাও আলাদা করে তুলে দেয়। কিন্তু সেদিন দেখলাম, স্যারের প্লেটে তেমন কিছুই হচ্ছে না। অন্যদের প্লেটে যেমনভাবে খানা পরিবেশন হচ্ছে, স্যারের প্লেটেও ঠিক সেভাবেই হচ্ছে। কোনো বাড়তি কেয়ার বা আলাদা নজর নেই। আমি তখন স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, আমরা যখন জামাতে যাই বা আমির সাহেবের দায়িত্বে থাকি, তখন সাথীরা ‘আমির সাহেব, আমির সাহেব’ বলে খুব বেশি খেয়াল রাখে। ভালো অংশটা আগে দেয়, মাছের মাথা বা এক চামচ বেশি গোস্ত, বিশেষ কিছু এনে প্লেটে তুলে দেয়। কিন্তু আপনার প্লেটে তো এরকম কিছু দেখলাম না।” স্যার সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, “দ্বিপাক্ষিক।” আমি বললাম, “স্যার, দ্বিপাক্ষিক কথাটা ঠিক বুঝলাম না।” তখন স্যার বুঝিয়ে বললেন, তোমার দিল আগে বলে যে, খেদমতের সাথীরা আমির সাহেবের খোঁজ কেন নেয় না; এরপর সাথীরা দৌড়ে তোমার কাছে আসে। তুমি তোমার দিল থেকেই নিজের (আমির সাহেবের) কদর বের করে দাও, তখন আর কোনো সাথী তোমার (প্লেটের) আলাদা খোঁজ নিতে আসবে না। যখন তোমার দিল নিজের মর্যাদা ও গুরুত্বের কথা মনে মনে ভাবতে থাকে, খেদমতের সাথীরা আমির সাহেবের খোঁজ নিচ্ছে না কেন? তখন সেই চাহিদাই সাথীদেরকে টেনে নিয়ে আসে তোমার খোঁজ নিতে। কিন্তু তুমি যদি নিজের দিল থেকেই নিজের কদর বের করে দাও, নিজের জন্য বাড়তি গুরুত্ব আশা না করো, তাহলে মানুষও স্বাভাবিকভাবেই তোমার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করবে।
🎤 ৩০৯
সফরে মদিনায় অবস্থানকালে একবার শনিবার সকালে মসজিদে কুবায় হেঁটে যাওয়ার ফজিলত সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শনিবার মসজিদে কুবায় যেতেন এবং সেখানে নামাজ আদায় করতেন। এ আমলের উমরার সমতুল্য ফজিলত সম্পর্কেও হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। তখন স্যার এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত কথা বলেন। স্যার বললেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কাজ করেছেন বলেই সব কাজ একই স্তরের সুন্নত হয়ে যায় না। কোন আমল শরীয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব, কোনটা সুন্নতে মুয়াক্কাদা, কোনটা মুস্তাহাব বা নফল, এসব নির্ধারণ করেছেন ফুকাহাগণ।” স্যার ব্যাখ্যা করে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন ছিল পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। তাঁর জীবনে অসংখ্য আমল, অভ্যাস ও আচরণ রয়েছে। কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে সেগুলোর গুরুত্ব এক রকম নয়। কোনো আমল তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়মিত করেছেন, কোনোটি মাঝে মাঝে করেছেন, আবার কোনোটি ছিল সাধারণ নফল বা ব্যক্তিগত অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত। এই কারণে ফুকাহাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমগ্র জীবন, তাঁর আমলের ধারাবাহিকতা, গুরুত্ব ও নির্দেশনাকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে শরীয়তের বিভিন্ন পরিভাষা নির্ধারণ করেছেন। স্যার বলেন, “ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদা, সুন্নতে যায়িদা, মুস্তাহাব, নফল, এসব শরীয়তের বিধানের স্তর বোঝানোর জন্য ফুকাহাদের নির্ধারিত পরিভাষা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমল ও নির্দেশনাকে বিশ্লেষণ করে তাঁরা এসব স্তর নির্ধারণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সারা জীবনের আমল ও তার গুরুত্বকে বিবেচনা করে আলেমরা বলেছেন, এটি ওয়াজিব, এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা, এটি সুন্নতে যায়িদা, আর এটি নফল।” উদাহরণ হিসেবে স্যার বলেন, আমরা যে বারো রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজের কথা বলি, “সুন্নতে মুয়াক্কাদা” শব্দটি সরাসরি হাদিসের শব্দ নয়; বরং ফুকাহাদের পরিভাষা। তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমলের ধারাবাহিকতা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে এটিকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তবে স্যার এ কথা বলেননি যে, শনিবার মসজিদে কুবায় যাওয়া সুন্নত নয়। স্যার নিরুৎসাহিত ও করেননি, বরং তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন থেকে প্রমাণিত বিভিন্ন আমলের গুরুত্ব এক নয়; শরীয়তের দৃষ্টিতে তার স্তর নির্ধারণ করেছেন ফুকাহাগণ। শনিবারে মসজিদে কুবায় নামাজ আদায় করা হাদিস শরীফে প্রমাণিত একটি ফজিলতপূর্ণ আমল। স্যার এখানে শুধু তুলে ধরেছেন যে শরীয়তের বিধানের দৃষ্টিতে কোনো আমলের গুরুত্ব নির্ধারণ করার জন্য আলেম ও ফুকাহাদের ব্যাখ্যাকে সামনে রাখতে হয়। তাঁরা গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করেছেন কোন আমল কতটুকু গুরুত্ব বহন করে।
🎤 ৩১০
নওগাঁর ভাই সাগর বলেন, একবার আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল মসজিদে অবস্থানকালে একজন প্রিয় ভাইয়ের পক্ষ থেকে একটি নতুন ডায়েরি উপহার পাই। সেই ডায়েরিতে হযরত স্যার (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)-এর নিকট কিছু দোয়া লিখে দেওয়ার অনুরোধ জানাই।
স্যার অত্যন্ত স্নেহ ও মমতার সাথে নিজের হাতে আরবিতে কিছু দোয়া লিখে দেন (হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পাঁচটি বাক্য শিখিয়েছিলেন, তার মর্মানুযায়ী)। দোয়াগুলো শুধু শব্দের সমষ্টি ছিল না; বরং এর ভেতরে ছিল একজন মুরব্বির আন্তরিকতা, দয়া এবং একজন শায়েখের (শিক্ষকের) হৃদয়ের গভীর অনুভূতি।
- ১. হে আল্লাহ! আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিন।
- ২. আমার উপার্জনকে পবিত্র ও হালাল করে দিন।
- ৩. আমার চরিত্রকে প্রশস্ত, সুন্দর ও উন্নত করে দিন।
- ৪. আপনি আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতে আমাকে সন্তুষ্ট রাখুন।
- ৫. যে বিষয় থেকে আপনি আমাকে দূরে রেখেছেন (আমার তাকদিরে নেই), তার প্রতি আমার মনকে আকৃষ্ট করবেন না।
(অনুবাদ: স্যারের বিভিন্ন বয়ান অবলম্বনে প্রণীত।)
আলহামদুলিল্লাহ, আজও সেই লিখিত দোয়াগুলো আমার কাছে অমূল্য সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত আছে। আমি দৃঢ়ভাবে অনুভব করি, এগুলো কেবল দোয়া নয়; বরং স্যারের পক্ষ থেকে আমার জন্য এক বিশেষ রহমত ও ভালোবাসার নিদর্শন।
ছোট আমল যেমন কারও জন্য দোয়া লেখা বা তার অনুরোধকে গুরুত্ব দেওয়া, স্যার হয়তো মনে করতেন- এগুলো আল্লাহর নিকট অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে এবং মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভাই বলেন, স্যার ছিলেন এমনই একজন দরদী মানুষ, যিনি মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং খালেস দোয়ার মাধ্যমে তাদের হৃদয় জয় করতেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, একজন দাঈ বা দীনের মেহনতকারী ব্যক্তির জন্য মানুষের সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
নোট: স্যারের হাতে লেখা দোয়ায় শব্দে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে; দোয়াটি হাদিসে বর্ণিত দোয়ার মর্মানুযায়ী। স্যার এটি দোয়া হিসেবে লিখেছেন, হাদিস হিসেবে নয়।
🎤 ৩১১
একবার নাটোরের এক পুরাতন জিম্মাদার সাথী বিদেশ সফর (কিছু আরব দেশ) থেকে ফিরে এসে স্যারকে তাঁর সফরের কিছু কারগুজারী শোনালেন। কথার এক পর্যায়ে তিনি বললেন, “স্যার, আমি একটি সফরনামা লিখতে চাই।”
স্যার বললেন, “লিখতে পারো, তবে প্রুফ রিডার ছাড়া কোন পাঠক পাবে না (খেয়াল রাখো, এমন না হয় যে তোমার সেই সফরনামার প্রুফরিডার ছাড়া আর কোনো পাঠক না থাকে!)”। এই সংক্ষিপ্ত কথার মধ্যে স্যার একটি গভীর ইঙ্গিত দিলেন, শুধু লেখা নয়; এমন লেখা হওয়া দরকার, যা মানুষের উপকারে আসে, মানুষের কাছে পৌঁছে এবং পাঠকের অন্তরে প্রভাব ফেলে।
এক ভাই একটি ঘটনা বললেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র চিল্লা থেকে এসে পড়াশোনা ছেড়ে এলাকায় চলে গেছে। পরে তার এলাকায় একবার সফরে গিয়ে দেখা গেল পোস্টারে তার নামের আগে লেখা- “বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ...”। এই কথা শুনে স্যার হালকা মুচকি হাসলেন। সরাসরি কিছু না বলে, ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিতে একই শব্দ উচ্চারণ করলেন, “বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ!” এই ছোট্ট প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই একটি বড় শিক্ষা ছিল।
প্রাসঙ্গিক আলোচনায় আরও কিছু বিষয় উঠে আসে, অনেক সময় দেখা যায়, কেউ ভালো নিয়তে উম্মতের উপকারের জন্য বই লিখছেন। অনেক পরিশ্রম করছেন, সময় ও অর্থ ব্যয় করছেন, বই প্রকাশ করছেন। কিন্তু সেই বইয়ের পাঠক তৈরি হয় না। বইগুলো মাদ্রাসায় জমে থাকে, লাইব্রেরিগুলো নিতে চায় না। পরে কোনো মেহমান এলে উপহার হিসেবে দিয়ে জায়গা খালি করা হয়। আর যিনি বই নিয়ে যান, তিনি হয়তো সেটি পড়েনও না, শুধু তাকেই সাজিয়ে রাখেন।
স্যার বলেন, শুধু পরিশ্রম করলেই যথেষ্ট নয়; কাজের ভেতরে এমন মান, গভীরতা ও প্রয়োজনীয়তা থাকা দরকার, আর তার চেয়েও বড় দরকার, মানুষের অন্তরে পৌঁছাতে পারে এমন ইখলাস। স্যার বলেন, লেখালেখি, বক্তৃতা, নেতৃত্ব- এসব বিশেষ যোগ্যতা, গভীরতা ও ইখলাসের বিষয়। নিজেকে বড় করে উপস্থাপন করার চেয়ে নিজের ভেতরকে গড়ে তোলা বেশি জরুরি। যোগ্যতা, ইখলাস ও গভীরতা ছাড়া কোনো খেদমত স্থায়ী প্রভাব ফেলে না। যে ব্যক্তি নিঃশব্দে নিজের যোগ্যতা তৈরি করে, আল্লাহ তাআলাই সময় হলে (কবুল করলে) তাকে (কৃত খেদমতকে) মানুষের অন্তরে স্থান করে দেন।
🎤 ৩১২
রাজশাহীতে কাজল ভাইয়ের বাসায় একবার এক ঘরোয়া বৈঠকে, মাহফুজ ভাইসহ দুই একজন সাথী ছিলেন, কোনো আনুষ্ঠানিক বয়ান বা মোজাকারা ছিল না; বরং প্রসঙ্গক্রমে চলা এক ঘরোয়া বৈঠক। কথার এক পর্যায়ে স্যার বাংলা সাহিত্যের এক কবি, কবি মুহাম্মদ রফিক এর একটি বহুল আলোচিত উক্তি “সব শালা কবি হবে” তুলে ধরেন, যা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে আলোড়ন তুলেছিল।
স্যারের ছাত্রজীবনে এই কবির সাথে পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা একই বর্ষের ছিলেন এবং একই কক্ষে থাকতেন। সে সময় দেশ ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে, রাষ্ট্রপ্রধানের লিখা কবিতা তখনকার বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় ‘বিশেষ মর্যাদা’য় প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। কবি মোহাম্মদ রফিক তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক অবক্ষয়কে তুলে ধরেছিলেন তার এক কবিতার মাধ্যমে। সেই বিখ্যাত ‘খোলা কবিতা’র দুঠো পংক্তি এরকম-
- ‘সব শালা কবি হবে; পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে, উড়বেই;
- বন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই।’
কবি রফিক-এর ঔ উক্তিটা উল্লেখ করে গভীর একটা বাস্তবতা স্যার নিয়ে এসেছিলেন। স্যার বোঝান, সব কাজ সবার জন্য না, দেখাদেখি করে কিছু হওয়া যায় না, শুধু অন্য কাউকে দেখে অনুকরণ করলে সত্যিকারের যোগ্যতা তৈরি হয় না।
স্যার বলেন, কেউ একজন ভালো বক্তা, তাকে দেখে আমিও বক্তা হতে চাই; কেউ বই লিখছে, আমিও লিখতে শুরু করি; কেউ দাওয়াতের কাজে পরিচিত, আমিও একইভাবে পরিচিত হতে চাই; এখানে সমস্যা ইচ্ছার মধ্যে না, ইচ্ছার পেছনের মানসিকতায়। আসল সমস্যা কোথায়? যখন চিন্তা হয়, “ও করছে, আমিও করব”; “ওর নাম হচ্ছে, আমারও হওয়া দরকার”; তখন কাজটা হয় ’অনুকরণ’, ’প্রতিযোগিতা’, বা কখনো ’নামের লোভ থেকে’। কিন্তু তখন থাকে না: গভীরতা, প্রস্তুতি, ইখলাস; ফলে বাইরে কাজটা একই রকম দেখালেও, ভেতরে শক্তি থাকে না।
কোনো ভালো মানুষকে দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া অবশ্যই ভালো। কিন্তু তার কাজের অনুকরণের পূর্বে চিন্তা হওয়া উচিত, “আমি কি এই কাজের জন্য উপযুক্ত, আমার এটার জন্য কি প্রস্তুতি আছে, আমার ভেতরে কি এই কাজের হক আদায় করার যোগ্যতা আছে?”
স্যার বলেন, মহান দাঈ ও বক্তা আলী মিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি (আবুল হাসান আলী নদভী) সারা পৃথিবী ঘুরে অসাধারণ বক্তৃতা দিয়েছেন। তাঁকে দেখে অনেকেই বক্তা হতে চায়। স্যার বলেন, চেষ্টা করলেই সবাই বক্তা হয়ে যায় না। একইভাবে লেখালেখির প্রসঙ্গে স্যার বলেন, লেখা সবাই পারে, কিন্তু লেখক সবাই না। তিনি উদাহরণ দেন, হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি- এর জীবনী যদি আমরা লিখতাম, হয়তো দশ ভলিউম লিখে ফেলতাম, কিন্তু ভেতরে থাকত না কিছুই; অথচ আলী মিয়া তাঁর জীবন নিয়ে ছোট্ট একটি কিতাব (দ্বীনি দাওয়াত) লিখেছেন, এইটা একটা প্রাণবন্ত জীবনী।
স্যার বলেন, কিতাব লেখা, জীবনী লেখা সহজ কাজ নয়; গভীরতা, উপলব্ধি ও আমল না থাকলে শুধু শব্দ দিয়ে বই হয়, কিন্তু উপকার হয় না। মিম্বারে উঠে কথা বললেই বক্তা হওয়া যায় না, কবিতা লিখলেই কবি হওয়া যায় না, নামে বই প্রকাশ হলেই লেখক হওয়া যায় না। এগুলো বিশেষ যোগ্যতার বিষয়, মেহনতের বিষয়, এবং আল্লাহর দেওয়া বিশেষ অনুগ্রহ।
🎤 ৩১৩
একবার বিশ্ব ইজতেমায় ইয়েমেন থেকে তিনজন সম্মানিত শায়েখ আগমন করেন। তাঁরা সবাই হাশিমি বংশের, ইয়েমেনের হাদরামাউত অঞ্চলের প্রসিদ্ধ মাদ্রাসার উস্তাদ এবং তাসাউফের বড় মাশায়েখ (পীর) ছিলেন। ইজতেমার আরব টেন্টে তাঁদের উপস্থিতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। মিশরের জিম্মাদার সাথী আব্দুল মোনায়েম আব্দেল্লাহকে তাঁদের খেদমতে নিয়োজিত করা হয়। ইজতেমা শেষে তাঁরা তিন দিনের জন্য সময় দিতে সম্মত হন। তাঁদের জামাতের রুখ করা হয় সিলেটের হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাজার মসজিদে; সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক মতে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহি আলাইহির জন্মও ইয়েমেনের হাদরামাউত অঞ্চলে এবং তিনি ও আরবের বিখ্যাত হাশিমি বংশীয় ছিলেন। সেই জামাতে স্যারকেও সাথে যাওয়ার জন্য বলা হয়।
ময়দান থেকে জামাত রওনা দিল। পথে মাগরিব পড়া হলো মাদানীনগর মাদ্রাসায়। এরপর শীতের রাতে গাড়ি চলতে লাগল সিলেটের দিকে। রাস্তা ছিল ভাঙাচোরা অন্ধকার ও কষ্টকর, তার সাথে ছিল প্রচণ্ড কুয়াশা। এক পর্যায়ে গভীর রাতে ড্রাইভার পথ ভুল করে অন্যদিকে চলে যায়। রাত প্রায় দুইটা-আড়াইটার সময় গাড়ি নরসিংদী পার হয়ে কোনো এক এলাকায় ঢুকে পড়ে।
সেখানে পথ খোঁজার জন্য যেখানে থামা হলো, পার্শ্ববর্তী একটি বাড়িতে ঘটনাক্রমে সেই সময় কোনো উপলক্ষে অতিথিপরায়ণতার আয়োজন ছিল। মাঝরাতে ভূলপথে পৌঁছে জামাতের জন্য খানা পিনা, চা-নাস্তা ও উত্তম আপ্যায়নের ব্যবস্থা হয়ে গেল। ইয়েমেনি শায়েখগণ বিস্মিত হয়ে গেছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কোথায় এসেছেন, কিছুই জানা নেই; আবার ড্রাইভার করেছে রাস্তা ভুল, ভূল পথে আবার আল্লাহপাক রেখেছেন রিজিক, হয়ে গেল উত্তম খানাপিনাও চা নাস্তার ব্যবস্থা।
খানা শেষে গাড়ি চলা শুরু হলে পথিমধ্যে এক সাথী কুরআন শরীফের সূরা আশ-শূরা এর একটি আয়াত পাঠ করলেন এবং এর অর্থ জানতে চাইলেন: “اللّٰهُ لَطِيفٌ بِعِبَادِهِ يَرْزُقُ مَن يَشَاءُ وَهُوَ الْقَوِيُّ الْعَزِيزُ”
স্যার সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি আসলে কী জানতে চাচ্ছেন। স্যার সংক্ষেপে বললেন, “লতিফ সেই সত্তা, যিনি বান্দার অন্তরের গভীর প্রয়োজন ও গোপন চাহিদা সূক্ষ্মভাবে জানেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা করেন।” ছিল প্রয়োজন, পথ ভুল হয়েছে কিন্তু সেটাই হয়ে গেল রিজিকের দরজা। ঘটনাটি যেন সেই আয়াতের জীবন্ত তাফসীর হয়ে উঠল।
অন্য এক প্রসঙ্গে স্যার একবার বলেন, আল্লাহ তাআলার “লুতফ (لُطف)” বা সূক্ষ্ম অনুগ্রহ অনেক সময় আমরা সাথে সাথে বুঝতে পারি না। কোনো ঘটনা আমাদের কাছে বিপদ বা ভুল মনে হতে পারে, কিন্তু তার ভেতরেই আল্লাহ তাআলা অদৃশ্যভাবে রহমত ও ব্যবস্থা রেখে দেন।
🎤 ৩১৪
রংপুরের ভাই সাজ্জাদ বলেন, তাদের মহল্লার এক সাথী, ভাই রিপন, একবার জামালপুরের এক সাথীর সাথে চিল্লায় যান। চিল্লার শেষে সেই জামালপুরের সাথী ব্যক্তিগত প্রয়োজনে রিপন ভাইয়ের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা কর্জ নেন। সময় শেষে রিপন ভাই নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর তিনি টাকা ফেরত চাইলেও, ওই সাথী বারবার “দিচ্ছি, দিচ্ছি” বলে দেরি করতে থাকেন। এভাবে অনেকদিন কেটে যায়, একসময় যোগাযোগও প্রায় বন্ধ করে দেন। প্রায় এক বছর পার হয়ে যায়, কিন্তু টাকা আর ফেরত আসে না। এই অবস্থায় ভাই রিপন ভাই সাজ্জাদকে একদিন বলেন, “তুমি তো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছো, সুযোগ পেলে বিষয়টা স্যারকে বলে দেখো, কোনোভাবে যদি টাকাটা উদ্ধার করা যায়।” ভাই সাজ্জাদ একদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে স্যারের সাথে দেখা করে বিষয়টি খুব সাধারণভাবে তুলে ধরেন, “স্যার, এমন একটি ঘটনা, এ ব্যাপারে কি করা যায়?” বিষয়টি বাহ্যিকভাবে দেখলে স্যারের সাথে এর কোনো সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। একজন রংপুরে, একজন জামালপুরে, স্যার রাজশাহীতে। তবুও স্যার বিষয়টিকে নিজের দায়িত্বের মতো গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করলেন। ভাই বলেন, কিছুদিন পর স্যার আমাকে ডেকে জামালপুরের একজন দায়িত্বশীল সাথীর যোগাযোগের নম্বর দিলেন। তিনি সম্ভবত সেখানকার মারকাজের শূরার সাথী ছিলেন। স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী তার সাথে যোগাযোগ করা হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রিপন ভাইয়ের টাকা সহজেই উদ্ধার হয়ে যায়। ভাই বলেন, স্যার শুধু বড় বড় বয়ান বা নসিহতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং মানুষের বাস্তব সমস্যাকেও গুরুত্ব দিতেন। একজন মুমিনের হক নষ্ট হলে তা আদায়ের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া, এটিও যে দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, ভাই রিপনের এই ঘটনাকে নিজের দায়িত্বের মধ্যে নিয়ে স্যার তা বাস্তবভাবে বুঝিয়েছেন।
🎤 ৩১৫
একবার আল্লাহর রাস্তায় (তাবলিগে) সময় লাগানো অবস্থায় স্যার এক কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হন। সেই সময় তাঁর মেয়ে হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন, অবস্থা একেবারে সংকটজনক। পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি এতটাই আশঙ্কাজনক ছিল যে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা জরুরি হয়ে পড়ে। স্যারের বড়ভাই (হেদায়েত আহমদ চৌধুরী, তখন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান) সহ আত্মীয়স্বজন দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করান এবং চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করেন।
ঠিক পরদিন সকালে কাকরাইল থেকে হাজী আব্দুল মুকিত সাহেব কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে নিয়ে স্যারকে রাহবার করে বড়ভাইয়ের দফতরে গাসতে (সাক্ষাতে) যান। রিসেপশন থেকে নাম পাঠানোর পর বড়ভাই সবাইকে ভেতরে ডাকার আগে শুধু স্যারকে একা ডেকে পাঠান। ভেতরে ঢোকার পর তিনি স্যারকে কঠোরভাবে শাসন করেন এবং প্রচণ্ড কড়া ভাষায় বললেন, "মেয়ে মারা যায় যায় অবস্থা, আর তুমি তবলিগে ঘুরে বেড়াচ্ছো?" এরপর আবার সবাইকে ভেতরে ডেকে স্বাভাবিকভাবে হাসিমুখে কথা বলেন ও আপ্যায়ন করে বিদায় দেন। কিন্তু স্যারকে যে ধমকটি দিয়েছিলেন, তা তিনি একান্তভাবেই দিয়েছিলেন।
স্যার যখন বাড়িতে ফিরলেন, তখন মনে তীব্র ভয় ও সংকোচ ছিল। ভাবছিলেন, বাড়িতে হয়তো সবাই খুব রাগ করে আছেন এবং পরিবেশ বেশ উত্তপ্ত হবে। এমন সংকটের সময় বাসায় স্বাভাবিকভাবে অনেক অস্থিরতা থাকার কথা। কিন্তু তেমন কিছুই নেই, বাসার পরিস্থিতি আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত ও স্বাভাবিক; তিনি অবাক হয়ে বিষয়টি লক্ষ্য করেন, কোনো অস্থিরতা বা হৈচৈ নেই।
পরে জানা গেল, এর পেছনের কারণটি ছিল স্যারের আহলিয়ার (স্ত্রী) দেখা একটি স্বপ্ন। সেই রাতে স্যারের আহলিয়া স্বপ্নে দেখেন, এক ব্যক্তি ছুরি নিয়ে বাসায় প্রবেশ করে বলছে,
“মুসফিককে তো পেলাম না, আতিককে মেরে গেলাম।”
(আতিক- স্যারের ছোট ভাই, ইসতিয়াক আহমদ চৌধুরী)
বাস্তবে দেখা গেল, সেই সংকটময় অবস্থায় স্যারের মেয়ে সুস্থ হয়ে উঠলেন, কিন্তু আতিক সাহেবের মেয়ে ইন্তেকাল করেন। এই স্বপ্ন থেকে স্যারের আহলিয়া তাবির করেছেন, আল্লাহর রাস্তায় থাকার কারণেই হয়তো আল্লাহ তাদের সন্তানকে হেফাজত করেছেন।
স্যার এই ঘটনাকে আরেকভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বাস্তবমুখী দিক থেকে বলেন, ”আমি উপস্থিত থাকলেও জাহেরী (জাগতিক) কোনো ব্যবস্থা সহজ হতো- এমন না, বরং না থাকাতেই বাহ্যিক ব্যবস্থাটা আরও সহজ হয়েছে। ভাই ও আত্মীয়রা দায়িত্ব নিয়ে দ্রুত সব ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। তাদের তৎপরতায় দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স, ভালো হাসপাতাল ও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা সহজ হয়েছে। আমি থাকলে হয়তো সবাই ভাবত, ‘মুসফিক তো আছেই’। কিন্তু আমি না থাকায় আল্লাহ তাআলা অন্যদের মাধ্যমে কাজগুলো সহজ করে দিয়েছেন।”
নোট: আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার জন্য এমনভাবে ফয়সালা করেন, যা অনেক সময় পরে গিয়ে বুঝা যায়। কখনো কখনো বান্দার অনুপস্থিতিই কল্যাণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে স্যার এই ঘটনা দিয়ে বুঝিয়েছেন, দায়িত্বহীনতা গ্রহণযোগ্য। বরং যার উপর দায়িত্ব রয়েছে, সে যথাসাধ্য ব্যবস্থা করবে এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখবে- এ বিষয়েও স্যারের সুস্পষ্ট মুজাকারা রয়েছে।
🎤 ৩১৬
একবার খবর এলো আব্দুস সোবহান স্যার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, যদিও তখনো তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। সে সময় স্যার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে অবস্থান করছিলেন। এ খবর শোনার পর স্যার উনার সাথে সাক্ষাৎ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
পরবর্তীতে অফিস সময়ে প্রথম বিজ্ঞান ভবনে আব্দুস সোবহান স্যারের চেম্বারে গিয়ে দেখা করা হয়। সেখানে স্যার অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দরদের সাথে উনার সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। মনে হচ্ছিল একজন অভিভাবক যেন নিজের সন্তানের মতো কাউকে বড় একটি দায়িত্বে যাওয়ার আগে উপদেশ দিচ্ছেন।
কথার এক পর্যায়ে স্যার দায়িত্ব (জিম্মাদারি) সম্পর্কে একটি গভীর বিষয় তুলে ধরেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু-এর একটি প্রসিদ্ধ উক্তি উল্লেখ করেন, “দজলা নদীর তীরে একটি বকরিও যদি অযত্নে মারা যায়, তবে আমার ভয় হয় যে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আমাকে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।”
এরকম আরেকটি কথা প্রচালিত আছে, ইরাকের কোনো রাস্তায় যদি একটি খচ্চরের পা গর্তে পড়ে যায়, বা হোঁচট খায়, তবে উমরকে জিজ্ঞেস করা হবে: কেন তুমি তার জন্য রাস্তা সমান করে দাওনি?
স্যার বলেন, বাস্তবিক দৃষ্টিতে তো মদিনা থেকে বহু দূরে দজলা নদীর পাড়ে কী ঘটছে, তা জানা একজন শাসকের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু সেই ছাগলের ব্যাপারেও নিজের দায়িত্ব অনুভব করছেন; এই কথার মাধ্যমে উমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ‘দায়িত্বের অনুভূতি’ বুঝিয়েছেন।
একজন উপাচার্যের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণে কী ঘটছে, তা সরাসরি জানা সম্ভব নয়। স্যার বলেন, একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির জন্য সবকিছু জানা সম্ভব নয়, কিন্তু তার অন্তরে যদি দায়িত্বের ফিকির থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে সাহায্য করেন।
যদি দায়িত্ববোধ জাগ্রত থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা কাজকে সহজ করে দেন এবং অনেক অদেখা বিষয় থেকেও হেফাজত করেন। স্যার আরও ইঙ্গিত দেন- দায়িত্বের সাথে সাথে শত্রুতা, বিরোধিতা ও বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ এসে থাকে। দায়িত্বশীল ব্যক্তির উচিত আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত রাখা, নিয়মিত দোয়া ও যিকিরে থাকা এবং বিশেষভাবে ‘মানযিল’ পড়ার প্রতি যত্নবান হওয়ার ব্যাপারে স্যার তাকিদ দেন, যাতে আল্লাহ তাআলার হেফাজত লাভ করা যায়।
স্যার বোঝান, দায়িত্ব শুধু একটি পদ নয়; এটি একটি আমানত। এর সাথে জবাবদিহিতা জড়িত। সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না হলেও, অন্তরে যদি জবাবদিহিতার সঠিক ফিকির ও দায়িত্ববোধ থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা সাহায্য করেন এবং কাজকে সহজ করে দেন।
🎤 ৩১৭
ভাই আব্দুল কাইয়ুম বলেন, একবার নারায়ণগঞ্জে সফরে এক মসজিদের জামাতের সাথীরা এসে স্যারকে দাওয়াত দিলেন। তারা বললেন, "স্যার, আমাদের পক্ষ থেকে পুরো জামাতের জন্য দাওয়াত।" স্যার এই দাওয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তিনি স্পষ্টভাবে বললেন, "‘আমাদের পক্ষ থেকে’, এমন কোনো দাওয়াত হয় না।" মহল্লার সাথীরা নাছোড়বান্দা; তারা জোর দিয়ে বলতে লাগলেন যে তারা সবাই মিলে জামাতকে খাওয়াতে চান। স্যার প্রশ্ন করলেন, "কে খাওয়াবে?" তারা উত্তর দিলেন, "আমরা খাওয়াবো।" স্যার অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বললেন, "এই ‘আমরা’ বলতে কোনো দাওয়াত হয় না। কে দাওয়াত দিচ্ছে, দাওয়াত হতে হবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে।" পরবর্তীতে একজন সাথী যখন আলাদাভাবে এসে বললেন, "স্যার, এই বেলার খাবার আমার পক্ষ থেকে দাওয়াত।" তখন স্যার বললেন, "হ্যাঁ, এটা ঠিক আছে। এই দাওয়াত গ্রহণ করা যায়।"
ভাই বলেন, সবাই মিলে চাঁদা তুলে একবেলা, একদিন বা তিনদিন খাওয়ানোকে স্যার প্রকৃত মেহমানদারী মনে করতেন না। স্যার বলতেন, দাওয়াত কেবল পেট ভরার মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি ইবাদত। আর ইবাদতে ব্যক্তির নিষ্ঠা (ইখলাস) ও নির্দিষ্ট সংকল্প প্রয়োজন। তাই দাওয়াত দেওয়ার সময় ‘আমরা’ নয়, বরং ‘আমি’ বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে হওয়াটাই উত্তম। স্যার চেয়েছিলেন দাওয়াত যেন কোনো "মসজিদওয়ার জামাত" বা "কমিটি" বা "অজ্ঞাত গোষ্ঠী"র পক্ষ থেকে না হয়ে নির্দিষ্ট কোনো বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়। স্যার চাচ্ছিলেন সাথীরা যেন মেহমানদারীকে একটি ‘সামাজিক অনুষ্ঠান’ না বানিয়ে বরং ‘ব্যক্তিগত ইবাদত’ হিসেবে গ্রহণ করে।
🎤 ৩১৮
এক মুজাকারায় স্যার দ্বীনি মেহমানদারী ও তাবলীগী উসূলের সূক্ষ্ম কিছু আদব বলেছিলেন। স্যার বলেন, দ্বীনের কাজে বের হওয়া জামাতের মেহমানদারী কোনো সামাজিক লৌকিকতা বা প্রথা নয়। যখন বলা হয় "আমরা খাওয়াবো" বা মহল্লার পক্ষ থেকে চাঁদা তুলে খাওয়ানো হয়, তখন তাতে ব্যক্তিগত আন্তরিকতা বা ‘ইকরাম’ (সম্মান) এর চেয়ে একটি ‘অনুষ্ঠান’ বা ‘রুটিন’ কাজ বেশি প্রকাশ পায়। আর দাওয়াত যখন নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকে হয়, সেখানে মেজবানের সাথে মেহমানের একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
স্যার বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কোনো কিছু দান করা বা মেহমানদারী করার জন্য ‘মালিকানা’ স্পষ্ট হওয়া জরুরি। যখন বলা হয় ‘আমাদের পক্ষ থেকে’ এবং এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি খরচ না করে বরং চাঁদা বা অস্পষ্ট কোনো উৎস থাকে, তখন সেখানে মেজবান (যিনি খাওয়াচ্ছেন) কে, তা অস্পষ্ট থেকে যায়। যখন একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি দাওয়াত দেন, তখন তার অন্তরে মেহমানের প্রতি যে মহব্বত ও ত্যাগের জজবা থাকে, "আমাদের" বা "কমিটির" দাওয়াতের ক্ষেত্রে অনেক সময় সেই ব্যক্তিগত রুহানিয়াত বা আন্তরিকতা থাকে না।
নির্দিষ্ট ব্যক্তি যখন বলেন "আমার দাওয়াত", তখন তিনি মেহমানের প্রতিটি লোকমার সওয়াব নিজের জন্য আশা করেন এবং মেহমানের সর্বোচ্চ খেদমত করার চেষ্টা করেন। "আমরা" শব্দের আড়ালে অনেক সময় দায়িত্বহীনতা বা লৌকিকতা লুকিয়ে থাকে। মেহমানদারীর মূল প্রাণ হলো ‘ইকরাম’। যখন মহল্লার পক্ষ থেকে বা কমিটির পক্ষ থেকে খানা আসে, তখন সেটি কেবল একটি ‘অর্ডার’ বা ‘প্রথা’ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যখন একজন ব্যক্তি তার ঘর থেকে খানা নিয়ে আসেন, তখন সেই খানার সাথে তার মহব্বত ও দোয়া শামিল থাকে। স্যার মূলত এই ব্যক্তিগত আত্মিক সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছেন।
স্যারের অভিমত ছিল, মহল্লায় জামাত আসলে কে খাওয়াবে, তা নিয়ে মসজিদে বসে মাশওয়ারা (পরামর্শ) করা বা চাঁদা তোলা তাবলীগী উসূলে কাম্য নয়। কারণ, এতে অনেক সময় কারো ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বরং নিয়ম হলো, মহল্লার সাথীরা ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহ নিয়ে জামাতের জিম্মাদারকে দাওয়াত দেবেন। জামাতের জিম্মাদার বা আমীর যখন কোনো দাওয়াত গ্রহণ করবেন, তখন তাকে নিশ্চিত হতে হবে যে এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির আন্তরিক দাওয়াত কি না। "মহল্লার দাওয়াত" হিসেবে নয়, বরং "অমুক ভাইয়ের দাওয়াত" হিসেবে তা গ্রহণ করা উচিত। এতে মেজবানের ইখলাস বজায় থাকে এবং মেহমানের প্রতি তার ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ তৈরি হয়।
স্যার বলতেন, "আমাদের দাওয়াত" বললে সেটি একটি ‘প্রথা’ বা ‘রুটিন’ হয়ে যায়, জামাতকে খাওয়ানোর জন্য মসজিদ ভিত্তিক চাঁদা তোলা বা ‘সবাই মিলে’ কোনো আয়োজন করাতে অনেক সময় কারো ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে (কেউ হয়তো লোকলজ্জার ভয়ে চাঁদা দিচ্ছে)। বরং মেহমানদারী খাওয়ানোর দ্বারা দাতা (মেজবান) ও গ্রহীতার (মেহমানের) মাঝে একটি মহব্বতের সম্পর্ক তৈরি হওয়া চাই।
🎤 ৩১৯
একবার এক ভাই স্যারের নিকট গাইবান্ধার জনৈক পুরাতন সাথীর সংবাদ দিলেন। তিনি জানালেন যে, ওই ব্যক্তি তার পৈতৃক কিছু জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন। সংবাদটি শোনামাত্র স্যার রীতিমতো চমকে উঠলেন এবং বিচলিতভাবে এর কারণ জানতে চাইলেন। ভাইটি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "স্যার, সামান্য জমি বিক্রির কথা শুনে আপনি এতটা আঁতকে উঠলেন কেন?"
তখন স্যার যে উত্তর দিলেন, তা হলো- "তেমন কিছু নয়, তবে সাধারণত সমাজে দুই শ্রেণির মানুষের দেখা মেলে। এক শ্রেণির মানুষের নেশা হলো জমি কেনা, আর অন্য শ্রেণির নেশা হলো জমি বিক্রি করা।"
স্যার বিষয়টি বুঝিয়ে বললেন: যাদের রক্তে জমি কেনার নেশা মিশে আছে, তারা সারাজীবন অতি সাধারণ ও কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন। তারা নিজেদের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে তিল তিল করে সম্পদ বৃদ্ধিতে মগ্ন থাকেন। নিজের জীবনকে অত্যন্ত কষ্টকর বা 'ফকিরের হাল' করে রাখে, মৃত্যুর সময় ১০০ বিঘা জমি (বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি) রেখে যায়।
বিপরীত দিকে, যাদের একবার জমি বিক্রির নেশা বা অভ্যাস ধরে যায়, তারা ছোটখাটো প্রয়োজন বা বিলাসিতার অযুহাতে সম্পদ হাতছাড়া করতে শুরু করে। একবার এই পথ উন্মুক্ত হলে তা আর থামতে চায় না। ফলশ্রুতিতে, এক সময়ের সচ্ছল ব্যক্তিও একদিন নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে পড়ে। বর্ণনাকারী ভাইটি বলেন, স্যার সেদিন ওই সাথীর ব্যাপারে যে আশঙ্কা করেছিলেন, পঁচিশ বছর পর আজ তা-ই অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। সম্পদ ধরে রাখার মানসিকতা হারিয়ে আজ সেই ব্যক্তি সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও উদ্বাস্তু জীবন যাপন করছেন।
🎤 ৩২০
হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একবার একটি কঠোর বাক্য ব্যবহার করেছিলেন, اُمْصُصْ بَظْرَ اللَّاتِ
(এটি আরবদের ভাষায় অত্যন্ত অশালীন গালি ছিল, মক্কার প্রধান দেবী 'লাত' প্রাসঙ্গিক তৎকালীন আরবে এটি ছিল চরম অবমাননাকর একটি গালি, যা অত্যন্ত অবজ্ঞাভরে ব্যবহৃত হতো)।
হোদায়বিয়ার সন্ধির সংকটময় মুহূর্তে মক্কার কুরাইশ প্রতিনিধি উরওয়া ইবনে মাসউদ যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি অবমাননাকর ইঙ্গিত করেছিলেন, এবং তার ধৃষ্টতাপূর্ণ কথার জবাবে তখন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে তাদের প্রিয় দেবীর নাম উল্লেখ করে এই কঠোর শব্দ প্রয়োগ করেছিলেন, যাতে তারা বুঝতে পারে তাদের অবস্থান কতটা তুচ্ছ।
সাধারণ দৃষ্টিতে এটি অন্যের উপাস্যকে গালি না দেওয়ার কুরআনী নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। যাতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কোরআন শরীফে তো স্পষ্টভাবে অন্যের উপাস্যদের গালমন্দ করতে নিষেধ করা হয়েছে,
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ
তাহলে একজন মহান সাহাবী এমন কথা কীভাবে বললেন? এই বিষয়টি পরিষ্কার হবার জন্যই হযরত মাওলানা সাইয়েদ আহমদ খান সাহেবের নিকট স্যার দশ দিনের জোরে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিলেন।
তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ পাল্টা প্রশ্ন করলেন-
کیا ابو بکر نبی تھے؟ ابو بکر نبی تھے؟ “আবু বকর কি নবী ছিলেন?”
তিনি একই প্রশ্ন দু’বার করলেন। স্যার আবার ওই একই প্রশ্ন করলেন, এবারও হযরত মাওলানা সাহেব স্যার কে আবার ওই একই কথা জিজ্ঞাসা করলেন যে, আবুবকর কি নবী ছিলেন? স্যারের ভাষায় এই সংক্ষিপ্ত প্রশ্নই তখন বিষয়টির প্রকৃত উপলব্ধির পথ উন্মুক্ত করে দিল। হযরত মাওলানা সাহেবের শিক্ষা হলো, কাউকেই নবীর সমপর্যায়ে নেওয়া যাবে না।
মাওলানা সাইয়েদ আহমদ খান সাহেব এই প্রশ্নের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছিলেন, হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবীদের একজন, কিন্তু তিনি নবী নন। আর ইসলামের আকিদা অনুযায়ী, ভুল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত (মাসুম) কেবল নবীগণই। নবী ব্যতীত যেকোনো কারো দ্বারা ইজতিহাদি বা পরিস্থিতিগত ভুল হতে পারে। সাধারণ মানুষ, এমনকি সাহাবীরাও, মানবীয় সীমাবদ্ধতার বাইরে নন।
স্যার বলেন, হযরত মাওলানা সাহেবের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর প্রশ্নের (উত্তরের) মাঝে লুকায়িত ছিল ইসলামের এক মৌলিক আকিদা। নিষ্পাপত্ব কেবল নবীদের গুণ: ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, একমাত্র আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামগণই 'মাসুম' বা ভুলের ঊর্ধ্বে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সর্বক্ষণিক সঙ্গী হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু-এর সেই উক্তিটি ছিল তাঁর তীব্র আবেগ ও নবীপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ।
🎤 ৩২১
এক মোজাকারায় স্যার বলেন, কোনো পীর, আলেম, মুরুব্বী, বুযুর্গ- এমনকি সাহাবীকেও নবীদের পর্যায়ে উঠিয়ে দেওয়া যাবে না। “তিনি ভুল করতে পারেন না”, এই ধারণা শুধুমাত্র নবীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মানুষের প্রতি অতিরঞ্জিত ভক্তি থেকে যদি তাকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা হয়, তাহলে তা আকিদাগত বিচ্যুতি হয়ে যায়।
এটি নবীদের বিশেষ মর্যাদা, যা অন্য কারো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ
إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ
“তিনি (নবী) নিজের প্রবৃত্তি থেকে কিছু বলেন না। এটি তো কেবলই ওহী, যা তাঁর কাছে প্রেরিত হয়।”
স্যার বলেন, মুরুব্বিদের প্রতি সম্মান রাখা আর তাঁদেরকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা, এই দুইয়ের মাঝে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে পীর-মাশায়েখ বা মুরুব্বিদের এমন এক উচ্চাসনে বসানো হয়, যেন মনে হয় তাঁরা ভুল করতেই পারেন না, এমনকি তাদের ভুল কাজকে ভুল মনে করা হয় না। এটি একটি ভুল আকিদা। মুরুব্বিদের ভুল হতে পারে এবং সেই ভুলকে ভুল হিসেবেই দেখতে হবে। আমাদের জন্য আদর্শ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্পষ্ট বিধান। স্যার সতর্ক করে বলতেন, মুরব্বি, পীর বা যেকোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের প্রতি ভালোবাসা যেন অন্ধত্বে রূপ না নেয়।
স্যার এই বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে জোর দিয়ে বুঝাতেন যে, আমাদের মুরুব্বি, আলেম বা নেতা, যেই হোন না কেন, তারা সম্মানের যোগ্য, কিন্তু তারা মানব। তাদের কথা ও কাজ কোরআন-সুন্নাহর আলোকে যাচাইযোগ্য। অন্ধ অনুসরণ ইসলাম সমর্থন করে না।
🎤 ৩২২
রাজশাহীর এক পুরাতন জিম্মাদার সাথী একবার সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে দাঁড়ান। স্যার সফর থেকে ফিরে এ খবর শুনে কাজল ভাইকে বললেন, “চলো, ওর সাথে একটু দেখা করে আসি।”
দু’জনে তাঁর বাসায় গেলেন। তিনি স্যারকে ভেতরে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছিলেন, কিন্তু স্যার ভেতরে প্রবেশ করলেন না; দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই কথা বলতে চাইলেন।
স্যার প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি নাকি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছো? কেন দাঁড়িয়েছো?”
তিনি বললেন, “স্যার, আমি ইস্তেখারা করেছি।”
স্যার আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “ইস্তেখারায় কী পেয়েছো?”
তিনি বললেন, “আমি স্বপ্নে চেয়ার দেখেছি।”
এ কথা শুনে স্যার শুধু বললেন, “ও… কুরসি দেখেছো!”
কাজল ভাই বলেন, এই কথা বলে স্যার আর কোনো কথা না বলেই হাঁটা শুরু করলেন এবং বললেন, “চলো যাই।”
সে সময় স্যারের এভাবে চলে আসাটা কিছুটা খটকা লাগলেও তখন বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। পরবর্তীতে স্যারের সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ার মধ্যে এই ইঙ্গিতই ছিল, “নির্বাচনে দাঁড়ানোর ইচ্ছাটা ওর কেন হলো?”
স্যার বোঝাতে চেয়েছেন, শুধু ইস্তেখারা করলেই যথেষ্ট নয়; ইস্তেখারার আগে নিজের নিয়ত ও উদ্দেশ্যকে যাচাই করা আরও জরুরি।
নিয়ত (অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য) কেই স্যার মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। কোনো কাজের আগে এই প্রশ্নটি জরুরি, “আমি কেন এটা করতে চাই?” স্যার বলেন, ইস্তেখারা করা ঠিক পদ্ধতি। কিন্তু তার আগে দেখতে হবে, এই কাজের ইচ্ছাটা কেন এসেছে? ভেতরে আসল উদ্দেশ্য কী? কেন তাঁর মনে হলো যে তাকে নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে? মানুষের মনে যখন কোনো পদের বা লালসার সুপ্ত বাসনা থাকে, তখন ইস্তিখারায় সেই বাসনার প্রতিফলন হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
🎤 ৩২৩
একবার মাদানীনগর মাদ্রাসার ইছলাহী জোড়ে স্যার অবস্থান করছিলেন। সে সময় এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তাবলীগের পুরাতন সাথী, যিনি সৌদি আরবে চাকরিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, স্যারের সাথে বিদায় সাক্ষাৎ করতে আসেন।
কথার এক পর্যায়ে তিনি স্যারকে বললেন, "দুই বছরের জন্য সৌদি আরবে চাকরিতে যাচ্ছেন, এবং আরো জানালেন যে আমি নিজে সাধারণত সব কাজেই ইস্তেখারা করি। এই সিদ্ধান্তটাও (সৌদি যাওয়া) ইস্তেখারা করেই নিয়েছি।”
তখন স্যার কিছু কথা বলতে গিয়ে বলেন, “কোনো কাজের আগে নিয়ত যাচাই করা সবচেয়ে জরুরি। ইস্তেখারা করা সঠিক পদ্ধতি। কিন্তু তার আগে দেখতে হবে, এই কাজের ইচ্ছাটা কেন হলো?”
স্যার বলেন, মানুষের কাজের ক্ষেত্রে দুইটি দিক থাকে, পদ্ধতি এবং নিয়ত বা অন্তরের চাহিদা। পদ্ধতি ঠিক হলেও যদি অন্তরের উদ্দেশ্য ভুল হয়, তাহলে সেই আমল সঠিক ফল দেয় না। শুধু ইস্তেখারা করলেই যথেষ্ট নয়; বরং তার আগে নিজের অন্তরের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
যেহেতু তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মাঝে সুপরিচিত ও অনুসরণীয় ছিলেন, সম্ভবত এ কারণেই স্যার কিছুটা সরাসরি ইঙ্গিত দেন যে, অনেক সময় বাহ্যিকভাবে দ্বীনি উদ্দেশ্যের কথা বলা হলেও, অন্তরে দুনিয়ার লাভ, যেমন বেশি আয়, সুযোগ-সুবিধা বা অবস্থান লুকিয়ে থাকতে পারে। তখন সেই উদ্দেশ্যের উপর ভিত্তি করে করা ইস্তেখারা প্রকৃত দিশা দেয় না। যদি বিদেশের চাকরিতে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বর্তমান অবস্থার চেয়ে কম হতো, তাহলে কি একইভাবে সেখানে যাওয়ার জন্য ইস্তেখারা করতাম? দেশে সম্মানজনক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও কেন বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা জাগল, এই প্রশ্নটি আগে নিজের কাছে করা জরুরি।
🎤 ৩২৪
নওগাঁর আত্রাইয়ের প্রিন্সিপাল আব্দুর রউফ খান সাহেব মঈন শূরা এবং নওগাঁ জেলার শূরার একজন সাথী ছিলেন। স্যারের সাথে উনার গভীর মহব্বত ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছিল।
জীবনের শেষ দিকে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংবাদ পেয়ে স্যার উনাকে দেখার জন্য আত্রাইয়ে উনার বাড়িতে উপস্থিত হন। প্যারালাইসিসের কারণে তাঁর একটি হাত ও একটি পা অকার্যকর হয়ে যায়; চলাফেরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল থাকলেও তাঁর ঈমানি জজবা ও সজাগতা ছিল বিস্ময়কর। তাঁর চেতনা ও অনুভূতি সম্পূর্ণ সজাগ ছিল। শরীরের একপাশ অকেজো হওয়া সত্ত্বেও তিনি হুইলচেয়ারে করে স্থানীয় দাওয়াতের কাজে, এমনকি দ্বিতীয় গাশতেও শরিক হতেন। দ্বীনের মেহনতের প্রতি তাঁর এ মজবুত সম্পর্ক ছিল দৃষ্টান্তমূলক।
স্যারের সাথে স্থানীয় ও নওগাঁর কিছু সাথী ছিলেন। খবর পেয়ে তাঁর পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে তাঁর এক ছেলে, যিনি স্থানীয় এক স্কুলের শিক্ষক ছিলেন, অত্যন্ত আগ্রহ ও আবেগ নিয়ে স্যারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। স্যার পৌঁছালে পুরো বাড়িতে যেন আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়; সবাই আন্তরিকতার সাথে মেহমানদারিতে লেগে যান। প্রিন্সিপাল আব্দুর রউফ সাহেব তাঁর এই অসুস্থ অবস্থায় স্যারকে কাছে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং ইশারায় সন্তানদের মেহমানদারির তাকিদ দিতে থাকেন। কথা বলতে না পারলেও ইশারা, ইঙ্গিতের মাধ্যমে ছেলেদেরকে নির্দেশ দেন, স্যার ও তাঁর সাথীদের খেদমতে যেন কোনো ত্রুটি না হয়।
এই সময় স্যার তাঁর ছেলেরা, নাতিরা, পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও উপস্থিত স্থানীয় সাথীদের সামনে অসুস্থ মুমিনের মর্যাদা এবং দ্বীনি মেহনতের স্বরূপ নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু মুজাকারা করেন। স্যার বলেন, “মানুষ যখন বাহ্যিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়, চলাফেরা করতে পারে না, আগের মতো দ্বীনের মেহনত করতে পারে না, তখন বাহ্যিকভাবে মনে হয় সে আর কিছু করতে পারছে না। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তার দোয়ার মাধ্যমে বড় বড় কাজ নেন। তার দোয়ার দ্বারা উম্মতের হেদায়েতের ফায়সালা হয়, অনেক বড় বড় ফেতনা দূর হয়।”
স্যার বলেন, “একজন ব্যক্তি সুস্থ অবস্থায় যতটা কাজ করেন, অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি দ্বীনের কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান না। দ্বীনের কাজ শুধু বাহ্যিক দৌড়ঝাঁপের নাম নয়। বরং কখনো কখনো তাঁর দোয়া ও অন্তরের তাওয়াজ্জুহের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আগের চেয়েও বড় কাজ গ্রহণ করেন।” স্যার বোঝান, মহান আল্লাহর পথে মেহনত কোনো সাময়িক শারীরিক কসরত নয়; বরং এটি হৃদয়ের এক স্থায়ী সম্পর্ক। অসুস্থতা বা বার্ধক্য মানেই দ্বীনি কাজ থেকে অবসর নয়; বরং এটি দোয়া ও তাওয়াজ্জুহের মাধ্যমে উম্মতের কল্যাণে কাজ করার এক নতুন এবং অনেক সময় আরও শক্তিশালী মাধ্যম।
স্যার খুব শক্তভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন- মানুষ যখন সুস্থ থাকে, তখন সে হাত-পা ও শারীরিক শক্তির মাধ্যমে মেহনত করে। কিন্তু যখন আল্লাহ তাআলা তাকে অসুস্থতা দেন, তখন তাঁর মেহনতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যায় তাঁর ‘কলব’ (হৃদয়) ও তাঁর ‘দোয়া’। বাহ্যিকভাবে অক্ষম মনে হলেও, সে দ্বীনের কাজে অক্ষম হয় না; বরং অনেক সময় আল্লাহ তাআলা তাকে আরও বেশি শক্তিশালী করে দেন, পূর্বের থেকে তার কাজের গতি আরো বাড়িয়ে দেন, তার দোয়ার মাধ্যমে। শারীরিক দুর্বলতা কখনো দ্বীনের কাজ থেকে কাউকে বঞ্চিত করে না। বাহ্যিকভাবে অক্ষম মনে হলেও, আধ্যাত্মিকভাবে সে পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে, আল্লাহ তাআলা তাকে এমনভাবে কবুল করেন যে, তার নীরব দোয়ার মাধ্যমেও উম্মতের জন্য বড় বড় কল্যাণের দরজা খুলে যায়।
🎤 ৩২৫
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন হাফেজ শাহজুল ইসলাম সাহেব দীর্ঘ সময় স্যারের সান্নিধ্য পেয়েছেন; মসজিদে উনার নির্ধারিত রুমে স্যার দীর্ঘ সময় একত্রে থেকেছেন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, স্যার বিভিন্ন দেশ (ফ্রান্স, সৌদি আরব, আমেরিকা) সফর থেকে ফিরে আসার পর প্রায়ই আমার হাতে মোটা অংকের রিয়াল, ডলার বা টাকা তুলে দিতেন। কখনও ৬০০ ডলার, কখনও ৭০০ ডলার, কখনও ৮০০ রিয়াল, কখনও ৫০ হাজার টাকা, কখনও ১ লাখ টাকা, কখনও দেড় লাখ টাকা-বা তারও বেশি।
স্যার আমার হাতে টাকা দিয়ে বলতেন, “কাটাখালী দেওয়ানপাড়া (বাখরাবাজ) মাদ্রাসায় পৌঁছে দিয়েন।” আমি যখন জানতে চাইতাম, রশিদ কী নামে কাটবো (রশিদে কার নাম লেখা হবে), স্যার সবসময় বলতেন, “আব্দুল্লাহ।” কৌতূহলবশত একদিন আমি প্রশ্ন করলাম, “স্যার, এই ‘আব্দুল্লাহ’ ব্যক্তিটি কে (যার নামে আপনি মাদ্রাসায় টাকা দিতে পাঠান, আমি তার নামে টাকা জমা দিয়ে আসি)?” তখন স্যার মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, “আল্লাহর বান্দা।”
হাফেজ সাহেব বলেন, নিজের নাম গোপন রেখে ‘আব্দুল্লাহ’ (আল্লাহর বান্দা) পরিচয়ে দান করা ছিল স্যারের নিয়মিত আমল। আমি সেই নামেই মাদ্রাসায় টাকা জমা দিতাম। তিনি চাইতেন না দাতা হিসেবে তাঁর পার্থিব কোনো নাম বা যশ ছড়িয়ে পড়ুক। তিনি আরও বলেন, আমানতদারিতার ওপর স্যারের ছিল অগাধ বিশ্বাস। একবার আল্লাহর রাস্তায় টাকা বের করে দেওয়ার পর তিনি আর পার্থিব হিসাবের পেছনে পড়ে থাকতেন না। কখনো জিজ্ঞাসা করতেন না, টাকা পৌঁছেছে কি না; কোনো হিসাব চাইতেন না। আমি নিজে থেকে রশিদ এনে দিলে তিনি তা নীরবে রেখে দিতেন; কিন্তু কোনোদিন বলেননি, “দিয়ে এসেছেন তো?”
হাফেজ সাহেব বলেন, স্যার চাইলে নিজেই মাদ্রাসায় গিয়ে টাকা দিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু তিনি অনেকবার এরকম আমাকে মাধ্যম বানিয়েছেন। হয়তো মাদ্রাসায় সরাসরি গেলে দাতা হিসেবে যে বিশেষ সম্মান বা প্রটোকল পাওয়া যায়, তা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইতেন; এবং অন্য একজন সাথীকে এই নেক কাজে শরিক করে তার মাঝেও দ্বীনি খিদমতের জজবা তৈরি করা স্যারের উদ্দেশ্য ছিল।
হাফেজ সাহেব বলেন, মাদ্রাসার পাশাপাশি স্যার ব্যক্তিগতভাবেও অসহায় সাথী ও নওমুসলিমদের গোপনে সাহায্য করতেন। এক্ষেত্রেও তিনি তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে সহযোগিতা পাঠাতেন, যাতে গ্রহীতা দাতার সামনে লজ্জিত না হন। কয়েকবার স্যার আমাকে নির্দিষ্ট কিছু সাথীর নাম বলে তাদেরকে অর্থ দেওয়ার জন্য দিয়েছিলেন। আমি এরকম একবার এক সাথীকে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই, এটা কিসের টাকা? উনি বললেন, একজন নতুন মুসলমান হয়েছে, তাকে দেওয়ার জন্য স্যার দিয়েছেন।
হাফেজ সাহেব বলেন, ‘আব্দুল্লাহ’ বা “আল্লাহর বান্দা” এই পরিচয়টিই একজন মুমিনের আসল পরিচয়। স্যারের এই আমল আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা যে, দান করা মানে কেবল টাকা দেওয়া নয়; বরং নিজের ‘অহং’ বা ‘আমি’কে বিসর্জন দেওয়া। দান যেন লৌকিকতামুক্ত হয়, মানুষের কাছে পরিচিতি অর্জনের জন্য না হয়; বরং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করার মাধ্যম হয়।
🎤 ৩২৬
আরাফাত ভাই বলেন, সম্ভবত ২০০৪ সালের দিকে দিনাজপুর জেলায় শূরার একটি ফয়সালাকে কেন্দ্র করে কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়। শূরার ফয়সালার বিপরীতে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে দিনাজপুর মারকাজ মসজিদে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাশোয়ারা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত মাশোয়ারায় কাকরাইল মারকাজের শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বিগণ উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ আমন্ত্রণে স্যারও সেই মাশোয়ারায় শরিক হওয়ার জন্য দিনাজপুর আসেন।
দিনাজপুর মারকাজের মুরুব্বিগণ (যাদের অনেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ছিলেন) আগত মেহমানদের ইস্তেকবাল ও আপ্যায়নের জন্য অত্যন্ত রাজকীয় এবং বিলাসপূর্ণ খানা-পিনার আয়োজন করেন। রান্নার জৌলুস ও পদের আধিক্য দেখে স্যার অস্বস্তি বোধ করলেন।
স্যার আয়োজকদের জিজ্ঞাসা করলেন, “এত উন্নত মানের মেহমানদারির আয়োজন কোন তাকাযাকে (প্রয়োজন) সামনে রেখে করা হয়েছে? এই মেহমানদারীর মাকসাদটা (ভেতরের মূল উদ্দেশ্যটি) আসলে কী?”
আয়োজকগণ উত্তর দিলেন, “স্যার, ইতিপূর্বে যখন আলী আকবর হুজুররা (রহমতুল্লাহি আলাইহি) আসতেন, আমরা তাদের জন্যও এমন আয়োজন করতাম। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও মুরুব্বিদের জন্য এই ব্যবস্থা করেছি।” স্যার তাদের এই উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না; বিষয়টি গভীরভাবে ধরলেন।
তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এক হাকিকত উন্মোচন করে বললেন: “পূর্বের বড়দের কথা ভিন্ন, তারা আল্লাহওয়ালা ছিলেন, তাই মহব্বতের খাতিরে তোমরা খাইয়েছ; তাদের জন্য খাওয়ানো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ছিল। কিন্তু আজ বিশেষ এক সংকটের সমাধানের মাশোয়ারায় যারা এসেছেন, তাদের জন্য কেন এই বিশেষ আয়োজন? এত বড় আয়োজন কেন? ভেতরের উদ্দেশ্যটা কী?”
স্যার তখন বিষয়টির ভেতরের উদ্দেশ্যটি পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলেন। এর পেছনে কি অবচেতন মনে এই চাহিদা কাজ করছে না যে, তাঁদেরকে (আগত মুরুব্বীদের) ভালো খাইয়ে সন্তুষ্ট রাখলে কাকরাইল থেকে বিশেষ কোনো সুযোগ-সুবিধা বা নিজেদের পক্ষে ফয়সালা পাওয়া যাবে? অথবা তাদেরকে সন্তুষ্ট করলে ভবিষ্যতে দিনাজপুরের (আমাদের) জন্য বিশেষ দৃষ্টি পাওয়া যাবে, বা কাকরাইলে গেলে কিছু বিশেষ সুবিধা মিলবে?
দ্বীনি কাজের যেকোনো আয়োজনে লৌকিকতা বা কোনো পার্থিব স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য থাকলে সেই কাজের বরকত নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে ফয়সালা বা মাশোয়ারার সময় মেহমানদারির আড়ালে কাউকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। যখন কোনো বিশেষ পদমর্যাদার মানুষকে এই উদ্দেশ্যে আপ্যায়ন করা হয় যে, তাঁর থেকে কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে, তখন তা বাহ্যিকভাবে মেহমানদারি মনে হলেও হাকিকতে তা ‘ঘুষ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। স্যার তাবলীগের ৬ উসূলের “تصحيح النية (তাসহীহে নিয়্যত)” বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বুঝিয়ে দেন, আমাদের প্রত্যেক কাজের আগে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার, “আমি এটা কেন করছি?” স্যারের এরকম প্রাসঙ্গিক আলোচনায় ধীরে ধীরে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। উপস্থিত দায়িত্বশীল আয়োজকগণ স্যারের এই পর্যবেক্ষণের সামনে নিরুত্তর হয়ে পড়েন এবং স্বীকার করেন যে, প্রকৃত মাকসাদ হয়তো অজান্তেই সেদিকে চলে গিয়েছিল।
স্যার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে বলেন, এই ধরনের মেহমানদারী, যদি ভেতরে কোনো দুনিয়াবি উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে তা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত; স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে করা এরূপ মেহমানদারি ‘ঘুষের’ মাসআলার মধ্যে পড়ে। এরপর স্যার বলেন, “এই খানা আমি খাব না।” সেদিন স্যার সেই আয়োজনের খাবার গ্রহণ করেননি; নিজে না খেয়ে নিজের আমলের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দ্বীনি মারকাজে অপচয় ও স্বার্থপরতার কোনো স্থান নেই। পরে দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষক শামীম ভাই নিজ বাসা থেকে সাধারণ খাবার নিয়ে আসেন। স্যার সেই খাবারই সাথীদের নিয়ে গ্রহণ করেন।
🎤 ৩২৭
একবার লন্ডনে একটি ইজতেমা/জোর উপলক্ষে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান থেকে মুরুব্বীদের জামাত যাওয়ার প্রস্তুতি হচ্ছিল। বাংলাদেশ থেকে যে জামাত যাবে, সেই জামাতে আনোয়ারুল আজিম সাহেব যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পূর্বেও তাঁর সফরের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ছিল। প্রথমে কাকরাইলের মাশোয়ারায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পরে কোনো কারণে হাজী আব্দুল মুকিত সাহেব তাঁকে যেতে নিষেধ করেন এবং জামাতের তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়।
তিনি বিষয়টি নিয়ে কারও কাছে কোনো অভিযোগ না করে নীরবে সরাসরি দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজে চলে যান। সেখানে গিয়ে হযরতজি মাওলানা এনামুল হাসান (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এর সাথে সাক্ষাৎ করে নিজের অবস্থা ও আগ্রহ প্রকাশ করেন। হযরতজি তাঁকে নিজের কাফেলায় (জামাতে) অন্তর্ভুক্ত করে নেন। এভাবে তিনি খোদ হযরতজির সফরসঙ্গী হয়ে, নিজামুদ্দিন মারকাজের কাফেলায় শামিল হয়ে ইংল্যান্ড সফর করেন।
স্যার যখন এই কথা শুনাচ্ছিলেন, তখন মাহফুজ ভাই প্রশ্ন করলেন, “স্যার, হযরতজির সাথে লন্ডন সফর করে তাঁর (আনোয়ারুল আজিম সাহেবের) লাভটা (ব্যক্তিগত) কী?”
তখন স্যার একটি গভীর নসীহতপূর্ণ কথা বলেন, “শয়তান সর্বদা চায় মানুষকে নিষ্ক্রিয় (‘inactive’: স্যার এখানে এই ইংরেজী শব্দটি ব্যবহার করেন) করে রাখতে। কোনো না কোনোভাবে সে মানুষকে জান, মাল ও সময় দ্বীনের কাজে খরচ করা থেকে বিরত রাখতে চায়। কোনো না কোনো উছিলায় মুমিন যেন দ্বীনি কোরবানি থেকে দূরে সরে যায় এবং অলস বসে থাকে, তাহলেই শয়তানের চক্রান্ত কামিয়াব হয়।”
স্যার তুলে ধরেন, এখানে মূল বিষয় ‘লাভ’ নয়; বরং দ্বীনের ময়দানে ‘সক্রিয়’ থাকা। কেউ যদি কোনো কারণে একটি সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় বা কোনো দ্বীনি কাজ থেকে বাধা আসে, তখন শয়তান কৌশলে নিষ্ক্রিয়তার ফাঁদ পাতে; মনে হতাশা ও অভিমান তৈরি করে তাকে নিরুৎসাহিত করে বসিয়ে রাখতে চায়। শয়তান চায়ই আমরা যেন আল্লাহর পথের মেহনত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি এবং ঘরে বসে থাকি।
স্যারের বর্ণনায় খুশির ভাব ছিল যে আনোয়ারুল আজিম সাহেব এই পরিস্থিতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকেননি; বরং নিজে থেকেই এমন একটি পথ খুঁজে নিয়েছেন, যার মাধ্যমে তিনি উপস্থিত দ্বীনি তাকাযার সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পেরেছেন। তিনি অভিমান না করে বিকল্প পথ গ্রহণ করেছেন এবং নিজের জান, মাল ও সময়ের ব্যবহার নিশ্চিত করতে দিল্লির কাফেলায় (হযরতজির সফরসঙ্গী হিসেবে) যুক্ত হয়েছেন।
স্যারের আলোচনায় ফুটে ওঠে, শয়তানের অন্যতম কৌশল হলো মানুষকে থামিয়ে দেওয়া, আর মুমিনের কাজ হলো যেকোনো অবস্থায় দ্বীনের ময়দানে নিজেকে সক্রিয় রাখা; পরিস্থিতি যাই হোক, দ্বীনি ময়দান ত্যাগ করা উচিত নয়। তিনি ইঙ্গিত করেন, কোনো অবস্থাতেই নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া ঠিক নয়; বরং দ্বীনি কাজে কোনো এক দরজা বন্ধ হলে অন্য দরজা তালাশ করা দরকার। স্যার স্পষ্ট করেন যে, মুমিনের কর্মতৎপরতাই শয়তানের পরাজয়।
🎤 ৩২৮
রাজশাহীর আরানীর শহীদুল ইসলাম ভাই বলেন, একবার তিনি তাঁর মেয়ের পড়াশোনার বিষয়ে স্যারের পরামর্শ জানতে চান। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, পার্শ্ববর্তী আত্মীয় (মামাতো ভাইয়ের আহলিয়া) এর কাছে অনাবাসিকভাবে হিফজ পড়ানো যাবে কি না। স্যার উত্তরে বলেন, “হ্যাঁ, এখানে পড়ানো যেতে পারে, এতে কোনো অসুবিধা নেই।”
তবে স্যার সাথে সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরামর্শও দেন। তিনি বলেন, “যদি প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে পড়াশোনা হয়, তাহলে আরও ভালো হয়। সেখানে হিফজের পাশাপাশি কিছু কিতাবের জ্ঞান, মাসআলা-মাসায়েল ইত্যাদিও সহজে শেখা যায়। দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানও একসাথে অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ।”
এরপর মাদ্রাসায় আবাসিকভাবে রেখে পড়ানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্যার সে পথে পরামর্শ দেননি। তিনি বলেন, “পূর্ণ সময়ের জন্য বোর্ডিংয়ে রেখে না; বরং নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ে যাওয়া এবং পড়া শেষে আবার বাসায় নিয়ে আসা, এভাবে পড়ানো ভালো।” স্যার ইঙ্গিত দেন, পারিবারিক পরিবেশ, অভিভাবকের তত্ত্বাবধান ও সান্নিধ্য, এগুলোও মেয়ের গড়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই পূর্ণকালীন পরিবার থেকে দূরে রেখে নয়, বরং পরিবার, পরিবেশ ও তত্ত্বাবধান, চরিত্র গঠন, নিরাপত্তা, সবকিছুর সমন্বয়ে পরিবারের কাছে থেকে পড়াশোনা হলে ভাল।
🎤 ৩২৯
শহীদুল ইসলাম ভাই স্মৃতিচারণ করে বলেন, বহু বছর আগের এক দৃশ্য আজও আমার হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করে আছে; এখনো চোখে ভাসে, অন্তরে দাগ কেটে আছে। তখন রাস্তাঘাট আজকের মতো উন্নত ছিল না। এক পরিচিত ভাই রাজশাহীর আরেকজনকে সঙ্গে নিয়ে স্যারসহ আমাদের সেই অজপাড়াগাঁ ‘আড়পাড়া’য় এসেছিলেন। বর্ষার কর্দমাক্ত পথ, পাকা রাস্তা নেই; কাদামাটির পথ দিয়ে কষ্ট করে চলতে হতো। হাঁটার সময় স্যান্ডেল কাঁদায় আটকে যাচ্ছিল, তাই খুলে হাতে নিয়ে হাঁটতে হচ্ছিল। স্যারের স্যান্ডেল জোড়া আমি হাতে নিয়েছিলাম, এইটুকু এখনো স্পষ্ট মনে আছে। তবে স্যার ঠিক কী উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন, তা আজ আর মনে নেই।
ফেরার সময় আমি স্যারকে অন্য একটি পথে এগিয়ে দিতে রওনা হলাম, যেখান থেকে দুই-তিন কিলোমিটার দূরে একটি পাকা রাস্তা ছিল, সেখানে আড়ানী বা পুঠিয়ার ভ্যান বা কোনো বাহন পাওয়ার আশা করা যেত। আমরা ভ্যানের অপেক্ষায় রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে; আর স্যার রাস্তার পাশের মসজিদে একাকী বসে ছিলেন।
ভ্যান খোঁজার জন্য বারবার রাস্তার এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, আবার ফিরে মসজিদে বসা স্যারের দিকে উঁকি দিচ্ছি, এভাবেই সময় কাটছিল। এমনই এক মুহূর্তে আমি মসজিদে এগিয়ে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি, স্যার একা বসে, আর তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। দু’হাত তুলে দোয়ার হালতে ছিলেন না; নীরবে বসে ছিলেন, আর অঝোর ধারায় তাঁর দু’চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল।
সেই মুহূর্তে মনে প্রশ্ন জাগল, কেনইবা স্যার সেই কাদা-মাটির পথে আমাদের এখানে এলেন? কী ছিল এই সফরের ভেতরের তাকাযা ও চাহিদা? তাঁর এই নীরব অশ্রুবিসর্জন দেখে মনে হচ্ছিল, এ যেন আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেম এবং উম্মতের ফিকিরে ব্যাকুল এক অন্তরের বহিঃপ্রকাশ।
ভাই বলেন, এই দৃশ্য আমাকে ভেতর থেকে বড় নাড়া দিয়েছিল। সেই নির্জন কান্নার দৃশ্য আমার অন্তরে আজও অমলিন। বাহ্যিক মেহনতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্যারের আরেক জীবন ছিল এটা। আমরা সামনে যা দেখতাম, স্যারের বয়ান, মেহনত, দাওয়াত- তা তো এক দিক; কিন্তু অন্তরের গোপন সম্পর্ক, নির্জনে কান্না ও দোয়া, স্যারের জীবনের আরেকটা শক্তিশালী দিক ছিল। তিনি আরও বলেন, এরকম আরও কয়েকবার দেখেছি, স্যার একা থাকলে তাঁর চোখে অশ্রু থাকত; নীরবে চোখ বেয়ে পানি ঝরত।
🎤 ৩৩০
খুলনার হাফেজ মাওলানা মামুন সাহেব বলেন, আমরা সাধারণত কোনো ওস্তাদ বা বয়োজ্যেষ্ঠের সামনে পা মেলে (আরাম করে) বসি না। কিন্তু দীর্ঘ সময় এভাবে বসে থাকা সহজ নয়; কিছুক্ষণ পরই হাঁটুতে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি, স্যার এই বয়সেও দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণ আদবের সাথে স্থির হয়ে বসে থাকতেন, আত্তাহিয়াতের মতো করে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতেন। এই বয়সে এমনভাবে স্থির হয়ে বসে থাকা, এটা আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হতো। তাঁর এই দৈহিক স্থিরতা ও ধৈর্য ছিল দেখার মতো, যা আমাদের মতো তরুণদের পক্ষেও কষ্টসাধ্য; একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। স্যারের এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই আসলে বড় এক মুজাহাদার পরিচয় দেয়।
তিনি দ্বিতীয় আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। হাটহাজারী মাদ্রাসার পুরোনো মসজিদে এক রাতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, সেই মসজিদের মশার উপদ্রব ছিল বর্ণনাতীত। প্রচুর বড় বড় মশা সেখানে ছিল সে সময়। মনে হতো, কোনো মানুষকে সেখানে এক রাত বেঁধে রাখলে তা কঠিন শাস্তির জন্য যথেষ্ট, মশার কামড়েই সে অতিষ্ঠ হয়ে পড়বে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও আমি স্যারকে দেখলাম গভীর রাতে অত্যন্ত নিবিষ্টচিত্তে তাহাজ্জুদ নামাজে দাঁড়িয়ে আছেন। স্যারের কাছে বাহ্যিক এ অবস্থা বা পরিবেশের কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে একাগ্রতার সাথে লম্বা লম্বা নামাজ পড়লেন। মশার উপদ্রব যেন তাঁকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারেনি, যেন অন্য কোনো জগতে মগ্ন হয়ে আছেন।
তিনি বলেন, স্যারের দীর্ঘক্ষণ আদবের সাথে বসে থাকা এবং তীব্র মশার উপদ্রব উপেক্ষা করে লম্বা তাহাজ্জুদ পড়ার কথা স্মরণ হলে মনে হয়, তাঁর বাহ্যিক বয়ান ও মুজাকারার পাশাপাশি জীবনের ভেতরে ছিল গভীর আমলি মুজাহাদার এক নীরব দিক। মনে হয়, তিনি আমলের মাধ্যমে শারীরিক যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে উঠে এক ভিন্ন আধ্যাত্মিক প্রশান্তি লাভ করতেন।
🎤 ৩৩১
একবার দশ দিনের জোড়ের মাঝখানের ৪ দিনের বড় এক জামাত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রিয় মসজিদে। ঐ জামাতে এশার পর মুজাকারায় স্যার একটি সহজ কিন্তু গভীর আমলের তরগীব দেন। অনেকেই শেষ রাতে ওঠার নিয়ত করেন, কিন্তু ঘুমের চাপে উঠতে পারেন না। স্যার বাস্তববাদী এক পরামর্শ দিলেন যে, “অন্তত বিছানায় যাওয়ার আগে চার রাকাত নামাজ পড়ে নেওয়া উচিত।” অর্থাৎ, আমরা যেন রাতে অন্তত চার রাকাত নামাজ পড়ে ঘুমাতে যাই। এতে শয়তান মানুষকে ইবাদত থেকে পুরোপুরি মাহরুম করতে পারে না। পরে যদি শেষ রাতে ওঠা সম্ভব হয়, তবে তা হবে ‘নূরের উপর নূর’-অতিরিক্ত প্রাপ্তি।
স্যার বলেন, তাহাজ্জুদের সময়, অর্থাৎ শেষ রাতে ওঠা সর্বোত্তম। তবে যদি কারও জন্য তা কঠিন হয় বা সুযোগ না থাকে, বা সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত ঘুমানোর আগে চার রাকাত নামাজ পড়ে শুয়ে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
তিনি বোঝান, সবার পক্ষে শেষ রাতে ওঠা সহজ নয়; কিন্তু ঘুমানোর আগে কিছু সময় বের করে চার রাকাত নামাজ পড়া প্রত্যেকের পক্ষেই সম্ভব। এই ছোট আমলটিই ধীরে ধীরে বড় আমলের পথ খুলে দেয়। যে ব্যক্তি নিয়মিত ঘুমানোর আগে নামাজ পড়ে, তার অন্তরের সাথে রাতের ইবাদতের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সম্পর্কই একসময় তাকে তাহাজ্জুদের দিকে নিয়ে যায়। স্যার আরও ইঙ্গিত করেন, আল্লাহর স্মরণে দিন শুরু করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আল্লাহর স্মরণেই দিন শেষ করাও অত্যন্ত মূল্যবান।
🎤 ৩৩২
স্যারের ইন্তেকালের কিছুদিন আগে, যখন তিনি পর্চা ছাড়া জামাতে চলছিলেন, তখন পুরান ঢাকা ও তেজগাঁও এলাকায় এক জামাতের সাথে কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একই দিনে পাঁচটি মসজিদ থেকে বের করে দেওয়া হয়। সর্বশেষ একটি মসজিদ থেকে রাত প্রায় এগারোটার সময় পুলিশ ডেকে জামাতকে বের করে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সেই জামাত হাতিরপুলে হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের বাসায় রাত যাপন করে।
এত অপমান ও লাঞ্ছনার পরেও সাথীরা অসীম ধৈর্য ও হিম্মতের সাথে মেহনতে অটল ছিলেন। বারবার বেইজ্জত হয়ে মসজিদ থেকে বের করে দেওয়া সত্ত্বেও তারা হিম্মত হারাননি; বরং সফরের মুজাহাদার উপর অটল থেকেছেন। পরদিন সকালে স্যার সেই জামাতের সাথীদের সামনে এক হৃদয়স্পর্শী মুজাকারা করেন। সেখানে তিনি বাহ্যিক মেহনতের চেয়েও ভেতরের আত্মশুদ্ধি, দুর্বলের সাথে নরম ব্যবহার, এবং মানুষের অধিকার বা ‘হক’ আদায়ের ওপর বিশেষ জোর দেন।
স্যার দুর্বলের সাথে নরম ব্যবহার করার উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন। স্যার বোঝান, যারা দুর্বল, অসহায় বা অন্যের উপর নির্ভরশীল, যেমন পরিবারের নারী সদস্য, শিশু, বৃদ্ধ, গরিব বা অধীনস্থ মানুষ, তাদের সাথে কঠোরতা নয়; বরং কোমলতা ও সহানুভূতির আচরণ করা উচিত। একজন মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য তার এই নম্রতা ও দয়ার মধ্যেই প্রকাশ পায়। নম্রতা ও ধৈর্যই হলো একজন ঈমানদারের প্রকৃত হাতিয়ার। অনেক সময় মানুষ বাইরের মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে, কিন্তু নিজের ঘরের ভেতরে, নিজের অধীনস্থদের সাথে কঠোর হয়ে যায়। অথচ প্রকৃত পরীক্ষা হলো সেখানে, যেখানে কেউ প্রতিবাদ করতে পারে না, বা আমাদের উপর নির্ভরশীল। একজন মুমিনের চরিত্রের সত্যিকারের পরিচয় প্রকাশ পায় তার দুর্বলদের সাথে আচরণের মাধ্যমে।
স্যার আরেকটি ব্যাপার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বলেন, “আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্যের হক আদায় করা অপরিহার্য।” তিনি বিশেষভাবে পারিবারিক উত্তরাধিকার ও বোনদের হকের কথা উল্লেখ করেন। স্যার বলেন, যদি দেখা যায় আমাদের আব্বা বা চাচারা পূর্বে ফুফুদের বা অন্য কোনো আত্মীয়ের হক (জমি-জমা বা সম্পদ) ঠিকমতো আদায় করেননি, তবে বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব হলো সেই হিসাব বের করা এবং যথাসাধ্য তা আদায় করে দেওয়ার চেষ্টা করা। স্যার এ বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, পরিবারের ভেতরে ভাই-বোনদের হক, ফুপুদের হক, চাচাতো ভাই-বোনদের হক, আত্মীয়-স্বজনের হক, এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। স্যার বলেন, এসব বিষয় খোঁজ নিয়ে, হিসাব করে, যথাসাধ্য হক আদায় করে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। অতীতে কেউ অবহেলা করে থাকলে সেই সম্পদ খুঁজে বের করে প্রকৃত পাওনাদারের কাছে পৌঁছে ফেরত দেওয়া উচিত।
স্যার বোঝান, দ্বীনের মেহনত শুধু বাহ্যিক কোরবানি বা কষ্ট সহ্য করার নাম নয়; বরং মানুষের হক আদায় করা এবং দুর্বলদের প্রতি সঠিক আচরণ করাও দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা যখন আল্লাহর পথে অপমান ও কষ্ট সহ্য করছি, তখন আমাদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে যেন আমাদের দ্বারা অন্য কেউ, বিশেষ করে নিজের পরিবার বা দুর্বল মানুষ, সামান্যতম বেইজ্জত বা হকের দিক থেকে বঞ্চিত না হয়। দ্বীনের ওপর টিকে থাকার জন্য যেমন সাহস ও ধৈর্য দরকার, তেমনি অন্যের হক আদায়ের জন্যও (পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার জন্য) দরকার সততা, হিম্মত ও নৈতিকতা। তিনি ইঙ্গিত করেন, কোরবানির সাথে সাথে চরিত্র ও লেনদেন শুদ্ধ না হলে দ্বীনের মেহনত পূর্ণতা পায় না।
🎤 ৩৩৩
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মজমায় এক মুজাকারায় স্যার বলেন, যারা নলকূপ বা চাপকল (টিউবওয়েল) বসানোর কাজ করে, তারা জানে যে মাটির নিচে পানি আছে; কিন্তু ঠিক কত ফিট নিচে পানি পাওয়া যাবে, তা তারা আগে থেকে জানে না। তাদের কাজ হলো পাইপ মাটির নিচে গেড়ে যাওয়া। তারা মাটির স্তর ও বালির ধরন দেখে বুঝতে চেষ্টা করে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত ভালো পানির স্তরে পৌঁছাতে না পারে, ততক্ষণ থামে না, গেড়েই যায়। তোমার আর আমার কাজও ঠিক তাই, মেহনত চালিয়ে যাওয়া।
স্যার বলেন, দ্বীনের মেহনত, দাওয়াত বা নিজের আমল, এসব ক্ষেত্রেও ফল কখন আসবে, তা আমরা জানি না। কখন হেদায়েত হবে বা দোয়া কবুল হবে, তা আমাদের হাতে নেই। তবে এ মেহনত কখনো বিফলে যায় না; এর ভেতরে ফল অবশ্যই আছে। অনেক সময় মানুষ ফল না দেখে হতাশ হয়ে পড়ে এবং চলার মাঝপথে থেমে যায়। অথচ হয়তো ঠিক সেই জায়গার পরেই “পানির স্তর” ছিল, অর্থাৎ হেদায়েত খুব কাছেই ছিল। যদি কোনো মিস্ত্রি ১০০ ফিট পাইপ গেড়ে ধৈর্য হারিয়ে থেমে যায়, অথচ আর ১০ ফিট নিচেই পানি থাকে, তবে তার পরিশ্রম বৃথা হয়ে যায়। স্যার সতর্ক করেন, যেন আমরা সফলতার একেবারে নিকটে গিয়েও ধৈর্য হারিয়ে না ফেলি।
স্যার বুঝান, মিস্ত্রির কাজ হলো পাইপ গেঁথে যাওয়া; পানি তুলে আনা বা পানির স্তর সৃষ্টি করাতে তার হাতে নেই। একইভাবে, আমাদের কাজ হলো আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী জান, মাল ও সময় দিয়ে মেহনত করে যাওয়া, 'পাইপ গাঁড়তেই থাকা' অর্থাৎ মেহনতে কোনো বিরতি না দেওয়া। ফলাফল আল্লাহ তাআলার হাতে, আল্লাহ দেবেন।
পাইপ গাঁড়ার সময় যেমন কখনো কাদা ওঠে, কখনো পাথর আসে, আবার কখনো বালির স্তর দেখা যায়, মিস্ত্রিরা কাদা দেখে নিরাশ হয় না যে এখানে পানি নেই। বরং জানে, কাদা পার হলেই বালির স্তর আসবে; তারা জানে এর পরেই ভালো স্তর আসতে পারে। তেমনি দ্বীনের পথে চলতে গিয়েও আমাদের জীবনে যখন বাধা বা ব্যর্থতা আসে; তখন মুমিনেরও ধৈর্য হারানো উচিত নয়, তখন বুঝতে হবে আমরা সাফল্যের একটি স্তর পার করছি। আমরা যেন ফলের অপেক্ষায় হতাশ না হয়ে যাই; বরং নিজের কাজ করে যেতে থাকি।
আমাদের দায়িত্ব হলো অবিরত চেষ্টা করে যাওয়া, থেমে না যাওয়া। ফল দেওয়া আল্লাহ তাআলার কাজ। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরে মেহনত চালিয়ে যায়, আল্লাহ তাআলা একসময় তার জন্য ফলাফলের দরজা খুলে দেন; যে থামে না, আল্লাহ তাআলা একসময় তাকে “পানির স্তর” পর্যন্ত পৌঁছে দেন। নলকূপের মিস্ত্রি যেমন দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে মাটির নিচে পানি আছেই, তেমনি একজন মুমিনের বিশ্বাস হওয়া উচিত, মেহনত করলে আল্লাহ তাআলা ফল দেবেনই। ফল কখন আসবে তা আমাদের জানা নেই; কিন্তু “ফল আছে”, এই বিশ্বাস নিয়ে কাজ করে যাওয়াই মুমিনের কর্তব্য।
🎤 ৩৩৪
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এক মুজাকারায় স্যার বলেন, আমরা সাধারণত কোনো কিছুর মান বিচার করি তার বাজারমূল্য বা সৌন্দর্য দিয়ে; কিন্তু কোনো কিছু দামী হলেই তা সব জায়গায় ব্যবহারের যোগ্য হয় না। অনেক সময় মনে হয়, কোনো বড় কাজের জন্য কেবল বড় ডিগ্রিধারী বা নামী-দামী মানুষই প্রয়োজন। একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি হয়তো তাত্ত্বিকভাবে অনেক মূল্যবান হতে পারেন, কিন্তু ময়দানের কঠিন পরিস্থিতিতে এমন একজনের প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে ধৈর্য, কষ্ট করার ক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
স্যার বলেন, “ক্রিস্টাল (স্ফটিক বা হীরা) অত্যন্ত দামি, স্বচ্ছ, দৃষ্টিনন্দন ও রাজকীয় জিনিস। অন্যদিকে অ্যালুমিনিয়াম অত্যন্ত সাধারণ ও সস্তা এক ধাতু। কিন্তু যখন একটি উড়োজাহাজ বা এভিয়েশন ইঞ্জিন তৈরির প্রশ্ন আসে, তখন সেই দামি ক্রিস্টাল কোনো কাজেই আসে না; সেখানে সস্তা অ্যালুমিনিয়ামই অপরিহার্য।” তিনি উদাহরণ দিয়ে বোঝান, অনেকসময় অফিসে দেখা যায়, কেউ খুব স্টাইলিশ, কথা বলায় চমৎকার; কিন্তু চাপের সময় সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আবার একদম সাধারণ, শান্ত স্বভাবের একজন মানুষ পুরো টিমকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। মরুভূমিতে সোনার বার নিয়ে গেলে তার কোনো মূল্য নেই, সেখানে এক বোতল পানি জীবন বাঁচায়। তাই কোনো জিনিস বা মানুষকে তার বাহ্যিক দামে নয়; বরং সঠিক পরিস্থিতিতে সে কতটা কার্যকর, এটাই তার প্রকৃত মূল্য।
দ্বীনি কাজের ক্ষেত্রেও আমরা অনেক সময় মনে করি, যদি অমুক বড় আলেম, প্রভাবশালী নেতা, বা ধনী ব্যক্তি আমাদের সাথে থাকতেন, তবে কাজ দ্রুত এগিয়ে যেত। এটি অনেকটা ইঞ্জিনে ক্রিস্টাল লাগানোর চেষ্টার মতো। কিন্তু স্যার শেখান, দ্বীনি মেহনত বা সমাজ সংস্কারের জন্য এমন মানুষ প্রয়োজন, যারা ইখলাসের সাথে ঘাম ঝরিয়ে মেহনত করে। আল্লাহর কাছে ব্যক্তির সামাজিক দামের চেয়ে তার ইখলাসই বড়। তিনি বোঝাতেন, আল্লাহ তাআলা বাহ্যিক আভিজাত্য নয়; বরং বান্দার ইখলাস, মুজাহাদা ও উপযোগিতার ভিত্তিতে কাজ নেন। আমরা যেন মশহুর হওয়ার পেছনে না ছুটি; বরং নিজের ভেতরকে এমনভাবে গড়ে তুলি, যাতে আমরা আল্লাহর কাছে মকবুল হতে পারি।
স্যার বলতেন, জনপ্রিয়তা (মশহুর হওয়া) একটি পরীক্ষা, আর কবুলিয়াত (মকবুল হওয়া) একটি নেয়ামত। দুনিয়ার মানুষ আমলের পরিমাণ দেখে, আর আল্লাহ দেখেন আমলের নিষ্ঠা ও গুণগত মান। তিনি আরও বুঝাতেন, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার তৃষ্ণা ত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্ক্ষাই একজন মুমিনের আসল পরিচয়। একটি পাত্র বাইরে থেকে যতই সুন্দর হোক, ভেতরের বস্তু যদি নাপাক হয়, তবে তাতে যা-ই রাখা হবে সবকিছুই নাপাক হয়ে যাবে। তেমনি, আমাদের কথা ও কাজ বাহ্যিকভাবে যত সুন্দরই হোক না কেন, ভেতরটা যদি অহংকার, হিংসা ও লৌকিকতায় ভরা থাকে, তবে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।
🎤 ৩৩৫
মানুষ সাধারণত খুব দ্রুত নিজের অনুভূতির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, আবেগের বশবর্তী হয়ে পড়ে। কোনো কিছু ভালো লাগলে আগ্রহ নিয়ে করে, আর ভালো না লাগলে তা এড়িয়ে যায়। কোনো কাজ করতে ভালো লাগলে আমরা তাতে উৎসাহ পাই, আর ভালো না লাগলে আমাদের মাঝে স্থবিরতা চলে আসে। এই মানসিকতা দ্বীনের পথে বড় বাধা। আল্লাহ পাকের ইবাদত ও আনুগত্যের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। এই প্রসঙ্গে স্যার একবার বলেন, আল্লাহর ইবাদত করতে হবে 'তা’আববুদান' (تعبُّدًا), 'তালাযজুজান' (تلذُّذًا) নয়।
স্যার বলেন, ‘তালাযজুজান’ (ভালো লাগা বা স্বাদ খোঁজা) শব্দটি এসেছে লযযত বা স্বাদ থেকে। কেবল নিজের ভালো লাগা, তৃপ্তি বা মানসিক প্রশান্তির জন্য কোনো কাজ করা। যদি কেউ ইবাদতকে কেবল নিজের 'ভালো লাগা'র ওপর নির্ভর করায়, তবে যে দিন তার মন ভালো থাকবে না বা তবিয়ত সায় দেবে না, সে দিন সে ইবাদত ছেড়ে দেবে। এখানে প্রকৃত ইলাহ বা উপাস্য আল্লাহ থাকেন না, বরং নিজের 'নফস' বা প্রবৃত্তিই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। মন চাইলে মানলাম, না চাইলে মানলাম না, এটি প্রকৃত আনুগত্য নয়; নিজের মন, রুচি ও অনুভূতিকে মাপকাঠি বানানো। দ্বীনের বুনিয়াদ হলো আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। ইবাদতকে নিজের অনুভূতির সাথে যুক্ত করলে তা দুর্বল হয়ে যায়; আর বান্দা হওয়ার চেতনার উপর দাঁড়ালে তা দৃঢ় ও স্থায়ী হয়।
‘তা’আব্বুদান’ (দাসত্ব বা আনুগত্য), এখানে মুখ্য বিষয় হলো, আমি আল্লাহর দাস (عبد), আর তিনি আমার মালিক। বান্দা হিসেবে মালিকের হুকুম পালন করা, ‘আমি আল্লাহর বান্দা’, এই পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁর ইবাদত করা; ইবাদতকে “ভালো লাগা-মন্দ লাগা” এর উপর নির্ভরশীল না করা। এখানে নিজের ভালো লাগা বা খারাপ লাগার কোনো স্থান নেই। আল্লাহ আদেশ করেছেন, এইটাই যথেষ্ট কারণ। স্যার বলেন, আল্লাহর আনুগত্য করতে হবে তাঁর আনুগত্যের কারণেই। আমি তাঁর বান্দা, এই পরিচয়ই যথেষ্ট। আমার মন চাইলো কি চাইলো না, ভালো লাগলো কি লাগলো না, এসব এখানে বিবেচ্য নয়।
স্যার আরও ইঙ্গিত করেন, যিনি কেবল স্বাদের জন্য ইবাদত করেন, তিনি আসলে নিজের নফসের ইবাদত করেন। আর যিনি কষ্ট করে, মনকে বাধ্য করে আল্লাহর হুকুম পালন করেন, তিনিই প্রকৃত 'عبد' বা বান্দা। ইবাদতের প্রকৃত রূপ হলো, “তাও‘আন ওয়া কারহান” (طوعًا وكرهًا), ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, আল্লাহর আদেশ মানতে হবে। মনের অবস্থা যাই হোক, কখনো ইবাদতে খুব স্বাদ পাওয়া যাবে, কখনো হয়তো একেবারে শুষ্কতা অনুভব হবে; এবাদত নিজের ভালো লাগার জন্য নয়, এটা আদেশ। ভালো লাগুক বা না লাগুক, মন চাক বা না চাক, যেহেতু আমার আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন, তাই আমি তা পালন করবই, ইচ্ছা হোক বা না হোক।
স্যার বোঝাতে চেয়েছেন, যে ব্যক্তি নিজের নফস ও অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর নির্দেশ মানতে পারে, তার ইবাদতই প্রকৃত ইবাদত। আর যে ব্যক্তি ‘নিজের ভালো লাগা’কে মাপকাঠি বানায়, তার ইবাদত স্থায়ী হয় না। স্যার চাইতেন, আমরা যেন ইবাদতকে কেবল 'মুড' বা ভালো লাগার ফ্রেমে না বাঁধি। মুমিন তার প্রবৃত্তির গোলাম নয়, তার ভালো লাগা বা মন্দ লাগার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি বড়।
🎤 ৩৩৬
ঢাকায় এক প্রোগ্রাম শেষে উপস্থিত সাথীদের মধ্যে পরামর্শ হলো, মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব হজের সফরে যাচ্ছেন, উনার সাথে সাক্ষাৎ করা যায়। পরামর্শ অনুযায়ী স্যারসহ পাঁচজন একটি গাড়িতে করে হযরতপুরে মারকাযুদ দাওয়াহ আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় উনার সাথে দেখা করতে যান। বর্ণনাকারী হাসান হাবিব ভাইও সে দলে উপস্থিত ছিলেন।
হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব তখন সফরের প্রস্তুতিতে ছিলেন; হাতে সময় খুবই কম, বের হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছিল। সাক্ষাৎটি ছিল সংক্ষিপ্ত। বিদায় নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে স্যার অত্যন্ত বিনয়ের সাথে একটি গভীর আবেদন পেশ করেন।
স্যার বলেন, “আপনি হজে যাচ্ছেন; সেখানে বিভিন্ন সময় ও স্থানে দোয়ার বিশেষ মওকা পাবেন। একটি বিষয়ের জন্য দোয়া করবেন, মানুষ সাধারণত ‘মালুমাত’ (তথ্য)কেই ‘ইলম’ মনে করে। দোয়া করবেন, উম্মত যেন ‘মালুমাত’ ও ‘ইলম’ এর পার্থক্য বুঝতে পারে।”
স্যারের এই আবেদন শোনার পর হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব কিছুক্ষণ নীরবে মাথা নিচু করে থাকলেন। এরপর মাথা তুলে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন, যেন কথাটির গভীরতা তিনি অন্তরে অনুভব করলেন।
স্যার বিভিন্ন সময় বয়ান ও মুজাকারায় এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তুলে ধরতেন। তিনি বোঝাতেন, বর্তমানে অনেকেই কিছু পড়াশোনা, কিতাব বা মাসায়েলের জ্ঞানকে ‘ইলম’ মনে করে। অথচ কিতাব পড়ে তথ্য জানা এক জিনিস, আর হক্কানি আলেমদের সোহবতে থেকে ইলমের হাকিকত অর্জন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ইলম শুধু মস্তিষ্কে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানুষের চরিত্র ও আচরণে প্রকাশ পায়। স্যার আরও ইঙ্গিত করতেন, তথ্যের আধিক্য মানুষকে অনেক সময় অহংকারী করে তোলে; কিন্তু প্রকৃত ইলম মানুষকে বিনয়ী করে। ইলমের উদ্দেশ্য হলো আমল ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন; কেবল তর্কে জেতা বা তথ্য দিয়ে অন্যকে চমকে দেওয়া নয়। আমরা যেন তথ্যের পেছনে না ছুটে, সেই ইলম অর্জনের চেষ্টা করি, যা আমাদের অন্তরকে শুদ্ধ করে এবং আল্লাহর নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়।
হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের মতো একজন পরিচিত আলেমের কাছে এই দোয়া চাওয়ার মধ্য দিয়ে স্যার বুঝাতে চেয়েছেন, এই সমস্যাটি অত্যন্ত গভীর ও উম্মতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উম্মত যখন ‘মালুমাত’ ও ‘ইলম’ এর পার্থক্য বুঝতে পারবে, তথ্যকে ইলম মনে করার ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে, তখনই প্রকৃত হিদায়াতের পথে অগ্রসর হতে পারবে।
🎤 ৩৩৭
নওগাঁ জেলার চকদেবপাড়ার বাসিন্দা কাজী আনসার আলী সাহেব ছিলেন তাবলিগের একজন নিবেদিতপ্রাণ পুরাতন মুরব্বি এবং জেলা শূরার সাথী। স্যার নওগাঁয় একটি জামাতের সাথে সফরে, তখন এই প্রবীণ মুরব্বি বেশ অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থ সাথীদের খোঁজখবর নেওয়া এবং তাঁদের দেখতে যাওয়া ছিল স্যারের জীবনের অন্যতম নিয়মিত আমল। সেই ধারাবাহিকতায় স্যার কিছু সাথী নিয়ে কাজী সাহেবের বাড়িতে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে উপস্থিত হলেন।
স্যারকে নিজের আঙিনায় দেখে কাজী আনসার আলী সাহেব যারপরনাই আনন্দিত হলেন। অসুস্থ শরীরেও তাঁর এই উদ্দীপনা ও ইস্তেকবাল (অভ্যর্থনা) দেখে উপস্থিত সবাই বুঝতে পারলেন, স্যারের প্রতি তাঁর মহব্বত কতটা গভীর ছিল। তিনি ব্যস্ত হয়ে সন্তানদের দোকানে পাঠালেন মিষ্টি ও বিস্কুট আনার জন্য। একজন অসুস্থ মানুষের মধ্যে মেহমানদারির এমন ব্যাকুলতা সচরাচর দেখা যায় না।
স্যার তাঁর পাশে বসলেন। দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত আপনজনের মতো কুশল বিনিময় করলেন। কোনো আনুষ্ঠানিক বা তাত্ত্বিক বয়ান ছিল না; স্যার উনার পারিবারিক খবরাখবর নিচ্ছিলেন। তাঁর ছেলেরা কী করে, আলেম ছেলেটি চট্টগ্রামে কেমন আছে, আত্মীয়স্বজন কে কোথায়, এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘদিন পর দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু একত্রিত হয়েছেন। বয়সের ব্যবধান থাকলেও সেখানে শ্রদ্ধার সাথে মিশে ছিল অকৃত্রিম আন্তরিকতা।
মুসাফাহা করে স্যার যখন ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই কাজী সাহেব আবেগাপ্লুত কণ্ঠে স্যারের নাম ধরে ডাক দিলেন, “মুশফিক!” স্যার সাথে সাথে ফিরে এসে তাঁর হাত ধরলেন। তখন বৃদ্ধ মুরব্বি স্যারকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললেন, “তোমার সাথে আর কবে দেখা হয় না হয়, বোধ হয় আর দেখা হবে না।” স্যার তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন; কিন্তু সেই মুহূর্ত ছিল গভীর আবেগ ও মহব্বতে ভরা। সেটিই ছিল তাঁদের শেষ সাক্ষাৎ। স্যারের পরবর্তী নওগাঁ সফরের আগেই কাজী আনসার আলী সাহেব ইন্তেকাল করেন।
কাজের ব্যস্ততায় আমরা অনেক সময় অসুস্থ বা অসহায় সাথীদের ভুলে যাই। কিন্তু স্যার তাঁর আমলের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, তাঁদের খোঁজখবর নেওয়া, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের সময় দেওয়া ঈমানি দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। স্যার দেখিয়েছেন, দ্বীনি সম্পর্কের ভিত্তি কেবল সাংগঠনিক নয়, বরং আত্মিক। কাজী সাহেবের সেই আবেগভরা ডাক ও কান্না প্রমাণ করে, দ্বীনের মেহনত মানুষের হৃদয়ে এমন এক বন্ধন তৈরি করে যা রক্তের সম্পর্কের চেয়েও মজবুত হতে পারে।
অনেকের ধারণা, কেবল দীর্ঘ বয়ান আর তাত্ত্বিক আলোচনা করাই বোধহয় দ্বীনি খিদমতের একমাত্র রূপ; কিন্তু স্যারের জীবনদর্শন ছিল ভিন্ন। স্যার দেখিয়েছেন, অসুস্থ সাথীর শিয়রে বসা কিংবা তার পরিবারের ছোটখাটো বিষয়েও আন্তরিকতা দেখানো, বড় মাপের আমল। এই ছোট ছোট আমলগুলোই মানুষের অন্তরে দ্বীনের প্রতি এমন এক গভীর ভালোবাসা জন্ম দেয়, যা হাজারো বয়ানের চেয়েও বেশি কার্যকর। বয়ান কান পর্যন্ত পৌঁছায়, কিন্তু আল্লাহর জন্য ভালোবাসা (ব্যক্তিগত মমতা) পৌঁছায় মানুষের হৃদস্পন্দন পর্যন্ত। মানুষের মন জয় করে তাকে দ্বীনের পথে ডাকা যে কত বড় কার্যকর কৌশল হতে পারে, স্যারের এই 'হালত পুর্ছি' বা কুশল বিনিময়ের আমলটি তার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মুরব্বি যখন বিদায়ের মুহূর্তে অশ্রু বিসর্জন দেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে সেই সম্পর্কের শেকড় হৃদয়ের কতটা গভীরে। কাজী সাহেবের সেই কান্না ছিল যেন তাঁর অন্তরের নিভৃত কোণ থেকে আসা এক শেষ নিবেদন। স্যারের এই সাক্ষাৎ কেবল কোনো লৌকিক সৌজন্য ছিল না, বরং এতে ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই পবিত্র আদর্শের প্রতিফলন, যিনি মানুষের মন জয় করতেন অকৃত্রিম মমতা দিয়ে। কাজী আনসার আলী সাহেবের সেই শেষ ডাক এবং টলমল চোখের পানি আমাদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
🎤 ৩৩৮
বাচ্চাদের সাথে স্যারের এক অমায়িক ও শিশুসুলভ আচরণের ঘটনা বর্ণনা করেন সায়ীদ আবুবকর ভাই। তিনি শুধু বড়দের সাথেই নয়; ছোট শিশুদের সাথেও এমনভাবে মিশে যেতেন, যেন তিনি তাদেরই একজন। ভাই বলেন, চাকরির সুবাদে আমাকে ঝিনাইদহ ও সিরাজগঞ্জে থাকতে হয়েছে। উভয় স্থানেই স্যার সফরে গিয়ে আমার বাসায় অবস্থান করেছেন, রাত যাপন করেছেন। ঝিনাইদহে থাকাকালীন একবার স্যার আমার বাসায় মেহমান হলেন। আমার দুই মেয়ে তখন একেবারেই ছোট। আমরা স্যারকে শোয়ার জন্য একটি ঘর নির্দিষ্ট করে দিলাম।
বাচ্চারা সাধারণত বাড়িতে মেহমান আসলে খুব কৌতূহলী হয়। স্যারের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। এদিকে ছোট দুই মেয়ে খুব আনন্দিত, বাড়িতে একজন মেহমান এসেছে। পরম উৎসাহে তারা নিজেদের মতো করে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ‘রান্নাবান্না’ করতে। কাগজের টুকরো দিয়ে তারা পাকিয়ে ফেলল মাছ, গোশত আর ভাত, তাদের শিশু মনের কল্পনার খাবার। তারপর তারা সেই ‘খাবার’ স্যারের সামনে নিয়ে এলো খাওয়ার জন্য, এবং পরম মমতায় স্যারকে তা খাওয়ার জন্য পরিবেশন করল।
স্যার তখন তাদের সাথে একদম ছোট শিশু হয়ে মিশে গেলেন, তাদের পরিবেশন করা সেই কাগজের টুকরো দিয়ে তৈরি খাবার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করলেন। শুধু তাই নয়, তিনি বাচ্চাদের সামনে সেই কাগজের খাবারগুলো ঠোটের কাছে নিয়ে চিবানোর মতো এমন নিপুণ অভিনয় আর অঙ্গভঙ্গি করলেন যে, মনে হচ্ছিল তিনি সত্যিই খুব সুস্বাদু কোনো খাবার খাচ্ছেন। তিনি বাচ্চাদের বোঝালেন যে, তাদের রান্না করা সেই খানা অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে, অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট ছিল “খুব মজা হয়েছে!”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের সাথে শিশুদের মতো আচরণ করতেন। তাদের সাথে হাসাহাসি ও খেলাধুলা করতেন। বড় হয়েও ছোটদের মন জয় করা এবং তাদের কল্পনার জগতের সাথে একাত্ম হওয়া একটি উঁচু মাপের চারিত্রিক গুণ। স্যার তাঁর এই আচরণের মাধ্যমে সেই সুন্নাহকেই জীবন্ত করেছেন। সাঈদ ভাই বলেন, এই দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে, একজন বড় মাপের মানুষ বা জ্ঞান তাপস হওয়া মানেই গম্ভীর হয়ে থাকা নয়। শিশুদের মন জয় করতে বড় কোনো কথা বা উপদেশের প্রয়োজন হয় না; বরং দরকার আন্তরিকতা, ভালোবাসা এবং তাদের স্তরে নেমে আসার মানসিকতা। স্যার মেহমান হিসেবে গিয়ে নিজেকে কোনো গণ্ডিতে আটকে রাখেননি। বরং মেজবানের সন্তানদের সাথে এমনভাবে মিশে গেছেন যেন তিনি তাদেরই পরিবারের একজন অতি আপনজন।
🎤 ৩৩৯
ঢাকার পশ্চিম আগারগাঁও এলাকায় এক ভাইয়ের বাসায় দুপুরে খানার দাওয়াত ছিল। মেজবানের পরিচিতির সুবাদে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিল। মেজবান ভাই স্যারের উপস্থিতির এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ছাত্রীদের উদ্দেশে কিছু দ্বীনি আলোচনার ব্যবস্থা করেন। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ঘরোয়া মজলিসে মাস্তুরাতের মুজাকারার আয়োজন করা হয়।
মাস্তুরাতের সে মুজাকারায় প্রথাগত শিক্ষার আলোচনা প্রসঙ্গে স্যার এক উদাহরণ পেশ করেন। একজন মেডিকেল কলেজের শিক্ষক মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের একটি বিশেষ অধ্যায় পড়াচ্ছিলেন, “হঠাৎ কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে তার প্রাথমিক চিকিৎসা ও তাৎক্ষণিক করণীয়”। কয়েকটি ক্লাস ধরে তিনি বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বুঝিয়েছেন, কীভাবে রোগীকে সামলাতে হয়, কীভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হয় ইত্যাদি। খুঁটিনাটি অনেক থিওরি শেখানোর পর যেদিন সেই চ্যাপ্টারের শেষ ক্লাস, শিক্ষক প্র্যাকটিক্যাল ডেমোস্ট্রেশন (ব্যবহারিক প্রদর্শন) কে সামনে আনতে চান, এই পাঠের শেষ পর্যায়ে হঠাৎ নিজেই অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন।
হঠাৎ শিক্ষকের এই শারীরিক অবনতি দেখে শিক্ষার্থীরা একটু ঘাবড়ে গেলো, সবাই আতঙ্কিত হয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। কেউ চিৎকার করছে, কেউ ডাক্তার ডাকতে বলছে, কেউ ডাক্তার ডাকতে দৌড়ালো, কেউ অ্যাম্বুলেন্সে ফোন দিল, কেউবা ডিপার্টমেন্টের অফিসে খবর দিতে ছুটল, চারদিকে হইচই শুরু হয়ে গেল, পুরো ক্লাসে শোরগোল, সবাই অস্থিরতায় লিপ্ত। কিন্তু যেটা তারা এতদিন শিখেছিল, তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা, একজন শিক্ষার্থীও শিক্ষকের শেখানো সেই 'প্রাথমিক চিকিৎসা' বা 'ফার্স্ট এইড' দেওয়ার কথা মনে করল না, তার কোনো প্রয়োগ কেউ করতে পারল না।
আসলে এটি ছিল ঐ শিক্ষকের একটি পরিকল্পিত প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা, তাঁর অজ্ঞান হওয়াটা ছিল একটি চমৎকার সাজানো অভিনয় বা 'সারপ্রাইজ টেস্ট'। কিছুক্ষণ পর শিক্ষক উঠে দাঁড়ালেন। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, দীর্ঘ ক্লাসে তিনি যা পড়িয়েছেন, বাস্তব সংকটের মুহূর্তে শিক্ষার্থীরা তার কতটুকু প্রয়োগ করতে পারে। তাঁর শিক্ষার্থীরা শুধু তত্ত্ব (থিওরি) শিখেছে, নাকি বাস্তবে তা প্রয়োগ করার সক্ষমতাও অর্জন করেছে। কিন্তু দেখা গেল, শিক্ষার্থীরা জেনেছে, বুঝেছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে কাজে লাগাতে পারেনি, তাত্ত্বিকভাবে জানলেও বিপদের সময় তাদের সেই শিক্ষার কোনো প্রতিফলন নেই।
স্যার এই উদাহরণের মাধ্যমে আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক সত্যের দিকে ইঙ্গিত করেন: আমরা অনেকেই অনেক মাসলা-মাসায়েল জানি, বয়ান মোজাকারা শুনি, অনেক দ্বীনি কিতাব পড়ি, কিন্তু যখন ধৈর্যের পরীক্ষা আসে, যখন শোকর গুজার হওয়ার মুহূর্ত আসে কিংবা চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখানোর সময় হয়, তখন আমরা সাধারণ মানুষের মতোই বিচলিত হয়ে পড়ি। সেই মুহূর্তে আমাদের তাত্ত্বিক দ্বীনদারী কোনো কাজে আসে না। স্যার আমাদের দ্বীনি জীবনের স্বরূপ এভাবে বোঝান, দেমাগ (মস্তিষ্ক) যা ধারণ করবে, জীবন যেন ঠিক তার সাক্ষ্য দেয়; জবান যা বলবে, জীবন যেন ঠিক তার সাক্ষ্য দেয়, তবেই সেটা দ্বীনদারী, তবেই তার শিক্ষা (ইলম) সার্থক। আমাদের জ্ঞান বা অর্জিত শিক্ষা যদি আমল পর্যন্ত না পৌঁছায়, তবে তা প্রকৃত জ্ঞান নয়; বরং এমন শিক্ষার কোনো বাস্তব উপযোগিতা নেই।
🎤 ৩৪০
একবার স্যার কিছু সাথী সহ ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে আবুল কাশেম ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করছিলেন। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে ‘কায়লুলা’ (দুপুরের বিশ্রাম) করার সময় হলে দেখা গেল, আবুল কাশেম ভাইয়ের ছোট ঘরটিতে সবার বিশ্রামের পর্যাপ্ত জায়গা হচ্ছে না, বাসার ছোট রুমে সবার জন্য আরামদায়কভাবে বিশ্রামের সুযোগ ছিল না।
যেহেতু আবুল কাশেম ভাইদের মহল্লার মসজিদটি বেশ বড় এবং দোতলা-তিনতলা ফাঁকা আছে; তাই সাথীদের কেউ আবুল কাশেম ভাইয়ের নিকট পরামর্শ চাইলেন যে মসজিদের দোতলায় গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া যাক। পরিচিত মেজবানের মহল্লার মসজিদ হওয়ায় সেখানে বিশ্রামে কোনো বাধা আসার সম্ভাবনাও ছিল না, কেউ আপত্তিও করবে না। কিছু সাথী মসজিদে চলে গেলেন, কিন্তু স্যার নড়ছেন না। তিনি দীর্ঘক্ষণ ওভাবেই বসে রইলেন।
স্যার দীর্ঘ সময় চুপচাপ থাকার পরও যখন নিজে মসজিদে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখালেন না, আর এব্যাপারে কিছু বলছেনও না, তখন মাহফুজ ভাই স্যারকে জিজ্ঞাসা করলেন, “স্যার, মসজিদকে বাসস্থান বানানো ঠিক নয়, এই উসুলের কারণেই কি আপনি যাচ্ছেন না?”
স্যার সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, এই উসুলের কারণেই আমি যাচ্ছি না।” এরপর তিনি পরিষ্কার করলেন যে, কেবল আরামের জন্য বা নিজের প্রয়োজনে মসজিদকে ব্যবহার করা ঠিক নয়।
শরীয়তের দৃষ্টিতে মসজিদ হলো আল্লাহর ঘর, যা কেবল নামাজ, জিকির ও দ্বীনি কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ। একান্ত অপারগতা বা দ্বীনি সফর (যেমন জামাতে থাকা) ব্যতীত কেবল ব্যক্তিগত আরামের জন্য মসজিদকে শয্যাস্থল বানানো, বিশ্রাম বা আরামের জায়গা বানানো মসজিদের মর্যাদার পরিপন্থী। সাথীরা অনেকেই মসজিদে বিশ্রাম নিতে গেছেন এবং সেখানে যাওয়ার যৌক্তিকতাও ছিল (পরিচয় ও পর্যাপ্ত জায়গা)। কিন্তু স্যার নিজের আমলের মাধ্যমে বোঝালেন, দ্বীনের আদব শুধু বড় বড় বিষয়ে নয়; বরং এ ধরনের ছোট ছোট বিষয়েও সংরক্ষণ করতে হয়।
🎤 ৩৪১
মুমিনের প্রতিটি আচরণের পেছনে থাকবে ঈমানি সচেতনতা। আখলাকের মূলনীতি হিসেবে স্যার বলতেন, মানুষকে তাদের মর্যাদা অনুযায়ী স্থান দেওয়া (আনযিলুন-নাসা মানাযিলাহুম)। বড়র সম্মান আর ছোটর স্নেহ যেমন আলাদা, তেমনি জ্ঞানী এবং বড়দের তাদের পাণ্ডিত্য ও ত্যাগ অনুযায়ী বিশেষ সম্মান দিতে হবে। এটি কোনো বৈষম্য নয়, বরং এটিই হলো প্রকৃত ইনসাফ বা ন্যায়বিচার।
স্যার ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর জীবনের একটি ঘটনা শোনাতেন। একবার উনার মজলিসে অনেক ফকীহ উপস্থিত ছিলেন। ঐ মজলিসে ইমাম আউযায়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি আসলেন, তিনি তাঁকে বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করলেন, একটু উচু তাকিয়ার উপর বসতে দিলেন। এরপর যখন ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি আসলেন, ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহিকে দেখে অত্যন্ত সম্মান করে নিজের পাশে জায়গা করে দিলেন এবং তাঁর বসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা (চাদর বা গালিচা) বিছিয়ে দিলেন।
উপস্থিতরা যখন এই বিশেষ একরাম বা সম্মানের কারণ জিজ্ঞেস করলেন, (উভয়ের মধ্যে) এই পার্থক্যের কারণ জানতে চাইলেন, তখন ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁদের ইলম ও প্রজ্ঞার স্তরের কথা উল্লেখ করেন। উনি এই হাদিসটি (أَنْزِلُوا النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ) উল্লেখ করে বলেন, "ইনাদের দুইজনের স্তর এক নয়।"
🎤 ৩৪২
আমাদের প্রচলিত ধারণা হলো, সবার সাথে সবসময় একইভাবে হাসিমুখে মেলামেশা করাই উত্তম চরিত্র। কিন্তু স্যার এই ধারণাকে সংশোধন করে বলতেন, নেককার আর বদকারের প্রতি আচরণ অবশ্যই ভিন্ন হতে হবে।
মুমিনের আসল চরিত্র কেমন হওয়া উচিত, তা বোঝাতে গিয়ে স্যার একটি উদাহরণ পেশ করতেন। তিনি বলতেন, সবার সাথে বাছ-বিচারহীনভাবে একই আচরণ করা মূলত "গরুর আখলাক"। একটি গরু তার সামনে উপস্থিত ব্যক্তিটি অনেক বড় আল্লাহওয়ালা নাকি চরম পাপাচারী, সেই পার্থক্য করতে পারে না, সে সবার সাথেই এক আচরণ করে। সবার কথার জবাবে তার একটাই ডাক, একই জবাব, 'হাম্বা!' যে-ই তাকে নাড়া দেয়, তার জবাবে ও কান নাড়িয়ে একই ভঙ্গিতে সাড়া দেয়; ওর একই আচরণ সবার সাথে। কিন্তু শরীয়ত মুমিনকে এই শিক্ষা দেয়নি।
স্যার শিখিয়েছেন যে, উত্তম চরিত্র মানে কেবল 'নরম হওয়া' নয়; বরং উত্তম চরিত্র হলো যেখানে নরম হওয়া দরকার সেখানে নরম হওয়া, আর যেখানে আদর্শের প্রশ্নে শক্ত হওয়া দরকার সেখানে পাহাড়ের মতো অটল থাকা। মানুষ কী বলবে বা কেউ অসন্তুষ্ট হবে কি না, এই চিন্তা না করে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী আচরণ করা হলো মুমিনের সিফত।
🎤 ৩৪৩
স্যার বলেন, ঈমানের দাবি হলো, হুব্বুন ফিল্লাহ, বুগদুন ফিল্লাহ (الْحُبُّ فِي اللَّهِ , الْبُغْضُ فِي اللَّهِ)। আল্লাহর জন্যই হবে ভালোবাসা, আবার আল্লাহর জন্যই হবে বিদ্বেষ বা ঘৃণা। সত্যবাদী আর আমানতদারকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, সাথে সাথে আর মিথ্যাবাদী ও খিয়ানতকারীকে আল্লাহর জন্যই ঘৃণা করা (কোনো ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত বা সত্যের বিরোধী হলে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তার সেই কর্মকে বা তাকে অপছন্দ করা)। মুমিনের ভালোবাসা বা ঘৃণা কোনোটিই মর্জিমতো হবে না; বরং সবকিছুর মাপকাঠি হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি।
স্যার ফাজায়েলে ছাদাকাত কিতাবের রেফারেন্স দিয়ে বলেন, যে ব্যক্তি সবার কাছে সমান প্রিয়, সম্ভবত তার দ্বীনদারিতে ত্রুটি আছে। কারণ হক আর বাতিল কখনো একসাথে কারো ওপর সন্তুষ্ট হতে পারে না। হকের ওপর যে অটল থাকবে, বাতিল তার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেই। তাই সবার কাছে ভালো হওয়ার চেষ্টা করা মানে হলো হকের সাথে আপস করা।
স্যার মুমিনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য এবং চারিত্রিক মানদণ্ড হিসেবে কালামে পাক থেকে উপমা দিতেন:
> أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ
> أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ
স্যার স্পষ্ট করতেন যে, দ্বীনদারি আর সামাজিকতা এক নয়। একজন মুমিন কখনোই বলতে পারে না যে, মুমিনও আমার বন্ধু, ইহুদি-মুশরিকও আমার বন্ধু। সহযোগিতার ক্ষেত্র আলাদা; ক্ষুধার্থকে খাবার খাওয়ানোর সময় সে কাফের কি মুসলিম তা দেখবে না। কিন্তু 'কালবি মহব্বত' বা হৃদয়ের ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির ভিত্তিতে হতে হবে। কাফের বা পাপাচারীর সাথে তার সম্পর্ক হবে কেবল মানবিক প্রয়োজনে বা দাওয়াতের প্রয়োজনে, হৃদয়ের টানে নয়। যে আল্লাহর শত্রু সে মুমিনের বন্ধু হতে পারে না, আর যে আল্লাহর বন্ধু সে মুমিনের শত্রু হতে পানে না। স্যার বলতেন এটা আমাদের আকীদার অংশ।
🎤 ৩৪৪
একবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কুষ্টিয়ায় একটি জামাত যায়। কয়েকদিন কুষ্টিয়া শহরে থাকার পর পরামর্শ অনুযায়ী স্যারসহ জামাতের একটি অংশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। কিন্তু আমাদের কয়েকজনের ক্লাস ও ব্যস্ততা থাকায় আমরা পাঁচজন কুষ্টিয়া শহর থেকেই রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা দেই। কুষ্টিয়া থেকে আমাদের ফেরার পথে এক ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। হুজুর মানুষ দেখে হয়তো ডাকাতরা আমাদের ছেড়ে দেয়; অন্য সবাইকে তল্লাশি করা হলেও আমরা রেহাই পাই।
সেই সময় পদ্মা নদীর উপর বাস চলাচলের সেতু ছিল না; ফেরি দিয়ে পার হতে হতো। আমরা যে বাসে উঠলাম, তাতে গরুর ব্যবসায়ীও ছিল, যারা চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে গরু কেনার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন এবং যাদের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা ছিল। পথিমধ্যে নির্জন এলাকায় একদল ডাকাত কৌশলে বাস থামিয়ে ফেলে। আগে থেকেই তাদের কয়েকজন বাসে ছিল। তারা ড্রাইভারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং মুহূর্তেই পুরো বাসে ত্রাস সৃষ্টি করে।
বাসে উঠে তারা সামনে বসা এক বৃদ্ধ মুরুব্বি যাত্রীকে ছুরি মেরে গুরুতর আহত করে, যাতে সবাই ভয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। সামনে একজন পিস্তল উঁচিয়ে পেছনের দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে ছিল। এরপর তারা একে একে যাত্রীদের তল্লাশি করে টাকা-পয়সা নিয়ে নিতে থাকে। কেউ দেরি করলে তাকে মারধর ও হুমকি দিচ্ছিল। ডাকাতরা আমাদের কাছে এসে তল্লাশি না করে পেছনে তল্লাশি শুরু করে।
মোতাহার স্যার, কাজল ভাইসহ আমরা পাঁচজন বাসের মাঝামাঝি একসাথে বসে ছিলাম। অত্যন্ত ভীত অবস্থায় আমরা দোয়া, ইস্তিগফার ও দোয়া ইউনূস পড়ছিলাম। আল্লাহর রহমতে ডাকাতরা আমাদের স্পর্শও করেনি। তারা সবকিছু নিয়ে দ্রুত চলে গেলে বাসে হাহাকার শুরু হয়। বিশেষ করে গরুর ব্যবসায়ীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। আর সামনে সেই আহত বৃদ্ধ, তিনি কষ্টে বলছিলেন, “আমি আমার অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য রাজশাহী নিয়ে যাচ্ছিলাম, এখন আমি নিজেই রোগী হয়ে গেলাম।” তাঁর লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি রক্তে ভিজে যায়।
আমরা তখন অন্যদের মতোই তাড়াহুড়ো করে বাস থেকে নেমে ফেরিঘাটের দিকে রওনা দেই। সেই বৃদ্ধের রক্তাক্ত অবস্থা চোখে পড়েছিল, কিন্তু ভয়ের চাপে আমরা আর কিছু করতে পারিনি। পরে রাজশাহীতে স্যার ফিরে আসলে পুরো ঘটনা শুনালাম। এই ‘অলৌকিক’ভাবে রক্ষা পাওয়ার খুশিতে ভেবেছিলাম, স্যার হয়তো আমাদের বেঁচে যাওয়া ও আমলের মধ্যে থাকার কথা শুনে খুশি হবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
স্যারের চেহারায় গভীর বেদনার ছাপ ফুটে উঠল। তিনি শুধু সেই রক্তাক্ত ও অসহায় বৃদ্ধের কথাই জিজ্ঞাসা করছিলেন, “যে বৃদ্ধকে ছুরি মারা হয়েছিল, তাঁর কী হলো?” বললাম, আমরা তো নেমে চলে এসেছি; তাঁর পরের অবস্থা জানি না। যখন স্যার শুনলেন যে সবাই যার যার মতো নেমে গেছে এবং সেই বৃদ্ধকে ওই অবস্থায় ফেলে আসা হয়েছে, তখন তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। তিনি সম্পূর্ণ নীরব হয়ে গেলেন। মনে হচ্ছিল, তিনি সেই অসহায় বৃদ্ধের কষ্টই অনুভব করছেন। আমাদের বেঁচে যাওয়ার গল্পে তিনি খুশি হতে পারেননি।
স্যার তাঁর গম্ভীর ও ব্যথিত চেহারার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন, মুমিন সেই ব্যক্তি যার হৃদয় অন্যের দুঃখে দগ্ধ হয়। নিজের নিরাপত্তা পাওয়াকে ‘কামিয়াবি’ মনে করা যথেষ্ট নয়; বরং অন্যের কষ্টে সাড়া দেওয়াই একজন মুমিনের আসল পরিচয়। আমাদের মনে হচ্ছিল, “আলহামদুলিল্লাহ, আমরা বেঁচে গেছি।” এটিকে এক ধরনের ‘কেরামতি’ ভেবেছিলাম। কিন্তু স্যারের অন্তরে বাজছিল, একজন অসহায় মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। স্যার পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিলেন, সেই মুহূর্তে ওই বৃদ্ধকে হাসপাতালে নেওয়া বা অন্তত তাঁকে বাস থেকে নামাতে সাহায্য করাটা ছিল সে সময়ের শ্রেষ্ঠ আমল।
বিপদের সময় দোয়া-দরুদ পড়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আমল মানুষকে বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে, কিন্তু আখলাক বা চরিত্র নির্ধারণ করে মানুষ আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারল কি না। স্যারের বেদনাভরা অশ্রুসিক্ত চেহারা যেন এ কথাই বলছিল, অন্যের অসুস্থতা বা বিপদের মুখে নিজের নিরাপত্তায় তৃপ্ত হওয়াটা এক প্রকারের আত্মকেন্দ্রিকতা, যা একজন দায়ী বা মুবাল্লিগের শান হতে পারে না।
🎤 ৩৪৫
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ছাত্র নাটোরের চান মোহাম্মদ ভাই স্যারের সান্নিধ্যের এক স্মৃতি ব্যক্ত করেন। অনার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তিনি কয়েকজন সাথী মিলে আল্লাহর রাস্তায় সময় লাগাবেন (তিন চিল্লা বা চার মাসের জন্য পাকিস্তান সফর)। এ উদ্দেশ্যে কাকরাইল গিয়ে পরামর্শ অনুযায়ী সফরের প্রস্তুতি শুরু করেন। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো, টাকা ভাঙানো (প্রয়োজনীয় ডলার সংগ্রহ) হলো এবং যাত্রার দিনক্ষণও চূড়ান্ত হলো।
কিন্তু ঠিক যাত্রার আগমুহূর্তে খবর এলো যে, খুব শীঘ্রই তাঁদের মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হতে যাচ্ছে। চার মাসের এই দীর্ঘ সফর শেষে ফিরে আসতে আসতে অনেক ক্লাস মিস হয়ে যাবে, সময়মতো ক্লাসে যোগ দেওয়া সম্ভব হবে না।
এই খবর শোনার পর কাফেলার অন্য সাথীরা তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। তারা ভাবলেন, মাস্টার্স ক্লাস মিস করা ঠিক হবে না, তাই তারা স্থানীয়ভাবে অল্প কয়েকদিনের জামাতে চলে গেলেন।
কিন্তু উনি ভাবলেন, "ক্লাসের তো কেবল ঘোষণা এসেছে, এখনো তো শুরু হয়নি। আমি আল্লাহর রাস্তায় বের হই, পরে যা হওয়ার হবে।" সফরের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে তিনি পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হলেন।
ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। ছাত্ররা ফিরে আসছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে ছাত্রদের 'মাশওয়ারা' (পরামর্শ) তে চান মোহাম্মদ ভাইয়ের বিষয়টি উত্থাপিত হলো। সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বললেন যে, এখন যদি পাকিস্তানে চিঠি লিখে তাকে ফিরিয়ে না আনা হয়, তবে তার ক্লাস পড়াশোনার বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। সবাই যখন তাঁকে ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিচ্ছিলেন, তখন স্যার অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন: "চান মোহাম্মদ সময় লাগাক (ওর চার মাস সময় পুরা করেই আসুক)। ও না আসা পর্যন্ত ওর বিভাগে ক্লাস শুরু হবে না।"
ফলাফল হলোও তাই। চান মোহাম্মদ ভাই নির্বিঘ্নে তাঁর চার মাসের সফর শেষ করে দেশে ফিরলেন। তিনি রাজশাহী পৌঁছানোর আরও ১৫ দিন পর তাঁর বিভাগে মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হয়। যে ক্লাসের ভয়ে অন্যরা পিছিয়ে গিয়েছিলেন, উনার সেই ক্লাসের সময়ই পিছিয়ে যায়, নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাস শুরু হয় না, উনার মাস্টার্স এর ক্লাসের কোনো মিস বা ক্ষতি হয় নাই। এটি নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের ঘটনা।
ভাই বলেন, আমি সফর থেকে ফিরে এসে যখন স্যারের এই কথা শুনলাম যে, "ও না আসা পর্যন্ত ক্লাস শুরু হবে না"- মনে হলো, আল্লাহর প্রিয় বান্দারা সাধারণ যুক্তির বাইরেও ঈমানি নূরের মাধ্যমে অনেক কিছু অনুধাবন করতে পারেন। তাঁদের কথা ও দোয়া মুমিনের পথচলাকে সহজ করে দেয়। আমরা মনে করি রুটিন বা নিয়মই সব। কিন্তু এই রুটিন যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন, সেই আল্লাহ যদি চান, তবে সময়ের চাকাও থমকে যেতে পারে।
🎤 ৩৪৬
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল লতিফ হলের সাবেক ছাত্র, ঈশ্বরদীর আব্দুল আহাদ ভাই, স্যারের সোহবতের একটি ঘটনা স্মরণ করে বলেন: তিনি একবার একটি জামাতকে ইস্তেকবাল করে হলের ভেতরে নিয়ে আসেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন প্রভোস্ট তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং তাঁর হলের সিট বাতিল করে দেন। প্রভোস্টের রোষানলে পড়ে তিনি আবাসন সিট হারান।
বিষয়টি তিনি স্যারকে জানালে স্যার তাঁকে অত্যন্ত সংযত ও সুস্পষ্ট ভাষায় একটি দরখাস্ত লিখতে বলেন। একই সঙ্গে এর একটি কপি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছেও দেওয়ার পরামর্শ দেন।
স্যারের নির্দেশনায় লেখা দরখাস্তের ভাষা ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু দৃঢ়: “মাননীয় প্রভোস্ট, অত্র হলে কখন কে আসে এবং কে যায়, তা চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি করা আমার দায়িত্ব নয়; কারণ আমি প্রভোস্ট নই। অতএব, আমার প্রতি গৃহীত এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে হলের সিট পুনর্বহালের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।”
আব্দুল আহাদ ভাই সেই দরখাস্ত প্রভোস্টের কাছে জমা দেন এবং এর একটি অনুলিপি ভিসির কাছেও পাঠান। দরখাস্তের কপি ভিসি বরাবর দেওয়ার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিষয়টি জানার পর প্রভোস্ট তাঁকে দরখাস্ত প্রত্যাহার করার জন্য বারবার অনুরোধ করেন; কিন্তু তিনি তা প্রত্যাহার করেননি। পরবর্তীতে একটি বৈঠকে প্রভোস্টকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর কিছুদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন।
আব্দুল আহাদ ভাই বলেন, স্যারের প্রশাসনিক দূরদর্শিতা এবং হকের ব্যাপারে দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞা ছিল অসাধারণ। তিনি কাউকে অন্যায়ভাবে চাপে পড়লে নীরব থাকতে শেখাননি; বরং শালীনতা বজায় রেখে নিজের অধিকার আদায়ের সঠিক পথ দেখিয়েছেন।
স্যারের পদ্ধতি ছিল না উত্তেজনা বা প্রতিক্রিয়াশীলতা; বরং যুক্তি, শালীনতা ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সত্যকে উপস্থাপন করা। তিনি দেখিয়েছেন, হক আদায় করা মানে শুধু প্রতিবাদ করা নয়; বরং সঠিক ভাষায়, সঠিক প্রক্রিয়ায় নিজের অবস্থান তুলে ধরা। অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা সমাধান নয়; আবার আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করাও সমাধান নয়। স্যার শিখিয়েছেন, দ্বীনদার হওয়া মানে কেবল নতিস্বীকার করা নয়। যেখানে অন্যায়ভাবে দ্বীনি কাজে বাধা দেওয়া হয় বা নিরপরাধ কাউকে হেনস্তা করা হয়, সেখানে শালীনভাবে দাঁড়ানোই মুমিনের পরিচয়।
স্যারের শেখানো দরখাস্তের ভাষা ছিল আত্মমর্যাদাবোধ ও যৌক্তিক প্রতিবাদের এক সুন্দর সমন্বয়। তিনি জানতেন হকের লড়াই কীভাবে লড়তে হয়। তিনি আবেগের বশবর্তী হয়ে গণ্ডগোল করতে বলেননি, বরং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে (ভিসি বরাবর কপি দেওয়া) অন্যায়ের প্রতিকার চেয়েছিলেন।
স্যার কেবল একজন শিক্ষক বা মুরুব্বি ছিলেন না; তিনি ছিলেন ছাত্রদের জন্য এক বটবৃক্ষ, এক আশ্রয়স্থল। যখন কোনো ছাত্র দ্বীনের পথে চলতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হতো, স্যার তাঁর অভিজ্ঞতা, দিকনির্দেশনা ও দোয়া নিয়ে ঢাল হয়ে তার পাশে দাঁড়াতেন।
🎤 ৩৪৭
একবার রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনার শেষে স্যার গণিত বিভাগের নিকটস্থ নামাজকক্ষে যুহরের নামাজের পর উপস্থিত ছাত্র ও শিক্ষকদের মাঝে কিছু মুজাকারা করেন। এটি সম্ভবত ২০১০ সালের কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকের সময়। স্যার কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের সাথে তাঁর কথোপকথনের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি করুণ বাস্তবতা তুলে ধরেন।
স্যার বলেন, একবার তিনি আরেকজন শিক্ষকসহ কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষকের কাছে দাওয়াতের কাজের (গাশতের) উদ্দেশ্যে যান। তখন ওই শিক্ষক পরীক্ষার খাতা দেখায় ব্যস্ত ছিলেন। কথার ফাঁকে তিনি কিছুদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির সংঘর্ষে প্রাণহানির একটি ঘটনা উল্লেখ করে আক্ষেপের সাথে বলেন, “এটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খুবই দুঃখজনক ঘটনা (বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক)।”
ওই শিক্ষকের এই মন্তব্যের পর স্যার একটি সূক্ষ্ম ও যৌক্তিক প্রশ্ন তুললেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: “ঘটনাটি দুঃখজনক-এটা ঠিক। কিন্তু এটি বিশেষভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কেন দুঃখজনক হবে?”
ওই শিক্ষক কিছুটা বিস্মিত হয়ে বললেন, “কেন, এটি কি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নয়?”
তখন স্যার গভীর একটি কথা দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, অভিভাবকরা সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা স্কুলে পাঠান মূলত দুনিয়াবি দক্ষতা অর্জনের জন্য, ভালো চাকরি পাওয়া বা পেশাজীবী হওয়ার জন্য। দ্বীনদার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে সাধারণত তাদের পাঠানো হয় না। উপরন্তু, এসব প্রতিষ্ঠানে দ্বীনি শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্তও নয়।
যেখানে নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই, সেখান থেকে একজন শিক্ষার্থী আদর্শ মানুষ বা দ্বীনদার হয়ে বের হবে, এমনটি প্রত্যাশা করা বৃথা। সেখানে নৈতিক স্খলন বা অঘটন ঘটলে সেটিকে প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা হিসেবে দেখাটা পুরোপুরি যৌক্তিক নয়। স্যারের যুক্তি ছিল, যেখানে নৈতিকতার কোনো পাঠই দেওয়া হয় না, সেখানে নৈতিক স্খলন বা অঘটন ঘটলে প্রতিষ্ঠানের বদনাম হওয়াটা অবান্তর; কারণ প্রতিষ্ঠানটি তো সেই শিক্ষা দেওয়ার বা সেই দায়িত্ব নেওয়ার দাবিই কখনও করেনি।
স্যার এই কথার মাধ্যমে একটি সূক্ষ্ম বাস্তবতা তুলে ধরেন, অভিভাবকরা যখন সন্তানদের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান, তখন তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে সন্তানকে একজন 'দক্ষ কর্মী' (যেমন: অফিসার, ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার) হিসেবে গড়ে তোলা। এই প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের সিলেবাসে কেবল কর্মমুখী বা জাগতিক জ্ঞানই প্রদান করে। এধরণের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের চরিত্রকে কিভাবে সুরক্ষিত রাখতে পারে? এজাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূলত জ্ঞান ও দক্ষতা প্রদান করে; কিন্তু চরিত্র গঠন, তাকওয়া সৃষ্টি, আল্লাহভীতি জাগ্রত করা, এসবের জন্য আলাদা মেহনত প্রয়োজন। দুনিয়াবি জ্ঞানের পাশাপাশি দ্বীনের মেহনত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা না থাকলে সমাজে অশান্তি ও বিপর্যয় দেখা দিতেই পারে। কেননা শুধু একাডেমিক শিক্ষার মাধ্যমে একজন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ বানানো সম্ভব নয়।
এই কথার মাধ্যমে স্যার মূলত দ্বীনি মেহনত ও দাওয়াতের অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি যদি মানুষের অন্তরে দ্বীনি চেতনা ও আল্লাহভীতি সৃষ্টি না হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও মানুষ সঠিক পথের দিশা পাবে না। এখানে অভিভাবকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নজরে পড়ে। আমরা সন্তানদের 'ক্যারিয়ার' গড়তে যতটা আগ্রহী, তাদের 'আখলাক' বা দ্বীনদারি গড়তে ততটাই উদাসীন। আমরা কেবল সন্তানদের দক্ষ বানাতে চাই, দুনিয়াবি প্রতিযোগিতার জন্য দক্ষ বানাচ্ছি, কিন্তু মানুষ বানানোর দায়িত্বটি প্রায়ই উপেক্ষা করি।
🎤 ৩৪৮
একবার মান্দায় এক সাথীর সাথে দেখা সাক্ষাতের প্রোগ্রাম শেষে নওগাঁর নজিপুরে একটি জামাতের নুসরতে যাওয়ার প্রোগ্রাম ছিল। শীতের দিন, সঙ্গে ঝিরঝির বৃষ্টি ও ঠাণ্ডা বাতাস। মান্দার সেই সাথীর কাছ থেকে বিদায় নিতে কিছুটা দেরি হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে রওনা হওয়া সম্ভব হয়নি। ওই সাথী পীড়াপীড়ি করছিলেন যে, “আজ আর যাওয়া হবে না, গাড়ি পাওয়া মুশকিল।” কিন্তু স্যার অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে বললেন, “রওনা দেই, ইনশাআল্লাহ কোনো না কোনো ব্যবস্থা হবে।”
এশার সময়ের কাছাকাছি মান্দা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও নজিপুরগামী কোনো গাড়ি মিলছিল না। বৃষ্টি পড়ছে, শীত বাড়ছে, চারদিকের নির্জনতা আরও ঘন হয়ে উঠছে। এমন সময় একটি ট্রাকের ড্রাইভার চা নাস্তার জন্য গাড়ি থামিয়েছিল। রওনা হওয়ার সময় তিনি স্যারকে খেয়াল করলেন, দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “হুজুর, কোথায় যাবেন?” স্যার বললেন, “নজিপুরে।” ড্রাইভার বললেন, “আমি সরাসরি নজিপুরে যাব না, তবে কাছাকাছি পর্যন্ত যাব। আসেন, কিছুটা এগিয়ে দিই। এখন বাস পাওয়া কঠিন হবে।”
ড্রাইভারের এই আন্তরিক প্রস্তাবে স্যার তাঁর পাশে উঠে বসলেন। সামনে ড্রাইভার, হেল্পার এবং স্যারসহ চারজন গাদাগাদি করে বসে পথ চলা শুরু হলো। যাত্রাপথে স্যার এমন আন্তরিক ও সহজভাবে ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে লাগলেন, যেন তিনি বহুদিনের পরিচিত একজন মানুষ। ট্রাকের মডেল, কত বছর চলে, ট্রাক্টরের সাথে ট্রাকের পার্থক্য, ইঞ্জিনের খুঁটিনাটি, ট্রিপের হিসাব, রাতের ড্রাইভিং, রাস্তাঘাট এজাতীয় নানা বিষয়ে কথা বলতে লাগলেন।
কথার ফাঁকে এক পর্যায়ে স্যার অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি তাবলিগে কখনো সময় লাগিয়েছেন নাকি?” প্রশ্নটি ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক দাওয়াতের ভাষায়; বরং আপন মানুষকে আপনভাবে দ্বীনের দিকে টেনে নেওয়ার মতো আন্তরিক। ড্রাইভারও খুব স্বাভাবিকভাবে নিজের অভিজ্ঞতা ও পরিচিত মানুষের কথা বলতে লাগলেন। স্যারের কথাবার্তায় কোথাও এমন কোনো ভাব ছিল না যে তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বরং মনে হচ্ছিল, তিনি যেন এই শ্রমজীবী সমাজেরই একজন আপন মানুষ। এক পর্যায়ে ড্রাইভার কৌতূহল করে জিজ্ঞাসা করলেন, “হুজুর, আপনি কী করেন? আপনার কথা তো খুব পরিষ্কার বাংলা, কোনো আঞ্চলিক টান নাই।” স্যার অত্যন্ত সহজ ও সাদাসিধে ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন: “আমি ছাত্র পড়াই।” তিনি চাইলে বলতে পারতেন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক; কিন্তু নিজের পরিচয়কে বড় করে তুলে ধরার কোনো প্রয়োজন তিনি অনুভব করেননি।
ড্রাইভার সম্ভবত মনে করেছিলেন, তিনি হয়তো মাদরাসার শিক্ষক বা গৃহশিক্ষক, যিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে আরবি পড়ান। এরপর তিনি তাঁর এক আত্মীয়ের কথাও বলতে লাগলেন, যিনি কিছুদিন মাদরাসায় পড়েছেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে আরবি পড়ান। তাঁর উসিলায় এলাকার অনেক মানুষ কুরআন পড়া শিখেছেন। স্যার অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তাঁর এই কথা শুনছিলেন। নিজের এই সাধারণ পরিচয়টিকেই যেন তিনি উপভোগ করছিলেন; বিশ্ববিদ্যালয়ের পদের কোনো গাম্ভীর্য প্রকাশ হতে দিলেন না। স্যারের জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি মানুষের সাথে তাদের স্তরে নেমে মিশে যেতে পারতেন। অপরিচিত কাউকে নিজের সামাজিক অবস্থান বা শিক্ষাগত পরিচয়কে সামনে এনে দূরত্ব সৃষ্টি করতেন না; বরং সহজ আচরণ ও আন্তরিক কথাবার্তার মাধ্যমে মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিতেন। সাধারণ মানুষের সাথে এমনভাবে মিশতেন যে, তারা তাঁকে নিজেদেরই একজন মনে করত।
আমাদের সমাজে সামান্য উচ্চশিক্ষা বা পদমর্যাদা পেলেই অনেক মানুষের হাঁটা চলা ও কথাবার্তার ধরন বদলে যায়; সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু স্যার চাইলে নিজের বড় পরিচয় দিয়ে ড্রাইভারকে চমকে দিতে পারতেন, অথচ তিনি তা করেননি। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের মন জয় করতে হলে আগে তার স্তরে নেমে আসতে হয়, এটাই একজন দ্বীনের দাঈ বা মুবাল্লিগের বড় গুণ। আবার শীত ও বৃষ্টির রাতে একটি ট্রাকের সামনের সিটে গাদাগাদি করে বসা একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের জন্য জাগতিক দৃষ্টিতে কষ্টকর বা মর্যাদাহানিকর মনে হতে পারে। কিন্তু যার অন্তরে দ্বীনের মেহনতের ফিকির থাকে, তার কাছে আরাম আয়েশ বা সামাজিক প্রটোকলের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং গন্তব্যে পৌঁছানোই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। স্যার নিজের আমলের মাধ্যমে এই বাস্তবতাই তুলে ধরেছেন।
🎤 ৩৪৯
স্যারের কাছে কুরআন শরীফের তিলাওয়াত কেবল সওয়াবের বিষয় ছিল না; বরং এটি ছিল আল্লাহর কালামের হক আদায়ের বিষয়। তিনি মনে করতেন, মানুষ যদি দুনিয়ার ছোটখাটো দক্ষতা অর্জনের জন্য দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে পারে, তাহলে আল্লাহর কিতাব শুদ্ধভাবে পড়ার জন্য আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
স্যার এক মুজাকারায় হযরত হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহির একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, হযরত থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মক্কা শরীফে, সেখানকার একজন প্রসিদ্ধ কারীর সাক্ষাৎ পান। তিনি উপমহাদেশের অন্যতম বড় আলেম, তাফসির, ফিকহ ও তাসাউফের রাহবার। কিন্তু এত বড় আলেম হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের কেরাতকে ‘যথেষ্ট’ মনে করেননি। মক্কা শরীফে তিনি ঐ কারীর নিকট দীর্ঘ সময় থেকে কেরাতের মশক করেছিলেন (হয়তো তাঁর তিলাওয়াত শুনে হযরত থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উপলব্ধি করেন যে, নিজের কেরাতকে আরও শুদ্ধ ও সুন্দর করার প্রয়োজন আছে)। স্যার এই ঘটনা দ্বারা বোঝান, কুরআনের তিলাওয়াতের শুদ্ধতার ব্যাপারে বড়দের কত গভীর গুরুত্ব ছিল।
অবসর সময়ে সুযোগ মিললে স্যার নিজে সময় নিয়ে অনেক সময় তিলাওয়াতের মশক করাতেন। একবার ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জে যাওয়ার পথে বাসে বসেই স্যার তিলাওয়াত শুনলেন এবং এক আয়াত এক আয়াত করে মশক করালেন। জামাতে যেমন কুরআনের হালকায় মশক করানো হয়, ঠিক সেভাবে। আবার রাজশাহীতে কাজল ভাইয়ের বাসায় অবস্থানকালেও অবসর সময়ে একাধিকবার এভাবে মশক করিয়েছেন।
স্যার কালামে পাকের তিলাওয়াতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। অনেক সময় মানুষ দ্বীনের বড় বড় আলোচনা, বয়ান বা ইলমের দিকে আগ্রহী হয়; কিন্তু কুরআনের মাখরাজ, তাজবীদ ও শুদ্ধ তিলাওয়াতের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। স্যার শেখাতেন, কুরআনের সাথে সম্পর্কের প্রথম ধাপই হলো, আল্লাহর কালামকে সঠিকভাবে আদায় (তিলাওয়াত) করা। তিনি বুঝাতেন, শুদ্ধ তিলাওয়াত শুধু কণ্ঠের সৌন্দর্য নয়; বরং এটি কুরআনের প্রতি সম্মান, মুহাব্বত ও আদবের বহিঃপ্রকাশ। কুরআনের ভুল উচ্চারণকে হালকা মনে করা ধীরে ধীরে কুরআনের আদব কমে যাওয়ার লক্ষণ।
মাহফুজ ভাই বলেন, একবার স্যার তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কুরআন শরীফের তিলাওয়াত কেমন?” তিনি সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, “মোটামুটি।” তখন স্যার সাথে সাথে বললেন, “মোটামুটি হলে চলবে না, সম্পূর্ণ শুদ্ধ করতে হবে।” স্যার এই কথা দ্বারা বোঝান, কুরআন তিলাওয়াত এমন একটি বিষয় যেখানে “মোটামুটি” বলে কোনো কথা নেই। কুরআন আল্লাহর কালাম; তাই তা যথাসম্ভব শুদ্ধভাবে আদায় করার চেষ্টা করা মুমিনের দায়িত্ব।
মাহফুজ ভাই আরও বলেন, একবার স্যার তাঁকে ফজরের নামাজে ইমামতি করতে দিলেন। তিনি সূরা তাকভীর পড়তে গিয়ে তিলাওয়াতে এমনভাবে উচ্চারণ করছিলেন যে, “যাল” অক্ষরটি “জীম” এর মতো শোনাচ্ছিল। সালাম ফেরানোর সাথে সাথে স্যার একটু কঠোর ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, “সব ‘যাল’ ‘জীম’ হয়ে গেল?”
একবার এক সফরে আসরের নামাজে ইমামতি করতে গিয়ে তাকবীরে “আল্লাহু আকবার” এর “কাফ” অক্ষরের উচ্চারণ সঠিকভাবে আদায় হয়নি। সালাম ফেরানোর পর স্যার বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথে ধরলেন। কুরআন তিলাওয়াতের শুদ্ধতা ও কেরাত শেখার গুরুত্ব এভাবে স্যার অনেক বার বুঝিয়েছিলেন।
স্যারের জীবনে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল, তিনি নিজে যেমন কুরআনের ব্যাপারে সংবেদনশীল ছিলেন, তেমনি সাথীদের মাঝেও সেই অনুভূতি সৃষ্টি করতে চাইতেন। তাঁর কাছে “মোটামুটি” দ্বীনদারি বা “মোটামুটি” তিলাওয়াত যথেষ্ট ছিল না; বরং তিনি চাইতেন, মানুষ নিজের সাধ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ শুদ্ধতা ও ইহসানের সাথে আল্লাহর দ্বীন পালন করার চেষ্টা করুক।
🎤 ৩৫০
একবার স্যার বলেন, আল্লাহ তাআলা সব মানুষকে একই রকম বানাননি। প্রত্যেক মানুষের মেজাজ, প্রকাশভঙ্গি, প্রভাব এবং চলার ধরণ আলাদা। তাই সবাইকে একই “শিল-পাটায় ডলা” (একই মাপকাঠিতে বিচার করা) সঠিক নয়। দ্বীনের মেহনতেও আল্লাহ তাআলা ভিন্ন ভিন্ন স্বভাবের মানুষ দ্বারা কাজ নেন।
স্যার এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদিসের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সাথে তুলনা করেছেন, আর হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হযরত নূহ আলাইহিস সালাম ও হযরত মূসা আলাইহিস সালামের সাথে তুলনা করেছেন। একদলের মধ্যে ছিল কোমলতা, দয়া ও নরম স্বভাবের প্রাধান্য; আর অন্যদলের মধ্যে ছিল দৃঢ়তা, জালাল ও কঠোরতার সিফাত।
স্যার বুঝান, হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্বভাব ছিল অত্যন্ত কোমল ও মায়াময়। শিশুদের প্রতিও তাঁর আচরণ ছিল এমন স্নেহপূর্ণ যে, তারা নির্ভয়ে তাঁর কাছে চলে আসত। অন্যদিকে হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যক্তিত্ব ছিল অত্যন্ত জালালী ও প্রভাবশালী। তাঁর উপস্থিতিতেই মানুষের অন্তরে এক ধরনের ভয় ও গাম্ভীর্য তৈরি হতো।
একইভাবে স্যার বলেন, হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন ধনী; তাঁর ধন সম্পদ ও দানশীলতা তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটবর্তী করেছে। অন্যদিকে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র; কিন্তু তাঁর গরিবি, সবর ও ইখলাসও তাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয় বানিয়েছে। একজন সম্পদের ভেতরে থেকে আল্লাহর পথে ছিলেন, আরেকজন অভাবের মাঝেও আল্লাহর পথে ছিলেন। আল্লাহ তাআলা উভয়কেই অতি উত্তম ভাবে কবুল করেছেন।
স্যার নিজের উদাহরণ টেনে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলতেন, “আমি কোথাও গেলে চারদিকে খবর হয়ে যাবে, আর সানাউল্লাহ কোথাও গেলে পিঁপড়াও জানবে না।” কেউ স্বাভাবিকভাবেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, আবার কেউ নীরবে কাজ করে যান, স্বভাব নিরব ও অপ্রকাশিত। তাই একজনের মেজাজ আরেকজনের সাথে মিলবে না।
স্যার আরও বলেন, একবার নাদের আলী খান সাহেব তাঁকে বলেছিলেন, “আমি মাসোয়ারায় সাধারণ কোনো রায় দিই, সাথীরা রেগে যায়। অথচ সানাউল্লাহ অনেক কঠিন কথা বললেও রাগ করে না।” স্যার এই কথা দ্বারা বুঝাতেন, একই কথা ভিন্ন মানুষ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে, এবং মানুষের প্রকৃতি অনুযায়ী তার প্রভাবও ভিন্ন হয়। কেউ “জামালী সিফাত” এর অধিকারী, কেউ “জালালী সিফাত” এর।
তিনি বলেন, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের মধ্যে ছিল কোমলতা, মমতা ও দয়ার প্রবল প্রকাশ। স্যার উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেন “জয়তুনের তেলের মতো” নরম স্বভাবের ছিলেন। অন্যদিকে হযরত নূহ আলাইহিস সালাম ও হযরত মূসা আলাইহিস সালামের মধ্যে ছিল দৃঢ়তা, শক্ত অবস্থান ও জালালের প্রকাশ।
স্যার এই গুরুত্বপূর্ণ আদবের দিকে ইঙ্গিত করেন যে, আমরা অনেক সময় চাই সবাই আমাদের মতো হবে, আমাদের মেজাজে চলবে, আমাদের মতো কথা বলবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন সিফাত দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কারো নরম স্বভাব দেখে তাকে দুর্বল ভাবা ঠিক নয়, আবার কারো দৃঢ় স্বভাব দেখে তাকে কঠোর মনে করাও ঠিক নয়। যদি উদ্দেশ্য হক হয়, তাহলে ভিন্ন ভিন্ন মেজাজও আল্লাহর দ্বীনের জন্য রহমত হতে পারে। স্যার বুঝাতেন, দ্বীনের ময়দানে যেমন “জামাল” দরকার, তেমনি “জালাল” ও দরকার। কোথাও কোমলতা মানুষকে কাছে আনে, কোথাও দৃঢ়তা মানুষকে সীমার ভেতরে রাখে। নবীদের জীবন, সাহাবাদের জীবন এবং আল্লাহওয়ালাদের জীবন এই বৈচিত্র্যের এক সুন্দর সমন্বয়।
🎤 ৩৫১
এক মুজাকারায় স্যার ‘ব্যক্তিগত ফিকির’ এবং ‘উম্মতের ফিকির’ এই দুইয়ের মধ্যকার আকাশ পাতাল ব্যবধানকে সহজভাবে তুলেছিলেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বোঝান যে, সব অভাবের চিন্তা এক ধরনের নয়। কোনো সমস্যার পরিসর যত বড় হয়, তার ফিকিরও তত ভিন্ন ও গভীর হয়। স্যার বলেন, “আমার ঘরে ডাল বা লবণ নেই, আমি চট করে বাজার থেকে তা কিনে আনলাম; সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। ঘরের অভাব পূরণ হয়ে গেল। কিন্তু যদি পুরো বাজারেই ডাল বা লবণ না থাকে, তবে সেই সংকট ও চিন্তার পরিধি সম্পূর্ণ ভিন্ন।”
স্যার বুঝাতেন, দ্বীনের ক্ষেত্রেও ’ব্যক্তি পর্যায়ের সংকট’ আর ’উম্মতের সামষ্টিক সংকট’ এক বিষয় নয়। একজন মানুষের নিজের জীবনে দ্বীনের ঘাটতি থাকতে পারে। সে নামাজ শুরু করল, দাড়ি রাখল, চিল্লা দিল, হজ করল, কোনো বুযুর্গের সোহবত নিল, নিজের ইসলাহের চেষ্টা করল। তার ব্যক্তিগত অভাব অনেকটা পূরণ হয়ে গেল। কিন্তু যখন পুরো সমাজেই দ্বীন থাকে না, এমনকি যাদের দ্বীনদার বা দ্বীনের মেহনতকারী মনে করা হয়, তাদের মধ্যেই দ্বীনি উসুল ও আমলের চরম অভাব দেখা দেয়, তখন এই দুই চিন্তা কখনো এক হতে পারে না। সমাজ যখন আমলশূন্য হয়ে পড়ে, তখন শুধু নিজের আমল নিয়ে ঘরে বসে থাকা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ নয়। স্যার আরো বলেন, যখন পুরো সমাজ থেকেই দ্বীন উঠে যেতে থাকে, যখন দ্বীনের নামে অপব্যাখ্যা শুরু হয়, তখন সেই চিন্তা সম্পূর্ণ আলাদা।
আমি দ্বীনের কোনো ভুল ব্যাখ্যা বুঝেছিলাম, কোনো আলেম আমাকে শুধরে দিলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি ঠিক হয়ে গেলাম। কিন্তু যখন পুরো সমাজজুড়ে দ্বীনের বিকৃতি ঘটে; যখন গাঁজা খাওয়াকে ‘জিকির’ বলা হয়, রাজনীতিকে ‘জিহাদ’ বলা হয়, চাঁদাবাজিকে ‘তাবলিগ’ বলা হয়, তখন সেটা কেবল ব্যক্তির ভুল নয়; বরং পুরো সমাজের দ্বীনি অবক্ষয়। স্যার বোঝান, সেই সামাজিক অবক্ষয় দূর করার ফিকির আর ব্যক্তিগত ভুল শোধরানোর ফিকির কখনো এক নয়।
স্যার এখানে হযরত ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির ফিকিরের কথা উল্লেখ করে বলতেন, মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে শুধু নিজের মাদরাসা, নিজের ছাত্র, বা নিজের মুরিদ যথেষ্ট ছিল না। তাঁর অন্তরে ছিল পুরো উম্মতের ব্যথা, সমাজের সাধারণ মানুষ, যারা মসজিদে আসে না, যাদের জীবনে দ্বীন নেই, তাদের কী হবে? তাঁর মাদরাসায় ছাত্র ছিল, পীর হিসেবে মুরিদও ছিল; কিন্তু বাকি সমাজের কী হবে, এই চিন্তাই উনাকে দিন রাত ব্যাকুল করে রাখত। খানকায় বসে কিছু মুরিদকে সংশোধন করা আর বেতলব মেহনতহীন উদাসীন মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে, আমজনতার দ্বারে দ্বারে গিয়ে হেদায়েতের আলো পৌঁছানো, এক বিষয় নয়। মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজের আরাম, নিজের মাদরাসা ও খানকার গণ্ডি পেরিয়ে গোটা উম্মতের ফিকিরে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
স্যার বলেন, একজন প্রকৃত দাঈর অন্তরে চিন্তার সংকীর্ণতা থাকতে পারে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মত হিসেবে আমাদের মেহনত যেন কেবল “নিজের ঘরের অভাব” পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। উম্মতের প্রতিটি মুমিনের ফিকির হওয়া উচিত গোটা সমাজের অভাব দূর করার। উম্মতের প্রতিটি মানুষ যেন জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাতের রাস্তায় উঠতে পারে, এই বিশাল ক্যানভাসে চিন্তা করাই হলো রাহমাতুল্লিল আলামীন এর প্রকৃত উম্মতের ঈমানি দূরদর্শিতা। ঘরে চালের জোগান নেই কিন্তু চাহিদা আছে, এর ফিকির এক রকম; আর বাজারে চালের বিপুল চাহিদা অথচ যথেষ্ট জোগানই নেই, এর ফিকির সম্পূর্ণ ভিন্ন।
🎤 ৩৫২
এক মুজাকারায় স্যার বলেন, বয়ান, মুজাকারা ও উপদেশ প্রদান নবীদের কাজ ছিল। নবীগণ উম্মতের মধ্যে দীর্ঘ নসীহত করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সাহাবাদের এমন নসীহত করতেন, বয়ান করতেন ও খুতবা প্রদান করতেন, যার প্রভাবে তাঁদের অন্তর কেঁপে উঠত। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যেও অনেকেই দাওয়াত, খুতবা ও হৃদয়স্পর্শী নসীহতের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। বিভিন্ন সাহাবী বিভিন্ন সময় মানুষের অন্তরে ঈমান জাগ্রত করার জন্য বয়ান ও নসীহত করেছেন। মুহাদ্দিসীন, আওলিয়া ও বুযুর্গরাও এই কাজ করেছেন। তাঁরা মানুষকে নসীহত করেছেন, ওয়াজ করেছেন এবং মানুষের অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন।
এরপর স্যার বলেন: “সেই ওয়াজ, সেই বয়ান তো আমিও করছি। তারা এই ওয়াজ করে আল্লাহকে পেয়েছেন; কিন্তু আমি এই ওয়াজ করে কী পাচ্ছি?” স্যার বলেন, বয়ান করা নিজে কোনো বড়ত্ব নয়; বরং ভয়ের বিষয় হলো, এই আমল আমাকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি আত্মপ্রশংসা, রিয়া, খ্যাতির মোহ ও আত্মগর্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অন্য মানুষকে নসীহত করতে করতে মানুষ নিজেই কখন অহংকারে আক্রান্ত হয়ে যায়, অনেক সময় সে নিজেও তা টের পায় না।
স্যার এ প্রসঙ্গে অন্য এক সময় বলেন, মানুষ যখন দেখে লোকজন তার কথা শুনছে, প্রশংসা করছে, আবেগাপ্লুত হচ্ছে, তখন তার অন্তরে অদৃশ্যভাবে “আমি” জন্ম নিতে শুরু করে। স্যার এ প্রসঙ্গে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু জ্ঞানহীন ও অযোগ্য বক্তাদের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। তিনি “কাসস” বা গল্পভিত্তিক বক্তাদের অপছন্দ করতেন, যারা ইলম ও আমল ছাড়া শুধু মানুষের সামনে কথা বলে বেড়াত, তাদের সতর্ক করতেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, এক ব্যক্তি তাঁর কাছে মানুষের সামনে ওয়াজ করার অনুমতি চাইল। হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে অনুমতি দিলেন না। তিনি বলেন: “আমি আশঙ্কা করি, তুমি যখন মানুষকে নসীহত করা শুরু করবে, তখন তোমার নিজের ভেতরে এমন অনুভূতি জন্ম নেবে যে তুমি নিজেকে সুরাইয়া নক্ষত্র পর্যন্ত পৌঁছে গেছে মনে করবে।”
স্যার বলেন, বয়ান করা যত বড় আমল, এর ফিতনাও তত বড়। মানুষের সামনে কথা বলতে বলতে অন্তরে নিজের মর্যাদার একটি কল্পিত আসন তৈরি হয়ে যেতে পারে। একজন মানুষ ভাবতে শুরু করতে পারে, “আমি মানুষের হাদী”, “আমি মানুষের মুরব্বি”, “আমি না থাকলে মানুষের হেদায়েত হবে না।” অথচ দ্বীনের কর্মী ব্যক্তি যত বেশি মানুষকে নসীহত করবে, তত বেশি নিজের ভেতরে ভয় অনুভব করবে।
অন্য একবার স্যার বলেন, বয়ানের আসল উদ্দেশ্য মানুষকে নিজের দিকে ডাকা নয়; বরং আল্লাহর দিকে ফেরানো। যদি কোনো বয়ানকারী নিজের নাম, জনপ্রিয়তা, প্রভাব, অনুসারী বা পক্ষের লোক বাড়ানোর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে সেই বয়ান তার জন্য নাজাতের বদলে ধ্বংসের কারণও হতে পারে। তিনি বলেন, আল্লাহওয়ালা ও বুযুর্গদের বয়ানের সাথে বিনয়, আত্মভয় ও আল্লাহর কাছে লুকিয়ে থাকার প্রবণতা জড়িত ছিল। তাঁদের অন্তরে সবসময় এই ভয় কাজ করত: “মানুষ আমার কথা শুনছে, কথায় প্রভাবিত হচ্ছে; কিন্তু আমি নিজে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি না তো?”
🎤 ৩৫৩
মিনার ময়দানে এক তাবুতে বয়ান করতে গিয়ে স্যার এই প্রসঙ্গ তুলে ধরেন যে, নেক আমল করা যত জরুরি, তার চেয়েও জরুরি সেই আমলকে হেফাজত করা। আমলকে মানুষের প্রশংসা, দুনিয়াবি প্রত্যাশা ও নফসের দাবির হাত থেকে বাঁচিয়ে আল্লাহর কাছে পৌঁছে দিতে পারাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় ফিকির হওয়া উচিত।
স্যার এই আয়াতটি তেলাওয়াত করেন:
> مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ خَيْرٌ مِّنْهَا وَهُم مِّن فَزَعٍ يَوْمَئِذٍ آمِنُونَ
এরপর স্যার আয়াতের সূক্ষ্ম দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আল্লাহ তাআলা এখানে শুধু “আমল করা”র কথা বলেননি; বরং বলেছেন, “যে ব্যক্তি নেক আমল নিয়ে আসবে”- مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ, আমল করাই যথেষ্ট নয়; সেই আমলকে আল্লাহর দরবার পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় পৌঁছিয়ে নিয়ে যাওয়াই আসল বিষয়।
স্যার বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, আমরা নামাজ পড়ছি, রোজা রাখছি, দান-সদকা করছি, হজ-উমরা করছি। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো: এই আমলগুলো কি সত্যিই আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে কিনা? কিয়ামতের দিন আমি কি এই আমলগুলো নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারব, নাকি পথেই সেগুলো নষ্ট হয়ে যাবে?
এই বিষয়টি বোঝাতে স্যার একটি উদাহরণ দেন। একজন মানুষ বাজারে গেল, অনেক কষ্ট করে বাজার করল, টাকা খরচ করল, ব্যাগভর্তি সদাই নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। কিন্তু বাড়িতে এসে দেখল, ব্যাগে ফুটো ছিল। পথে পথে সব জিনিস পড়ে গেছে। সে বাজার তো করেছে, কষ্টও করেছে, টাকা পয়সাও খরচ করেছে; কিন্তু বাড়িতে পৌঁছে দেখল, গুরুত্বপূর্ণ কিছুই অবশিষ্ট নেই। তার সেই পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত কোনো উপকারেই এলো না।
স্যার বলেন, আমলের ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অনেক নেক আমল করার তাওফিক দেন; কিন্তু সেই আমলকে হেফাজত করে আল্লাহর কাছে পৌঁছানো আমাদের কাজ। রিয়া, আত্মপ্রশংসা, মানুষের প্রশংসার আশা, প্রতিদানের প্রত্যাশা, অহংকার, কৃতিত্ববোধ, এসব কারণে অনেক সময় আমল ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়, আল্লাহ পর্যন্ত আমল আর পৌঁছে না।
স্যার বলেন, একজন মানুষ হয়তো বিশ বছর আগে কাউকে সাহায্য করেছিল, দান-সদকা করেছিল, কোনো উপকার করেছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কিন্তু বিশ বছর পর এসে সে মনে মনে আশা করছে, “আজ সে আমার পক্ষে কথা বলবে, আমার মতকে সমর্থন করবে, আমার জন্য সাক্ষ্য দেবে।” যদি সেই ব্যক্তি তার প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ না করে, তবে সে কষ্ট পায়, মনঃক্ষুণ্ণ হয়, এমনকি কটু কথাও বলে ফেলে।
স্যার বলেন, এই যে বিশ বছর পর এসে নিজের পুরোনো নেক আমলের বিনিময় প্রত্যাশা করা, এটাই তো সেই আমলের ইখলাসকে ধ্বংস করে দিতে পারে। যে আমল একদিন আল্লাহর জন্য করা হয়েছিল, আজ মানুষের প্রতিদানের আশা এসে সেটাকে নষ্ট করে দিল।
এই প্রসঙ্গে কথা বলতে বলতে স্যার অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সাধারণত স্যার বয়ান বা মুজাকারায় সহজে কাঁদতেন না; এটি তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ ছিল। কিন্তু সেদিন মিনার তাবুতে তিনি একথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন। “না জানি কোন প্রত্যাশা, কোন গোপন চাওয়া, কোন মানুষের দিকে তাকানো, কোন আত্মতৃপ্তি এসে আমার আমলগুলো নষ্ট করে দেয়! না জানি কিয়ামতের দিন আমি সেই আমলগুলো সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারব কি না!” তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তিনি আর স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেননি।
সেদিনের সেই মোজাকারায় স্যার আরো তুলে ধরেন, আল্লাহ তাআলা শুধু আমলের পরিমাণ দেখবেন না; বরং আমলের ওজন দেখবেন। সেই আমল কতটুকু খাঁটি ছিল, কতটুকু শুধু আল্লাহর জন্য ছিল, সেটাই ভাববার বিষয়। বাহ্যিকভাবে ছোট একটি আমলও ইখলাসের কারণে আল্লাহর কাছে পাহাড়সম ভারী হয়ে যেতে পারে। আবার বাহ্যিকভাবে বিশাল আমলও মানুষের প্রশংসা, স্বার্থ বা প্রত্যাশা মিশে যাওয়ার কারণে শূন্য হয়ে যেতে পারে।
🎤 ৩৫৪
স্যার বলেন, মুমিনের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত “আল্লাহ রাজি হচ্ছেন কি না”, এই চিন্তা। একজন মুমিনের ফিকির দুনিয়ার ক্ষতি বা শাস্তি নয়, অনেক বড় প্রাপ্তি নাকি সে বঞ্চিত তা নয়; বরং সকল হালতে আল্লাহ তার উপর রাজি আছেন কি না। মোমেনের তলব হবে, আল্লাহর সামনে এমনভাবে উপস্থিত হওয়া, যেন তিনি তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন।
এই মুজাকারায় স্যার ভারতের মেওয়াত এলাকার এক সাধারণ গরুর গাড়িওয়ালার ঘটনা উল্লেখ করেন। ওই ব্যক্তি গরুর গাড়ি নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। রাস্তার পাশে একটি ছোট শিশু খেলছিল। হঠাৎ করে শিশুটি গাড়ির চাকার নিচে পড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই মারা যায়। ঘটনাটি নিয়ে মামলা হয়। ধীরে ধীরে বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ওই গরুর গাড়িওয়ালার ফাঁসি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
আত্মীয় স্বজন তার জন্য একজন উকিল ঠিক করে। উকিল তাকে বললেন, “হাকিমের সামনে এভাবে ঘটনা বলবে, তাহলে তুমি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে যাবে।” অথচ উকিল যে ভাষা শিখাচ্ছিলেন, তা প্রকৃত ঘটনার সাথে পুরোপুরি মিল ছিল না। গাড়িওয়ালা অত্যন্ত সরলভাবে উকিলকে বললেন, “ঘটনা তো আসলে এমন নয়। বাস্তবে তো বাচ্চাটা আমার গাড়ির নিচে পড়েই মারা গেছে।” উকিল বললেন, “ঘটনা যাই হোক, আমি যেভাবে শিখাচ্ছি আদালতে সেভাবেই বলতে হবে, নয়তো তোমার ফাঁসি হয়ে যেতে পারে।”
তখন সেই সাধারণ, অশিক্ষিত গরুর গাড়িওয়ালা বললেন: “উকিল সাহেব, আমি তো দুনিয়াতে না শুধু বেঁচে থাকার এসেছি, না মরে যাবার জন্য এসেছি, আমি তো আল্লাহকে রাজি করতে এসেছি। সত্য কথা বলার কারণে যদি আমার ফাঁসি হয়ে যায়, আর আল্লাহ আমার উপর খুশি হন; তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু মিথ্যা বলে যদি আমি বেঁচে যাই আর আল্লাহ আমার উপর নারাজ হন, তাহলে সেই বাঁচার কোনো মূল্য নেই।”
স্যার বলেন, ঈমানের আসল পরিচয় শুধু আমল বা মুখের কথায় প্রকাশ পায় না; বরং হকের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সময় একজন মানুষ কী করে, তা দিয়েই তার ঈমানের বাস্তবতা প্রকাশ পায়। মানুষ অনেক সময় নিজের সম্মান, প্রাণ, সম্পদ, দুনিয়াবি ক্ষতির ভয়ে, বা কঠিন অবস্থায় পরীক্ষার সময় সত্য কথা বলা থেকে পিছিয়ে যায়। কিন্তু যার অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকে, তার কাছে দুনিয়ার সাময়িক ক্ষতি, কষ্ট বা বিপদ বড় বিষয় নয়; বরং সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আল্লাহ তার উপর রাজি আছেন কি না। দুনিয়ার ক্ষতি একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহর নারাজি কোনো ঈমানদার মানুষের জন্য সহ্য করার বিষয় নয়।
🎤 ৩৫৫
এক বয়ানে স্যার বলেন, এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে খুনের মামলা চলছিল। বিচারকার্য শেষে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। রায় ঘোষণার পর সেই আসামি বারবার অনুরোধ করতে থাকে যে, “আমি বিচারপতির সাথে একটু কথা বলতে চাই।” সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী রায় হয়ে যাওয়ার পর আর ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সুযোগ থাকে না। কিন্তু তার বারবার অনুরোধের কারণে অবশেষে তাকে অনুমতি দেওয়া হলো।
বিচারকের সামনে লোকটি বলল, “আপনি যে মামলায় আমাকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন, আসলে এই খুন আমি করিনি। কিন্তু আপনার বিচার সম্পূর্ণ সঠিক হয়েছে।” বিচারক বিস্মিত হয়ে বললেন, “তুমি খুন করোনি, তাহলে বিচার সঠিক হলো কীভাবে?” তখন লোকটি বলল, “এর আগের আরেকটি খুনের মামলায় আমি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেয়ে গিয়েছিলাম। অথচ সেই খুনটি আমিই করেছিলাম। আজ আমি যে অপরাধ করিনি, সেই অপরাধে শাস্তি পাচ্ছি; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা আমার পূর্বের অপরাধেরই প্রতিফল।”
স্যার বলেন, মানুষ অনেক সময় কোনো অপরাধ করে সমাজ বা মানুষের চোখ থেকে বেঁচে যেতে পারে। দুনিয়ার আদালত, বা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে, মানুষকে ধোঁকা দিতে পারে, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতেও সক্ষম হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর বিচার থেকে সে পালাবে কিভাবে? স্যার বলেন, অনেক সময় মানুষ মনে করে, “আমি তো বেঁচে গেছি”, “আমার কিছু হয়নি”, “কেউ ধরতে পারেনি”, অথচ সে বুঝতে পারে না যে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হিসাবের খাতা বন্ধ হয়নি।
স্যার অন্য আরেক প্রসঙ্গে একবার বলেন, গুনাহর প্রভাব কখনো মানুষের অন্তর অন্ধ করে দেয়, কখনো জীবনের বরকত উঠিয়ে নেয়, কখনো অন্য কোনো বিপদ, অপমান বা কষ্টের মাধ্যমে তার সামনে ফিরে আসে। একজন মুমিনের ভয় শুধু তাৎক্ষণিক শাস্তিকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত নয়; বরং আল্লাহর বিচারের প্রতি অন্তরে গভীর সচেতনতা থাকা দরকার। মানুষ যদি দুনিয়ার আদালত থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেঁচেও যায়, কিন্তু আল্লাহর কাছে অপরাধী থাকে, তবে প্রকৃতপক্ষে সে রক্ষা পায়নি।
🎤 ৩৫৬
সাঘাটার আজাহার ভাই, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ছাত্র, দ্বীনের মেহনতের ভাল সাথী ছিলেন। তাঁর বড় ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র, একবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান যে, আজাহার ভাইয়ের বিয়ের ব্যাপারে স্যার তাঁদের অভিভাবকের উদ্দেশ্যে একটি জরুরি চিঠি লিখেছিলেন।
চিঠিতে স্যার অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে জোর দিয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন: ওকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া দরকার। যদি এখন বিয়ে না দেওয়া হয়, তাহলে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে, যার আর কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না। চিঠিতে স্যার উল্লেখ করেছিলেন,"ওকে বিয়ে দিয়ে দাও, যদি এখন বিয়ে না দাও, হয়তো এমন সমস্যা হবে যার আর কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না।"
তৎকালীন পারিবারিক অবস্থা, বাস্তবতা ও নানা কারণে সেই পরামর্শ অনুযায়ী বিয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। অভিভাবকরা তখন স্যারের এই দূরদর্শী পরামর্শটি আমলে নেননি এবং আজাহার ভাইয়ের বিয়ে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে বাস্তব জীবনে ঠিক তা-ই ঘটেছিল; তাঁর বিয়ে সংক্রান্ত এমন কিছু জটিল ও অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, যার কোনো সমাধান আর মেলেনি। তার পরিবারের সদস্যরা স্যারের সেই পরামর্শের কথা স্মরণ করতেন।
[কিছু বিষয় আছে, যা শুরুতেই প্রতিরোধ করা সম্ভব; কিন্তু একবার জটিল আকার ধারণ করলে পরে তার সমাধান অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, মানুষের সাথে চলাফেরা এবং উম্মতের হালত সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি থেকে স্যার অনেক সময় এমন বিষয় সামনে আনতেন, যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক উপলব্ধি অনেক সময় কঠিন হয়ে যেত। আজাহার ভাইয়ের অবচেতনে বা পারিপার্শ্বিক হালোতে কী ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে, তা স্যার আগে থেকেই অনুমান করতে পেরেছিলেন বলেই হয়তো অভিভাবক বড় ভাইকে অমন সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিলেন।]
🎤 ৩৫৭
একবার স্যার মানুষের একটি স্বভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, মানুষের মধ্যে অনেক সময় এমন প্রবণতা দেখা যায় যে, যা প্রকৃতপক্ষে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেটিকেই বড় বিষয় বানিয়ে ফেলা হয়; আর যে বিষয়টি সত্যিই জরুরি, সেটি অবহেলিত থেকে যায়। মানুষ কখনো কখনো অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে, মূল উদ্দেশ্যই আড়ালে চলে যায়।
এই প্রসঙ্গে স্যার রসিকতাপূর্ণ একটি উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, মাটির নিচে চল্লিশ হাত খুঁড়ে একটি তার পাওয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে গবেষণা শুরু হলো। তারপর ঘোষণা দেওয়া হলো, “আজ থেকে চারশো বছর আগে মানুষ তারের মাধ্যমে যোগাযোগ করত। এই তারই তার প্রমাণ!”
এরপর আরো চল্লিশ হাত নিচে খনন করা হলো। সেখানে কোনো তার পাওয়া গেল না। তখন আরেকটি ‘বিরাট আবিষ্কার’ সামনে এলো। বলা হলো, “আজ থেকে আটশো বছর আগে মানুষ ওয়্যারলেসে যোগাযোগ করত। কারণ এত নিচে কোনো তার পাওয়া যায়নি!”
স্যারের এই উদাহরণ বা রসিকতা মূলক এই বক্তব্যে একটি গভীর ইঙ্গিত লক্ষ্য করা যায়, অনেক সময় মানুষ পূর্বধারণা নিয়ে এমন সব সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়, যার বাস্তব ভিত্তি খুবই দুর্বল। অথচ সেগুলো নিয়েই দীর্ঘ আলোচনা, গবেষণা ও ব্যস্ততা চলতে থাকে।
একবার দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সফরকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ (স্থাপত্যশৈলী অনেকটা প্রাচীন ধাঁচের) দেখে স্যার মজার ছলে বলেছিলেন, “মসজিদের দেয়ালে যদি কয়েকটা বটগাছের চারা লাগিয়ে দেওয়া যেত, তাহলে হয়তো প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটাকে নিয়ে নিত! তারপর গবেষণা করে বের করত, এটি হয়তো দুই হাজার বছরের পুরোনো স্থাপনা!”
বিভিন্ন সময়ে স্যার মানুষের সময়, মেধা ও শক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করতেন। মানুষের সময়, মেধা ও শক্তি সীমিত, তাই একজন মুমিনের উচিত আসল উদ্দেশ্য ও প্রকৃত প্রয়োজনকে সামনে রাখা। এমন অনেক বিষয় আছে, যা জানলে কোনো ক্ষতি নেই; কিন্তু এমনও অনেক বিষয় আছে, যা নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে গেলে জীবনের মূল দায়িত্বগুলো আড়ালে চলে যায়।
মতিহার হলে ছাত্রদের এক মজমায় স্যার একবার বলেন, বুদ্ধিমত্তা শুধু অনেক কিছু জানার মধ্যে নয়; বরং কোন বিষয়কে কতটুকু গুরুত্ব দিতে হবে, সেই ভারসাম্য বুঝার মধ্যেও নিহিত। যে মানুষ আসল ও গৌণ বিষয়ের পার্থক্য বুঝতে পারে, সে তার সময় ও জীবনকে অধিক ফলপ্রসূভাবে ব্যয় করতে পারে।
🎤 ৩৫৮
এক মুজাকারায় স্যার আলীগড়ের প্রখ্যাত আলেম ও শিক্ষাবিদ, তাবলীগের মুরব্বী প্রফেসর নাদের আলী খান সাহেবের একটি কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলতেন:
> "حسد جو ہے نا، وہ کسی کمال کی وجہ سے ہوتا ہے۔"
[হিংসা যে জিনিসটা, ওটা আসলে মানুষের কোনো না কোনো পূর্ণতা বা যোগ্যতার কারণে সৃষ্টি হয়।]
স্যার বলেন, মানুষ সাধারণত এমন কাউকে হিংসা করে না, যার মধ্যে কোনো বিশেষত্ব নেই, একজন অসহায় অন্ধ ফকির তাকে দেখে কেউ হিংসা করে না। বরং কারো জ্ঞান, যোগ্যতা, সৌন্দর্য, প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতা, সম্পদ, দ্বীনদারি বা অন্য কোনো উৎকর্ষ যখন মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়, তখন অনেকের অন্তরে হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সাধারণত আমরা মনে করি হিংসা একটি নেতিবাচক অনুভূতি, যা এমনি এমনিই তৈরি হয়। কিন্তু স্যার এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কোনো বিশেষ যোগ্যতা, সৌন্দর্য, গুণ, গ্রহণযোগ্যতা বা উৎকর্ষের (কামাল) কারণেই অন্যের অন্তরে তার প্রতি হিংসার জন্ম হয়। সাধারণত মানুষ সেই ব্যক্তিকেই বেশি হিংসা করে, যার মধ্যে সে নিজের তুলনায় কোনো বাড়তি নেয়ামত, বিশেষত্ব বা সফলতা দেখতে পায়।
স্যার বলেন, একজন মানুষের মাঝে যখন কোনো বিষয়ের 'পূর্ণতা' বা 'কামাল' (অসাধারণ মেধা, চারিত্রিক মাধুর্য, সুন্দর চেহারা, সম্পদ কিংবা দ্বীনি মাকাম) প্রকাশ পায়, তখনই অবচেতনভাবে অন্য মানুষের নফস বা অহংকারে আঘাত লাগে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজের চেয়ে অন্যকে শ্রেষ্ঠ দেখার এই অপারগতা থেকেই 'হাসাদ' বা হিংসার জন্ম হয়।
এই আলোচনায় স্যার ভিন্ন দুটি দিকে আলোকপাত করেছিলেন:
প্রথমত, যদি কেউ আমার প্রতি হিংসা করে, তবে বুঝতে হবে আল্লাহ তাআলা আমাকে কোনো না কোনো বিশেষ যোগ্যতা বা নেয়ামত (কামাল) দ্বারা ভূষিত করেছেন। তাই হিংসুকের আচরণে বিচলিত বা প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা এবং তাঁর কাছেই আশ্রয় চাওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, আমাদের নিজেদের মনকে পরীক্ষা করা উচিত। যখনই কারও কোনো সাফল্যে বা সৌন্দর্যে আমাদের মনে সংকীর্ণতা তৈরি হয়, তখনই বুঝতে হবে আমাদের নফস অসুস্থ। অন্যের যোগ্যতাকে আল্লাহর দান হিসেবে মেনে নিতে না পারাটাই আমাদের আত্মিক ব্যাধি।
স্যার বলেন, যে ব্যক্তি হিংসা করছে, সে মূলত আল্লাহর বণ্টনের ওপর অসন্তুষ্ট হচ্ছে। কারণ ওই ব্যক্তির 'কামাল' বা যোগ্যতা তো আল্লাহই তাকে দিয়েছেন। তিনি বলতেন, কোনো ভাইয়ের কল্যাণ, অগ্রগতি বা সফলতা দেখে যদি আমাদের অন্তর আনন্দিত হয়, তবে এটি অন্তরের সুস্থতার একটি আলামত। আর যদি অন্তরে কষ্ট, সংকীর্ণতা বা হিংসার ভাব জেগে ওঠে, তাহলে নিজের দিলের অবস্থা নিয়ে চিন্তা করা দরকার।
🎤 ৩৫৯
একবার স্যার বলেন, একজন মানুষের মূল্যায়ন শুধু তার বক্তব্যের মাধ্যমে হয় না। তার ঈমান, ইখলাস, সুন্নতের অনুসরণ, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক, আমানতদারিতা, আখলাক এবং ব্যক্তিগত জীবন ও আমল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্যার বলেন, সুন্দর কথা বলা এবং সুন্দর জীবন যাপন করা এক জিনিস নয়। এই কারণে আল্লাহ ওয়ালারা শুধু কথা নয়, কথার পেছনের মানুষটিকেও দেখতেন। এমন কিছু মানুষ আছে যারা উপদেশ দিতে বসলে এত সুন্দর কথা বলবে যে, শুনলে মনে হবে বড় কোনো বুযুর্গ কথা বলছেন। কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্যতা নির্ধারিত হয় তার ইলমের সাথে ইখলাস এবং জীবনের মধ্যে তাকওয়া কতটুকু যুক্ত হয়েছে, তার উপর।
প্রসঙ্গক্রমে স্যার একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। একবার সরকারি কর্মকর্তাদের একটি পরিদর্শক দল পাবনা মানসিক হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। তারা হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখছিলেন, রোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং সেবার মান সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন।
এমন সময় পরিপাটিভাবে চুল আচড়ানো এক ব্যক্তি অত্যন্ত ভদ্রোচিতভাবে এগিয়ে এসে পরিদর্শক দলের সাথে কথা বলতে শুরু করে। পরিচ্ছন্ন পোশাক, সুন্দর ব্যবহার, মার্জিত ভাষা এবং অত্যন্ত সুসংগঠিত কথাবার্তা। তিনি পরিদর্শক দলের সদস্যদের সাথে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করলেন যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের সাথে তাঁর বেশ সখ্যতা হয়ে গেল। সে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে, শুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষায় কর্মকর্তাদের বোঝাতে সক্ষম হলো যে, সে আসলে কোনো পাগল নয়; বরং পারিবারিক শত্রুতার জেরে তাকে এখানে পাঠানো হয়েছে, আটকে রাখা হয়েছে। সে পরিদর্শক দলকে হাসপাতালের বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল এবং অন্যান্য রোগীদের অবস্থা এমনভাবে বিশ্লেষণ করছিল যে, তাকে কোনোভাবেই অসুস্থ মনে করার সুযোগ ছিল না। তাঁর কথাবার্তা, উপস্থাপনা এবং যুক্তি শুনে দলের কয়েকজন সদস্য সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করলেন যে, লোকটি সম্ভবত সুস্থ এবং তাকে অন্যায়ভাবে এখানে রাখা হয়েছে।
তার চমৎকার কথাবার্তায় মুগ্ধ হয়ে পরিদর্শক দলের একজন সদস্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি উত্থাপন করলেন। বললেন, “ভদ্রলোককে তো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মানুষ মনে হচ্ছে। এমন একজন সুস্থ মানুষকে কেন আটকে রাখা হয়েছে?” দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক হেসে বললেন, “ওর কথা আমলে নিয়েন না, সে এখানকার সবচেয়ে জটিল রোগীদের একজন।” কর্তৃপক্ষের মুখে এই সত্য প্রকাশ হওয়া মাত্রই ওই ব্যক্তি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে ক্ষোভের সাথে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আপনাদের পেছনে এতক্ষণ সময় নষ্ট করলাম, এত করে বুঝালাম, তাও আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করলেন না!’ এই বলেই সে উপস্থিত সবার সামনে নিচের পরিধেয় বস্ত্র খুলে, নিজের লুঙ্গি খুলে দৌড় দিল; উলঙ্গ হয়ে দৌড়ে সেখান থেকে সরে গেল।
এই ঘটনাটি বলার পর স্যার বলেন: “সমাজে এমন অনেক নেশাখোর মানুষ আছে, তারা যখন কাউকে উপদেশ দেয় বা বক্তৃতা শুরু করে, মনে হয় বড় কোনো ওলি-আল্লাহ; কিন্তু সেতো খায় গাঁজা।" একশ্রেণির মানুষের বক্তব্য, বাগ্মিতা, মাসআলা-মাসায়িলের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা এবং দ্বীনি বিষয়ের উপস্থাপন এত বেশি আকর্ষণীয় ও নিখুঁত হয় যে, সাধারণ মানুষ খুব সহজেই মুগ্ধ হয়ে তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। তাদের কথা বারবার শুনতে ইচ্ছা করে। কিন্তু স্যারের সেদিনের নসিহত ছিলো, কেবল কথার এই বাহ্যিক জৌলুস দেখে কাউকে দ্বীনি রাহবার বা আদর্শ মেনে নেওয়া মারাত্মক ভুল।
স্যারের ওই কথায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা লক্ষ করা যায়: অনেক সময় ভ্রান্ত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যক্তিরা নিজেদের ত্রুটি আড়াল করতে দ্বীনের অত্যন্ত সুন্দর ও যৌক্তিক উপস্থাপনা তৈরি করে। সাধারণ মানুষ বাহ্যিক অবয়ব ও বাকপটুতা দেখে অনেক সময় ধোঁকা খায়। দ্বীনের বিবেচনায় কেবল 'সুন্দর কথা' যথেষ্ট নয়; বরং সুন্দর চরিত্র, সুন্নতের অনুসরণ, উত্তম আখলাক, ইখলাস, আমানতদারিতা ও তাকওয়াই একজন মানুষকে অনুসরণযোগ্য করে তোলে।
🎤 ৩৬০
স্যার বলতেন, নেক আমলের পরিমাণের চেয়ে তার উদ্দেশ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ; মুমিনের উচিত বারবার নিজের অন্তরকে যাচাই করা। আমি কেন নামাজ পড়ছি? কেন জিকির করছি? কেন তাবলিগ করছি? কেন হজ্জ্ব করছি? কেন দান করছি? যদি এসব আমল আমাকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে, তবে আমি সফলতার রাস্তাতেই আছি। আর এই নেক আমলের মাধ্যমে আমার আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা যদি বেড়ে যায়, নেক আমলের মাধ্যমে অহংকার যদি বাড়তে থাকে, নেক আমলের মাধ্যমে অন্যের প্রতি তাচ্ছিল্য যদি বাড়তে থাকে, তবে সেই নেক আমলই আমার জন্য সতর্কতার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
স্যার একবার গভীর উপমার মাধ্যমে নেক আমলের প্রকৃত উদ্দেশ্যের গুরুত্ব তুলে ধরেন। ইবাদত বন্দেগি ও দ্বীনি মেহনত কীভাবে মানুষের নাজাতের পরিবর্তে ধ্বংসের কারণ হতে পারে, তা বোঝাতে তিনি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অ্যান্টিবায়োটিকের এক উপমা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া হয় শরীরের ক্ষতিকর জীবাণু বা রোগ ধ্বংস করার জন্য। কিন্তু শরীর যখন এই ওষুধের ওপর অতিরিক্ত অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন কখনো কখনো উল্টো ঘটনা ঘটে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে সেই জীবাণুগুলো আর অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা মরে না। কিন্তু যখন জীবাণু দীর্ঘদিন একই অ্যান্টিবায়োটিকের সংস্পর্শে থেকে তার প্রতি প্রতিরোধী হয়ে যায়, তখন যে ওষুধ একসময় রোগ নিরাময়ের মাধ্যম ছিল, সেটিই আর কার্যকর থাকে না। রোগ থেকে যায়, অথচ মানুষ ওষুধ খেয়েই চলতে থাকে। যে ওষুধটি ছিল রোগ নিরাময়ের মাধ্যম, সেটাই একসময় রোগের বেঁচে থাকার আশ্রয়ে যেনো পরিণত হয়।
স্যার বলেন, নামাজ, জিকির, হজ, সদকা, তবলিগ সবকিছুর উদ্দেশ্য তো ভালো হওয়া। কিন্তু মিম্বরে বয়ান করে যদি অহংকার বাড়ে, তবলিগ করতে গিয়ে, জিকির করতে গিয়ে যদি দুনিয়ার লোভ বৃদ্ধি পায় এবং দান সদকা করে যদি মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা বাহাদুরি জাহির করা হয়, তবে তো বুঝতে হবে জীবাণু মারার অ্যান্টিবায়োটিক নিজেই এখন জীবাণুর ‘খাদ্য’ হয়ে গেছে! যে আমল দিয়ে নাজাত পাওয়ার কথা ছিল, সেটাই জাহান্নামে যাওয়ার সহজ রাস্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
🎤 ৩৬১
স্যার বলেন, নামাজ, জিকির, সদকা, হজ, তাবলিগ বা দ্বীনের যেকোনো মেহনতের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, নফসকে দমন করা এবং দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর করা। কিন্তু যদি ইখলাস নষ্ট হয়ে যায়, নিয়ত বা লক্ষ্য ঠিক না থাকে, সেই আমলের মধ্যে রিয়া, আত্মপ্রশংসা, পদমর্যাদার আকাঙ্ক্ষা, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার বাসনা বা দুনিয়াবি স্বার্থ প্রবেশ করে, অর্থ ও সম্পদ বাড়ানোর জজবা বাড়তে থাকে, তাহলে সেই নেক আমলই পরীক্ষার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। নফস দাবানোর এই আমলের দ্বারা যখন নফস খুশি হতে থাকে, তখন এই নেক আমলগুলোই মানুষের আত্মিক ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, জাহান্নামের যাবার রাস্তাকে সহজ করে।
একসময় মানুষ জিকির করত আল্লাহর সাথে সম্পর্ক জোড়ার জন্য, অন্তরে আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের ফিকির পয়দা করার জন্য। জিকিরের উসিলায় যখন দুনিয়ার লোভ বাড়তে থাকে, বড় বড় সম্পর্ক তৈরি হয় এবং খানকায় আধিপত্য বিস্তার লাভ করে, সেই জিকিরই তার পরিচিতি, প্রভাব বা দুনিয়াবি স্বার্থ অর্জনের মাধ্যম হয়ে যায়, তখন আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমটিই আল্লাহকে নারাজ করার কারণে পরিণত হয়। আল্লাহর রাস্তায় চিল্লা দেওয়া, গাশত করা এবং সময় লাগানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল নফসকে দাবানো এবং দুনিয়া বিমুখ হওয়া, আখেরাতমুখি চিন্তা বাড়ানো, কিন্তু কিছুদিন পর ধীরে ধীরে যখন সে জামাতের জিম্মাদার হয়, মারকাজের মশোয়ারায় বেকে বসে, বা বড় মেম্বারে বসে বয়ান করে, এলাকার ডিসি এসপি বা প্রভাবশালীদের সালাম পেয়ে নিজেকে অনেক বড় কিছু ভাবতে শুরু করে, তখন নফস দাবার পরিবর্তে নফস আরও চাঙ্গা হতে থাকে।
স্যার অত্যন্ত জোরালো ভাষায় প্রশ্ন রাখেন, যে জিকির, যে খানকা বা যে তাবলিগ ছিল আল্লাহর সাথে সম্পর্ক জূড়ানোর মাধ্যম, তা যদি টাকা কামানোর, পদের বা অন্যের কাছে বড় হবার মাধ্যম হয়ে যায়, তবে সেই আমলগুলো আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?
🎤 ৩৬২
রাজশাহীর স্থানীয় শূরার একজন সাথী, মারকাজ ও রাজশাহীর স্থানীয় তাবলিগের মেহনতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতেন। মারকাজের বিভিন্ন বিষয় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী উসূল নির্ধারণের প্রবণতাও তাঁর মধ্যে খুব দৃশ্যমান ছিল। মারকাজ মসজিদের একজন ইমাম ছিলেন, যিনি তাবলিগের মেহনতে সাল লাগানো একজন আলেম ও পুরোনো কর্মী সাথী ছিলেন। এসব অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও খবরদারির কিছু বিষয় তিনি পছন্দ করতেন না এবং মাঝে মাঝে এর প্রতিবাদও করতেন। ঐ শূরার প্রভাবের কারণে একপর্যায়ে ঐ ইমাম সাহেবকে মারকাজ মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
মারকাজ মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর তিনি ঐ সময় অনেকটা ঘরমুখী হয়ে পড়েন এবং আগের মতো সরাসরি মেহনতে সক্রিয় থাকতেন না। কোনো এক সময় ইমাম সাহেবের কথা স্যারকে জানানো হয়েছিল। স্যার কথাটি শুনে রেখেছিলেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জামাত আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও দূরবর্তী এলাকায় সফর করত। অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন দিনের জামাত নিয়ে স্যার বিভিন্ন জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সফর করতেন। এসব সফরের মাধ্যমে নতুন নতুন মানুষের কাছে পৌঁছানো যেত এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে দ্বীনের মেহনতের ভালো পরিবেশও তৈরি হতো। একসময় নতুন কিছু উসূলের কথা প্রচার করা হলো, তিন দিনের জামাত দশ মাইলের বেশি দূরে যেতে পারবে না, এক এলাকার (হালকা) জামাত অন্য এলাকায় যেতে পারবে না এবং এক জেলা থেকে অন্য জেলায়ও সফর করতে পারবে না।
কাজল ভাই স্যারকে এই নতুন প্রচারিত উসূলের কথা জানালে স্যার খুব ব্যথিত হলেন। এ কথা বুঝতে বাকি ছিল না যে স্যারের চলাচল সীমিত করতেই এ ধরনের উসূল করা হয়েছে; স্যারের দূরে দূরে জামাত নিয়ে যাওয়া বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের নিয়মের প্রবর্তন হয়েছে। তিনি বিষণ্ণ হয়ে বলেছিলেন, “আমার জন্যই তো এই উসূল বানানো।” কথাটি বলার সময় স্যারের চেহারায় গভীর মনঃকষ্টের ছাপ দেখা যাচ্ছিল।
নিজের কষ্ট বা নতুন উসূল নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ না করে স্যার কাজল ভাইকে বললেন, *“চলো, গাশতে যাই।”* “কোথায় যাবেন, স্যার?” জিজ্ঞাসা করা হলে স্যার সেই সাবেক ইমাম সাহেবের কথা বলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতে চাইলেন। স্যার উনার বাড়িতে গেলেন। কাজল ভাই বলেন, মনে হচ্ছিল, হয়তো স্যার সেখানে নতুন এই উসূল, মারকাজের পরিস্থিতি, কিংবা ইমাম সাহেবের প্রতি হওয়া আচরণ নিয়ে কিছু বলবেন। কিন্তু স্যার এসবের কিছুই বললেন না। স্বাভাবিকভাবে দেখা সাক্ষাৎ করলেন। দ্বীনের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং মেহনতের ফিকিরে থাকার ব্যাপারে অল্প কিছু কথা বললেন। তারপর বিদায় নিয়ে চলে এলেন।
বহু বছর পর দ্বীনের মেহনতের মধ্যে মতপার্থক্য ও বিভাজনের এক কঠিন সময়ে সেই মাওলানা সাহেবকেই আবার সক্রিয়ভাবে দ্বীনের মেহনতের ফিকির করতে দেখা গেল। তিনি আলেমদের কাছে যাচ্ছেন, মাদরাসায় যাচ্ছেন এবং মেহনতকে সামনে রেখে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছেন। ইমাম সাহেবকে এক গুরুত্বপূর্ণ তাকাজায় সামনে থেকে সক্রিয় দেখে কাজল ভাই বলেন, সেই দিনের ঘটনাটি মনে পড়ে যায়, বহু বছর আগে এক মনখারাপের মুহূর্তে স্যার হঠাৎ বলেছিলেন, *“চলো, গাশতে যাই।”* (মন ভাঙার সেই কঠিন মুহূর্তে স্যার নিজের দুঃখ নিয়ে বসে না থেকে যে মানুষটির কাছে গাশতে গিয়েছিলেন, কত বছর পর সেই মানুষটিকেই দ্বীনের একটি বড় প্রয়োজনে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে।)
নিজের প্রতি কোনো আচরণে কষ্ট পাওয়ার মুহূর্তেও স্যার সেই কষ্টকে অভিযোগ, প্রতিক্রিয়া বা ব্যক্তিগত বিরোধের দিকে নিয়ে যাননি; সম্পর্কচ্ছেদের দিকেও নিয়ে যাননি। বরং সঙ্গে সঙ্গেই দ্বীনের একটি কাজে নিজেকে ব্যস্ত করেছেন; সেই মুহূর্তেই তাঁর মনে পড়েছে এমন একজন আলেমের কথা, যিনি একসময় দ্বীনের মেহনতে সক্রিয় ছিলেন। নিজের মনখারাপকে পাশে রেখে তিনি তাঁর কাছে পৌঁছে গেলেন। আবার তাঁর কাছে গিয়েও নিজের কষ্টের কথা না বলে দ্বীনের সম্পর্কটুকু জাগিয়ে দিয়ে ফিরে এলেন।
স্যারের সঙ্গে সেদিনের সেই গাশতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কাজল ভাই বলেন, দ্বীনের ফিকিরের কোনো প্রচেষ্টাই ছোট নয়। আজকের একটি দেখা সাক্ষাৎ, একটি গাশত, কয়েক মিনিটের একটি কথা কিংবা কারও অন্তরে রেখে আসা দ্বীনের সামান্য একটি ফিকির আল্লাহ চাইলে বহু বছর পরও বড় কোনো খায়েরের উপলক্ষ হতে পারে। স্যার বিভিন্ন বয়ানে নানা উদাহরণের মাধ্যমে বোঝাতেন, *দাঈর কাজ বীজ বপন করে যাওয়া; কখন, কোথায় এবং কীভাবে সেই বীজ অঙ্কুরিত হবে, তা আল্লাহ তাআলাই জানেন।*
🎤 ৩৬৩
স্যার বলতেন, দাওয়াত এবং আদেশ এক বিষয় নয়। আদেশ দেওয়ার জন্য একধরনের কর্তৃত্ব ও সম্পর্ক প্রয়োজন; নিষেধ করার ক্ষেত্রে প্রয়োজন আরও বেশি প্রজ্ঞা, সামর্থ্য ও শরয়ি সীমারেখা। কিন্তু দাওয়াতের দরজা প্রত্যেক মানুষের জন্য খোলা। দাওয়াত হলো ভালোবাসা ও শুভকামনার সঙ্গে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, তার অন্তরে নেক আমলের আগ্রহ জাগানো এবং তাকে আল্লাহর দিকে এগিয়ে দেওয়া।
এ প্রসঙ্গে স্যার একবার হযরত মাওলানা সাঈদ আহমদ খান সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত আবদুল ওহাব সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহির- একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। রেলস্টেশনে অপেক্ষার সময় হযরত আবদুল ওহাব সাহেব সেখানে উপস্থিত কয়েকজনকে নামাজ পড়ার কথা বলছিলেন। তখন হযরত মাওলানা সাঈদ আহমদ খান সাহেব বললেন, “তুমি তো তাদের আদেশ দিলে; দাওয়াত দিলে না।” (বয়োজ্যেষ্ঠতার অবস্থান থেকে আদেশের ভঙ্গিতে কোনো কথা চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং নামাজের গুরুত্ব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে মানুষের অন্তরে নামাজের আগ্রহ সৃষ্টি করা হলো দাওয়াত)।
اُدْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
“আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করুন সর্বোত্তম পন্থায়।”
এই আয়াত উল্লেখ করে স্যার বলেন, দাওয়াতের মেজাজ শাসন করা বা আদেশ করা নয়, মানুষের অন্তর জয় করা; তর্কে পরাজিত করা নয়, বরং কল্যাণের পথে উৎসাহিত করা। দাঈর কথায় যেমন হিকমত থাকবে, তেমনি আচরণে কোমলতা থাকবে; এবং অন্তরে থাকবে মানুষের হেদায়াত ও কল্যাণের প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
🎤 ৩৬৪
স্যার বোঝাতেন, দ্বীনের মেহনতের অনেক সূক্ষ্ম বিষয় শুধু আলোচনা ও তত্ত্বের মাধ্যমে পুরোপুরি বোঝা যায় না; মেহনত করতে করতে তার বুঝ সৃষ্টি হয়। স্যার বলতেন, যে করে, সে বোঝে। স্যার একবার বলেন দাওয়াত ও দ্বীনের মেহনত কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় না; ময়দানে থেকে মানুষের অবস্থা, পরিবেশ, সময় ও পরিস্থিতির দাবি বুঝে কাজ করতে করতে একজন দাঈ উপলব্ধি করেন, কোথায় কি ব্যবস্থা উপযুক্ত। একই নীতি সব ব্যক্তি ও সব পরিস্থিতিতে একইভাবে প্রয়োগ করা যায় না। ময়দানে কাজের সঙ্গে সরাসরিভাবে যুক্ত থাকলে আল্লাহ তাআলা অবস্থার দাবি বুঝে যথাযথ পন্থা অবলম্বনের ফাহম ও প্রজ্ঞা দান করেন।
প্রাসঙ্গিক আলোচনায় স্যার একবার হজের সফরের একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। হেরেম শরীফে অবস্থানকালে তিনি হযরতজি মাওলানা ইনআমুল হাসান সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহির নিকট একটি বিষয় জানতে চান।
স্যার বলেন, আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও হযরত হারূন আলাইহিস সালামকে ফেরাউনের মতো সীমালঙ্ঘনকারী ব্যক্তির নিকট পাঠিয়েও নির্দেশ দিয়েছেন,
﴿فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ﴾
“তোমরা তার সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলো, যাতে সে উপদেশ গ্রহণ করে অথবা ভয় করে।”
অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তাআলা অন্য স্থানে নির্দেশ দিয়েছেন,
﴿يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ﴾
“হে নবী! কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর হোন।”
স্যার হযরতজির নিকট জানতে চান, উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহর নবীগণকে কাফেরদের মোকাবেলায় পাঠানো হয়েছে। অথচ এক স্থানে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কোমলভাবে কথা বলতে, আর অন্য স্থানে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কঠোরতা অবলম্বন করতে। এই পার্থক্যের কারণ কী?
স্যার বলেন, হযরতজি মাওলানা ইনআমুল হাসান সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি সাধারণত খুব সংক্ষিপ্ত কথা বলতেন। দীর্ঘ ব্যাখ্যায় না গিয়ে তিনি মাত্র একটি বাক্যে উত্তর দিলেন,
“جو کرتا ہے وہ سمجھتا ہے۔”
“যে করে, সে বোঝে।”
🎤 ৩৬৫
স্যার বলতেন, মানুষ যখন বড়দের কাছে সম্মান, মহব্বত ও প্রশস্ততা পায়, তখন তার অন্তরও তাঁদের জন্য এবং দ্বীনের মেহনতের জন্য ঝুকে যায়। একজন সাথীকে শুধু তার ত্রুটি, দুর্বলতা কিংবা দ্বীনের কাজে সে কতটুকু সময় দিচ্ছে, সেই মাপকাঠিতে বিচার না করে তার ভালো দিকগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া, বৈধ ও কল্যাণকর কাজে তাকে উৎসাহিত করা এবং তাকে আপন করে নেওয়া প্রয়োজন।
স্যার বলেন, কাউকে কাছে আনার জন্য সব সময় তাকে উপদেশ দেওয়াই জরুরি নয়; কখনো তার ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া, তার আনন্দে আনন্দিত হওয়া এবং দুটো উৎসাহের কথা বলাও তার অন্তরে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে। আবার সংকীর্ণতা, অপ্রয়োজনীয় আপত্তি কিংবা প্রত্যেক বৈধ দুনিয়াবি ব্যস্ততাকে ছোট করে দেখলে মানুষ দ্বীনের কাছাকাছি হওয়ার পরিবর্তে দূরেও সরে যেতে পারে।
স্যার একবার নিজামুদ্দিন মারকাজে অবস্থান করছিলেন। সে সময় দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় একটি সেমিনারে বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত দিনে সেখানে যাওয়ার আগে তিনি হযরত মাওলানা আহমদ লাট সাহেবকে বললেন যে, তিনি জামিয়া মিলিয়ার একটি সেমিনারে যোগ দিতে যাচ্ছেন।
স্যার বলেন, কথাটি শুনে হযরত মাওলানা আহমদ লাট সাহেব এমনভাবে আনন্দ প্রকাশ করলেন এবং উৎসাহ দিলেন, যেন তিনি কোনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজেই যাচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি স্যারকে হাত ধরে (সঙ্গে করে) হযরতজি মাওলানা ইনআমুল হাসান সাহেব রহমতুল্লাহ আলাইহি এর কাছেও নিয়ে গেলেন এবং বিষয়টি তাঁকে জানালেন। হযরতজি ইনআমুল হাসান সাহেব শুনে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বললেন, “ہاں بھائی، ہاں بھائی، ضرور جانا چاہیے۔” (হ্যাঁ ভাই, হ্যাঁ ভাই, অবশ্যই যাওয়া উচিত)।
স্যার এ ঘটনা উল্লেখ করে উনাদের দিলের প্রশস্ততার কথা বুঝাতেন। আমি তো সেখানে দ্বীনের কোনো বিশেষ কাজে যাচ্ছিলাম না; একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে একাডেমিক কাজে যাচ্ছিলাম। অথচ উনারা আমার কাজকে তুচ্ছ করেননি, নিরুৎসাহিত করেননি কিংবা এমন মনোভাবও দেখাননি যে, নিজামুদ্দিনে (মারকাজে) এসে আবার দুনিয়াবি কাজে যাওয়ার কী প্রয়োজন! বরং তাঁরা আমার কাজে আগ্রহ দেখিয়েছেন, আনন্দ প্রকাশ করেছেন এবং আমাকে আরও উৎসাহ দিয়েছেন।
স্যার কালামে পাকের আয়াত উল্লেখ করে বলেন:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ
“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।”
স্যার বলতেন, দ্বীনের মেহনতে মানুষকে আগে বাড়ানোর একটি বড় উসূল হলো তার দিলকে জয় করা। বড় হওয়া শুধু কথা বলা বা নির্দেশ দেওয়ার নাম নয়; বড় হওয়ার একটি পরিচয় হলো দিল বড় হওয়া, মানুষকে অন্তরে জায়গা দেওয়া, তার ভালোকে স্বীকৃতি দেওয়া, মহব্বতের সঙ্গে তাকে সামনে এগিয়ে দেওয়া। বড় যে তার দিল প্রশস্ত হয়, তাঁরা মানুষকে শুধু তার একটি কাজ বা একটি পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করে দেখেন না।
🎤 ৩৬৬
চিল্লার জন্য ভারত সফরের উদ্দেশ্যে কাকরাইলে মাশওয়ারার পর বুয়েটের নয়জন ছাত্র এবং খায়রুল বাসার ভাইসহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমরা দুজনসহ মোট এগারোজনকে এক জামাতে একত্র করা হয়। আমাদের জামাতের সফরের যিম্মাদার নিযুক্ত হন বুয়েটের এক হলের যিম্মাদার সাথী মাসুম ভাই। ঢাকার সাথী হিসেবে কাকরাইলের অনেক মুরব্বির সঙ্গে তাঁর পূর্বপরিচয় ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ভারত সফরে রওনা দেওয়ার আগে তিনি আমাদের জামাতের সবাইকে নিয়ে কয়েকজন মুরব্বির সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন। উদ্দেশ্য ছিল সালাম-মুসাফাহা করা, দোয়া নেওয়া এবং সফরের জন্য বিশেষ কিছু হেদায়েতের কথা শোনা। যদিও জামাতের আনুষ্ঠানিক হেদায়েত ইতোমধ্যে হয়ে গিয়েছিল।
এভাবে মাওলানা রুহুল কিস্ত সাহেব, আজিজুল মাকসুদ সাহেব, ওয়ালীউল ইসলাম ভাই, হাজি আব্দুল মুকিত সাহেবসহ কাকরাইলের আরও কয়েকজন মুরব্বির সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। প্রত্যেকেই আমাদের সফরের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ হেদায়েতের কথা বলেন। একপর্যায়ে একজন বিশিষ্ট মুরব্বির কামরায় উপস্থিত হলে ছাত্রদের জামাত পরীক্ষার পর চিল্লার জন্য ভারত সফরে যাচ্ছে, তিনি বাহবা বাহবা বলে অত্যন্ত আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি আমাদের বিশেষভাবে উর্দু ভাষা শেখার গুরুত্ব বোঝান। বলেন, তোমরা বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই মনে করবে, এখন আর তোমাদের কথাবার্তার ভাষা বাংলা নয়, উর্দু। উর্দু পারো আর না পারো, যতটুকু পারো, যেভাবেই পারো, নিজেদের মধ্যে উর্দুতে কথা বলা শুরু করবে।
তিনি বোঝান, তাবলিগের মেহনতে উর্দু একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা। টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা, দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজসহ দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে বড় মুরব্বিরা উর্দুতে বয়ান করেন। তাবলিগের বড়দের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিতাবও উর্দু ভাষায় রচিত। উর্দু শিখতে পারলে মুরব্বিদের কথা সরাসরি বোঝা যায় এবং তাঁদের বয়ান ও কিতাব থেকে তর্জমা ছাড়াই উপকৃত হওয়া যায়। তাই তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারতের সীমান্তে প্রবেশ করার পর নিজেদের মধ্যে আর বাংলা ভাষায় কথা বলবে না। এই চিল্লার সফর থেকে অন্তত উর্দুতে সাধারণ কথোপকথন করার যোগ্যতা অর্জন করে দেশে ফিরবে। বস্তুত তাঁর হেদায়েতের প্রধান বিষয় ছিল, ভারত সফরের সুযোগে আমরা যেন উর্দু ভাষা শিখে আসতে পারি।
তাঁর কামরা থেকে বের হয়ে মসজিদের দিকে যাওয়ার সময় কাকরাইল মসজিদের দোতলার করিডোরে স্যারের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। জামাতের যিম্মাদার মাসুম ভাই স্যারকে বললেন, ‘স্যার, আমরা আল্লাহর রাস্তায় ভারত সফরে যাচ্ছি। আমাদের জামাতের জন্য কিছু হেদায়েতের কথা বলেন।’ স্যার আমাদের সবাইকে নিয়ে করিডোরেই বসে পড়লেন। স্যার কথার শুরুতেই বললেন, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ভারত সফরে যাচ্ছ; ভাষা শেখার চক্করে পড়বে না (উর্দু শেখার চক্করে পড়বে না)। আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার উদ্দেশ্য কী? আল্লাহকে রাজি করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।
স্যারের মুখে কথাগুলো শুনে আমরা বিশেষভাবে লক্ষ করলাম, এই অল্প কিছুক্ষণ আগে যে মুরব্বি আমাদের পুরো সফরে উর্দু ভাষা শেখার ওপর এত গুরুত্ব দিয়েছেন, স্যার সেই একই বিষয়কে সামনে এনে সফরের মূল উদ্দেশ্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
স্যার বলেন, আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, নিজেকে আল্লাহর কাছে মকবুল বানানো, নিজের জীবনে আল্লাহর হুকুম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত অনুযায়ী চলার যোগ্যতা সৃষ্টি করা এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করা। এই সফরের মাধ্যমে আমার অন্তরে যেন আল্লাহর মহব্বত ও দ্বীনের ফিকির পয়দা হয়, এটাই হবে আমার আসল নিয়ত ও মাকসাদ।
স্যার আমাদের বোঝালেন, সফরে চলতে গিয়ে উর্দু ভাষা শেখা হতে পারে, বয়ান করার যোগ্যতা সৃষ্টি হতে পারে, মানুষের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা এবং দ্বীনের বিভিন্ন বিষয় শেখার সুযোগও হতে পারে। কিন্তু এগুলোর কোনোটি যেন সফরের মূল উদ্দেশ্যের স্থলাভিষিক্ত না হয়। আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার উদ্দেশ্য ভাষা শেখা, বয়ান করা কিংবা বক্তৃতার যোগ্যতা অর্জন করা নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। এসব আনুষঙ্গিক অর্জনের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে গিয়ে যেন সফরের আসল মাকসাদ থেকে দৃষ্টি সরে না যায়।
ঘটনাটি মনে বিশেষভাবে দাগ কেটে আছে। একই সময়ে, একই সফরের প্রাক্কালে, মাত্র কিছুক্ষণের ব্যবধানে আমরা দুজন মুরব্বির কাছ থেকে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণের হেদায়েত শুনেছিলাম। সেদিন স্যারের এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর হেদায়েত আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার আসল মাকসাদকে নতুনভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছিল।
🎤 ৩৬৭
একবার এক ব্যক্তি কোনো এক প্রসঙ্গে স্যারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘স্যার, এই ব্যাপারে আমাদের এলাকার উলামারা এমন কথা বলেন।’ তাঁর কথার জবাবে স্যার বললেন, ‘মনে করো, তোমার গ্রামে বিশজন এমএ পাস লোক আছে। তুমি কি বলবে, আমার গ্রামে বিশজন জ্ঞানী লোক আছে? তুমি বলবে, আমার গ্রামে বিশজন এমএ পাস করা লোক আছে। এমএ পাস করলেই তো কাউকে জ্ঞানী বলা যায় না।’
স্যার দ্বীনি শিক্ষার প্রসঙ্গ এনে বললেন, একইভাবে তোমার এলাকায় বিশজন দাওরায়ে হাদিস পাস করা ছেলে থাকতে পারে, ফাজিল বা টাইটেল পাস করা লোক থাকতে পারে। তুমি বলতে পারো, আমার এলাকায় বিশজন দাওরা পাস করা লোক আছে। কিন্তু শুধু দাওরা পাস করেছে বলেই তাদের সবাইকে আলেম বলা যাবে না। ইফতা কোর্স সম্পন্ন করেছে বলেই কেউ প্রকৃত অর্থে মুফতি হয়ে যায় না। আলেম, মুফতি তো অনেক বড় ব্যাপার! স্যার বিশেষভাবে বললেন, ‘আলেমের অন্য ডেফিনেশন (Definition) আছে।’ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সনদ অর্জন করা এক বিষয়, আর প্রকৃত অর্থে আলেম বা মুফতি হওয়া অন্য বিষয়। একজন প্রকৃত আলেম ইলমের মর্যাদা ও তার যথাযথ প্রয়োগ বোঝেন এবং দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকেন।
ইলমের গভীরতা, সঠিক বুঝ, আমল, তাকওয়া, দায়িত্ববোধ এবং নিজের ইলমের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতনতা একজন প্রকৃত আলেমের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। স্যার স্পষ্ট করেন, আলেম ও মুফতি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পরিচয়, যার সঙ্গে গভীর ইলম, যোগ্যতা, আমানতদারি ও সতর্কতার গুরুদায়িত্ব জড়িত। শুধু শিক্ষাগত সনদ বা বাহ্যিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কারও বক্তব্যকে উলামায়ে কেরামের সম্মিলিত বা প্রামাণ্য মত হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। দ্বীনি বিষয়ে কোনো কথা বলা, প্রচার করা কিংবা কারও নামে উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই ও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
🎤 ৩৬৮
স্যার এক বয়ানে বলেন, আল্লাহওয়ালা মানুষদের অনেকেই দেখতে খুব সাদাসিধা হন। বাস্তবেও তাঁরা সহজ সরল প্রকৃতির হয়ে থাকেন। বাহ্যিকভাবে দেখে কখনো মনে হতে পারে, তাঁরা খুব একটা চালাক চতুর নন, অনেকটা হাবাগোবা ধরনের মানুষ। কিন্তু কাজের সময়, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁরা অত্যন্ত সজাগ, সতর্ক ও বিচক্ষণ হন।
অন্যদিকে, দুনিয়াদার মানুষদের অনেকেই সাধারণ কথাবার্তা ও দৈনন্দিন আচরণে নিজেদের অত্যন্ত বুদ্ধিমান, চালাক ও সতর্ক বলে প্রকাশ করেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় দেখা যায়, তাঁদের সেই চালাকি ও বুদ্ধিমত্তা যথাযথভাবে কাজে আসে না। কখনো এমন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন, যা তাঁদের সাধারণ চালাকির সঙ্গে একেবারেই সংগতিপূর্ণ নয়।
স্যার প্রসঙ্গক্রমে বলেন, এক ব্যক্তি একজন সাহাবিকে হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের খলিফা কেমন?’ জবাবে সেই সাহাবি অত্যন্ত সংক্ষেপে বললেন, ‘তিনি ধোঁকা দেন না, ধোঁকা খানও না।’ স্যার কথাটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বললেন, একজন দ্বীনদার, পরহেজগার ও আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি অন্যকে ধোঁকা দেবেন না, এটা তো বোঝা গেল। কিন্তু তিনি নিজে ধোঁকা খাবেন না কেন? অন্যের ধোঁকা থেকে তিনি কীভাবে বেঁচে থাকবেন? স্যার বললেন, ‘আল্লাহ পাক নিজেই তাঁকে অন্যের ধোঁকা থেকে হেফাজত করেন।’
যে ব্যক্তি নিজে কাউকে ধোঁকা দেয় না, আল্লাহ তাআলা তাঁকে অন্যের ধোঁকা ও প্রতারণা থেকে নিজ কুদরতে হেফাজত করেন। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত সাদাসিধা হতে পারেন; তাঁর মধ্যে দুনিয়াবি চালাকি চতুরতা নাও থাকতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যদি তাঁকে নিজের হেফাজতে রাখেন, তাহলে অন্যের চালাকি তাঁর কী ক্ষতি করতে পারে? আল্লাহ তাআলা যাঁকে হেফাজত করেন, তাঁর জন্য মানুষের চালাকি চতুরতার ওপর নির্ভর করার কী প্রয়োজন?
🎤 ৩৬৯
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৭০
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৭১
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৭২
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৭৩
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৭৪
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৭৫
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৭৬
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৭৭
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৭৮
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৭৯
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৮০
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৮১
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৮২
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৮৩
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৮৪
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৮৫
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৮৬
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৮৭
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৮৮
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৮৯
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৯০
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৯১
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৯২
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৯৩
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৯৪
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৯৫
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৯৬
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৯৭
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৯৮
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৩৯৯
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।
🎤 ৪০০
এখানে মালফুযাতের মূল লেখা থাকবে।