মালফুযাত

Volume 3

মালফুযাত ২০১–৩০০

🎤 ২০১

মুন্সিগঞ্জের ভাই তালহা একবার স্মৃতিচারণা করে বলছিলেন, ২০১০ সালে পরীক্ষার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে ছিলেন। সেসময় স্যারকে নিয়ে ভাই তালহা ও স্যার রিকশায় একসাথে হলে আসতেছিলেন। রিকশায় আসার পথে স্যারকে বলেন, স্যার, পরীক্ষা শেষ, আমি তো তিন চিল্লার নিয়ত করেছিলাম, খুব মন চাচ্ছে বের হয়ে যেতে, কিন্তু নানা হালত, পারিবারিক চাপ, শরীরিক দুর্বলতা, মানসিক টানাপোড়েন, সব মিলিয়ে বুঝতে পারছি না কীভাবে যাবো। ভাই বলেন, স্যার আমার বিস্তারিত হালত শুনে মমতাভরা কণ্ঠে এক উদাহরণ পেশ করলেন। স্যার বললেন, দেখো, একটি মা যখন সন্তান জন্ম দেওয়ার অপেক্ষায় থাকে, তার হৃদয়ে থাকে এক অপার আনন্দ, এক নতুন প্রাণকে বুকে জড়িয়ে ধরার স্বপ্ন। কিন্তু সন্তান জন্মের মুহূর্ত যখন ঘনিয়ে আসে, তখন তাকে প্রচণ্ড কষ্ট, ব্যথা ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এখন যদি সেই মা ব্যথা সহ্য করতে না পারে, কেবল ব্যথানাশক খেতে থাকে, তাহলে সে কি সন্তানের মুখ দেখতে পারবে? না, সন্তান জন্মানোর জন্য সেই কষ্টকে তাকে গ্রহণ করতেই হবে। সেই কষ্টের মধ্য দিয়েই আসে সন্তানের আগমন, এক পরিপূর্ণতা, এক নতুন সূচনা। এরপর স্যার গভীর মমতায় ভাইকে বলেন, তোমার পথেও এখন কিছু কষ্ট আসবে, কিছু টানাপোড়েন থাকবে, কিন্তু তুমি এই কষ্টগুলোকে পেইন কিলার দিয়ে চাপা দিও না। বরং আল্লাহর উপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাও। তিন চিল্লার নিয়ত করেছো, বের হয়ে যাও। ইনশাআল্লাহ, ধীরে ধীরে এসব হালত সহজ হয়ে যাবে, আল্লাহ পাক সফলতা দান করবেন। জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও ইবাদতের পথে কিছু কষ্ট, ত্যাগ ও পরীক্ষার মুখোমুখি হতেই হয়, দ্বীনের মেহনত পরিশ্রম ও ত্যাগ ছাড়া ফলপ্রসূ হয় না। কিন্তু এই কষ্টগুলোই মূলত আল্লাহর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে।

🎤 ২০২

একদিন মাহফুজ ভাই স্যারকে প্রশ্ন করেন, “স্যার, আপনি তো এক সময় এমন এক পরিবেশে ছিলেন, যেখানে দ্বীনদারি সহজ ছিল না। সেখান থেকে আপনি কিভাবে এতটা গভীরভাবে দ্বীনের পথে আসতে পারলেন? এর পেছনে এমন কোন জাহেরী আমল আছে কি, যেটা আপনি মনে করেন এই পরিবর্তনের পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে?” স্যার বিনয়ভরে জবাব দেন, “হ্যাঁ, আমার জীবনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আমল ছিল, যেগুলোর প্রতি আমি সবসময় যত্নবান ছিলাম এবং কোনো অবস্থাতেই ছাড় দিইনি। প্রথমত, আমি কখনো কোনো নারীর সংস্পর্শে যাইনি। কোন কোন সময় মেয়েরা আমাকে খুঁজে বের করে যোগাযোগ করতে চেয়েছে, ঠিকানাও সংগ্রহ করেছে, এমনকি দেখা করার ইচ্ছা পোষণ করেছে। কিন্তু আমি মেয়েদের চক্করে পরিনি, কোন মেয়ের সাথে সম্পর্কের পথে যাইনি। বরং এমন অবস্থায় আমি নিজের বাসা পর্যন্ত পরিবর্তন করেছি, শুধুমাত্র এই ফিতনা থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য।” “দ্বিতীয়ত, আমি জীবনে কখনো নামায ছাড়িনি। আনন্দে, দুঃখে, ক্লান্তিতে, ব্যস্ততায়, সফরে, অসুস্থতায়, যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, আমি নামায কখনোই পরিত্যাগ করিনি।” আমাদের জন্য স্যারের এই কথা এক গভীর আত্মসমীক্ষার দরজা খুলে দেয়, আজ আমি কিসে অটল? কোন ফিতনায় আমি আপোষ করছি? আমি নামায নিয়ে কতটা সতর্ক? এই প্রশ্নগুলোর জবাবই নির্ধারণ করবে আমাদের ভবিষ্যতের দীনদারি।

🎤 ২০৩

বগুড়ার ভাই মাহবুব তিন চিল্লার সফরে পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। ঐ সময় স্বল্প কিছুদিনের জন্য স্যারও রাইব্যান্ড সফরে ছিলেন। সফরের মধ্যেই ভাই মাহবুব একদিন স্যারের নিকট পরামর্শ চাইলেন, “স্যার, আমি আমার স্ত্রীকে এমন অবস্থায় বাসায় রেখে সফরে এসেছি, যখন তার সন্তান প্রসবের নির্ধারিত সময় একেবারে নিকটবর্তী। একটু খোঁজখবর নিলে ভালো হতো, ফোনে অন্তত হালহকিকত জেনে নিলে মনে হয় ভালো হত। আমি ফোন করতে চাই।” স্যার মনোযোগ দিয়ে কথা শুনলেন এবং বললেন, “ঠিক আছে, তুমি ফোন করতে পারো, ফোন করো। তবে মনে রেখে, যেদিন তুমি ফোন করবে, সেদিন থেকেই নতুন করে তোমার তিন চিল্লার গণনা শুরু করবে।” এই উত্তরে স্যারের দৃষ্টিভঙ্গি যেন স্বাভাবিক কথার আড়ালে এক গভীর আত্মিক দাওয়াত। স্যার হয়তো বলতে চাচ্ছিলেন, তুমি যার রাস্তায় এসেছো, যার দরবারে এসেছো, যার কাছে কিছু পাওয়ার আশা করছো, তার উপরেই পুরোপুরি ভরসা করো। যার উপর নির্ভর করো, সে যেন আসলেই নির্ভরযোগ্য হন। বাহ্যিক এই খোঁজখবর নিয়ে কী হবে? স্যারের এই কথার পর ভাই মাহবুব আর বাসায় ফোন করে নাই। স্যারের কথাবার্তায় অনেক সময়ই এমন সূক্ষ্ম শিক্ষা থাকতো, যা হৃদয়কে নাড়িয়ে দিত, স্যারের প্রতিটি উক্তিতে থাকতো চিন্তা ও চেতনার জাগরণ। স্যার যেন প্রশ্ন রেখে গেলেন অন্তরে, আসল ভরসার জায়গাটা কোথায়? আমরা কী সত্যিই আল্লাহর উপর নির্ভর করছি? নাকি আমাদের নির্ভরতা এখনো মানুষ, ফোন, কিংবা বাহ্যিক উপায়ে সীমাবদ্ধ? এই উপলব্ধিই আমাদের আল্লাহর পথে চলার সত্যিকারের মান নির্ধারণ করে। সফরের এক পর্যায়ে কোনো দরকারে ঐ ভাই সিরাজগঞ্জের আলেম, মাওলানা আব্দুল্লাহ সাহেবকে ফোন করে। তখনই মাওলানা সাহেব জানালেন, স্যার আমার এখানে আসতেছেন, আপনি একটু পর ফোন করলে স্যারের সাথেও কথা বলতে পারবেন। এক ঘণ্টা পর যখন ভাই মাহবুব আবার ফোন করেন, মাওলানা সাহেব ফোন রিসিভ করেই স্যারের হাতে দিয়ে দেন। প্রথম কথায় স্যার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ছেলের খবর কী? ভাই আশ্চর্য হয়ে বললেন, স্যার, আমার ছেলে হয়েছে এটা তো আমি জানিই না! আমি তো আর পরে ফোন করিনি। আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনছি। স্যার শান্তভাবে জানালেন, হ্যাঁ, তোমার ছেলে হয়েছে। মাহবুব আবার জানতে চাইলেন, স্যার, কোনো নাম রেখেছেন কিনা? স্যার বললেন, তোমার ছেলের নাম ‘আতিক’।

🎤 ২০৪

বিরামপুরের প্রফেসর ফরহাদ ভাই একবার এক স্মৃতির কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার পরপরই তিনি তিন চিল্লার সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সফরে বের হওয়ার আগে যখন তিনি স্যারের নিকট বিদায় নিতে যান, স্যার পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু টাকা বের করে নীরবে তাঁর হাতে তুলে দেন। না ছিল কোনো জিজ্ঞাসা, না কোনো শর্ত, না কোনো হিসেব, যেন এক নিঃশব্দ দোয়া, এক অলিখিত আশীর্বাদ তাঁর হাতে তুলে দিলেন। তখন আমার আর্থিক অবস্থা কেমন ছিল, সেটা হয়তো স্যার অন্তর দিয়ে অনুভব করেছিলেন। পরবর্তীতে টাকা গুনে দেখা যায়, টাকার পরিমাণ ১২০০ টাকা। সময়টা ছিল ১৯৭৭/৭৮ সাল। সে সময়কার ১২০০ টাকা অনেক বড় অঙ্কের ছিল। তিনি বলেন, এ টাকায় পুরো তিন চিল্লার সময়টা নির্বিঘ্নে কেটেছে, এমনকি সফর শেষে হাতে কিছু টাকা রয়ে গিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, স্যার কখনো সেই টাকা ফেরত চাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেননি, এবং আমিও কখনো সাহস করে সে টাকা ফিরিয়ে দিতে পারিনি, কারণ তা তো শুধু টাকা ছিল না! সেই টাকা শুধু আর্থিক সহায়তা ছিল না, আমার জন্য সেটি ছিল এক আল্লাহওয়ালার অন্তরের অন্তর্দৃষ্টি, ছায়ার মতো দয়া, আর ঈমানি পথের প্রেরণা। (মানুষের পথে সাহায্য খুঁজতে গেলে হিসেব আসে, শর্ত আসে; কিন্তু আল্লাহওয়ালাদের দেয়া সাহায্য শুধুই দান নয়, তাদের সাহায্যে থাকে বরকত, থাকে ভালোবাসা, থাকে আখিরাতের সুঘ্রাণ। একটা দান, যখন আল্লাহর জন্য হয়, তখন তা হয়ে দাঁড়ায় সারা জীবনের পাথেয়।)

🎤 ২০৫

এক ভাই স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয় হলে থাকতাম। স্যার মাঝে মাঝে আমাদের হলে আসতেন, গাশতের দিন বয়ান করতেন, তাবলিগের কাজের হালত দেখতেন, উৎসাহ দিতেন। তখন আমাদের হলে তিন দিনের জামাত বের হওয়া শুরু হয়। জামাতে যাবার সময় অন্য হল বা মহল্লা থেকে খেদমতের হাড়ি পাতিল, প্লেট চুলা ইত্যাদি নিয়ে যেতে হতো। একবার স্যার আমাদের হলের নিজস্ব খেদমতের সামগ্রী কেনার জন্য আমার হাতে পাঁচ হাজার টাকা তুলে দেন। সে সময় ৫,০০০ টাকা খুবই উল্লেখযোগ্য অঙ্ক, এবং তা দিয়ে প্রয়োজনীয় ভালো মানের সব সামগ্রী কেনা যেত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা সেই অর্থের সদ্ব্যবহার করিনি। ভাই বলেন, আমরা সেই টাকা খেয়েদেয়ে শেষ করে ফেলি। কোনো প্রস্তুতি নেয়া হয়নি, কোন ছামানাও কেনা হয়নি, আর স্যারকেও জানাইনি। অথচ অবাক করার বিষয় হলো, স্যার কখনো আমাদের কিছু জিজ্ঞেসই করলেন না। না তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ছামানা কিনলে কি কিনলে না? না বললেন, টাকার কি করেছো? না চাইলেন, কোনো হিসেব বা ব্যাখ্যা। ভাই বলেন, আমাদের বিবেক মাঝে মাঝে কষ্ট পেত এই ভেবে যে, স্যার নিশ্চয়ই হয়তো সব জানতেন। কিন্তু তার মুখে কখনো আক্ষেপ ছিল না, রাগ ছিল না, এমনকি কোনো ইঙ্গিতও ছিল না যে তিনি এ বিষয়ে অবগত। পরবর্তীতে স্যারের সাথে দেখা হলে সেই একই প্রাণবন্ত হাসি, স্নেহের দৃষ্টি, যেন কিছুই হয়নি! প্রত্যেক মানুষই ভুল করে। কিন্তু সবার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি এক রকম হয় না। কেউ সরাসরি বলে দেন, কেউ কটাক্ষ করেন, আবার কেউ হালকা ইঙ্গিত দিয়ে বুঝিয়ে দেন। তবে আল্লাহওয়ালারা বা সত্যিকারের সৎ ও স্নেহভাজন মানুষরা অনেক সময় কিছু বলেন না, নিরব থাকেন। তাঁদের এই নিরবতা কোনো দুর্বলতা বা অজ্ঞতা নয়, বরং এটি: আস্থা ও সংশোধনের সূক্ষ্ম পদ্ধতি। যে আমাদের মুখের উপর কিছু বলেন না, অথচ আমাদের ভুল দেখেও বিশ্বাস রাখেন, নিরব থেকে আমাদের সংশোধন চান, দোয়া করেন, তার নিরবতা অনেক বেশি স্পর্শ করে হৃদয়কে, আমাদের আত্মসম্মান ও দায়বোধ জাগিয়ে তোলে। আমরা তখন শুধরে যেতে চাই নিজের থেকে, স্যারের এই নিরবতা হয়ে ওঠে, এক ধরনের অভিমানহীন উপদেশ, আর আখিরাতমুখী সংশোধনের এক মার্জিত আহ্বান।

🎤 ২০৬

একবার স্যার ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে নিজ কক্ষে বসে ডিগ্রি পাস কোর্সের পরীক্ষার খাতা দেখছিলেন। এটি সেই সময়ের কথা, যখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি; দেশের অনেক কলেজের ডিগ্রি, প্রিভিয়াস ও মাস্টার্স কোর্সের পরীক্ষা পরিচালনা করা হতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। স্যারের সামনে ছিল একগাদা খাতা, অধিকাংশ খাতাতেই অপ্রাসঙ্গিক, অগোছালো এবং অপ্রতুল উত্তর। কিছু কিছু খাতায় এমন আজগুবি লেখা ছিল, যা দেখে বোঝা যায়, ছাত্ররা হয়তো বিষয় বুঝেইনি। খাতাগুলোর নম্বর দেখে বোঝা যাচ্ছিল, অধিকাংশই পাশের যোগ্য নয়। স্যার স্বাভাবিক নিয়মেই খাতা দেখছিলেন, যথাযথ উত্তর না পেলে ফেল দিচ্ছিলেন। বেশিরভাগ ফেল করছে দেখে পাশে বসে থাকা মাহফুজ ভাই স্যারের দিকে তাকিয়ে আবেগে বললেন, “স্যার, একটু দয়া করেন, যেটুকু লিখেছে সেটুকুর ভিত্তিতে কোনোমতে পাশটা করিয়ে দিন।” স্যার মাথা নাড়লেন, শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, “এটা দয়ার জায়গা নয়।” মাহফুজ ভাই জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে এটা কিসের জায়গা?” স্যার বললেন, “এটা বিচারের জায়গা। জাজমেন্টের জায়গা।” এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেরই একটি নিজস্ব মানদণ্ড আছে, কিছু স্থানে দয়া নয়, যেখানে ন্যায়ের প্রয়োজন, সেখানে দয়া ন্যায়ের বিকৃতি।

🎤 ২০৭

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে এক বয়ানে স্যার বলেছিলেন, যখন কারও আখেরাতমুখী উন্নতি ঘটতে থাকে, তখন তার অন্তরের শুদ্ধতা ও পরিচ্ছন্নতা বাড়তে থাকে। মানুষ যদি আখেরাতের লাইনে উন্নতি করতে থাকে, তার দ্বীনি তরক্কী হতে থাকে, তাহলে দুনিয়ার কোনো জরুরতে, দুনিয়ার কোনো ব্যস্ততায় বা কাজের মধ্যে সে স্থায়ী থাকতে পারবে না, সে এতমিনান (সন্তুষ্টি) পাবে না। সে সবসময় সেই অবস্থাকে পরিবর্তন করতে চাইবে, কোথাও তার দ্বীল এতমিনান হবে না। তার অস্থিরতা, ঈমানি স্পর্শকাতরতা বাড়তে থাকবে, আর তখন সে দুনিয়ার কোনো কাজে, কোন অবস্থানে স্থায়ী হতে চাইবে না। স্যার বলেন, তার এই অভ্যন্তরীণ পরিচ্ছন্নতা ও দ্বীনি উন্নতি যত বাড়তে থাকে, সে তত বেশি নিজেকে বিশুদ্ধ রাখতে চায়, তত বেশি প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের জন্য অশুদ্ধতা বা ত্রুটি দেখতে পায়। তখন তার চোখে তার ব্যস্ততার মধ্যে, তার কাজের মাঝে, চারপাশের সব কিছুতেই ক্রমাগত অশুদ্ধতা ধরা পড়তে শুরু করে। যা আগে তার কাছে স্বাভাবিক মনে হতো, এখন তা তার কাছে অপূর্ণাঙ্গ বা ত্রুটিপূর্ণ মনে হয়। স্যার স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন, হয়তো তার দুনিয়াবী কাজ গুলো শুদ্ধই, কিন্তু তার দ্বীনি উন্নতি, তার পরহেজগারী ও অন্তরের অনুভব তাকে তার এমন শুদ্ধ কাজেও সম্পূর্ণ শান্তি দেয় না। স্যার আরো বলেন, দুনিয়ার আরাম আয়েশ বা কর্মব্যস্ততায় দ্বীল এতমিনান হওয়াটা (আত্মিক প্রশান্তি খুঁজে পাওয়াটা) দ্বীনের পথে স্থবিরতার লক্ষণ হতে পারে। যদি কেউ দুনিয়ার কোনো কাজে নিজেকে স্থায়ী করে ফেলে, এবং তাতেই তৃপ্ত হয়ে যায়, তাতে যদি সে পরিপূর্ণ স্বস্তি ও এতমিনান পায়, তবে খুব সম্ভবত এটি ইঙ্গিত দেয় যে সে দ্বীনের পথে থেমে গেছে, কিংবা তার দ্বীনি হালত নিম্নগামী হয়েছে। যার অন্তর দুনিয়ার ভেতরেই শান্তি পেয়ে যায়, দ্বীনদারীর দিক থেকে সে হয় দাঁড়িয়ে পড়েছে, না হয় পিছিয়ে যাচ্ছে।

🎤 ২০৮

স্যার এক মোজাকারায় বলেন, আমাদের ইমান কতটা পূর্ণ, তা অনেক সময় আমাদের পার্থিব বস্তুর প্রতি আসক্তি এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার প্রবণতা থেকে বোঝা যায়। প্রসঙ্গক্রমে স্যার একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, মনে করো একজন ব্যক্তি একটি দামি ও সুপরিচিত ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল চালাতে অভ্যস্ত। এলাকায় সবাই তাকে এই মোটরসাইকেল চালক হিসেবেই চেনে। এখন, যদি কোনো কারণে তাকে সাইকেল চালিয়ে কোথাও যেতে হয় এবং সে এই ভেবে লজ্জা পান যে, "আমি দামি মোটরসাইকেল চালিয়ে অভ্যস্ত, এখন সাইকেল চালালে লোকে কী ভাববে?" এই মনোভাবই প্রমাণ করে যে সে এখনো ইমানের পূর্ণাঙ্গ স্বাদ গ্রহণ করতে পারেননি। কেননা, এই পরিস্থিতিতে সাইকেল চালানোকে ছোট বা অসম্মানের মনে করছে, সে তার সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে আসবাবের উঁচু নিচুকে যুক্ত করে ফেলেছে। এই ধরনের মানসিকতা ইমানের দুর্বলতারই লক্ষণ। একজন মুমিন কখনোই পার্থিব বস্তুর মানদণ্ডে নিজের সম্মান বা মর্যাদা পরিমাপ করবে না। বরং, বিনয় এবং আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টিই তার কাছে মুখ্য। স্যার আরও বলেন, কেউ যদি এই ধরনের পরিস্থিতিতে (দ্বীলের এই অবস্থায়) মাঝে মাঝে সাইকেলও না চালায়, তাহলে দিল কখনোই সেই ইমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না, যা মানুষকে পার্থিব অহংকার ও লোক লজ্জার ঊর্ধ্বে রাখে। একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো বিনয় ও সরলতা। দামী জিনিস ব্যবহার করা বা ভালো অবস্থানে থাকা দোষের নয়, কিন্তু এর কারণে নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় ভাবা বা ছোট জিনিসের প্রতি বিতৃষ্ণা অনুভব করা ইমানের দুর্বলতা। ইমানের পূর্ণতা তখনই আসে যখন আমরা সকল আসবাবের ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টিকে জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য বানাতে পারি।

🎤 ২০৯

একবার নাটোরের ভাই আমানুল্লাহর জামাতের নুসরতে এসে সাথীদের সাথে মোজাকারায় স্যার দাওয়াতের কাজের ব্যাপারে তরগীব দেন। স্যার প্রশ্ন করেন, "এই যে আমরা এখানে গেলাম, ওখানে গেলাম, কী ফায়দা হলো আমাদের? বিভিন্ন জায়গায় গাশ্ত করছি, গাশ্ত করি, দাওয়াত দেই, এর কি ফায়দা হয়?" প্রশ্নটি উত্থাপন করে স্যার নিজেই এর উত্তর দেন এক উপমার মাধ্যমে। স্যার বলেন, মনে করো একটা পাখি বটগাছ থেকে একটা ফল মুখে করে নিয়ে রাজার রাজপ্রাসাদের চূড়ায় গিয়ে বসল। ফলটা খেয়ে সে তার ঠোঁটটা ঐ বিল্ডিংয়ের গায়ে একটু মুছে দিল, শুধু একটু ঘষে দিল। ওখানে তো ঐ পাখি এমন কোনো বিশাল কাজ করেনি, শুধু তার ঠোঁটটা একটু ঘষে দিয়েছে। হয়তো তার ঠোঁটে ফলের বিচি ছিল। তার ঐ সামান্য একটু ঘষাতেই রাজপ্রাসাদের চূড়ায় একটা নরম, ছোট্ট শিকড় বের হলো। আস্তে আস্তে সেই শিকড় থেকে ডালপালা গজালো, গাছ বড় হতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে সেই গাছ এতটাই বড় হয় যে, কখনো কখনো ঐ গাছের মোটা শিকড়ের ফাঁকে প্রাসাদের কিছু ইটের গাঁথুনি বা পিলার দেখা যায়। এক পর্যায়ে দেখা যায়, বিল্ডিংয়ের অস্তিত্বই নেই, কিন্তু ঐ গাছ সটান দাঁড়িয়ে আছে। তেমনি তোমাদের এই গাসত, সাক্ষাৎ, সালাম, মেহমানি, এসব হয়তো বাহ্যিকভাবে সামান্য মনে হয়, কিন্তু একসময় ঠিক সেই ঠোঁট ঘষার মতো তা কারো অন্তরে দ্বীনের বীজ বপন করে দেয়। ধীরে ধীরে তা বেড়ে ওঠে, ঐ একটু ঠোঁট ঘষা যেরকম বিশাল গাছের এক অস্তিত্বে নিয়ে আসে, তেমনি এই একটু ঘষা মাজা গাশ্তে ঐ ভাইয়ের জিন্দেগীতে, ঐ ভাইয়ের ঘরে, বা ঐ এলাকায় বেদ্বীনিকে দূরে হটিয়ে দ্বীনকে নিয়ে আসে, দ্বীনি জিন্দেগী দাড় করিয়ে দেয়। হয়তো আজ নয় (দেখা যাচ্ছে না), কিন্তু একদিন সেই ভাইয়ের জীবনে, তার পরিবারে, তার এলাকায় দ্বীনের চর্চা প্রতিষ্ঠা পাবে, এবং বেদ্বীনির সব অবশেষ মুছে যাবে। স্যার বলেন, আল্লাহর জন্য দাওয়াতের প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাও আল্লাহর কাছে অনেক বড় এবং এর ফলাফল অকল্পনীয়, আপাতদৃষ্টিতে ছোট এই প্রচেষ্টাগুলোই সুদূরপ্রসারী ও বিশাল পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।

🎤 ২১০

একবার স্যার ইখলাস এর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক তুলে ধরেছিলেন। স্যার বলেন, "ধরা যাক, কোনো ভিআইপি জামাত এসেছে, সেখানে সচিব আছেন, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অথবা বিদেশী ভাইয়েরা আছেন। তখন আমরা নিজের অজান্তেই খুবই উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে তাদের নুসরতে লেগে যাই। সাথীদের নিয়ে শহরজুড়ে গাসত করি, মেহমানদারিতে কোনো ঘাটতি রাখি না, সময় দেই, মাল খরচ করি, পরিশ্রম করি। আর তখন আমাদের মনেও ভাল লাগে যে, দ্বীনের জন্য কত বড় কাজ করছি, কত সুন্দর মেহনত করছি। তাদের মেহমানদারী করতে আমাদের মধ্যে এক ধরনের বাড়তি আগ্রহ ও উদ্দীপনা কাজ করে। বড় আত্মতৃপ্তি অনুভব করি যে, "আল্লাহ পাক আমাকে দ্বীনের জন্য সময়, মাল ও জান খরচ করার তৌফিক দিলেন।" বড় কর্মকর্তা, সচিব বা বিদেশী জামাত, তাদের নুসরত করার লোকের অভাব হয় না। কিন্তু যদি কোনো গ্রামের সাধারণ কৃষক ভাইদের জামাত আসে, গরীব মানুষ, কুলি, মজুর শ্রেণির জামাত আসে? তখন সেই একই আগ্রহ, সেই একই আন্তরিকতা, সেই একই সময় দেওয়ার মন মানসিকতা দেখা যায় না। কিন্তু কেন এমনটা হয়? স্যার প্রশ্ন তোলেন, "কেন ঐ একই আগ্রহ পাই না সাধারণ জামাতের ক্ষেত্রে? কেন হবে এরকম?" গ্রামের খুব গরীব মানুষ, সাধারণ কৃষক, কুলি মজুরদের জামাত আসে, তখন সেই একই আগ্রহ, সেই একই উদ্দীপনা তাদের নুসরত করার জন্য, তাদের সাথে সময় দেওয়ার জন্য বা তাদের মেহমানদারী করার জন্য থাকে কি? স্যার বলেন, যদি সত্যিই আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করি, তাহলে জামাতের সদস্য কারা, সেটার ওপর নির্ভর করার কথা না। এখলাস তো তাকে তাকাজা দেখে কাজ করাবে, ব্যক্তি দেখে নয়। বরং এক জন মুমিনতো এমন জামাতের দিকে বেশি মনোযোগ দেবে, যাদের দুর্বলতা বেশি, যাদের সাহায্য ও নূসরতের প্রয়োজন বেশি। কারণ এসব সাথীর প্রতি খিদমত করলেই আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা বেশি।

🎤 ২১১

একবার হজ্জ সফরে, মিনা থেকে মক্কার পথে ফিরছিলেন স্যার ও সাথীসঙ্গীরা। দীর্ঘ হেঁটে চলা, প্রচণ্ড গরম, আর হজ্জের চূড়ান্ত আমল শেষ করার ক্লান্তি, সব মিলিয়ে সবার মাঝেই দ্রুত মক্কায় পৌঁছে ‘হালাল’ হওয়ার এক রকম তাড়া কাজ করছিল। মিনা থেকে মক্কার পথে ফিরছেন হাজ্বীদের দল। সবার মনে তখন একটাই চিন্তা, কত দ্রুত হোটেলে পৌঁছে মাথা কামানো, গোসল করা, হালাল হওয়া যাবে, প্রচন্ড রোদ আর হাঁটার ক্লান্তি সবার চোখে মুখে স্পষ্ট। এই ক্লান্তি আর কষ্টের মুহূর্তে হঠাৎ এক ভাই অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রচণ্ড গরমে তার শরীর ভেঙে পড়ে, তিনি রাস্তাতেই শুয়ে পড়েন, বমি করতে করতে একবারেই নিস্তেজ হয়ে পড়েন। অবস্থা এমন যে, সাথে থাকা সকলেই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান, সবাই ঐ ভাইকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে পুলিশের সাথে যোগাযোগ করা হয়, কিছুক্ষণ পরে পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স আসে এবং জানায়, রোগীর সাথে তার সঙ্গীদের মধ্য থেকে একজনকে যেতে হবে হাসপাতালে, অ্যাম্বুলেন্সে একটি সিট ফাঁকা আছে। এমন এক পরিস্থিতি, যখন সবাই ক্লান্ত, হালাল হওয়ার জন্য অধীর, দ্রুত হালাল হওয়ার তাগিদে মক্কার দিকে ছুটছেন, আবার ঐ অসুস্থ ভাইটি ভিন্ন এজেন্সির হওয়ায় তার হোটেলও ছিল ভিন্ন ও দূরে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। সেখানে একজন রোগীর সাথে হাসপাতালে যাওয়া মানে নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক দেরি হওয়া, নিজের কষ্ট আরও বাড়িয়ে তোলা। অন্যরা অপেক্ষাকৃত তরুণ হলেও, স্যার ছিলেন জামাতের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ও অভিভাবকসুলভ। সাথে থাকা সাথীদের সবাই যুবক, কেউ কেউ যেতে আগ্রহ দেখালেও স্যার নিজেই এগিয়ে এলেন, নির্দ্বিধায় বললেন, আমি যাবো। রোগীর সাথে স্যারের কষ্ট হবে এবং ফিরতে দেরী হতে পারে মনে করে সাথীদের কেউ কেউ স্যারকে না যাবার রায় দেন। 'স্যার' দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন, "আমিই যাই।" স্যার আরবী ভাষার অজুহাতে (হাসপাতালে কথা বলতে সুবিধা হবে) কৌশলে রোগীর সাথে হাসপাতালে যাওয়ার গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন, বাকী সাথীদেরকে ফ্রি করে দিয়ে নিজে এ্যাম্বুলেন্সে উঠে পড়েন। নিজের ক্লান্তি, বয়স, এবং দ্রুত হালাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিয়ে, অসুস্থ ভাইটিকে হাসপাতালে ভর্তি করানো, চিকিৎসার তদারকি করা, সুস্থ হলে তাকে হোটেলে পৌঁছে দেওয়া, এসব সম্পন্ন করে যখন স্যার নিজ হোটেলে ফিরলেন, তখন বেশ রাত। ততক্ষণে বাকি সাথীরা হালাল হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। এটি শুধুমাত্র একটি হজ্জ্বের অভিজ্ঞতা ছিল না, কেবল একটি সফরের স্মৃতি নয়, জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল। নিজের আরাম, আয়েশ, ব্যক্তিগত সুবিধা, ও ক্লান্তি উপেক্ষা করে অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে আসা ঐ সময় খুব সাধারণ ত্যাগ ছিল না। অন্যের অবস্থান, পরিচয় বা সম্পর্ক বিচার না করে, কষ্টে থাকা একজনকেও ভালোবাসা ও যত্নের সঙ্গে দেখাভাল ও সঙ্গ দেওয়া, এক মহৎ হৃদয়, নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং অসাধারণ ভালবাসা, নেতৃত্ব, এখলাস এবং ত্যাগের দৃষ্টান্ত দেখালেন স্যার।

🎤 ২১২

নওগাঁ সরকারি কলেজের এক ছাত্রজামাত ১০ দিনের মেহনতের জন্য মান্দা উপজেলার মইনূম এলাকায় অবস্থান করছিল। জামাতের ১০ দিনের সফরের প্রায় শেষ দিকে, দিনগুলো কাটতে কাটতে শেষদিকে এসে ছাত্রদের আর্থিক অবস্থা বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। ঐ এলাকায় বাজারও প্রতিদিন বসতো না, সহজলভ্য জিনিসপত্রও পাওয়া যেত না। মইনূম বাজার মসজিদে অবস্থানকালে, স্যার, কাজল ভাই এবং কিছু সাথী এই জামাতের নুসরাতে গিয়েছিলেন। স্যার ঐ রাতে জামাতের সাথে রাত্রিযাপন করেন। সেদিনের খানাপিনা ছিল অত্যন্ত সাদাসিধা। ঐদিন হাটবার ছিল না, ফলে বিশেষ কিছু রান্না করা সম্ভব হয়নি। সাধারণ আলোর চাল (আতপ চাল) দিয়ে, গরুর চর্বি (তেল) এবং লাউ দিয়ে ভুজনার মতো এক প্রকার খিচুড়ি রান্না করা হয়েছিল। জামাতের সাথী ভাই সাগর বর্ণনা করেন, তারা খুব পেরেশান ছিলেন যে এই সাধারণ খাবার স্যার খেতে পারবেন কি না। এমন সম্মানিত মেহমানের সামনে এই খিচুরি পেশ করা কি শোভনীয় হলো? কিন্তু স্যার অত্যন্ত আগ্রহ ও তৃপ্তির সাথে সেই খাবার গ্রহণ করেন। স্যার এমনভাবে খেয়ে উঠেন যে, সাথীদের বিন্দুমাত্র বুঝতে দিলেন না যে এটি কোনো সাধারণ খাবার। স্যার আচরণে একটুও বুঝতে দেননি যে খাবারটা খুবই সাদামাটা হয়েছে। ভাই সাগর বলেন, স্যারের এই তৃপ্তি সাথীদের হৃদয়ে এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মাগরিবের পর স্যার জামাতের হালত (অবস্থা) নিয়ে বয়ান করেন। স্যার হযরত আমির ইবন আব্দুল কায়স রহমতুল্লাহি আলাইহি এর একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। যখন তাকে গভর্নর হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, তখন স্থানীয় লোকজন তার জন্য একটি বড় ও সম্মানজনক বাড়ি নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, "আমাকে যদি বাড়ি বানিয়ে দিতে চাও তবে এমন বাড়ি বানিয়ে দাও যেন আমি শুলে আমার পা দেয়ালের সাথে লেগে থাকে, আর দাঁড়ালে আমার মাথা চালের সাথে ঠেকে যায়। কারণ আমার এই দুনিয়ার জীবনের দরকার এতটুকুই।” এই ঘটনা বর্ণনা করে স্যার বয়ানের মধ্যে প্রশ্ন করে বলেন, এমন ঘরে শুয়ে কি দুনিয়ার মহব্বত হবে নাকি আখিরাতের দিকেই মন নিবদ্ধ থাকবে? স্যার আরও বলেন, অনেক আল্লাহওয়ালাদের জীবনতো এমন ছিল যে, ঘোড়ার পিঠেই জন্ম এবং এই ঘোড়ার পিঠেই প্রান্তর থেকে প্রান্তর ছুটে চলেছেন, দুনিয়ার বিলাসিতা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, তারা ছিলেন অজেয়। তিনি আরও বলেন, যখন কেউ এমন অভাবী, দুর্বল অবস্থায় থেকেও মেহনত করে যায়, মেহনতের এই দুর্ভোগই তাকে আল্লাহর দরবারে কদরের স্থান এনে দেয়। আল্লাহ পাক তাতে এস্তেকামাত (স্থিরতা, অবিচলতা) দান করেন, সাহায্য করেন, এবং আখেরাতের চিন্তা হৃদয়ে গেঁথে দেন। আল্লাহ পাক আখিরাতের জন্য তাদের অন্তরকে প্রস্তুত করে দেন।

🎤 ২১৩

ভাই সাগর বলেন, স্যারের জীবনযাপন ছিল সরলতা ও সুন্নাহর এক প্রতিচ্ছবি। স্যারের প্রতিটি কাজ, এমনকি ছোটখাটো অভ্যাসও অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করত। ওজুর পরে কেউ যদি গামছা বা রুমাল এগিয়ে দিতেন, স্যার তা বিনয়ের সাথে গ্রহণ করে ব্যবহার করতেন, হাত মুখ মুছতেন, কখনো অবহেলা করতেন না, অন্যদের দেওয়া কোনো বস্তুকে সম্মান করে মনোভাব প্রকাশ করতেন। একবার নওগাঁয় এক সফরে এক সাথী স্যারকে ওজু করতে দেখে অনুপ্রাণিত হন। সেই সাথী বিনয়ের সাথে স্যারকে একটি ছোট রুমাল হাদিয়া (উপহার) দেন। স্যার অত্যন্ত খুশি মনে সেই রুমাল কবুল করেন এবং উপহারদাতার সামনেই সেটি ব্যবহারও করেন। স্যারের এই আচরণে কেবল রুমাল গ্রহণই ছিল না, বরং উপহারদাতার প্রতি তার ভালোবাসা ও সম্মানও প্রকাশ পেয়েছিল। ছোট উপহারকেও কীভাবে সাদরে গ্রহণ করতে হয় এবং এর মাধ্যমেও মানুষের মন জয় করা যায়, স্যার আমাদের শিখিয়েছিলেন। স্যার কখনো নিজেকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা মনে করেননি, স্যারের সরলতা এবং অন্যের দেওয়া তুচ্ছ জিনিসকে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করা স্যারের বিনয়ী চরিত্রের পরিচায়ক ছিল।

🎤 ২১৪

রাজশাহীতে কাজল ভাইয়ের বাসায় স্যারের অবস্থানকালে অনেকবার স্যারের মাথা কামিয়ে দিয়েছিলাম। অনেক সময় অসাবধানতায় স্যারের মাথা কেটে ফেলতাম, রক্ত বের হত। কিন্তু স্যার কখনো একটিবারও বিরক্ত হননি, একবারের জন্যও "ওহ! আহ!" বলেননি, বিরক্তি প্রকাশ করেননি, আঘাতের কথা বলেননি, এতটুকুও জিজ্ঞেস করেননি যে, "কেটে গেছে নাকি?" যখন নিজেই অনেক সময় "ওহ" বলে উঠতাম (নিজের হাতে স্যারের মাথায় কেটে দিলাম), স্যার খুব স্বাভাবিকভাবে বলে উঠতেন, "ওওওরকম এমন একটু হয়ই", বরং "জাযাকাল্লাহ" বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। রাজশাহীতে স্যারকে কখনো কোনো সেলুন বা দোকানে গিয়ে মাথা কামাতে দেখি নাই।

🎤 ২১৫

একবার হজ্জের সফরে মিনায় হালাল হবার জন্য মাথা কামানোর ব্যবস্থা করা হয়, স্যার ইফরাদ হজ্জ করছিলেন। সাথে ছিল সাধারণ এক টাকা দামের একটি প্লাস্টিকের রেজার এবং পূর্বে ব্যবহৃত বলাকা ব্লেড। এই অতি সাধারণ রেজারেই সাধারণ ব্লেড ভরে স্যারের মাথা কামানো হচ্ছিল। রেজারের প্যাঁচ ভালো না থাকায় ব্লেডটি কিছুটা আলগা হয়ে যাচ্ছিল, ফলে চুল ঠিকমতো কাটা যাচ্ছিল না এবং বারবার মাথা কেটে রক্ত বের হচ্ছিল। স্যার নিজে রেজারটি হাতে নিয়ে প্যাঁচ টাইট করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তা যথেষ্ট টাইট হচ্ছিল না। তখন মাটিতে পড়ে থাকা একটি ম্যাচের কাঠির মতো শলাকা ব্লেডের নিচে ভরে রেজারের প্যাচটা টাইট করে আবার চুল কাটার জন্য দেন। চুল কাটতে কাটতে মাথার অনেক জায়গায় কেটে যায় এবং বেশ রক্তও বের হয়, এক জায়গায় তো মাথা ছিলে গিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু স্যার একবারের জন্যও "ওহ, ব্যথা," বা "ওহ, কষ্ট হচ্ছে," অথবা "মাথা কেটে ফেলেছ নাকি!" এমন কোনো কথা বলেননি। বরং, যখন আমরাই স্যারের রক্তক্ষরণ দেখে "ওহ! ওহ!" করছিলাম এবং বলছিলাম, "স্যার, কেটে যাচ্ছে তো!" আমাদের এই উদ্বিগ্ন মুখ দেখে স্যার তার চিরচেনা হাসির অভ্যাসের মতো এক ঝলক হেসে উঠে বললেন, "চুল তো কাটা হচ্ছে, কেটে (চুল) দাও, শেষ করো।" হজ ও ওমরার পর যখনই হালাল হওয়ার জন্য মাথা কামানোর দরকার হতো, স্যার সবসময় সফরসঙ্গীদের হাতেই মাথা কামিয়ে নিতেন। স্যারকে কখনো কোনো দোকানে, সেলুনে মাথা কামাতে দেখা যায়নি। অনেক সময় হোটেলে (বাসায়) যাওয়ার পথে সেলুন বা রাস্তায় চুল কাটার জন্য থাকা ব্যক্তির ডাক শুনে স্যারকে সহজে (মাথা না কেটে অল্প সময়ে) মাথা কামিয়ে নেওয়ার কথা বললেও, স্যার অন্যদের কখনো নিষেধ করেননি; কিন্তু নিজে কখনো দোকানে বা নাপিতের হাতে চুল কাটেননি। অন্য একবার এরকম চুল কাটার পূর্ব মুহূর্তে স্যার বলেন, "তোমার চুল আগে কেটে দেই।" কিন্তু স্যারের হাতে চুল কামিয়ে নিতে ইতস্তত লাগছিলো, স্যারকে বসিয়ে প্রথমে স্যারের চুল কেটে দেওয়া হয়। স্যারের চুল কাটা হয়ে যাওয়ার পর ইচ্ছা ছিল যে, স্যার গোসল করতে করতে বাইরে দোকানে গিয়ে নিজের চুল কামিয়ে আসা যাবে। কিন্তু স্যারের চুল কাটা শেষ হতেই স্যার বললেন, "তুমি বসো।" "স্যার, আপনি গোসল করে নেন, আমি চুল কেটে নিব ইনশাআল্লাহ।" স্যার একটু জোর দিয়ে বললেন, "আবার কোথায় যাবে, এখানেই বসো।" স্যার নিজ হাতে তার সফরসঙ্গি, বয়সে অনেক ছোট, ছাত্রদের মধ্যে, চুল কামিয়ে দেন, একটুও ইতস্তত করেননি, খুব স্বাভাবিক ও সাদাসিধা মনে চুল কামিয়ে দিলেন।

🎤 ২১৬

হজ্জের সফরে আরাফার দিন আসরের নামাজের প্রস্তুতি চলছিল। স্যারের সাথে প্রায় ১২-১৪ জন একত্রে তাবুর নিচে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সাথীদের মধ্যে তখন কেবলার দিক নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা দেখা দেয়। সাথীদের কেউ কেউ বললেন, কাতার কেবলামুখী হয়নি, এদিকে (ডানে বা বামে) একটু ঘুরে সোজা করতে হবে। আবার অন্য একজন বললেন, না, এভাবেই কেবলা ঠিক আছে। তাবুর ভেতরে কেবলার কোনো নির্দেশক চিহ্ন ছিল না, তাবুর বাইরে বড় খুঁটিতে কেবলার নির্দেশনা চিহ্ন ছিল। এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুহূর্তে স্যার বাইরে গিয়ে কেবলা নির্দেশক দেখে নিশ্চিত হয়ে আসতে বললেন, ঠিক করে দেখে আসো কেবলার দিক। একভাই বাইরে গিয়ে দেখে আসলেন এবং ফিরে এসে কাতার সোজা করে একামত দেওয়া হলো। এরই মধ্যে এক ভাই বলে উঠলেন, "আরও একটু এইদিকে মোড় নিলে ভালো হয়।" অন্য একজন (যিনি এইমাত্র বাইরে গিয়ে দেখে এসেছিলেন) বললেন, "না, এভাবেই বোধহয় ঠিক আছে।" ঐ ভাইয়ের এই কথার পর স্যার একটু জোর দিয়েই বললেন, "বোধহয় কী? ঠিকমতো দেখে আসো, অস্পষ্টতা নিয়ে কেন? (বোধহয়, মনে হয়, মানে কী? এরকম অস্পষ্টতা নিয়ে কেনো, অস্পষ্টতা থাকবে কেন? অস্পষ্টতা রাখবে কেন? স্পষ্টভাবে দেখে এসো)!" স্যারের এই তাকিদের পর আবারও দুই তিন ভাই তাবুর বাইরে গিয়ে নিশ্চিত হয়ে এলেন, তখন কাতার সোজা করে নিয়ে নামাজ আদায় করা হলো। নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতে কেবলার মতো মৌলিক বিষয়ে অস্পষ্টতা বা অনুমাননির্ভরতা স্যার ঐসময় একদমই পছন্দ করেননি। স্যারের দৃঢ় উক্তি, "বোধহয় কী? ঠিকমতো দেখে আসো, অস্পষ্টতা নিয়ে কেন?" মনে হচ্ছিল শুধু কেবলার দিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ছোট বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি এক অমূল্য শিক্ষা (যখনই কোনো বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহ জাগে, তা নিরসন করে, নিশ্চিত হয়ে শুরু করাই প্রকৃত সচেতনতা ও দূরদর্শিতার পরিচয়)।

🎤 ২১৭

আরিফুর রহমান ভাই হজ্জের সফরের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আরাফার ময়দানে স্যারের সাথে পায়ে হেঁটে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও মাস্তুরাত (মহিলা সদস্য) থাকায় তা সম্ভব হয়ে উঠেছিল না। তবে মিনার তাবুতে ফেরার পরে, জামারাতে একত্রে রওয়ানা হলাম। মিনার তাঁবু থেকে জামারাতে পাথর মারতে যাওয়ার সময়কার ঐ জনসমুদ্রের মধ্যে আমাদের জন্য দায়িত্বশীল একজন রাহবার ছিলেন স্যার। পথে ছিলো বিপুল ভিড়, মানুষের স্রোত যেন থামছেই না, লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে জামারার পথে চলাটা ছিল এক কঠিন অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে আহলিয়া ও বয়স্ক আম্মা সাথে ছিলেন। ভাই বলেন, আমি নিজে চেষ্টা করছিলাম আম্মা ও স্ত্রীকে নিয়ে স্যারের পেছনে চলতে, কিন্তু সামনে থাকা স্যারকে ফলো করাটাই হয়ে উঠছিল দুরূহ। লক্ষ করছিলাম, স্যার কিছু দূর গিয়ে বারবার পেছনে ফিরে আমাদের দেখছেন, আমরা ঠিক আছি কি না, দলছুট হচ্ছি কি না, মাস্তুরাতদের নিয়ে চলাচলের সময় রাস্তায় কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। এভাবে পুরো পথজুড়ে, স্যার আমাদের গতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে চলেছেন, একবার থেমে দাঁড়াচ্ছেন, আমরা এগোলে আবার হাঁটা শুরু করছেন। লাখো মানুষের সেই চলমান ভিড়ে স্যার তাঁর নিজস্ব গতিতে এগিয়ে না গিয়ে, বারবার পেছনে ফিরে আমাদের অনুসরণ করছিলেন। জামারাতে পৌঁছে পাথর নিক্ষেপের কাজ শেষে ফিরতি পথেও একইভাবে স্যারের সাথি ছিলাম। অথচ ইচ্ছে করলে স্যার আমাদের দায়িত্ব আমার (যেহেতু আমি পুরানো সাথী) উপর ছেড়ে দিয়ে নিজে এগিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। স্যারের এই আখলাক আমাদের চোখে একজন রাহবারের প্রকৃত রূপ তুলে ধরেছিল, যিনি নেতৃত্ব দেন, কিন্তু ঊর্ধ্বতাসুলভ আচরণ করেন না; বরং দল থেকে দুর্বলদের খেয়াল রাখেন, গতি ও কষ্টের ভারসাম্য বজায় রাখেন, এবং সাথীদের সঙ্গেই নিজেকে একাত্ম করেন।

🎤 ২১৮

ভাই আরিফুর রহমান বলেন, হজের সফরের শেষে মদীনায় স্যারসহ সাথীরা এক ভাইয়ের বাসায় কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। স্যার সাধারণত চা খেতেন এবং জামাতের সাথীরাই চায়ের ব্যবস্থা করতেন। একদিন অন্য সাথীরা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। স্যার বিশ্রাম থেকে উঠে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি চা বানাতে পারো?" আমি সম্মতি জানালে স্যার বললেন, "তুমি যদি চা বানাতে পারো তাহলে চা বানাও, ভেতরে (মাসতুরাতকে) বলার দরকার নেই।" ভাই স্যারের স্মৃতিচারণ থেকে বলেন এটা ছিল স্যারের অসাধারণ বিচক্ষণতা এবং অন্যের প্রতি যত্নের প্রমাণ। উনি বলেন যে স্যার সাধারণত কখনো চা বানানো বা এই ধরনের কোনো কাজের কথা তাঁকে বলেননি। স্যারের এই জিজ্ঞাসা থেকে বোঝা যায়, স্যার নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে উনি কাজটি করতে সক্ষম কিনা। যখন উনি হ্যাঁ বললেন, তখন স্যার তাঁকে তাঁর স্ত্রী বা মাকে বিরক্ত করতে নিষেধ করলেন, যাতে তাঁরা বিশ্রাম নিতে পারেন। ভাই যখন ভেতরে গিয়ে তাঁর স্ত্রীকে স্যারের চায়ের কথা জানালেন, স্যার চা খাবেন এটা বানানো আর এমন কি কষ্ট বলে সানন্দে চা তৈরি করে দেন। সফরের ক্লান্তি এবং বিশ্রামের গুরুত্ব স্যার কতটা উপলব্ধি করতেন, তা এই ছোট্ট ঘটনা থেকেই বোঝা যায়। একটা সফরের মধ্যে সাথে থাকা সাথীর মাস্তুরাতের বিশ্রামের ব্যাপারেও স্যার খেয়াল রাখতেন (সত্যিকারের নেতৃত্ব কেবল আদেশ করা নয়, বরং নিজের অধীনস্থ বা সঙ্গীদের প্রয়োজন ও আরামের দিকে খেয়াল রাখা; অন্যের আরাম এবং সুবিধার প্রতি সর্বদা সংবেদনশীল থাকা উচিত, এমনকি তুচ্ছ ছোট বিষয়েও)।

🎤 ২১৯

নাট্যকার সেলিম আল দীনের কাছে একবার স্যারকে মাহফুজ ভাই গাসতে নিয়ে যান। কথোপকথনের মধ্যে স্যার শিল্প সংস্কৃতি ও মানবজীবনের প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করেন। স্যার বলেন, “মানুষ যখন গতির মধ্যে থাকে, অর্থাৎ লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও শৃঙ্খলার সাথে জীবনের পথে চলতে থাকে, তখন তার শিল্পের দিকে মনোযোগ দেওয়ার অবকাশ থাকে না। সে তখন আবিষ্কারে ব্যস্ত থাকে, চলার মধ্যেই থাকে। কিন্তু যখন গতি থেমে যায়, তখন সে নিজের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়, নিজের দিকে তাকায়। তখনই সে নাটক, শিল্প, কবিতা, গান, এসবের দিকে ধাবিত হয়, ও প্রকৃত গন্তব্য হারিয়ে ফেলে।” স্যার উদাহরণ দিয়ে বলেন: “পাখি যখন আকাশে উড়ে চলে, তার দৃষ্টি থাকে গন্তব্যে, গতি থাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ। সে তখন উড়ে চলে দিগন্তের দিকে। কিন্তু যখন সে পানির ধারে নামে, গতি কমিয়ে দেয়, তখন সে চারপাশের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়, পানির ঢেউ, গাছের ডাল, রোদের ঝিলিক, সবকিছুর মধ্যে সে সৌন্দর্য খুঁজে পায় এবং নাচতে থাকে, গানে মেতে ওঠে।” পাখির এই উপমা দিয়ে স্যার ব্যাখ্যা করেন, জীবনের ‘গতি’ হলো, লক্ষ্যভিত্তিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন, যেখানে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে অগ্রসর হয়। গতির সাথে থাকে, তার মনোযোগ থাকে গন্তব্যে, তার সময় ও শক্তি ব্যয় হয় আবিষ্কারে ও অগ্রগতিতে। কিন্তু যখন এই গতি থেমে যায়, তখন সে নিজের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বসে পড়ে, জীবনের মূল গন্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।

🎤 ২২০

ভাই আব্দুল কাইয়্যুম বলেন, একবার রমজান মাসে স্যার মাদানীনগর মাদ্রাসার মসজিদে ই‘তিকাফে ছিলেন। স্যারের ই‘তিকাফের সাথী হিসেবে প্রাথমিকভাবে একটি জামাত আগে থেকেই স্যারের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। স্যারের ই‘তিকাফের জামাতে সাথীর সংখ্যা দাঁড়ায় আনুমানিক ১৯ জন। আমি (ভাই কাইয়্যুম) এবং ভাই মতিয়ার পরে এসে শেষের দিকে ই‘তিকাফে স্যারের সাথে শরিক হই। ই‘তিকাফ শেষে ঢাকায় ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ চলছিল। এ সময় স্যার স্থানীয় এক ভাইয়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, “উনি আমাদেরকে দাওয়াত করেছেন। তোমরা যেহেতু তখন উপস্থিত ছিলে না, আমরা উনার সঙ্গে ১৯ জনের হিসেবেই কথা বলেছি। এখন দু’টি পথ এক, তোমরা আমাদের সঙ্গেই বের হলে, তবে আমরা বাসায় ভেতরে প্রবেশ করবো আর তোমরা বাইরে অপেক্ষা করবে। আমরা খাওয়া দাওয়া শেষ করলে একসাথে ঢাকায় ফিরবো। দুই, তোমরা চাইলে এখান থেকেই আলাদাভাবে ঢাকায় ফিরে যেতে পারো।” স্যারের এই কথার মধ্যে ছিল এক সূক্ষ্ম সৌজন্যবোধ, ভদ্রতা ও মেহমানদারির উসূল শেখানোর চেষ্টা। তিনি চাচ্ছিলেন যেন নিমন্ত্রণকারীর আতিথেয়তায় কোনো রকম চাপ বা অস্বস্তি সৃষ্টি না হয়। এমন সময় ঐ মেজবান ভাই শুনেছেন যে আমরা দুইজন অতিরিক্ত আছি, নিজেই এগিয়ে এসে স্যারকে বললেন, “স্যার, সাথী যদি বেশি হয় তাতে কোনো সমস্যা নেই। ২০-২৫ জন হলেও অসুবিধা হবে না।” পরে সবাই একসঙ্গেই স্যারের সাথে ঢাকায় ফিরে আসা হয়।

🎤 ২২১

হজযাত্রীদের উদ্দেশ্যে এক মোজাকারায় স্যার বলেছিলেন, সব আমলেই মূল উদ্দেশ্য হলো: মানুষের মনকে পার্থিব সকল চিন্তা ও সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে একমাত্র আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করানো। নামাযের শুরু হয় তাকবীরে তাহরীমা দিয়ে। এ তাকবীর এমন এক ঘোষণা, যা সমস্ত পার্থিব সম্পর্ক ও কাজকে 'হারাম' বা নিষিদ্ধ করে দেয়। নামায শুরুর মুহূর্তেই মানুষ দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেকে সরে এসে শুধুমাত্র আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, এ যেন একান্তে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার সুযোগ। স্যার ব্যাখ্যা করেন, নামায যেভাবে এই উদ্দেশ্য বাস্তব করে তোলে, হজ্বও একই সাধনারই এক বৃহৎ সংস্করণ। হজ্বেও রয়েছে এই একই বাস্তবতা, এখানেও শুরু হয় ইহরাম দিয়ে। এই ‘ইহরাম’ শব্দটি এবং ‘তাকবীরে তাহরীমা’ উভয়ই এসেছে মূল আরবি শব্দ ‘হারাম’ থেকে, যার অর্থ ‘নিষিদ্ধ’। অর্থাৎ, হজ্ব শুরু করার সাথেই যেমন কিছু কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায়, তেমনি চিন্তা ভাবনার দিক থেকেও এক ধরণের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। মনের সমস্ত দিক যেন এক আল্লাহর দিকে ঘুরে পড়ে। এ এক বাস্তব হাশরের অনুশীলন, যেখানে মানুষ কারও দিকে খেয়াল রাখে না, শুধু আল্লাহ, শুধুই শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টি! স্যার বলেন, “তাকবীরে তাহরীমা বলার সাথে সাথে কি সব দুনিয়াদার চিন্তা এক মুহূর্তেই চলে যায়? তা তো হয় না! নামাযে দাঁড়ানোর পরও নানা খেয়াল চলে আসে, মন এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়।” তাই হজ্বের প্রস্তুতিও এমন হওয়া উচিত যেন মনকে ধীরে ধীরে প্রশিক্ষিত করা যায়। স্যারের ভাষায়, “এজন্য পূর্ব থেকেই ফিকির করতে হবে, আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে, চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে যেন হজ্বের সময় অন্য কোনো খেয়াল না আসে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, ফিকাহ্ ও মাসায়েলের সাথে সাথে হজ্বের ফযীলতের অংশগুলোও বারবার করে পড়তে হবে। কারণ এই ফযীলতগুলো পড়লে অন্তরে হজের মাহাত্ম্য ও তলব সৃষ্টি হবে। দুনিয়াবী চাহিদা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে, একমাত্র আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জনের তলব বাড়তে থাকবে।

🎤 ২২২

হজযাত্রীদের সাথে মোজাকারায় স্যার বলেন, হাশরের ময়দানে মানুষ উলঙ্গ অবস্থায় পুনরুত্থিত হবে। উম্মুল মু’মিনীন আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “সব মানুষ যখন উলঙ্গ থাকবে, তখন পরস্পরের প্রতি লজ্জা হবে না?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন, “সেদিন মানুষের অবস্থা এত ভয়াবহ ও দুশ্চিন্তাময় হবে যে, কারো চোখ অন্য কারো দিকে পড়ার অবকাশই থাকবে না।” স্যার বলেন, হজ্বের ইহরামের অবস্থা মূলত সেই হাশরের ময়দানেরই একটি অনুশীলন। ইহরামের কাপড় একটি প্রতীক মাত্র। বাস্তবে, এই অবস্থার উদ্দেশ্য হলো দুনিয়ার সব পরিচয় ও সম্মান পরিত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো। ইহরামের কাপড়ে মাথা খালি রাখার বিধানটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দুনিয়ার সমাজে মাথার পোষাক সম্মানের প্রতীক। রাজার মুকুট, আলেমদের পাগড়ি, এসব কিছুই মানুষের মর্যাদা ও পরিচয় বহন করে। অথচ ইহরামে সেই সম্মান পরিচয়ের প্রতীকটিও তুলে ফেলা হয়। যেন বুঝিয়ে দেওয়া হয়, এখন সে ব্যক্তি দুনিয়ার নয়, হাশরের বাস্তবতার ভেতর প্রবেশ করেছে, যেখানে সম্মান, পরিচয়, পদ পদবি সব কিছুই মূল্যহীন। অন্য সময়ে নামাযের মধ্যে মাথা খালি রাখা আদবের পরিপন্থী ধরা হয়, এবং মসজিদগুলোতে নামাযের সময় টুপি রাখা হয় যাতে মাথা ঢেকে নামায পড়া যায়। কিন্তু ইহরামের সময় উল্টো, সেখানে মাথা খালি রাখা ইবাদতেরই অংশ। স্যার বলেন, এই পুরো হজ্বের সফর যেন হাশরের ময়দানের ধ্যানে ও একাগ্রতায় কাটে, এটাই হওয়া উচিত। অন্য সব চিন্তা থেকে মুক্ত থেকে, দুনিয়ার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে একমাত্র আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকা, অন্য কোন খেয়াল নয়, এক খেয়ালের মধ্যে, এক ধ্যানের মধ্যে সম্পূর্ণ সময় কাটানো। তবে এটি কেবল কথায় সম্ভব নয়; একাগ্রতা ও ধ্যান এমন জিনিস নয় যা শুধু মুখে বললেই অর্জিত হয়। এর জন্য চাই পূর্ব প্রস্তুতি, অভ্যাস, নিয়মিত ফিকির ও মুজাহাদা (অভ্যন্তরীণ সাধনা)। দোয়া, আমল, মাসায়েল শেখা, ফাযায়েলের তালিম, এসবের মাধ্যমে নিজের মনকে তৈরি করতে হয়, যেন সম্পূর্ণ সময়টুকু দুনিয়ার কোন ফিকির কোন চিন্তা ভাবনা অন্তরে না রেখে আল্লাহ পাকের স্মরণে মগ্ন থাকা যায়।

🎤 ২২৩

স্যারের শেষ হজ্জের সফর, ১২/১৩ জন, তিন চারটি এজেন্সির মাধ্যমে হজ্জে যাওয়া, একত্রে স্যারের সাথে পায়দল রওনা দেই আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশ্যে। লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢলে আমরাও চলছি এক দিকেই, আরাফাতের দিকে। সকাল গড়িয়ে গেছে, রৌদ্র উঠেছে, সেই রৌদ্রের প্রখর তাপে প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝে পায়ে হেঁটে চলেছিলাম। অনেক সফরেই স্যারের সাথে পায়ে হেঁটেছি, কিন্তু সেদিনের এই হাটার সফর ছিলো একেবারে আলাদা। অন্যান্য সফরে স্যার ডানে বামে তাকিয়ে সাথীদের খোঁজ রাখতেন, কথা বলতেন, কথা শুনতেন। কিন্তু আজ, এই সফরে স্যার একেবারে নীরব, যেন তিনি কারও সাথেই নেই, শুধু চলছেন, নিশ্চুপ, একটানা। যারা সাথে ছিলাম কারও দিকেই স্যারের বিশেষ কোনো খেয়াল নেই। মনে হচ্ছিল, স্যারের জানাই নেই, তিনি একা নন। হয়তো স্যারের মন সেদিন অন্য কোথাও, এক ফকিরের মতো এক গভীর ভাবনায় নিমগ্ন, মনে হচ্ছিল যেন এক অদৃশ্য চিন্তা স্যারকে আপন করে নিয়েছে, ভুলিয়ে রেখেছে দুনিয়ার সবকিছু। এক ভাই স্যারের মাথার উপর ছাতা ধরলেন, রোদের তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য। রোদের প্রচণ্ড তাপ থেকে একটু যেন রক্ষা করা যায়, এই আশায়। স্যার কোনো প্রতিক্রিয়া দিলেন না, তাকালেন না, বললেনও না কিছু। নীরবে হেঁটে চলেছেন, যেন দুনিয়ার কোনো কিছু দৃষ্টিতে পড়ছে না। স্যারের দীর্ঘ কদমে ঐ ছাতা ধরে থাকা ভাই তাল মিলিয়ে চলতে না পেরে এক সময় ছাতা নামিয়ে ফেললেন। এরই মধ্যে আরেক ভাই স্যারের মাথায় একটা ছোট্ট ছাতি (ক্যাপের মতো ছাতা) লাগিয়ে দিলেন, হাতে ধরে রাখতে হয় না, ইলাস্টিক ব্যান্ডে মাথায় আটকানো থাকে। কপালের ওপর দিয়ে ইলাস্টিকটা স্যারের মাথায় আটকে দিলেন, যাতে স্যার রোদের তাপে কষ্ট না পান। স্যার কিছু বললেন না। নাড়া চাড়া করলেন না। সেই নীরব ভাব আর গভীর চিন্তার জগতেই, চলেছেন নিশ্চুপ। প্রখর রৌদ্রের মধ্যে চলতে চলতে সাথীরা ক্লান্ত, কিছু সময়ের জন্য একটু বিশ্রাম নিলে ভাল হয়, স্যারের দিকে তাকিয়ে চলছি সব সাথি, কেউ কিছু স্যারকে বলছে না, সেই সফর, সেই মুহূর্ত একেবারে অন্যরকম। পথ চলতে চলতে রোদের তাপে ও ভিড়ের চাপে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল, সাথীরা একটু বসে বিশ্রাম নিতে চাইছিল। কেউ স্যারের কাছে সে প্রস্তাব করলে শুধু বললেন, “আগে যাই”, স্যারের চলা থামলো না। আরও কিছুদূর যাওয়ার পর সাথীরা আবারও অনুরোধ করল যেন একটু বসে নেয়া যায়। এবার স্যার একটু বসলেন বটে, কিন্তু মাত্র দুই তিন মিনিট। তারপর আবার উঠে দাঁড়ালেন, চলতে শুরু করলেন, একই ছন্দে, একই নীরবতায়। যেন কারো ক্লান্তির কথা স্যারের মনে নেই। আরাফার ময়দানে তাবু পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত স্যার একই ভাবেই ঐ একই অজানা ফিকিরে, একই ভঙ্গিতে হাঁটলেন, নিশ্চুপ, নিরবিচারে। পথচলার পুরোটা সময় তেমন কথা নেই, কারো দিকে তাকানো নেই, চলছেন তো চলছেনই। স্যারের চোখে মুখে ছিল না কোনো ক্লান্তির ছাপ, আবার ছিল না কোনো উত্তেজনার প্রকাশও। মনে হচ্ছিল, স্যার যেন আরাফার ময়দানের আগে থেকেই “আরাফা”র আসল তাৎপর্যে, নিজেকে ভুলে একান্তভাবে আল্লাহ পাকের সামনে উপস্থিত হবার প্রস্তুতিতে। সেদিনের পথচলার সাথীরা শুধু তাকিয়ে ছিলাম, স্যারের পদচারণায় দিকে, এই দৃশ্যের বর্ণনার ভাষা নেই, শুধু উপলব্ধি, যা লিখে বোঝানো যায় না।

🎤 ২২৪

মিনায় অবস্থানকালে একবার এক সাথী বিভিন্ন গাড়ি থেকে বিতরণকৃত ফ্রি খাবারের একটি প্যাকেট থেকে একটি ফলের জুস স্যারের সামনে পরিবেশন করেন। তখন স্যার বললেন: “যেখানে জমজম মওজুদ, সেখানে এইসব রদ্দি (অপ্রয়োজনীয় ও নিম্নমানের) জিনিস কেন খাব?” মক্কা ও মদীনায় অবস্থানকালে স্যার সাধারণত জমজম ব্যতীত অন্য কোনো পানি, বোতলজাত মিনারেল ওয়াটার বা পানীয়জাত কিছু গ্রহণ করতেন না। এমনকি জমজম পাশে থাকলে ফল থেকে তৈরি জুসও প্রস্তাব করা হলে তিনি তা গ্রহণ না করে জমজমকেই অগ্রাধিকার দিতেন। জমজমের উপস্থিতিতে অন্য যেকোনো পানীয় পান করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকতেন। তবে হজের সফরে স্যার ফল হিসেবে মালটা খেতে পছন্দ করতেন। মালটা কেটে সামনে পরিবেশন করা হলে তিনি তা পছন্দ করে খেতেন।

🎤 ২২৫

মক্কার বাসায় পৌঁছার পর সাথীদের মধ্যে আলোচনা চলছিল, “কাবা শরীফ প্রথম দর্শনে কী দোয়া করা উচিত?” সাথীদের এই কথাবার্তার শেষে স্যার কিছু মোজাকারা করেন। স্যার বলেন: ইবাদতের মাধ্যমে দোয়ার মধ্যে কবুলিয়াত সৃষ্টি হয়। আর ঈমানের মাধ্যমে এই অনুভূতি জাগে, আমি কী চাইব, কী চাওয়া দরকার, কী চাওয়া উচিত। ইবাদতের মাধ্যমে দোয়ার মধ্যে কবুলিয়াত সৃষ্টি হয়। যখন একজন বান্দা আন্তরিকতার সঙ্গে ইবাদত করে, নামাজ, রোজা, তিলাওয়াত, জিকির ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের মন-প্রাণকে পরিশুদ্ধ করে তখন তার দোয়ায় এক ধরনের ওজন ও গ্রহণযোগ্যতা (কবুলিয়াত) সৃষ্টি হয়। ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়, ফলে তার দোয়াও আল্লাহর কাছে অধিক গৃহীত হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে। আর ঈমানের মাধ্যমে এই অনুভূতি জাগে, আমি কী চাইব, কী চাওয়া দরকার। একজন মুমিন শুধু ইবাদত করে আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং তার ঈমান তাকে এই সচেতনতা ও অনুভূতি জাগিয়ে তোলে যে, আমি আসলে কী চাইছি? আল্লাহর কাছে কোন দোয়াগুলো করা উচিত? আমার চাওয়া কি দুনিয়াদারী, না আখিরাতনির্ভর? ঈমান একজন মুমিনকে শেখায়, কী দোয়া করা উচিত, কী তার মূল চাহিদা হওয়া উচিত। স্যার খুব জোর দিয়ে বুঝাতে চাইছিলেন শুধু চাওয়া নয়, কী চাওয়া উচিত সেটা জানা আগে জরুরি। স্যার বলেন, শয়তানের দোয়াও কবুল হয়েছে। তার ইবাদত, তার একাগ্রতা তার দোয়াকে আল্লাহর দরবারে কবুল করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সে তো হয়েছে ইবলিস, বিতাড়িত। শুধু দোয়া কবুল করানোই যথেষ্ট নয়; বরং আগে শিখতে হবে, ‘আমি কী চাইছি?’ এই চাওয়ার শিক্ষাই আসল। স্যার আরও বলেন, মানুষ কী চাইছে, তার দোয়াতেই তা প্রকাশ পায়। দোয়াই তার অন্তরের চাহিদার প্রতিচ্ছবি। এক ভাই স্যারের কাছে জানতে চান, স্যার, তাহলে আমরা কী দোয়া করব? স্যার উত্তর দেন: এইটা শিখতেই তো আমরা এখানে এসেছি! দোয়া শেখা, অন্তরের চাহিদা গঠন করা, চাইতে জানা, অন্তরের চাওয়াই শেখা, আমার আসল প্রয়োজন কোনটা।

🎤 ২২৬

স্যার বলতেন, আসল দোয়া হলো অন্তরের চাওয়া, অন্তরের গভীর আগ্রহ, চাহিদা, আকাঙ্ক্ষাটাই দোয়া। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে বহু চাওয়া পূর্ণ হচ্ছে, মানে আমাদের বহু দোয়াই কবুল হচ্ছে। কিন্তু এই কবুল হওয়া আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? স্যার বলতেন, দোয়া কবুল হওয়াটাই আসল না, বরং কী চাইছি, কেন চাইছি, এই চাওয়ার বিশুদ্ধতা ও মানটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মেহনত হওয়া উচিত এই চাওয়ার মান বাড়ানো নিয়ে। চাওয়ার ময়দানে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি এটাকে বুঝবার জন্য স্যার আব্দুল ওয়াহাব সাহেবের এক কথাকে উল্লেখ করে বলেন, একবার ইজতেমার দোয়ার পরদিন আব্দুল ওয়াহাব সাহেব বলেন, গতকাল ইজতেমায় যতদূর চোখ যায় শুধু লোক আর লোক। কিন্তু এরা অধিকাংশই এসেছে নিজের ধান্দায়, চাকরি, ব্যবসা, জমি ইত্যাদি উন্নতির জন্য। আল্লাহর জন্য নয়। স্যার এই প্রসঙ্গে আব্দুল ওয়াহাব সাহেবের আরেকটি কথা বলতেন, “কেউ মারা গেলে প্রতিবেশীরা এসে কাঁদে, কিন্তু সে কাঁদে আসলে নিজের বাপের কথা মনে করে। মৃতের জন্য কাঁদে না।” আমাদের নামাজ, রোজা, তাওয়াফ, সাদকা, কান্না, সবই না হয়ে যায় দুনিয়ার জন্য, শুধুই পার্থিব স্বার্থে। আল্লাহর জন্য কাঁদা, আল্লাহর মহব্বত চাওয়া, আখেরাত সাজানোর জন্য চাওয়া, আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জন এইগুলো আমার চাহিদা হয়। এক ওলি আল্লাহর কথা স্যার বলেন, তার কাছে তাঁর এক নেককার বন্ধু এসে বললেন, “তোমার আশপাশে কত মুরিদ, কত লোকজন, কত ভিড়! ভালোই তো লাগছে!” তিনি জবাব দিলেন: “না দোস্ত! আমি যে ভাণ্ডার নিয়ে বসে আছি, সেটা নেওয়ার মতো লোক নেই। এরা সবাই নিজের ধান্দায় এসেছে, তারা তো ইমান এখলাস তকওয়া আখলাক শেখার জন্য না, নিজ নিজ চাহিদা পাস করাতে এসেছে। স্যার বলেন, চাওয়া শুদ্ধ করাই দোয়ার মূল মেহনত। দোয়ার কবুল হওয়া মানেই সফলতা নয়, ইবলিস তার মকবুল দোয়া দিয়ে আরও মরদুদ (বিতাড়িত, প্রত্যাখ্যাত) হয়েছে। স্যার বলেন, কী চাইছি, সেটাই মুখ্য। আমাদের প্রতিদিনের দোয়া, ইবাদত, কান্না, এসব যেন কেবল নিজের লাভ-ক্ষতির হিসাবই শুধু না হয়ে থাকে। আমাদের হৃদয় যেন আল্লাহর জন্য তলবওয়ালা হয়, দোয়া যেন আল্লাহর রেজার দিকে মোড় নেয়।

🎤 ২২৭

হজের এক সফরের শুরুতে জামাতের সাথী এক ভাই স্যারকে জিজ্ঞাসা করেন, স্যার, হজের দোয়া কী (তাওয়াফ সাফা মারওয়া মিনা আরাফাত মুজদালিফা ইত্যাদিতে কি দোয়া পড়তে হয়)? উত্তরে স্যার বললেন, হজের কোনো দোয়া নাই। স্যার, হজ তো দোয়ারই জায়গা, দোয়া নাই, এটা কীভাবে? স্যার বুঝাতে চাচ্ছিলেন, হজ অবশ্যই দোয়ারই জায়গা। কিন্তু যদি মানুষ ‘দোয়া পড়া’র চক্করে পড়ে যায়, তাহলে দোয়া আর ‘হবে’ না। সে দোয়া পড়বে, দোয়া ‘করবে’ না। হজের ময়দানগুলো, আরাফাত, মুযদালিফা, মিনা, তাওয়াফ, সায়ী এসব তো দোয়ারই ময়দান। এখানে মুখস্থ কিছু দোয়া পড়ে গেলেই দায় সারা হয় না। বরং এখানে অন্তরের গভীর থেকে আত্মনিবেদন, কান্না, অনুতাপ আর আশা নিয়ে আল্লাহর দরবারে নিজেকে পেশ করবে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির আশায়। স্যার আরো বুঝালেন: দোয়ার ‘তেলাওয়াত’ এক জিনিস আর দোয়া করা আরেক জিনিস। মোবারক এই জায়গাগুলোতো দোয়া তেলাওয়াত করার জায়গা না, এগুলো দোয়া ‘করার’ জায়গা। এখানে মুখস্থ কিছু আরবী শব্দ পড়াটাই শুধু না, বরং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার, নিজেদের অন্তর খুলে বলার জায়গা এগুলো। স্যার আরো স্পষ্ট করেন, যদি কারো অন্তর গরু-ছাগল, চাকরি-বাণিজ্য, দুনিয়ার চিন্তায় ভরা থাকে, তাহলে সে নির্দিষ্ট কিছু দোয়া পড়লেও আসল দোয়া তো ওর চাকরি বাবসাই। দোয়া শুধু মুখে কিছু আরবী শব্দ পড়া নয়, বরং অন্তরের গভীর অবস্থার প্রকাশ। দুনিয়ার আকর্ষণ ও ব্যস্ততা যদি অন্তর ভরে রাখে, কিছু দোয়া তেলাওয়াত করবে ঠিকই কিন্তু সে অন্তর থেকে খাঁটি দোয়া বের হওয়া কঠিন।

🎤 ২২৮

এক বয়ানে স্যার তওবা ও ইস্তেগফারের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক উদাহরণ দেন। স্যার বলেন: একজন মহিলা রান্না করছিলেন। পাশেই তাঁর ছোট্ট সন্তান ছিল। তিনি একটু পানি আনতে বাইরে গেলেন। ফিরে এসে দেখলেন, তাঁর সেই অবুঝ শিশুটি চুলার ভেতরে পড়ে গিয়ে পুড়ে মারা গেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা একজন মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ হয়ে থাকবে। তিনি যতবার ঘটনাটি স্মরণ করবেন, ততবার তাঁর হৃদয়ে অনুশোচনার আগুন জ্বলবে, চোখে পানি আসবে, অন্তর কাঁপবে। স্যার বললেন: এই অন্তরের জ্বালা, এই অশ্রু, এই অনুশোচনা, এটাই ‘ইস্তেগফার’। ইস্তেগফার মানে শুধু মুখে “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা নয়, বরং এমন গভীর অনুতাপ, যা হৃদয় থেকে আসে, যা ভুলের স্মরণে বারবার দগ্ধ করে, কাঁদিয়ে তোলে। স্যার এরপর বলেন: আর ওই নারী যদি এই ঘটনার পর নিজের অন্তরে দৃঢ় সংকল্প করে নেন, “আমি জীবনে আর কখনোই আমার কোনও শিশুকে একা রেখে আগুনের কাছে যাব না”, তাহলে এই সিদ্ধান্ত, এই প্রতিজ্ঞা হলো ‘তওবা’। এই উদাহরণের মাধ্যমে স্যার বুঝিয়েছেন, ইস্তেগফার কেবল মুখের কথা নয়, হৃদয়ের কান্না, যখন অন্তর কাঁদে, তা হয় ইস্তেগফার। আর তওবা কেবল একবারের নয়, বরং একটি পরিবর্তিত জীবনের সিদ্ধান্ত, যখন জীবন বদলায়, তা হয় তওবা।

🎤 ২২৯

স্যার ও কাজল ভাই ওই সময় জুবেরী ভবনে একই রুমে থাকতেন। শের-ই-বাংলা হলের এক ভাই, ভাই রানা একদিন কাজল ভাইকে খুবই লাজুক ভঙ্গিতে অনুরোধ করলেন যেন তিনি স্যারের মাধ্যমে তাঁর পিতাকে এক বিষয়ে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। ভাই রানার মনবাসনা ছিল, একটি মেয়েকে তিনি বিয়ে করতে চান, যাকে তিনি দ্বীনি ও দুনিয়াবি দিক থেকে উপযুক্ত মনে করেন। মেয়ের মা ও রানার মা দুজনেই এতে সম্মত ছিলেন। সমস্যা একমাত্র তাঁর পিতা, তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অনড়, কোনো কথাই শুনতে চান না, এই বিয়েতে কোনো ভাবেই উনার মত নাই। কিন্তু ভাই রানা স্যারের বহু বয়ান শুনে এ বিশ্বাস পোষণ করতেন যে, স্যার যদি তাঁর পিতাকে একটু বলেন, তবে তিনি হয়তো মন গলিয়ে রাজি হয়ে যাবেন। তবে সরাসরি স্যারের কাছে গিয়ে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করার সাহস তিনি করতে পারছিলেন না। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে কাজল ভাইয়ের কাছে বললেন, “স্যারকে কি বলা যায় এই কথা? স্যার কি আমার পিতাকে এই বেপারে বলবেন?” কাজল ভাই শুরুতে সহজভাবেই বলে ফেললেন, “আরে, এটা তো কোনো ব্যাপার না! স্যার নিশ্চয়ই বলবেন।” কিন্তু কথাটা বলার পর পরই কাজল ভাইয়ের মনে এক ধরণের দ্বিধা ও সংকোচ জেগে উঠলো, স্যারের অনুমতি না নিয়ে এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া কি ঠিক হলো? অবশেষে লজ্জা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজল ভাই স্যারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরলেন। স্যার শুনে বললেন, “তুমি তাকে (রানা) কি বলেছো?” কাজল ভাই বললেন, “বলেছি যে, স্যারকে বলবো, ইনশাআল্লাহ স্যার রাজি হবেন।” স্যার শান্তভাবে বললেন, “ঠিক আছে।” এই উত্তর পেয়ে ভাই রানা খুব খুশি হলেন। তিনি জানিয়ে দিলেন, কবে স্যারকে তাঁর পিতার সঙ্গে দেখা করতে হবে, তারিখ ঠিক হলো। কাজল ভাই ধারণা করেছিলেন রানার বাড়ি রাজশাহীর আশেপাশে কোথাও হবে, কিন্তু পরে জানলেন সেটা কুষ্টিয়া, এবং তা-ও আবার শহর থেকে অনেক দূরে, গ্রামের একেবারে ভেতরে। এত দূরে যাওয়ার কথা ভেবে কিছুটা অস্বস্তি জন্ম নিলেও, স্যার এটাও সহজভাবেই নিলেন। সোমবার, সেদিন স্যার রোজা ছিলেন, রাজশাহী থেকে ট্রেনে চেপে বেলা ২ টায় কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা হলো। কুষ্টিয়া শহরে পৌঁছে দেখা গেল, গ্রামের পথ খুবই ভাঙাচোরা, গাড়িতে চলতেও কষ্ট হচ্ছিল। মাগরিবের পর ভাই রানার বাড়িতে পৌঁছলেন। ইফতার পথেই করে নিয়েছিলেন। সেদিন রাতে কোনো আলোচনা না হয়ে শুধু খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ্রামে। সকালে নাশতার সময় স্যার রানাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার আব্বা কোথায়? ডাকো, একসাথে খাই।” আব্বা আসলে নাশতার ফাঁকে স্যার শুধু জিজ্ঞেস করলেন, “ছেলে তো বড়ই হয়ে গেলো, বিয়ের ব্যাপারে কী চিন্তা করছেন?” এতটুকুই। অত্যন্ত অবাক করা বিষয়, যে পিতা সম্পর্কে ভাই রানা বলেছিলেন, তিনি কিছুতেই রাজি নন, সেই পিতা উত্তরে বললেন, “স্যার, আপনি যেটা বলবেন তাই হবে।” এ যেন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে স্যারের প্রতি এক অনুগ্রহ ও কুদরত! কথাবার্তা পাকা হলো, রানার পিতা বললেন, ছেলের মা তো আগেই রাজি। স্যার বললেন, “তাহলে দেরি কিসের?” নাশটা করতে করতেই মেয়ের বাড়িতে খবর পাঠানো হলো। নাশতার পরই স্যার ও কাজল ভাই মেয়ের বাড়িতে গেলেন। আশ্চর্যের বিষয়, মেয়ের পিতা তাবলিগে সময় লাগানো এক পুরনো সাথী ছিলেন। স্যারের নাম তিনি আগেই জানতেন। যখন শুনলেন মুশফিক স্যার স্বয়ং তাঁদের বাড়িতে এসেছেন, তিনি আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়েন। কোথায় বসাবেন, কিভাবে আপ্যায়ন করবেন, এই নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সে দিনই বিয়ের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হলো। স্যার নিজেই বিয়ে পড়ালেন। ফেরার পথে স্যার আনন্দভরে কাজল ভাইকে বললেন: "দুনিয়াতে যে কত রকমের নেক আমল আছে, আমরা কল্পনাও করতে পারি না। আজ আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন একটি নেক আমল করার তাওফিক দিলেন, যেটা আগে চিন্তায়ও আসেনি।" (এক ছাত্রের লজ্জাশীলতা, হালাল চাহিদার প্রতি আন্তরিকতা, স্যারের দায়িত্ববোধ, ছাত্রের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে স্যারের এমন আন্তরিক অংশগ্রহণ, রোজা অবস্থায় দীর্ঘ কষ্টসাধ্য সফর করা, সবই ছিল নিছক আল্লাহর জন্য। এক নীরব শিক্ষা, কেবল মিম্বার-মসজিদেই নয়, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সহজ নেক আমলগুলোর মধ্য দিয়েও হয়ে উঠতে পারে এক বরকতময় ইবাদত।)

🎤 ২৩০

বর্তমান সময়ের হজ ও ওমরাহর ক্ষেত্রে তানইম থেকে বারবার ওমরাহ করার আমলের বিরুদ্ধে এক সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি স্যার বজায় রাখতেন। হজ বা ওমরার সফরে স্যার কখনও নিজে তানইম থেকে ইহরাম বেঁধে অতিরিক্ত ওমরাহ করেননি। এমনকি কোনো সফরে সাথীদের মধ্যেও অতিরিক্ত ওমরাহ করার জন্য তানইম যাওয়ার বিষয়ে তরগীব বা আলোচনা করেননি। তবে যদি কেউ আগ্রহবশত তানইম থেকে ওমরাহ করতেন, স্যার তাঁদের বারণও করতেন না, নিরুৎসাহও করতেন না। তাঁদের কারগুজারী শুনে নিতেন, কিন্তু নিজে সেই পথে আগ্রহ প্রকাশ করতেন না, বরং নীরব থাকতেন। একবার এমন একটি সফরে, যেখানে হজ ও ওমরাহর ভিসায় মক্কা ও মদিনার বাইরে কোথাও যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল, এমনকি তায়েফেও যাওয়া যেত না, তখন সফর-সাথীদের অনেকের ইচ্ছা ছিল হজের পরে অন্তত একটি অতিরিক্ত ওমরাহ করার। স্যার তখন ব্যতিক্রমভাবে একটি চেষ্টা করেছিলেন, সফরের সৌদি মুয়াল্লিম অফিসে একটি আবেদনপত্র লেখেন যাতে করে ফেরার রুট মদিনা থেকে সরাসরি জেদ্দা না হয়ে মক্কা হয়ে হয়, যাতে সাথীরা মক্কায় এক রাত থেকে একটি অতিরিক্ত ওমরাহ আদায় করতে পারেন। স্যার সে চিঠিতে আরবী ভাষায় সংবেদনশীল ও বিনীতভাবে লিখেন, বাংলাদেশের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ জীবনে একবারই হজ বা ওমরাহ করতে পারেন, দূরত্ব ও খরচের কারণে বারবার আসা সম্ভব হয় না। তাদের এই একবারের সফরে যদি একটি অতিরিক্ত ওমরাহর সুযোগ হয়, তা বড় সৌভাগ্যের বিষয় হবে। চিঠি ছিল আন্তরিক ও মুয়াল্লিম অফিসের মর্যাদা রক্ষা করে রচিত, কিন্তু তবুও সৌদি অফিস পূর্বনির্ধারিত রুটের বাইরে কিছু পরিবর্তন করতে রাজি হয়নি। ফলে অতিরিক্ত ওমরাহর সেই চেষ্টা সফল হয়নি। কিন্তু তাও স্যার তানইম থেকে ওমরাহ করার কোনো তরগীব দেননি, নিজেও তানইম গিয়ে ওমরাহ করেননি। যদিও সফরের দু একজন নিজের আগ্রহে গিয়ে তানইম থেকে ইহরাম নিয়ে ওমরাহ করে আসেন। একই সফরে একাধিক ওমরাহ করা সুন্নত নয় এবং এটি বাড়াবাড়ির কারণ হতে পারে; বা সৎ উদ্দেশ্য থাকলেও সুন্নতের সীমা অতিক্রম করে আমল করলে তাতে বরকতের বদলে বাড়াবাড়ি চলে আসতে পারে; অথবা সাহাবায়ে কিরাম হজ বা উমরাহ করে মক্কায় থেকে বারবার উমরাহ করতেন না; বা যেকোনো কারনেই হোক, স্যার নিজে কখনও মসজিদে আয়েশা থেকে ইহরাম করে অতিরিক্ত ওমরা করেননি। তবে স্যার কখনও এটাকে নাজায়েয বা নিষিদ্ধ বলেননি, এবং পুরুষদের জন্য আলাদা কোনো বাধা বা নিষেধ হিসেবেও উল্লেখ করেননি। কেউ করতে চাইলে নিষেধ বা নিরুৎসাহ ও করেননি। স্যারের এই নিঃশব্দ অবস্থান আমাদের জানায়, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাদের আমল ছিল না, তা ‘ইবাদতের লোভে’ অহেতুক না বাড়িয়ে দীনের আমলে পরিমিতবোধের মধ্যে থাকা ভালো।

🎤 ২৩১

হজরত মাওলানা লুৎফর রহমান সাহেব রহমতুল্লাহ এর সাথে স্যারের গভীর হৃদ্যতা ছিল। তিনি স্যারকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং সুযোগ পেলে নিজামুদ্দিন মারকাযের মূল্যবান অভিজ্ঞতা শোনাতেন। স্যারের প্রতি উনার ভালোবাসা ও আস্থা এতটাই গভীর ছিল যে, অনেক অন্তরঙ্গ কথা তিনি সরলতার সাথে বলে যেতেন। একবার স্যার বলছিলেন: “মাওলানা সাহেব একদিন বলছিলেন, একসময় নিজামুদ্দিন মারকাযে জামাত বিদায়ের আগে তিনি হেদায়েতের কথা বলছিলেন। কথা হয়ে গেছে, মজমার পরিবেশ শান্ত ও গভীর, জামাত প্রস্তুত, দোয়ার জন্য সকলেই অপেক্ষমাণ, হজরতজি এসে দোয়া করবেন। এরই মধ্যে হজরতজি রহমতুল্লাহি আলাইহি দোয়ার জন্য চলে এসেছেন, মিম্বারের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন, মেম্বারে বসবেন। হজরতজিকে আসতে দেখে তিনি মজমার উদ্দেশ্যে বললেন-- ‘হজরতজি চলে এসেছেন, আপনারা বসে পড়ুন’: “آپ بیٹھ جاؤ” (আপনারা বসে পড়ুন) উর্দু ভাষায় এ তো খুব সাধারণ একটি শব্দ, কিন্তু হয়তো ঠিক এখানেই লুকিয়ে ছিল দাওয়াত ও তাবলিগের সেই সূক্ষ্ম আদব, যা সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না। হজরতজি রহমতুল্লাহ মিম্বারে বসেই খুব কোমল অথচ গভীর অর্থপূর্ণ কণ্ঠে বললেন: “ہم نے حکم دینا سیکھا، دعوت دینا نہیں سیکھا۔” “আমরা আদেশ করতে শিখেছি, দাওয়াত দিতে শিখিনি।” এই একটি বাক্যে যেন তিনি বলে দিলেন, দাওয়াতের কাজ কেবল বক্তব্য বা পরিকল্পনার নাম নয়, এটি একটি নফস ভাঙার ও ভাষা কোমল করার সাধনা। এমনকি “বসুন” বলার মধ্যেও যেন আদবের পরিপূর্ণতা থাকে, হুকুম নয়, অনুরোধ; শাসন বা আদেশ নয়, দাওয়াত। হজরতজির মতে, এমন শব্দ ব্যবহার যাতে দীনী মজমায় আদবের ঘাটতি বা বেঅহেতরমির শামিল হয়, তা পরিহার করা উচিত। কথার ঢঙ, শব্দের ভঙ্গিমা, সবকিছুর মধ্যেই আদব থাকতে হবে। দ্বীনের খেদমতে কখনো এমন ভাষা, ভঙ্গি বা তর্জনী ব্যবহার করা উচিত নয়, যাতে মানুষ ‘হুকুম’ অনুভব করে। “বসুন” বলার চেয়ে “বসে গেলে ভালো হবে” বা “আমরা বসে পড়ি” বলা বেশি মার্জিত। স্যার বারবার জোর দিয়ে বলতেন, দাওয়াতের কাজের প্রাণ হলো আদব। হক কথাও যদি কঠিন ভাষায় বলা হয়, মানুষ তাতে আকৃষ্ট হয় না। আর যদি কোমল ভাষায়, ভালোবাসা দিয়ে বলা হয়, তা মানুষের অন্তরে গেঁথে যায়।

🎤 ২৩২

একবার এক ভাই স্যারের নিকট জানতে চাইলেন, "স্যার, গারিব (গরিব) বা অপরিচিত বলতে কী বোঝায়?" এই প্রশ্নটি উঠে আসে সেই হাদিস প্রসঙ্গে যেখানে বলা হয়েছে, "ইসলাম গরিব (অপরিচিত) অবস্থায় শুরু হয়েছে, আবার সে গরিব অবস্থায় ফিরে যাবে, বা যে অবস্থায় তার সূচনা হয়েছিল আবার সে রকম অপরিচিত অবস্থায় ফিরে আসবে।" স্যার উত্তরে এই গারিব বা অপরিচিত বলতে যা বুঝিয়েছেন, তা হলো: প্রত্যেকটি সৎকাজ বা দ্বীনি উদ্যোগ তার মূল উদ্দেশ্য (মাকসাদ) হারিয়ে ফেলবে। এর মানে এই নয় যে সেই উদ্যোগগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে, বরং তাদের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও প্রকৃত লক্ষ্যগুলো মানুষের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠবে। স্যার উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করেন: তাবলীগ থাকবে, কিন্তু তার মূল মাকসাদ হারিয়ে যাবে। মাদ্রাসা থাকবে, কিন্তু তার মূল মাকসাদ অপরিচিত হয়ে যাবে। তাবলীগ ওয়ালার সংখ্যা কমবে না, কিন্তু তারা তাদের মূল মাকসাদের উপর স্থির থাকবে না। খানকা (সূফী সাধকদের আশ্রয়স্থল) থাকবে, এর সংখ্যাও হয়তো কমবে না, কিন্তু এর মূল মাকসাদ অপরিচিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ, ইসলামের নামাজ রোজা হজ ইত্যাদির বাহ্যিক রূপ ও কার্যক্রম হয়তো বজায় থাকবে, কিন্তু সেগুলোর পেছনের মৌলিক উদ্দেশ্য এবং আধ্যাত্মিক লক্ষ্যগুলো অস্পষ্ট বা বিস্মৃত হয়ে যাবে। স্যার বলেন এই 'গরিব' বা 'অপরিচিত' বলতে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সংখ্যা কমে যাওয়া বা কোনো আমল বা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিলীন হয়ে যাওয়া না। প্রতিটি মহৎ কাজ তার মূল 'মাকসাদ' (উদ্দেশ্য) হারিয়ে ফেলবে। অর্থাৎ, 'গারিব' অবস্থার অর্থ হলো, ইসলামের বাহ্যিক রূপ, কাঠামো এবং কার্যকলাপগুলো হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু সেগুলোর ভেতরের মূল উদ্দেশ্য, স্পৃহা ও আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যগুলো ধীরে ধীরে বিস্মৃত হয়ে যাবে বা বিকৃত হয়ে পড়বে।

🎤 ২৩৩

হজে গমনেচ্ছু কিছু ভাইদের সামনে একবার স্যার হজ্বের উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি নিয়ে কিছু কথা বলেন। স্যার বলেন: “ইহরাম শুধু কিছু জায়েয কাজকে সাময়িকভাবে হারাম করা নয়, বরং হজ্বের নিয়্যতের সাথে সাথে দুনিয়ার যাবতীয় ইচ্ছা, প্রয়োজন এমনকি জায়েয কাজগুলো অন্তর থেকেও বের করে দেওয়া” এপ্রসঙ্গে স্যার উপমা পেশ করেন: যেমন এক মুমূর্ষ রোগী, হাসপাতালের বেডে বা আই সি ইউ তে থাকলে সন্তান কাঁদছে কিনা, খেয়েছে কিনা, এসব আর তার মনে থাকে না। সন্তানের পড়াশুনা বিয়েসাদি ইত্যাদির কোনো ফিকির থাকে না। চাকরি বাবসা ক্ষেতের কোনো চাহিদা সামনে থাকে না। দুনিয়ার কোনো লাভ তাঁকে হাসায় না, কোনো ক্ষতি তাঁকে কাঁদায় না। কারণ সে চলে যায় এক সংকীর্ণ, ও একান্ত এক হালতের মধ্যে। একান্ত নিজস্ব এক জগৎ, এক অনুভূতি, মৃত্যুর মুখোমুখি এক হালতে। এক সময়ের চরম ব্যস্ততার চিন্তা, এখন তার নিকট একেবারেই ফালতু, এইতো কিছু দিন পূর্বের লাভ ক্ষতির আসবাব, কার্যক্রম এখন তার নিকট একেবারেই মূল্যহীন। একেবারেই এক সংকীর্ণ হালতের মধ্যে সে। স্যার বলেন: “হজ্বের ইহরামও এমন এক অবস্থা, যেখানে মানুষ দুনিয়ার সব চিন্তা, সব ফিকির, পার্থিব সব দায়িত্ব, সকল ধরনের বাস্ততা ছেড়ে একান্তভাবে আল্লাহর দিকে রওনা দেয়। এই ইহরামের মধ্য দিয়ে শুধু শরীরকে বাস্ততা থেকে বিচ্ছিন্ন করা নয়, সকল কিছু থেকে দেমাগের সকল চিন্তা, এমনকি দীলের ফিকির ও ঘুরিয়ে নেয়া একান্ত আল্লাহর জন্য। স্যার আরো বলেন: “হজে যাওয়ার পর নয়, বরং আগে থেকেই অন্তরকে দুনিয়ার যাবতীয় ‘জায়েয’ চিন্তা থেকেও মুক্ত করে প্রস্তুত হতে হয়।” এই প্রস্তুতি দুইভাবে দরকার-- জাহিরী: মাসআলা-মাসায়েল জেনে নেওয়া, বাতেনী: অন্তরকে শুদ্ধ করা, দুনিয়া থেকে হিজরত করে একমাত্র আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়া। স্যার বলেন, হজ্ব শুধু একটি সফর নয়, এটি অন্তরের এক হিজরত, দুনিয়ার ব্যস্ততা, জায়েয চিন্তা ও দায়িত্ব থেকে অন্তরকে একান্তভাবে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া, আল্লাহর একান্ত নৈকট্যের দিকে রওনা দেওয়া। সাদা কাপড়ের ইহরাম বাঁধার আগেই এই সফরের প্রকৃত শুরু হওয়া উচিত অন্তরের এই ইহরাম দিয়ে।

🎤 ২৩৪

একবার স্যার রাজশাহী থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। তখনকার দিনে যাত্রাপথ ছিল পাবনা ও মানিকগঞ্জ হয়ে, যমুনা নদী পার হত আরিচা ও নগরবাড়ী ঘাট ফেরির মাধ্যমে। ফেরিতে ওঠার পর প্রায় দুই-আড়াই ঘণ্টা সময় লাগত নদীপথ পার হতে। ফেরিতে বসে স্যার জরুরত নামাজ শেষ করে একপাশে বসেছিলেন। পাশে বসা এক যুবক ভাইয়ের সাথে আলাপ হয়। আলাপ পরিচয়ের মাঝে স্যার তাকে কিছু দাওয়াতও দেন। দীর্ঘ কথাবার্তায় সে ভাই নিজের জীবনের নানা অভাব, সমস্যা ও পারিবারিক টানাপোড়েনের কথা স্যারের সামনে খুলে বলেন। স্যার ধৈর্যসহকারে মনোযোগ দিয়ে সব শোনেন, কিছু পরামর্শও দেন। কিছুক্ষণ পর সেই ভাই ব্যাগ থেকে একটি টিফিন বাটি বের করলেন। তাতে ছিল পরোটা আর ডিম ভাজি, তিনি বললেন, তার স্ত্রী ভোরে উঠে নাশতার এই বক্সটি বানিয়ে দিয়েছেন। কথাবার্তার আন্তরিকতায় তিনি স্যারকেও অংশগ্রহণ করতে বলেন, স্যার হাসিমুখে তার সঙ্গে নাশতায় শরিক হন। নাশতা শেষ করে স্যার মৃদু হাসি দিয়ে বললেন: ”তুমি এতক্ষণ কত রকম অভাব অভিযোগ বললে, এখন দেখি পরোটার সঙ্গে ডিমও খাচ্ছ। বাংলাদেশের কয়জন মানুষ ডিম দিয়ে পরোটা খায়? আল্লাহ পাকের শুকরিয়া আদায় করো।” জীবনে কত নেয়ামত আছে, আমরা তা বুঝতে পারি না কেবল এই কারণে যে, আমরা সমস্যা দেখতে শিখেছি, শুকরিয়া দেখতে শিখিনি। নিজের সমস্যা গুনতে গুনতে, কষ্টের হিসাব রাখতে রাখতে, নিজের ওপর থাকা আল্লাহর অনুগ্রহগুলো ভুলে যাই। স্যার ছোট্ট এক মুহূর্তেই সেই ভুলটা ধরিয়ে দিলেন, যেন অন্তরে কৃতজ্ঞতার আলো জ্বলে ওঠে। স্যার কেবল কথা বলেননি, ওই একটি ছোট্ট দৃশ্যের মাধ্যমে বোঝাবার চেষ্টা করেন, শুকরিয়া কিভাবে বাস্তব জীবনে চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে।

🎤 ২৩৫

রুয়েট-এর প্রাক্তন কর্মকর্তা আব্দুল মুমিন ভাইয়ের বাসায় এক বিকেলে উপস্থিত হয়েছিলেন স্যার ও কাজল ভাই। উদ্দেশ্য ছিল সামনের গ্রীষ্মকালীন অবকাশে চিল্লার তাসকিল করা। স্যার এর আগেও আব্দুল মুমিন ভাইয়ের পরিচিত ছিলেন। কিন্তু সেদিন আগমনের সময়টি ছিল ভিন্ন, আব্দুল মুমিন ভাইকে পাওয়া গেল খুবই বিষণ্ণ অবস্থায়। তাঁর মন খারাপের কারণ জানতে চাইলে তিনি স্যারকে জানালেন, "স্যার, আজ আমার মেয়ের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। ওর প্রস্তুতি এত ভালো ছিল যে আমরা নিশ্চিত ছিলাম সে সুযোগ পাবে, কোনোভাবেই বাদ পড়ার কথা ছিল না। কিন্তু আজ যখন ফল পেলাম, দেখলাম সে সুযোগ পায়নি। এ কারণে বাসার সবার মন খুব খারাপ।" আব্দুল মুমিন ভাইয়ের কথা শুনে স্যার বেশ কিছুক্ষণ তাঁর সঙ্গে আলোচনা করলেন। স্যারের কণ্ঠ ছিল কিছুটা উঁচু, যেন দরজার ওপার থেকে বাসার ভেতরের সবাই শুনতে পান। আব্দুল মুমিন ভাইও ভেতর থেকে তাঁর মেয়ে, মেয়ের মা এবং অন্যদের স্যারের কথা শুনতে বললেন। মাগরিবের আগ পর্যন্ত স্যার দীর্ঘক্ষণ আলোচনা চালিয়ে গেলেন। স্যার যখন বাসা থেকে বেরিয়ে আসছিলেন, আব্দুল মুমিন ভাই স্যারকে বললেন, "স্যার, আমার যে পরিমাণ মন খারাপ ছিল, আপনার কথাগুলো শোনার পর বেশ হালকা লাগছে।” স্যার কথাগুলোর মাধ্যমে বোঝালেন, বর্তমানে যে কষ্ট বা ব্যর্থতা চোখে পড়ছে, হয়তো ভবিষ্যতে সে ব্যর্থতার মধ্যেই আল্লাহ্‌র হিকমতপূর্ণ কোনো জয় লুকিয়ে রেখেছেন। অনেক সময় মানুষ যে দরজা চায় তা না দিয়ে, অপ্রত্যাশিত অন্য দরজায় আল্লাহ বরকত দেন। স্যার বোঝাতে চেয়েছিলেন: মানুষ প্রায়শই নিজের জন্য যা ভালো মনে করে, তাৎক্ষণিক বিচারে তার কাছে সেটাই কাম্য মনে হয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সে বুঝতে পারে যে আসলে ওইটা তার জন্য ভালো ছিল না, বরং মন্দ ফল নিয়ে এসেছিল। বর্তমানের অনেক ভালো জিনিস ভবিষ্যতে খারাপ ফল বয়ে আনতে পারে। আবার, বর্তমানের অনেক অনুশোচনা বা কষ্ট ভবিষ্যতে তাকে খুশি করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য যা কল্যাণকর, সেটাই নির্ধারণ করেন, যা মানুষ অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। কাজল ভাই বলেন, পরবর্তীতে আব্দুল মুমিন ভাইয়ের সাথে দেখা হলে মুমিন ভাই নিজেই বলেন, "ওই দিন স্যারের আমাদের বাসায় আসাটা আমাদের সবার জন্য বড়ই রহমত ছিল। বাসার সবাই ওই দিন এতটাই বিমর্ষ ছিল যে সবাই খুব ভেঙে পড়েছিল। আল্লাহ পাক এখন আমাদের সবাইকে বুঝিয়েছেন যে ওই দিনের ওই হালতের মধ্যেই আমাদের মঙ্গল ছিল। বর্তমানে আল্লাহ পাক ভালো বন্দোবস্ত করেছেন।"

🎤 ২৩৬

এক সময় কাকরাইলে কিছু বিষয় নিয়ে মুরব্বীদের মাঝে মতপার্থক্য দেখা দেয়। এই পার্থক্য কিছু মানুষের মধ্যে দুশ্চিন্তা ও বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। অনেক সাথী, বিশেষ করে কিছু মুকিম ভাই, এ নিয়ে কোনো আলোচনা করতে রাজি নন, এমনকি মাসওয়ারাতে এ প্রসঙ্গ তুলতেও তারা অনীহা প্রকাশ করেন। তাদের যুক্তি ছিল: “এগুলো মুরব্বীদের ব্যাপার, তারা যেভাবে ভালো মনে করেন, করবেন। আমাদের এসব আলোচনায় না যাওয়াই ভালো।” এই মানসিকতার প্রসঙ্গে একদিন স্যার একটি দৃষ্টান্তমূলক মন্তব্য করেন। তিনি বললেন: ”এক গরু তুলসী গাছ খেতে গেছে। একজন তা দেখে গরুটাকে তাড়াতে লাগলো। তখন আরেকজন এসে বলল, ‘এই গরুটাকে তাড়াচ্ছো কেন?’ সে উত্তর দিল, ‘এই গরু আমাদের দেবতাকে খেয়ে ফেলছে।’ তখন সে বলল, ‘আরে গরুও তো দেবতা। এক দেবতা আরেক দেবতার উপর চড়াও হয়েছে, এটা দেবতাদের নিজেদের ব্যাপার। আমাদের ওতে নাক গলানো উচিত না।’” এর পর স্যার বোঝাতে গিয়ে বলেন: “অনেকেই মুরব্বীদের মতপার্থক্য বা কিছু ভুল আচরণের মুখোমুখি হয়ে, এমন মনোভাব পোষণ করেন, ‘উনারা তো বড়, উনারা যা করেন, তাতেই নিশ্চয় হিকমত আছে।’ অথচ শরীয়তের আলোকে সঠিক-বেঠিকের এক সংবেদনশীল ও গঠনমূলক উপলব্ধি থাকা জরুরি। শুধুমাত্র “উনারা মুরব্বী”, এই ভয়ে অথবা অন্ধ আনুগত্যের কারণে সবকিছু পাশ কাটিয়ে যাওয়া কোনো সহিহ মনোভাব না। স্যার বোঝাতে চান, মুরব্বীদের প্রতি সম্মান রাখা জরুরি। কিন্তু সম্মান ও অন্ধ অনুসরণ এক জিনিস নয়। যদি কোথাও বিভ্রান্তি, ভুল বোঝাবুঝি বা স্পষ্ট অন্যায় লক্ষ্য করা যায়, তবে সে বিষয়ে শরীয়তের আলোকে যথাযথ ও নম্রভাবে সুরাহার চেষ্টাও আমাদের দায়িত্ব।

🎤 ২৩৭

এক আলোচনায় স্যার বলছিলেন: “আইনস্টাইন, যিনি বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এক কিংবদন্তি, তাঁর একটি গাণিতিক ভুল (মহাজাগতিক ধ্রুবক, বা আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বা এরকম কিছু), একজন ইন্টারমিডিয়েট লেভেলের ছাত্রও বুঝতে পারবে। এটা ধরতে মাস্টার্স বা পিএইচডি লাগবে না। দুনিয়ার নামকরা অনেক সায়েন্টিস্টদের সামনে এই ভুলটি তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু তারা কিছুতেই মানতে রাজি না, এমনকি অনেকে শুনতেও চায় না। বললেই ভাবটা এমন, ‘অবিশ্বাস্য কথা’। ‘ওরে বাপরে বাপ! এটা আইনস্টাইনের কথা!’ অর্থাৎ, আইনস্টাইন ভুল করতে পারে, এই ধারণাটাই তারা গ্রহণ করতে পারে না। এই উদাহরণ টেনে স্যার বলেন: “ঠিক একই রকম মানসিকতা অনেক সাথীর মধ্যেও দেখা যায়। তাবলিগের কোনো বড় মুরব্বী বা কোনো প্রসিদ্ধ তাবলিগী যদি কোথাও কিছু ভুল করেন, আর কেউ যদি নম্রভাবে সেই ভুলের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তখন কিছু মানুষ তৎক্ষণাৎ ক্ষেপে ওঠে। তারা বলে, ‘উনার সমালোচনা করবে? তিনি তো অমুক বড় মুরব্বী! অমুক বড় কুরবানিওয়ালা!’ যেনো ‘বড়’ মানেই ‘ভুলের ঊর্ধ্বে’। স্যার বড় সতর্কতার সাথে বলেন, “এটা এক ভয়ংকর মানসিকতা।” যখন কোনো মুরব্বী বা আলিমকে কেউ ভুল ধরলে বলা হয়, “উনার সমালোচনা করা যাবে না”, তখন এটি অনেক সময় সত্যকে আড়াল করার দরজা খুলে দেয়। অন্ধ আনুগত্যের এই সংস্কৃতি দ্বীনের ক্ষতি করে, কারণ এতে হক চাপা পড়ে যায়। স্যার জোর দিয়ে বোঝান, দ্বীনের উপর চলা মানে হলো, হকের উপর থাকা। হককে ব্যক্তি দিয়ে বিচার করা নয়, বরং ব্যক্তিকে হক দিয়ে বিচার করা।

🎤 ২৩৮

স্যার প্রায়শই কোরআনের এই আয়াতটি উদ্ধৃত করতেন: “وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ” ওয়ামা খলাকতুল জিন্না ওয়াল ইনসা ইল্লাল ইয়া'বুদুন। (আমি জিন ও মানুষকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি)। স্যার বলতেন এখানে إِلَّا لِيَعْبُدُونِ إِلَّا لِيَعْرِفُونِ (ইল্লা লি-ইয়ারিফুন) অর্থে ব্যবহিত হয়। এখানে ইবাদত মারেফত অর্থে বাবহীত হয়। স্যার ব্যাখ্যা করতেন যে, এখানে 'ইয়া'বুদুন', অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর মা'রেফাত হাসিলের জন্য। এই মা'রেফাতই হলো ইবাদতের মূল রহস্য। ইবাদত কেবল বাহ্যিক কাজ নয় (যেমন নামাজ, রোযা, হজ), বরং এর আধ্যাত্মিক ভিত্তি হলো আল্লাহর প্রতি চিন্তা, ভালবাসা, ভয় এবং নির্ভরতা, যা আল্লাহর পরিচয় (মা'রেফাত) ছাড়া সম্ভব নয়। স্যার একসময় মা'রেফাত প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে এক মেওয়াতি (ভারতের মেওয়াত অঞ্চলের একজন সাধারণ, সরলপ্রাণ মানুষ) ব্যক্তির উদাহরণ দেন। সেই মেওয়াতিকে যখন মা'রেফাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি খুব সহজ করে উত্তর দিয়েছিলেন: "জান পেহচান”, অর্থাৎ, 'চিন পরিচয়'। এমন চেনা-পরিচয়, যেখানে কেউ কিছু চাইলে তিনি তা দিয়ে দেন। মা'রেফাত হলো আল্লাহ তায়ালার সাথে এমন গভীর পরিচয় গড়ে তোলা, যেখানে তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি তা পূরণ করে দেন। এক গভীর সম্পর্ক। স্যার বলতেন, আল্লাহ পাকের পরিচয় পাওয়াই ইবাদতের আসল রহস্য। অন্যান্য সব পরিচয় তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যাবে, যখন আল্লাহ্‌র পরিচয় হাসিল করতে পারবে। আল্লাহ্‌র এই মা'রেফাত হাসিলের পর বান্দার মধ্যে যে গুণটি সৃষ্টি হয়, তাই হলো ইখলাস।

🎤 ২৩৯

ইখলাস বোঝাতে স্যার অনেকসময় একটি উপমা দিতেন: এক মেয়ে বাড়িতেই থাকত। ম্যাট্রিক পাসের পর কলেজে ভর্তি হলো এবং বাইরে যাওয়া শুরু করল। মেয়েটি ছিল খুবই সুন্দরী, তার পোশাক-পরিচ্ছদ, চালচলন সবই ছিল আকর্ষণীয়। রাস্তাঘাটে, বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে সবাই তার প্রশংসা করত। যখন সবাই তাকে ভালোবাসত এবং তার প্রশংসা করত, প্রথমদিকে তার বেশ ভালোই লাগত, সকলের প্রশংসা সকলের ভালোবাসা তাঁকে আনন্দ দিতো। এভাবে চলতে চলতে ধীরে ধীরে যদি সে কোনো একজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, তখন তার আর অন্য কারো প্রশংসা ভালো লাগে না। সে চায় না অন্য কেউ তার প্রশংসা করুক। ওই একজনের আকর্ষণ, ওই এক জনের নিকট ভালো হবার আকাঙ্ক্ষা, ওই এক জনের নিকটবর্তী হবার তলব তাঁকে অন্য সকলের প্রশংসা পাওয়া থেকে বিমুখ করে তোলে। কেউ তাকে ভালো বলল বা কী বলল, এখন তার আর সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এখন তার নজর শুধু ওই একদিকে, সে যেন তাকে ভালো বলে, সে যেন তাকে ভালো জানে। অন্য কারো দিকে তার এখন আর কোন রকম নজর নেই। এখন আর অন্য কেউ তাকে চিনুক বা তার প্রশংসা করুক, এটা সে পছন্দ করবে না। স্যার এই উপমা দিয়ে বোঝাতেন যে, এটাই হলো ইখলাস। যখন কোনো বান্দা আল্লাহ্‌র দিকে এমনভাবে আকৃষ্ট হয়ে যায়, তখন তার আর অন্য কেউ চিনুক, এটা ভালো লাগে না। সে শুধু সেই পরিচয় নিয়ে থাকতে পছন্দ করে, যে তিনি (আল্লাহ) যেন আমাকে চেনেন এবং অন্য কেউ যেন আমাকে না চেনে। স্যার অসংখ্য বয়ানে এই মা'রেফাত ও ইখলাসের প্রসঙ্গ এনেছেন।

🎤 ২৪০

একবার স্যার বলছিলেন, “দীনের কাজের ফায়দা কেবল তার তরতীব বা কর্মপদ্ধতির উপর নির্ভর করে না, বরং অনেক বেশি নির্ভর করে, এই কাজ যার দ্বারা হচ্ছে, সে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে কতটুকু মকবুল।” স্যার বলেন: “তরতীব খুব উন্নত হতে পারে, পরিকল্পনা চমৎকার হতে পারে, বই-পুস্তক, দাওয়াতি ভাষা সব নিখুঁত হতে পারে, কিন্তু যদি এই তরতীব চালানোর ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ঐ পর্যায়ের মকবুল না হন, তবে এই কাজ থেকে ফায়দা খুবই সীমিত হবে, নাহয় কোনো উপকারই হবে না। অপরদিকে, যদি কোনো ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর কাছে মকবুল হন, যদি তার তরতীব খুব উন্নত না হয়, তবু তার মাধ্যমে কাজের ফায়দা অনেক বেশি হবে।” হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রসঙ্গ তুলে স্যার বলেন: দাওয়াত ও তাবলিগের খুবই সহজ ও সাধারণ তরতিব উনি দেখিয়েছেন, কিন্তু উনি বাক্তি ছিলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা, এক মকবুল বান্দা, তাই তাঁর সহজ তরতীবের মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা হাজারো মানুষকে বদলিয়ে দিয়েছেন, আজও দুনিয়াবাপি মানুষ ফায়দা পাচ্ছে। স্যার বোঝাতে চান, তরতীব হলো দাওয়াতের বাহ্যিক অবকাঠামো, যা প্রয়োজনীয় ও উপকারী, কিন্তু তা আসল শক্তি নয়। মকবুলিয়াত হলো সেই অদৃশ্য আত্মিক গ্রহণযোগ্যতা, যার দ্বারা কাজের মাঝে নূর, তাসির, বরকত ও হিদায়াত জন্ম নেয়। আল্লাহর দৃষ্টিতে যিনি প্রিয়, তাঁর মাধ্যমে সামান্য কথা, সামান্য হরকতও অনেক বড় ফায়দা নিয়ে আসতে পারে। আর আল্লাহ পাকের নিকট মকবুল না হলে, হতে পারে তাঁর জ্ঞান ও পরিকল্পনা অনেক সুসংগঠিত, অনেক সুশৃঙ্খল, কিন্তু তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্জীব হয়ে যায়, মানুষের অন্তর পর্যন্ত পৌঁছায় না। স্যার স্পষ্ট করতে চাইছেন, দ্বীনের মেহনতকে মকবুল ও তাসিরদার বানাতে চাইলে, শুধু বাহ্যিক গঠন নয়, বরং মেহনতকারীর ভিতরের আমল, ইখলাস, তাকওয়া, এবং আল্লাহমুখিতা বেশি জরুরি। উসুল, পদ্ধতি, তরতীব, শৃঙ্খলা, সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার প্রাণশক্তি অন্তরের নিষ্কলুষ মনোভাব ও আল্লাহর কাছে কবুল হওয়া।

🎤 ২৪১

স্যার এক বয়ানে বলেন, আল্লাহ তায়ালা নবী আলাইহিমুস সালাম গণকে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে এভাবে পাঠাননি যে, দ্বীন জরুরি; বরং পাঠিয়েছেন এই বিশ্বাস দিয়ে যে, দ্বীন যথেষ্ট। এই দুটি কথার মাঝে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। যে দ্বীনকে যথেষ্ট মনে করে, সে তার পূর্ণ শক্তি দ্বীনের ওপর ঢেলে দেয়। বাকি সবকিছুর গুরুত্ব তার কাছে গৌণ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, যে কেবল দ্বীনকে জরুরি মনে করে, সে দ্বীনের পাশাপাশি দুনিয়ার অন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকেও সমান গুরুত্ব দেয়। স্যার বলেন, আজ আমরা অনেকেই দ্বীনকে “ভালো” মনে করি, কেউ কেউ “প্রয়োজনীয়” বলেও মনে করি; কিন্তু দ্বীন দাবী করে, আমরা দ্বীন কে ঐরকম “যথেষ্ট” মনে করি, যেরকম সাহাবা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহুম গণ মনে করতেন। স্যার বোঝাতে চান, যদি একজন ব্যক্তি দ্বীনদার হয়, তবে তার চাকরি, ডিগ্রি, সম্পদ, বংশ, এসব কিছু না থাকলেও তা কোনো ঘাটতি নয়। যে দ্বীনদার, মুত্তাকি, পরহেজগার, তার বাকি কিছু না থাকলেও আল্লাহর কাছে সে পরিপূর্ণ।

🎤 ২৪২

একবার কাকরাইল মসজিদে একসাথে দই খাচ্ছিলেন। সেই সময় মাহফুজ ভাই দইয়ের প্রশংসা করে বলে উঠলেন, “এই দই তো বেশ একেবারে রাইবেন্ডের (পাকিস্তানের মারকায) দইয়ের মতো!” এই কথা শেষ হতে না হতেই স্যার জিজ্ঞেস করলেন: "তুমি যে পাকিস্তান সফর করেছো তা জানাতে চাচ্ছো?" আমাদের মন অনেক সময় চায়, আমরা এমনভাবে কথা বলি যাতে কথার মধ্যে সফরের গৌরব প্রচার করার একটি সূক্ষ্ম প্রবণতা থাকে এবং মানুষ নিজে থেকেই আমাদের প্রশংসা করতে বাধ্য হয়। এই খুব সূক্ষ্ম আত্মপ্রচারের চর্চা কে স্যার ধরে ফেললেন, যা বাহ্যিকভাবে নিরীহ মনে হলেও আত্মশুদ্ধির পথে বড় অন্তরায়। স্যারের এই প্রশ্নটি মাহফুজ ভাইকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দেয়, হঠাৎ এভাবে প্রশ্ন করায় মাহফুজ ভাই কিছুটা লজ্জিত হয়ে বললেন: “না, আসলে তা বোঝাতে চাচ্ছিলাম না।” এরপর যেনো মৃদু আক্ষেপ ভরে বললেন: "যদি জানাতেও চাই, প্রচার করতেও চাই, তা কি আর আপনাকে বলবো?" স্যারের কথা এখানেও শেষ হলো না, স্যারের তরফ থেকে আরও এক খোঁচা (দরদভরা সংশোধনের ভাষা) আসল-- স্যার আবার বললেন: "না, তুমি এই প্র্যাকটিস করছো, আর কী!" স্যার সরাসরি কোনো কঠোর কথা বলেননি, বরং হাস্যরসের মাধ্যমে, হালকা মন্তব্যে তিনি হৃদয়ে আঘাত করেছেন। কিন্তু সেই আঘাতে কোনো অপমান নেই, বরং ছিলো একটি চেতনা জাগানোর চেষ্টা। মাহফুজ ভাই হয়ত অবচেতনভাবে তার সফরকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করছেন বা এর মাধ্যমে কোনো বিশেষ বার্তা দিতে চাইছেন। দ্বীনি সফরে বা নেক আমলে লিপ্ত হওয়ার পর তা প্রকাশ না করা এবং বিনয়ী থাকা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। স্যারের মন্তব্যে সম্ভবত সফরের নিয়তের স্বচ্ছতা বজায় রাখা, এবং বিদেশ সফর সম্পর্কে কোনো প্রকার প্রচার বা লোক দেখানোর সূক্ষ্ম উদ্দেশ্য পোষণ থেকেও বিরত রাখার বেপারে তাকিদ ছিলো। স্যার যেনো বলতে চাচ্ছিলেন, আমাদের প্রতিটি আমল যেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য হয়, লোক দেখানো বা প্রশংসা কুড়ানোর জন্য নয়। আমরা অনেক সময় অজান্তেই নিজের প্রশংসা বা কাজের প্রচারের ফাঁদে পড়ে যাই, দইয়ের প্রশংসার মাধ্যমে অসাবধানতাবশত বিদেশ সফরের এই বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে যায়, যে বেপারে সতর্কতা গ্রহণ স্যারের উদ্দেশ্য ছিলো।

🎤 ২৪৩

এক মোজাকারায় স্যার বলেন: “আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সাদিকীনদের সঙ্গী হতে বলেছেন।” يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ স্যার বলেন, এখানে “مَعَ الصَّادِقِينَ”, অর্থাৎ “সত্যবাদীদের সঙ্গী হও”, এই শব্দটি খুবই গভীর ও ব্যাপক অর্থবোধক। স্যার বলেন: “এই ‘সঙ্গী হওয়া’ ব্যাপক শব্দটি কেবল শরীরের পাশে থাকার নাম নয়, বরং এটি মনের মিল, চিন্তার মিল, উদ্দেশ্যের মিল, সব কিছুর এক গভীর সম্পর্ক বোঝায়।” স্যার বলেন, সঙ্গ দুই রকম হতে পারে: এক হলো স্থানের সঙ্গ: যেমন, কেউ কারও পাশে বসে আছে, কিংবা একসাথে অবস্থান করছে। এটি বাহ্যিক বা শারীরিক সঙ্গ, শারীরিকভাবে কাছাকাছি থাকা বা এক স্থানে অবস্থান করা। আরেক হলো মতের সঙ্গ: যেমন বলা হয়, “أنا معك”, “আমি তোমার সাথে আছি।” এখানে সঙ্গ মানে চিন্তার মিল, এটি হল চিন্তাভাবনা, মতাদর্শ, মন এবং বিশ্বাসের ঐক্য। যখন আমরা বলি, "আমি তোমার সঙ্গে আছি" বা "আমি তোমার সাথে একমত", তখন এটি মতের সঙ্গকেই বোঝায়। আল্লাহ তায়ালা যখন মুমিনদের সঙ্গী হতে বলেছেন, তখন এর প্রধান উদ্দেশ্য হল এই মনের মিল ও চিন্তার ঐক্য। স্যার স্মরণ করালেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে ইয়েমেনের গভর্নর করে পাঠিয়েছিলেন। এরপর জীবদ্দশায় আর দেখা হয়নি। কিন্তু হযরত মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জীবনের শেষ পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গেই ছিলেন। এই সঙ্গ ছিল ঈমানের কারণে, আকিদার কারণে, চিন্তার কারণে, শারীরিক উপস্থিতির কারণে নয়। স্যার বলেন, আল্লাহর নির্দেশ, “সাদিকীনদের সঙ্গী হও”, এই ‘সঙ্গী’ হওয়ার অর্থ মূলত সেই মতের সঙ্গ, বা ভাবগত বা অন্তরগত সঙ্গ’। তাদের মতো চিন্তা করা, তাদের বিশ্বাসকে বিশ্বাস করা, তাদের মতো জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করা, তাদের পথের অনুসারী হওয়া। এটা কেবল পাশেই বসা নয়, বরং অন্তরের গভীরে তাদের অনুসারিত হওয়া, মনের ঐক্য স্থাপন করা।

🎤 ২৪৪

স্যার বলেন, আল্লাহতাআলা আমাদেরকে সাদিকিনদের সঙ্গী হওয়ার আদেশ দিয়েছেন। তোমরা মা‘আস্-সাদিকীন হও। স্যার বুঝিয়েছেন, এখানে “مَعَ” (সঙ্গে হও) শব্দটি শুধু বাহ্যিক সঙ্গ নয়, বরং তাদের মতাদর্শ গ্রহণ, ও অন্তর দিয়ে তাদের অনুসরণ করাকে বোঝায়। এর দ্বারা বোঝানো হয়, সাদিকীন কেবল কিছু ব্যক্তি নন; বরং তারা একটি মানসিকতা, একটি আদর্শ। সেই আদর্শের প্রতি সমর্পিত হওয়াই হচ্ছে প্রকৃত সঙ্গী হওয়া। স্যার বলেন, এই নির্দেশের আড়ালে এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা নিহিত আছে, ”প্রত্যেক ‘হাঁ’ এর সাথে একটি ‘না’ জড়িত থাকে।” অর্থাৎ, যখন কাউকে সঙ্গী হওয়ার কথা বলা হয়, তখন পরোক্ষভাবে বলা হয়, তার বিরুদ্ধপন্থীদের থেকে দূরে থাকো। এটি إثبات (ইসবাত) ও نفي (নফি) এর নীতি। সত্যনিষ্ঠ, ঈমানদার, আল্লাহভীরু, ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রকৃত অনুসারীদের সঙ্গ গ্রহণ করা, তাদের ভালোবাসা, তাদের উপর বিশ্বাস করা, এবং তাদের পথে চলা। এবং একই সাথে, ভ্রষ্ট, কপট ও বিপথগামীদের চিনে তাদের ভালোবাসা থেকে, তাদের সঙ্গ গ্রহণ থেকে, তাদেরকে বিশ্বাস করা থেকে, এবং তাদের পথে চলা থেকে দূরে থাকা। স্যার ইঙ্গিত করেছেন, “সাদিকীনদের সঙ্গী হও” বলা মানেই “বিপথগামী মুর্তাদ, মুনাফিক, বা বাতিলপন্থীদের সঙ্গী হইও না”, এটা আর আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না, কারণ তা এর অন্তর্নিহিত অংশ।

🎤 ২৪৫

স্যার প্যারিসে থাকাকালীন, স্যারের এক বন্ধু, খ্রিষ্টান, যিনি স্যারের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক রাখতেন, তিনি একবার একটি অদ্ভুত অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন। প্যারিসের স্থানীয় এক গির্জায় প্রতি রবিবার আনুষ্ঠানিক যে ধর্মীয় ভাষণ (সারমন) দেওয়া হয়, যা মূলত খ্রিষ্টানদের ‘ওয়াঅয’ বা ধর্মীয় উপদেশের একটি কাঠামোবদ্ধ পাঠ। এসব ভাষণ কখনো ওই গির্জার ফাদার নিজে দেন, আবার কখনো কোনো ইয়াং ভলান্টিয়ারদের দিয়েও পড়ানো হয়। স্যার বলেন, একবার ওই গির্জায় বক্তব্য দেওয়ার পালা সেই বন্ধুর ওপর এলে, সে স্যারকে অনুরোধ করল: “তুমি আমার জন্য একটা সুন্দর ‘সারমন’ লিখে দাও।” স্যার তার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। স্যার হয়তো ভেবেছিলেন ইসলামের শিক্ষার কিছু বার্তা এমনভাবে দেওয়া যায় যাতে সার্বজনীন কল্যাণের দিকটা ফুটে ওঠে। স্যার তার জন্য একটি অতি পরিচিত কিন্তু গভীর অর্থবোধক দোআ কুরআন শরীফ থেকে উদ্ধৃত করে সারমন আকারে লিখে দেন। দোআটি ছিল নবী মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লামের। যখন তিনি ফেরাউনের সামনে দাওয়াত নিয়ে যাচ্ছিলেন। এতে আত্মপ্রকাশের আগেই আত্মশুদ্ধি, এবং কথার শক্তি চাওয়ার অনন্য নমুনা আছে। ”হে আমার প্রভু! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও, আমার কাজ সহজ করে দাও, আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দাও, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।” رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي স্যার বলেন, রবিবারের আগেই সে দুই-একবার রিহার্সেল করে এসে আমাকে বলল-- ”এইটা পড়া যাবে না!” আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেন? সে জানালো, ”এই কথাগুলো বেশি ‘হাই থট’ এর হয়ে গেছে। সবাই বুঝে ফেলবে যে এইটা আমার পেট থেকে বের হয়নি। আমি ধরা পড়ে যাব যে এটা আমি নিজে লিখিনি।”

🎤 ২৪৬

কাজল ভাই একবার মেহমানদারির প্রসঙ্গে স্যার, এর একটি গভীর পর্যবেক্ষণের কথা স্মরণ করে বলছিলেন-- “স্যার বলতেন, মেহমান ও মেজবান, উভয়ের হৃদয়ের অবস্থা একে অপরের কাছে প্রকাশ হয়ে যায়। যে আন্তরিকতা দিয়ে মেহমানদারি করা হয়েছে, তা মেহমান বুঝে ফেলে। আবার যেভাবে মেহমান তা গ্রহণ করেছে, সেটাও মেজবান টের পায়।” স্যার বলতেন, এটা শুধু খাবার খাওয়ানো বা দাওয়াতের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এক অন্তরঙ্গ হৃদ্যতা, দীলের লেনদেন। যেন এক নীরব মুআমালাহ-হৃদয়ের আদান-প্রদান। স্যার বোঝাতে চান, এটা এমন এক লেনদেন যা ঢেকে রাখা যায় না, জোর করে সাজানোও যায় না। কথা, আচরণ, পরিবেশন, শরীরী ভাষা, এমনকি হাঁটাচলা ও চোখের চাহনি, সব মিলিয়ে আল্লাহ পাক দীলের ভেতরের হালত প্রকাশ করে দেন। আল্লাহ পাক উভয়ের মুভমেন্ট, চলাফেরা, পরিবেশন, কথাবার্তার মাধ্যমে তাঁদের মনের অবস্থা প্রকাশ করে দেন, কে কতটা আন্তরিক ছিল। স্যারের ভাষায়, মেহমান বুঝে ফেলে যে, এটা শুধুই রেওয়াজ বা চাপের দাওয়াত। আবার মেজবানও অনুভব করেন, এই মেহমান আমার ‘বেতাকল্লুফী’ বা সাদাসিধে পরিবেশনকেই দীল থেকে গ্রহণ করেছেন, নাকি শুধু ভদ্রতা করেছেন। স্যার ইঙ্গিত প্রদান করেন যে, আল্লাহ পাক দীলের অবস্থা বা অন্তরের সত্তাকে প্রকাশ করে দেন, মুখাবয়ব ও আচরণের মাধ্যমে।

🎤 ২৪৭

কাজল ভাই স্মরণ করেন, হযরত মাওলানা জামাল উদ্দিন স্যার যিনি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব ছিলেন এবং পরবর্তীতে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সম্মানিত শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, স্যারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাদের মাঝে পরস্পর মহব্বতপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কাজল ভাই বলেন, “আমি একাধিকবার জামাল স্যারের বাসায় স্যারের সাথে গিয়েছি। দেখতাম, উনার মেহমানদারির এক বিশেষ আদব আছে। খাবার পরিবেশনের একটা নির্দিষ্ট তরতীব মেনে চলতেন, একটি আইটেম এনে দিতেন, সেটি শেষ হলে আরেকটি; এভাবে এক এক করে সব পরিবেশন করতেন। একসঙ্গে সব খাবার পরিবেশন করতেন না।” কাজল ভাই একবার বিস্ময়ের সাথে স্যারকে জিজ্ঞেস করেন, “স্যার, এমন তরতীব কেন? সব একসাথে দিলে তো যেমন ইচ্ছা মেপে খাওয়া যেত!” এ কথা শুনে জামাল উদ্দিন স্যার মুচকি হেসে বললেন, “তোমার স্যার আর কি বলবেন, তার আগে আমিই তোমাকে ঘটনা শুনাই!” জামাল উদ্দিন স্যার বলেন, “৭৮ বা ৭৯ সালের কথা। একদিন স্যার আমার বাসায় আসেন। সেদিন বাসায় মেহমানদারী করানোর মতো তেমন কিছু ছিল না। আমার স্ত্রী ঘরের ভিতর থেকে যেটুকু ছিল তা-ই সরলভাবে পরিবেশন করেন, আগের দিনের পান্তা ভাত, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ। কিন্তু তোমার স্যার সে খাবার এমন পরিতৃপ্তি ও আনন্দ নিয়ে চেটে পুটে খেলেন যে তা আমার স্ত্রীর মনে গভীর প্রভাব ফেলল।” জামাল স্যার উনার আহলিয়ার কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন: “এমন মেহমান যদি আমাদের বাসায় আসে, তাহলে কোনো সংকোচ বা চিন্তার কিছু নেই। যিনি পান্তা ভাত এমন তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারেন, তার মেহমানদারিতে হৃদয়ের আনন্দ পাওয়া যায়, তার মেহমানদারিতে কোনো সমস্যা নাই।” এর পর থেকে জামাল উদ্দিন স্যার, এর বাসায় অন্তরের ইচ্ছা হয়ে গিয়েছিল, যখনই মুশফিক স্যার বাসায় আসেন, তার জন্য যত্ন করে বিভিন্ন আইটেম প্রস্তুত করবেন এবং এমনভাবে পরিবেশন করবেন যেন স্যার প্রতিটি আইটেম খান। তাই একসঙ্গে সব কিছু না দিয়ে, ধীরে ধীরে পরিবেশন করতেন, যাতে কোনো কিছু বাদ না পড়ে, এবং স্যার যেন স্বাচ্ছন্দ্যে সবকিছু (প্রতিটা আইটেম) উপভোগ করতে পারেন।

🎤 ২৪৮

স্যার প্রায়ই বলতেন যে, নিশ্চুপ থাকা, আর নিষ্ক্রিয় থাকা, এক জিনিস নয়। অনেক সময় নিশ্চুপ ব্যক্তিরাই দুনিয়ার অনেক মহান কাজ করে গেছেন। অনেক মহান কাজ নিশ্চুপ ব্যক্তিদের হাত ধরেই সম্পন্ন হয়েছে। অনেকে যারা প্রকৃতভাবে দ্বীনের কাজের বোঝা বহন করেন, অনেক সময় তাদের বাহ্যিক কর্মকম্প বা উচ্চারিত শব্দ থাকে না, কিন্তু ভেতরে তারা উত্তাল এক বাতেনী দায়িত্ব পালন করে যান। এই প্রসঙ্গে স্যার আমাদের তাবলিগ জামাতের তৃতীয় আমির হযরতজী এনামুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর উদাহরণ দিতেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাঁকে কোনো বিশেষ দায়িত্বে বা ছোটাছুটিতে দেখা যেত না। তিনি ছিলেন একেবারেই চুপচাপ প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু তাঁর এই বাহ্যিক নীরবতা ছিল তাঁর গভীর চিন্তা, পরিকল্পনা ও আল্লাহর সাথে একান্তে সংযোগের একটি রূপ। তিনি নীরবে থেকেই সারা পৃথিবীতে তাবলিগের কাজকে এমনভাবে আঞ্জাম দিয়েছেন যা সত্যিই অভাবনীয়। একবার স্যারের এক ভাগ্নে কৌতূহলবশত হযরতজী সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমাদের চিফ বস কী করেন?” স্যার খুব সহজভাবে উত্তর দিলেন, "ওনাকে তো পান খাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ করতে দেখি না (তিনি কোনো বয়ান করেন না, তালিম করেন না, গাশত করেন না, বই লেখেন না, ছোটাছুটি করেন না... বসে বসে পান খাওয়া ছাড়া তাঁকে আর কোনো বিশেষ কাজে দেখা যায় না।)” স্যার জানতেন ভাগ্নে বিচক্ষণ ও সমঝদার মানুষ, স্যারের এই আপাত সহজ উত্তরটি ভাগ্নের বুঝতে একটুও বাকি রইল না। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দিলেন, "এটাতো (পান খাওয়া) বড় কঠিন কাজ।” বাহ্যিক কর্মের চেয়ে নীরবতার মাঝে যে গভীর আধ্যাত্মিক শক্তি ও কর্মতৎপরতা লুকিয়ে থাকে, তা তিনি বুঝেছিলেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তুচ্ছ মনে হলেও, প্রকৃতভাবে এটি (এই পান খাওয়া) ছিল এক পর্দার আড়ালের ইন্তেজামী ও রূহানী নেতৃত্ব, যার প্রভাব গোটা দুনিয়ার উপর পড়েছে। পরবর্তীতে স্যার এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "এই একটা পান খানেওয়ালা মানুষ দুনিয়াতে না থাকার কারণেই আজ দুনিয়াতে (তাবলিগী মহলে) এই বেহাল অবস্থা। ওই রকম একটা পান খানেওয়ালা মানুষ আর নেই।" এর মাধ্যমে স্যার বোঝাতে চেয়েছিলেন, হযরতজীর নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আত্মিক শক্তি ও আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্কের অভাব আজ অনুভব হচ্ছে। এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় স্যার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মক্কী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মক্কায় কাফেরদের অমানবিক অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। হযরত বেলাল রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু, হযরত খাব্বাব রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু, হযরত সুমাইয়া রাদিআল্লাহু তাআলা আনহা এবং তাঁর পরিবারের ওপর নির্মম নির্যাতন চলছিল। তাঁদের ছোট সন্তান আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু-সহ পুরো পরিবারকে শহীদ করে দেওয়া হয়েছিল। মক্কায় বাইতুল্লাহ এর মধ্যে ৩৬০টি মূর্তি। এমন করুণ পরিস্থিতিতে বাহ্যিক দৃষ্টিতে তো এমনই মনে হয় যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো তাৎক্ষণিক ভূমিকা নিচ্ছেন না; তিনি যেন চুপচাপ। না কোনো প্রতিবাদ করছেন, না প্রকাশ্যে কিছু বলছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐসময় বাহ্যিকভাবে নিশ্চুপ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। এই নিশ্চুপতা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গভীর দূরদৃষ্টি, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং অবিচল প্রত্যয়ের প্রতিচ্ছবি, একটি নির্দিষ্ট পথের দিকে নীরবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি চিন্তা-ভাবনা করছিলেন, পরিকল্পনা সাজাচ্ছিলেন এবং উম্মতের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা তৈরি করছিলেন। তিনি মোটেও বিকারগ্রস্ত হয়ে বসে ছিলেন না। স্যার বলেন, কোনো পরিস্থিতিতে হয়তো আমরা কিছু বলতে বা করতে পারছি না, বাহ্যিকভাবে চুপ থাকতে হচ্ছে, এটি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু দীনের দায়িত্ব বা তাকাজার ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থাকাঅর্থাৎ, কোনো দায়ভার নেই বা কোনো দায়িত্ব নেই, এমন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যে ব্যক্তি এমন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, সে যেন নিজেকে উম্মত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, উম্মতের পরিচয়কেই ঝাপসা করে দেয়, যেন নিজেকে উম্মতের কাঠামো থেকে আলাদা করে ফেলে (উম্মত চুপ থাকতে পারে, কিন্তু দায়িত্বহীন হতে পারে না)!

🎤 ২৪৯

সিলেটের গহরপুরের একজন প্রখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস ছিলেন হযরত নূরুদ্দীন সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি। একবার কাকরাইল মসজিদে তালীমের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সে সময় তালিম প্রসঙ্গে আলোচনায় কিছু কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, “কুরআনের আয়াত, হাদীস শরীফ, এগুলো ইলম নিজে নয়, বরং বলা যেতে পারে ইলমের পাত্র। এগুলোর ভিতর ইলম পাওয়া যেতে পারে, তবে ইলম পেতে হলে বিশেষ মেহনতের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।” হজরত মাওলানার ওই কথা উদ্ধৃত করে স্যার এক সময় কিছু কথায় এই বিষয়টিকে সহজবোধ্য কিছু দৃষ্টান্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন। স্যার বলেন, মনে করা যাক একটি পাত্রে দুধ আছে, কিন্তু সেই পাত্র বা বাটি দুধ নয়, তা দুধ ধারণ করছে, দুধ তার ভিতরে আছে। আবার সেই দুধের মধ্যেও মাখন আছে, তবে দুধ মানেই মাখন নয়। মাখন আছে দুধের মধ্যে ঠিকই কিন্তু দুধ কিনলেই মাখন পেয়ে যাবে তাও নয়। মাখন পেতে হলে দুধ ঘেঁটে, পরিশ্রম করে মাখন আলাদা করতে হয়। ঠিক তেমনই, কুরআন-হাদীসের মধ্যে ইলম আছে ঠিকই, কিন্তু তা শুধু পড়ে ফেললেই চলে না (ইলম অর্জন হয় না)। কুরআন-হাদীসের জ্ঞান, জানাশুনা বা মালুমাত এক জিনিস আর ইলম ভিন্ন জিনিস। স্যার বলেন, আমরা সাধারণত ইলম বলতে যেগুলো বুঝি, সেগুলো ইলমের বাইরের কাঠামো, অর্থাৎ পাত্র। স্যার উদাহরণ দেন: দোকানে চা খেতে গেলে আমরা বলি, ‘এক কাপ’ বা ‘এক কাপ দেন।’ প্রায় সময়ই ‘এক পেয়ালা চা দেন’ এরূপ বলা হয় না। অথচ আমরা কাপ বা পেয়ালা চাই না, চাই চা। চা থাকে (পরিবেশন করা হয়) কাপেই, কাপ দেখে চা চিনি। দোকানদার যদি খালি কাপ দিয়ে দেয়, তাহলে কেউ তা গ্রহণ করবে না। স্যার বলেন, অনুরূপ ইলম বহন করে তার বাইরের পাত্র, আয়াত, হাদীস, কিতাব ইত্যাদি; কিন্তু ইলম নিজে এক অন্তর্নিহিত রূহ, যা কিছু বিশেষ মেহনত ছাড়া ধরা দেয় না। ইলম কেবল মুখস্থ জ্ঞান বা তথ্য নয়, বরং তা একটি নূর, যা হৃদয়ে উদিত হয় মেহনত, খালিস নিয়ত, এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে। কুরআন ও হাদীস ইলমের বাহক, কিন্তু সেই ইলম আহরণ করতে হলে তাকওয়া ও আমলের দরজা দিয়ে এগোতে হয়। স্যার বোঝাতে চেষ্টা করেন, মনের একাগ্রতা, আমলের নূর, এবং আত্মার মেহনত ছাড়া আসল ইলম অর্জন অসম্ভব।

🎤 ২৫০

একবার কোনো কথাবার্তার প্রসঙ্গে মাহফুজ ভাই বলেন, “আট রশির পীর সাহেব…” এই বাক্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্যারের চেহারায় এক বিরাট পরিবর্তন দেখা গেল। মুহূর্তের মধ্যে তিনি গম্ভীর হয়ে গেলেন, এবং চেহারায় এক ধরনের রাগ ও অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠল। মাহফুজ ভাই নিজেও স্যারের এই আচরণে কিছুটা হতচকিত হয়ে পড়েন। ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি নিয়ে স্যারকে জিজ্ঞেস করেন: “স্যার, আমার কি কোনো ভুল হয়েছে?” স্যার তখন সংযত কণ্ঠে কিন্তু দৃঢ়ভাবে বললেন: ”তুমি ‘সাহেব’ বললে কেনো?” ‘সাহেব’ তো একটি সম্মানসূচক শব্দ। কাউকে সম্মান দেখাতে গেলে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়। একজন বেদআতির কথা উল্লেখ করতে তাঁকে এই সম্মান প্রদর্শন কেনো, সাহেব শব্দ কেনো বললে?” এরপর স্যার আরও বলেন: কোনো বেদআতি ব্যক্তিকে সম্মান করা মানে হলো, দীনকে ধ্বংস করার কাজে অংশ নেওয়া। যাকে দীন থেকে বিচ্যুতি করার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে (যেমন বিদআতি), তাকে সম্মানসূচক উপাধি দিলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে। ‘সাহেব’, বা এধরনের শব্দের ব্যবহার তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা প্রকৃত সম্মান প্রাপ্তদের জন্য ব্যবহৃত হয়। যার কাজ বাতিল, যার দাওয়াত বিদআতের, তাকে বাহ্যিকভাবে ‘সাহেব’ বলাও, দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ তা আন্তরিক সম্মানের ইঙ্গিত দেয়, যা একটি ভ্রান্ত পথকে “পরোক্ষ বৈধতা” দিচ্ছে, এমনটা দ্বীন সহ্য করতে পারে না। এই কথার স্মরণ করতে গিয়ে মাহফুজ ভাই বলেন, এই প্রশ্নের মধ্যেই ছিল স্যারের ঈমানী বোধ, দীন রক্ষার স্পষ্ট মিযাজ এবং সুন্নতের প্রতি ভালোবাসার এক নিখাদ পরিচয়। এই কথাটি স্যার শুধু কথার সৌন্দর্যে বলেননি, বরং তা ছিল হক ও বাতিলের মাঝখানের সীমারেখাকে স্পষ্ট করে দেওয়া। স্যার বোঝাতে চেয়েছেন, দ্বীনের ক্ষেত্রে ভাষা ও শব্দের ব্যবহারও দ্বীনদারীর অংশ।

🎤 ২৫১

আহলে হাদিস সম্প্রদায়ের কিছু আলেম ওলামা ও শায়েখদেরকে যে তারা আলেম মনে করে, এপ্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেন, এদেরকে যে তারা আলেম শায়েখ মনে করে এটা তাদের কোনো গভীর পাপের প্রতিফল। পাশে বসা মাহফুজ ভাই, যিনি নিজেও একজন কট্টর আহলে হাদিস পরিবেশে বেড়ে ওঠা আহলে হাদিস পরিবারের একজন, জিজ্ঞেস করেন: ”স্যার, এই পাপটা কী? এটা কি আল্লাহওয়ালা এবং ফোকাহাদের প্রতি বিদ্বেশপ্রসূত কোনো গভীর (অন্তর্জাগতিক) পাপ?” স্যার দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দেন: ”হ্যাঁ। একদম সঠিক। আল্লাহওয়ালা ও ফোকাহাদের প্রতি বিদ্বেষ। এই বিদ্বেষ কেবল সাধারণ বিদ্বেষ নয়, বরং জগৎশ্রেষ্ঠ সকল ইমাম, ফোকাহা, এবং আল্লাহওয়ালাদের প্রতি চরম বিদ্বেষ তারা পোষণ করে।” ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহি, এমন যারা ইসলামী জ্ঞান, ফিকহ এবং আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে যুগের পর যুগ ধরে উম্মাহকে পথ দেখিয়েছেন, তাদের প্রতি চরম বিদ্বেষ এরা পোষণ করে। স্যার বোঝাতে চান, এটা তাদের হৃদয়ের গভীর পচন ও আত্মিক স্খলন, এক গভীর পাপ। এই পাপের ফলেই আল্লাহ পাক তাদের ওপর এমন গজব চাপিয়েছেন যে, তারা কিছু ফাসেক ও আত্মিক নূরবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদেরকে (তাদের প্রচারণা ও মিশনের ফাঁদে) আলেম ও শায়েখ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে, যা এক গভীর আধ্যাত্মিক অন্ধত্ব। যে জাতি ইলম ও রুহানিয়াতের আসল অভিভাবকদের অস্বীকার করে, তাদের নেতৃত্ব অবধারিতভাবেই ইলমহীনদের হাতে চলে যায়। আলোচনার একপর্যায়ে প্রসঙ্গ ওঠে সালাফী মিশন ও আরব দুনিয়ার কিছু দেশের বর্তমান হীনতাগ্রস্ত অবস্থার। স্যার বলেন: এরা যখন এই ফোকাহাদের ইজতিহাদ ও ফতোয়াকে অস্বীকার করে, তখন আল্লাহ পাক তাদের ঘাড়ের ওপর আমেরিকাকে চাপিয়ে দেন। এখন আমেরিকা যা বলে তাই মানে, আমেরিকাই এখন তাদের ইমাম। আমেরিকার প্রতিটি নির্দেশ মেনে চলে। (যারা একসময় নিজেদের ইমামদের অনুসরণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, আল্লাহ তাদের ওপর এমন বিজাতি ক্ষমতাকে চাপিয়ে দেন, যাদেরকে তারা নিজেদের ইমাম হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়।) আহলে হাদিসরা বিদ'আত প্রসঙ্গে অত্যন্ত কঠোর, এই কথাটি যখন আলোচনায় আসে, তখন স্যার বলেন, বেদআত তাড়াতে গিয়ে তারা শুধু বেদআতই নয়, আদবও তুলে ফেলে। আদব, রুহানিয়াত, ইখলাস, মুহাব্বত, সব ফেলে দেয়। মাথার চুল আঁচড়িয়ে পরিপাটি করতে গিয়ে তারা মাথার চামড়া শুদ্ধ তুলে ফেলে। তারা বিদ'আত দূর করতে গিয়ে এমন চরম পন্থা অবলম্বন করে যে, এর ফলে ইসলামের সৌন্দর্য, ঐতিহ্য এবং উম্মাহর হাজার বছরের স্বীকৃত আদব-ইখলাস, ও রুহানিয়াতকে ধ্বংস করে ফেলে। স্যার গভীর উপলব্ধি থেকে ইঙ্গিত দেন, আল্লাহওয়ালা ও ফুকাহাদের প্রতি বিদ্বেষ একটি আত্মিক জড়ত্বের ফল। বিদ্বেষের এই মেঘ যাদের অন্তরে জমে, তাদের ঈমানের নূর নষ্ট হয়ে পড়ে, এপর্যায়ে হক ও বাতিলের পার্থক্য তার সামনে ধরা পড়ে না।

🎤 ২৫২

একবার ১০ দিনের জোড়ে, ইজতিমার ময়দানে হযরত মাওলানা সায়ীদ আহমদ খান সাহেব, এর নিকট একজন ব্যক্তি এসে তার একটি স্বপ্নের কথা বললেন, যেটি ছিল ইমাম মাহদী আলাইহিস সালামকে নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই এমন স্বপ্ন শুনে অনেকেই অভিভূত হয়ে পড়েন, আবেগে ভেসে যান, ভবিষ্যতের কল্পনায় হারিয়ে যান। কিন্তু হযরত মাওলানা অত্যন্ত সরল ও স্পষ্টভাষায় বললেন: ”ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম কবে আসবেন না আসবেন, সেই চক্করে তুমি পড়ো না। তোমার কাজ তুমি করে যাও।” এই প্রসঙ্গ টেনে স্যার একবার বলেন: “এ ধরনের স্বপ্ন, আলোচনা, অতিরিক্ত চিন্তা ও ভবিষ্যতের আলামতের সঙ্গে ঘটনা মেলানো, সবই অনেক সময় শয়তানের এক সূক্ষ্ম ফাঁদ। যার ভেতর পড়ে মানুষ ইনঅ্যাক্টিভ (নিষ্ক্রিয়) হয়ে পড়ে, আমলহীন হয়ে যায়। সে খুব বড় এক ‘ফিকিরে’ আছে, কিন্তু বাস্তব জীবনের করণীয় থেকে সম্পূর্ণ গাফেল। ইমাম মাহদীর চিন্তায় এতটাই মগ্ন হয়ে পড়ে যে তার ইবাদত, দাওয়াত, আত্মশুদ্ধি, সবই যেন গৌণ হয়ে যায়।” স্যার ব্যাখ্যা করেন, এ ধরণের চিন্তার ফাঁদে পড়া মানুষ, প্রতিদিন দিন গোনে: মাহদী কখন আসবেন? প্রতিটি সমসাময়িক ঘটনা মিলিয়ে দেখে: এই বুঝি আলামত! এই বুঝি দাজ্জালের আগমন! অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে অন্যদের বোঝাতে থাকে: এই সময়টা স্পেশাল, এখন মাহদীর যুগ চলছে। বাস্তব দ্বীনি দায়িত্ব, আত্মশুদ্ধির প্রয়াস ভুলে গিয়ে শুধু ঐ কল্পনার মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকে। স্যার বলেন: “শয়তানের কৌশল তো এটাই, তাকে এমন এক আবেগে ডুবিয়ে দাও, যেন সে তার আসল করণীয় ভুলে যায়। একটা ‘বড়’ ভাবনার নামে তাকে বিভ্রান্ত করো, যেন আজকের প্রয়োজনীয় আমলটাই তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।” প্রাসঙ্গিক আলোচনায় স্যার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝাতে চান, ভবিষ্যতের অজানা বিষয় নিয়ে না ভেবে বর্তমানের দায়িত্ব ও করণীয়তে মনোযোগী হওয়াই প্রকৃত হিদায়াতের পথ। অনেক স্বপ্ন, আবেগ, ভাবনা, এসবের মধ্যেও শয়তান তার কৌশল লুকিয়ে রাখে, যেন মানুষ বাস্তব আমল থেকে দূরে সরে যায়। স্যার ইঙ্গিত দেন: ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম কবে আসবেন, সেটা আল্লাহর ইলমে গোপন। কিন্তু আমি আজকের দিনটা কীভাবে কাটালাম, সে হিসাব আমার জন্য নির্ধারিত। মহা চিন্তার নামে যদি আমি বর্তমান আমলের দরজাই বন্ধ করে ফেলি, তাহলে সেটা এক ভয়ংকর আত্মিক ফাঁদ ছাড়া কিছু নয়।

🎤 ২৫৩

মালদা থেকে দিল্লি পর্যন্ত ট্রেনে সফরকালে ওই সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলছিলো। ফলে রাস্তাঘাট ও স্টেশনজুড়ে গেরুয়া পোশাকধারী বহু যোগী চোখে পড়ছিল। আমিও তখন একটি গেরুয়া-সদৃশ জুব্বা পরে ছিলাম, পূর্বে এই জুব্বা পরেই স্যারের সাথে বহুবার সফর করেছি, জামাতে গিয়েছি, কিন্তু স্যার কখনো এর রঙ নিয়ে কিছু বলেননি। কিন্তু সেদিন পরিবেশ ছিল আলাদা। সেই দিন ট্রেনে, ও স্টেশনগুলোতে হিন্দু যোগীদের ব্যাপক উপস্থিতির মধ্যে আমার পোশাক যে একপ্রকার তাদের সাথে রঙের দিক থেকে মিলে যাচ্ছে, তা আমি খেয়াল করিনি। অথচ স্যার অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তা লক্ষ্য করেন। যদিও আমি বিষয়টি নিয়ে বিচলিত ছিলাম না, স্যার তা সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ট্রেনের মধ্যেই স্যার অত্যন্ত কোমল ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন: ”তোমার জামাটা চেঞ্জ করে নিলেই বোধ হয় ভালো।” স্যারের কথাটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং নিরুত্তাপ। আমি মনে মনে পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেও, স্যারের কথার সময়োপযোগী গুরুত্ব ও ইঙ্গিত আমি বুঝতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম, যেহেতু এখন পরা অবস্থায় আছি, ট্রেনেই পরিবর্তন করার দরকার নেই, দিল্লিতে পৌঁছে পরিবর্তন করব। স্যারের কথার উত্তরে আমি বললাম, "হ্যাঁ, এদের (যোগীদের) সাথে একই রকম লাগছে, দিল্লি গিয়ে পরিবর্তন করে নেব, ইনশাআল্লাহ।" স্যার হয়তো মুহূর্তের বাস্তবতা ও পরিবেশের হুকুম অনুযায়ী রঙের সামঞ্জস্যতা এড়ানোর জন্য তখনই পরিবর্তনের আশা করেছিলেন, আমি তা বুঝে উঠতে পারিনি। স্যার যাত্রাপথে এ বিষয়ে আর বিশেষ কিছু বলেননি। সে সময় নিজামুদ্দিন মারকাজে বাংলাদেশের জোড় চলছিল, বেশ ভিড় ছিল। স্যারের কথা আমার মনে ছিল, কিন্তু আমি ভেবেছিলাম গোসলের সময় পোশাক খুলে অন্য পোশাক পরে নেব। নিজামুদ্দিন মারকাজে পৌঁছে যখন আমি সেই জুব্বাতেই ঘোরাফেরা করছিলাম, স্যার কিছুটা কঠোর গলায় বললেন, ”তোমার জামাটা পরিবর্তন করার কথা ছিল!” স্বাভাবিকভাবে স্যার কখনো এমন বিরক্তির স্বরে কথা বলেন না। স্যারের এই ছোট কথাতেই স্যারের তখনকার মনোভাব সহজেই আঁচ করতে পারলাম এবং পরনের জুব্বাটি খুলে অন্য একটি পোশাক পরে নিলাম। স্যারের এই সাধারণ অথচ জোরালো নির্দেশনায় মনে হচ্ছিল শরঈ দৃষ্টিতে বৈধ পোশাক হলেও স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী সমাজের বার্তাও বিবেচনায় রাখা আবশ্যক। বিশেষত এমন দেশে যেখানে ধর্মীয় পরিচিতি স্পর্শকাতর, সেখানে মুসলমানের সাতন্ত্রতা বজায় রাখার জন্য পোশাকে ভারসাম্য রাখা শুধু প্রয়োজন নয়, দায়িত্বও বটে।

🎤 ২৫৪

হাসান হাবিব ভাই বলেন, এক জুমার দিন আসরের নামাজের পর আমি কাকরাইল মসজিদের ভেতরে স্যারকে দেখতে পেয়ে স্যারের কাছে গেলাম। নামাজ শেষে স্যার একাকী বসে আছেন, আত্তাহিয়্যাত অবস্থায় বসে আছেন, মনোযোগের সাথে কিছু পড়ছেন। আমার মনে হলো, হয়তো স্যার সেই দরূদ শরীফটি পাঠ করছেন, যেটির ফজিলত সম্পর্কে প্রসিদ্ধ- “যে ব্যক্তি জুমার দিনে আসরের পর ৮০ বার এই দরূদ পাঠ করবে, তার ৮০ বছরের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” হাসান হাবিব ভাই বলেন, এই প্রসঙ্গে উনার মনে একটি কথা এসে যায়, যা উনি কারও মাধ্যমে শুনেছিলাম -- মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব তার ‘জাল হাদীস’ গ্রন্থে এই হাদীসটিকে জাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও উনি সরাসরি সেই কিতাব পড়েননি, তবে কথাটি নির্ভরযোগ্য একজনের মুখে শুনেছেন। উনি বলেন, আমি স্যারের কাছে গিয়ে চুপচাপ বসে রইলাম। স্যার আমার দিকে একবার তাকালেন, কিন্তু আমল চালিয়ে যেতে থাকলেন। আমল শেষে আমি স্যারের কাছে নম্রভাবে জিজ্ঞেস করলাম: “স্যার, আপনি কি ওই দরূদ শরীফটি পড়ছিলেন যে জুমার দিন আসরের পর ৮০ বার পড়লে ৮০ বছরের গুনাহ মাফ হয়?” স্যার বললেন, “হ্যাঁ, ওইটাই।” আমি বললাম, “স্যার, শুনেছি মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব নাকি এই হাদীসটিকে জাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।” এই কথা বলার পর হঠাৎ স্যারের চেহারায় এক দৃঢ় রাগ ও ক্ষোভের ছাপ দেখা দিলো- স্যার প্রচণ্ড ক্ষেপে গেলেন, এমন ক্ষিপ্ত অবস্থায় আমি স্যারকে পূর্বে কখনও দেখি নাই। বিরবির করে কিছু বললেন, তবে তার গাম্ভীর্য ও তীব্রতার কারণে আমি তখন ঘাবড়ে গিয়ে কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। মনে হচ্ছিল, স্যার খুব কষ্ট পেয়েছেন। আমি ভয়ে উঠে চলে গেলাম। পরে স্মরণ করার চেষ্টা করলে স্যারের বলা কথার সারমর্ম এই ছিল -- এই হাদীসের সনদ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, আমাদের আকাবির ও বুযুর্গানে দ্বীন (যেমন হাকীমুল উম্মত থানভী রহমতুল্লাহ, মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভী রহমতুল্লাহ, মাওলানা জাকারিয়া রহমতুল্লাহ প্রমুখ) এই আমলটি করে এসেছেন এবং তা তাদের তরীকার অংশ হিসেবে প্রমাণিত। তাদের আমলের উপর আমাদের ভরসা থাকা উচিত।

🎤 ২৫৫

পোশাক শুধু শরীর ঢাকার জন্য নয়; এটি একটি সামাজিক ভাষাও। এক অঞ্চলে কোন পোশাক কারো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের পরিচায়ক, সেটা ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। এই বাস্তবতা বোঝা জরুরি। এপ্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একসময় স্যার উদাহরণ স্বরূপ বললেন-- “বাংলাদেশে শাড়ি মুসলমান নারী এবং হিন্দু নারী, উভয়ের মাঝেই বহুল প্রচলিত। এখানে একজন মুসলিম নারী শাড়ি পরলে তাতে ধর্মীয় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় না। কিন্তু ভারতে এর বিপরীত। ভারতে শাড়ি মূলত হিন্দু নারীদের সাংস্কৃতিক পোশাক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মুসলিম নারীরা সাধারণত সালোয়ার কামিজ পরেন। সেখানে যদি একজন মুসলিম নারী শাড়ি পরে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যান, তাহলে উপস্থিত লোকেরা তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্ত হতে পারে।” এই কথার সাথে সাথে স্যার আরেকটি বিষয় তুলে ধরেন-- “এক সময় বাংলাদেশে মুসলিম নারীরা কপালে টিপ দিতেন। কিন্তু এখন এই অভ্যাস নেই বললেই চলে। বর্তমানে কপালে টিপ দেওয়া, বিশেষ করে লাল টিপ, মূলত হিন্দু নারীদের সংস্কৃতির অংশ। তাই আজকের প্রেক্ষাপটে মুসলিম নারীর জন্য কপালে টিপ দেওয়া সাজসজ্জার অংশ হিসেবে ঠিক নয়। এটা তার ধর্মীয় পরিচয়কে অস্পষ্ট করে তোলে। মুসলমানের সাজগোজ এমন হওয়া উচিত, যাতে করে সে আলাদা হয়ে চেনা যায়, গুলিয়ে ফেলা না যায়।” এরপর স্যার এক ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করলেন-- “একটি মুসলিম নারী কপালে বড় লাল টিপ পরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। খানা পরিবেশনকারী ওয়েটার তাঁকে আলাদাভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি গরুর গোশতের কাবাব খাবেন কি না?’ কারণ সে বুঝতে পারছিল না, ঐ নারী হিন্দু না মুসলিম। এই বিভ্রান্তির উৎস ছিল কপালের লাল টিপ।” পরে স্যার পাগড়ির প্রসঙ্গে বললেন-- “বাংলাদেশে কালো পাগড়ি পরা যায়, এতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ইরানে গিয়ে কেউ যদি কালো পাগড়ি পরে, সেটা শিয়া আলেমদের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। সেখানে সুন্নি কেউ যদি এটা পরে, তা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।” স্যার নিজের জীবনের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন, যা তিনি আমেরিকা সফরের সময়ে নিজে ভোগ করেছিলেন। স্যার বললেন-- “আমি আমেরিকায় রাস্তায় হাঁটছিলাম, মাথায় কালো পাগড়ি ছিল। হঠাৎ একটি চলন্ত গাড়ি আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ির ভেতর থেকে একজন চিৎকার করে উঠলো, ‘এই আয়াটুললাহ!’, এই বলে পেপসির বোতল ছুড়ে মেরে দিলো আমার মাথায়।” স্যার বললেন, ঘটনার পর স্থানীয় সাথিরা বললো, কালো পাগড়ি এখানে (আমেরিকায়) অনেকের চোখে শিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কট্টরপন্থার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়, এখানে রাস্তায় পাগড়ি পরে বের হবে না, শুধু টুপি পরে বের হবে। এভাবেই স্যার পোশাক ও আচার-আচরণে সামাজিক প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করলেন। স্যার আরও বলেন-- “আমাদের দেশে পাগড়ি নানা রঙের হতে পারে। কিন্তু ভারতে রঙিন পাগড়ি আবার শিখ ধর্মাবলম্বীদের সাংস্কৃতিক প্রতীক। সেখানে মুসলমানদের এমন রঙিন পাগড়ি ব্যবহার বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে।” এসব আলোচনা থেকে স্যার বোঝাতে চেয়েছিলেন, ইসলামি পরিচয় শুধু কথায় নয়, আচরণে ও পোশাকে-পরিচ্ছদেও প্রকাশিত হওয়া উচিত। স্থানভেদে যে বিষয়টি নিছক রুচি বা অভ্যাস, অন্যত্র তা ধর্মীয় প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। একজন মুসলমানের উচিত, পোশাক ও সাজসজ্জায় নিজের পরিচয়কে পরিষ্কার রাখা, ও এমন কিছু পরিহার করা যা অন্য ধর্মের অনুসারীদের অনুকরণ বা বিভ্রান্তির কারণ হয়।

🎤 ২৫৬

একবার মুফতি ফয়জুল্লাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি - কে কেউ প্রশ্ন করলেন: ”পাগড়ি কত হাত লম্বা হওয়া উচিত?” তিনি উত্তরে বললেন: ”যত হাত হলে পাগড়ি মনে হয়।” (এমন যেন না হয় যে একেবারে ব্যাণ্ডেজ এর মতো সামান্য কিছু মাথায় জড়িয়ে রাখা হয়েছে, আবার এমনও না হয় যে ৫০ হাত লম্বা কাপড় জড়িয়ে। বরং এমন পরিমাণ হওয়া উচিত যাতে সেটিকে বাস্তবসম্মত এবং পাগড়ি বলা যায়।) এরপর উনাকে জিজ্ঞেস করা হলো: ”পাগড়ির রং কী হওয়া উচিত?” উনি বললেন: ”বিভিন্ন রং (বিভিন্ন রঙের হতে পারে।)” (উনার এই উত্তরের অর্থ এই নয় যে শরীয়তে পুরুষদের জন্য যেসব রং নিষিদ্ধ, সেগুলোকেও বৈধ বলা হয়েছে। বরং, শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকেই বিভিন্ন বৈধ রঙ ব্যবহার করা যেতে পারে) এই কথাগুলো যখন স্যার বলেছিলেন, তখন তিনি এক গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতার সাথে কথায় জোর দিয়ে বলেন: ”উনি (মুফতি সাহেব) একথা বলবেন না কেন? মুফতিই তো!…” স্যারের কথায় এরকম ইঙ্গিত ছিলো যে এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরতায় পূর্ণ উত্তরের ভেতরেই একজন প্রকৃত মুফতির পরিচয় লুকায়িত। কারণ, তিনি এমন উত্তর দিয়েছেন যা একদিকে শরীয়তের সীমা ছাড়ায় না, আবার অপরদিকে সাধারণ মানুষের ফিতরতের (স্বভাবগত অনুভূতি ও বাস্তবতা) সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। স্যার বোঝাতে চান, মুফতী সাহেবের এই উত্তরে আছে ভারসাম্য, প্রজ্ঞা এবং বাস্তবতার বিবেচনা, যা একজন আলিমের বিশেষ গুণ। কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যায় বা কঠোর সীমারেখায় আটকে না থেকে শরীয়তের মূল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সহজ, সংবেদনশীল ও বাস্তবসম্মত জবাব, এটাই “ফিকহি এলেমের” নিখুঁত সৌন্দর্য।

🎤 ২৫৭

এক বয়ানে স্যার বলছিলেন, আজকের দুনিয়ার যেকোনো মাদ্রাসার যেকোনো পরীক্ষায় যদি কোনো এক সাহাবি অংশ নেন, তবে তিনি শুধু ফেলই করবেন না, বরং ‘জিরো’ পেয়ে ফেল করবেন। কারণ, আজ যেসব বিষয়ে মাদ্রাসায় পড়ানো হয়, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে সেগুলোর অস্তিত্বই ছিল না। প্রথম ক্লাসে মক্তব থেকে শুরু হয় 'আলিফ, বা, তা, ছা’ শেখা। অথচ সাহাবাদের যুগে এই পড়াশুনা ছিলো না। আজ যেটা দ্বারা 'বা' ‘তা' ও ‘ছা’ আলাদা হয়, আরবী অক্ষরগুলোর নিচে উপরের ‘নোকতা’, সেসব নিছক পরবর্তীকালের সৃষ্টি। যদি নোকতাই না থাকে, তাহলে 'জিম, হা, খা', এসব চেনা যাবে কীভাবে? যদি মূল অক্ষরই না থাকে, তাহলে বাকিটা তো শুরুই হয় না। তারপর, আজ আমরা যেসব শাস্ত্রে (ইলমে) গর্ব করি, তাফসির, হাদিস, ফিকাহ, নাহু-সারফ, এইসবের সংজ্ঞা যদি সাহাবাদের সামনে রেখে জিজ্ঞেস করা হয়, একজন সাহাবিও উত্তর দিতে পারবেন না। কোনও এক জন সাহাবী কে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে ‘হাসান হাদিস আর জইফ হাদিসের মধ্যে পার্থক্য কী?’ একজন সাহাবিও উত্তর দিতে পারবেন না। তাহলে প্রশ্ন আসে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট থেকে তারা কী শিখেছিলেন? তাদের এলেম টা আসলে কী ছিল? অক্ষর জানতেন না, সংজ্ঞা জানতেন না, গ্রামার জানতেন না, তাফসির-ফিকাহের বর্তমান কাঠামো জানতেন না, তাহলে সাহাবিদের ‘ইলম’ আসলে কী ছিল? সাহাবিরা জানতেন না ‘ইলম’ কী, কিন্তু তারা ছিলেন ইলমের জীবন্ত রূপ। তারা জানতেন না ‘তাফসির’ কী, কিন্তু তারা বুঝতেন কুরআনের প্রাণ। তারা জানতেন না ‘ফিকাহ’ কী, কিন্তু তারা ছিলেন আল্লাহর হুকুমের অনুসারী প্রতিটি পদক্ষেপে। স্যার বলেন, তাদের এলেম ছিলো, আল্লাহর সাথে এক গভীর সম্পর্ক, এমন এক সম্পর্ক, যা থেকে জন্ম নিতো আল্লাহর ইচ্ছাকে বোঝার ক্ষমতা। আর সেই ইচ্ছানুযায়ী চলতে তাদের অন্তর পেতো শান্তি, তৃপ্তি, এক অপরিমেয় আনন্দ। এটাই ছিল তাদের এলেম।

🎤 ২৫৮

স্যার বলতেন, অনেক বড় জিনিসের পরিচয় দিতে গেলে, সেটাকে একটা ছোট সংজ্ঞার গন্ডির মধ্যে ঢোকানো যায় না। সহজ জিনিসের সংজ্ঞা সহজ হয়, কিন্তু অর্থ যত গভীর হয়, তার সংজ্ঞা তত কঠিন হয়। আমরা কোনো জিনিসের সীমানা দেখিয়ে তাকে চিনি। ম্যাপে যেমন বলা হয়, এইটা ঢাকা, এইটা বাংলাদেশ, এইটা আমেরিকা, তেমনি সংজ্ঞাও হচ্ছে এক ধরনের বর্ডারলাইন। কিন্তু যদি কোনো কিছুর সীমা-পরিসীমাই না থাকে, তবে তাকে সংজ্ঞা দিয়ে ধরা যায় না। এইজন্যই আল্লাহর পরিচয় এ বলা হয়েছে: তার সদৃশ কিছুই নেই। আল্লাহর পরিচয় নেতিবাচক ভাষায়, "এইটা না, ওইটা না" এজাতীয় কিছু বলা হয়, কিন্তু ইতিবাচকভাবে বলা মুশকিল, "এইটাই আল্লাহ।" কারণ, আল্লাহর সত্তা সীমাহীন, অনন্ত। তাকে সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না, চিনতে হয়। স্যার বলেন, তেমনি সাহাবিদের এলেমও সীমাবদ্ধ কোনো সংজ্ঞার মধ্যে বন্দি ছিল না। আজ আমরা কুরআন-হাদিসভিত্তিক যেসব শাস্ত্র নিয়ে গর্ব করি, সেগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শাস্ত্রের কাঠামোকে যদি আমরা এলেমের পূর্ণতা মনে করি, তাহলে আমরা সাহাবিদের এলেমের রূপরেখা হারিয়ে ফেলব। স্যার বোঝাতে চান, এলেম মানে শুধু তথ্য নয়, এলেম মানে আল্লাহর দিকে যাত্রা। এলেম মানে মুখস্থ সংজ্ঞা নয়, এলেম মানে হৃদয় দিয়ে বুঝে ফেলা, কোনটা আল্লাহ চায়, আর কোনটা চায় না। এটা এমন এক দ্যুতিময় উপলব্ধি, যেখানে হৃদয় ও আমল আনন্দের সাথে আল্লাহর দিকে ফিরে।

🎤 ২৫৯

স্যার বলতেন, সাহাবাদের জ্ঞান বা 'এলেম' ছিল এক বিশেষ ধরনের উপলব্ধি, যা কেবল তথাকথিত মালুমাত বা পাণ্ডিত্য ছিল না। এটি ছিল আল্লাহ তাআলার সাথে এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক, যার মাধ্যমে তাঁরা আল্লাহর ইচ্ছা বুঝতে পারতেন এবং সেই ইচ্ছা পালনে নিজেদের অন্তরে অনাবিল আনন্দ অনুভব করতেন। স্যার একটি সুন্দর উপমার মাধ্যমে এই বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। একজন মা যেমন তার সন্তানের প্রতিটি কান্নাকে আলাদা আলাদাভাবে বুঝতে পারেন, যদিও সন্তানের ভাষা কেবল একটাই, কান্না। বাচ্চা জাগতে চাইলেও কাঁদে, ঘুমাতে চাইলেও কাঁদে, ঠান্ডায় কাঁদে, গরমেও কাঁদে, খেতে চাইলেও কাঁদে, এমনকি না খাওয়ার ইচ্ছাও কান্না দিয়েই প্রকাশ করে। প্রতিটি কান্নার সুর এক হলেও একজন মা তার সন্তানের কান্নার ভিন্ন ভিন্ন অর্থ অনুধাবন করতে পারেন। বিভিন্ন হালতে বাচ্চার একই ধরনের কান্নার সুরের ভিন্ন ভিন্ন তফসীর মায়ের কাছে পরিষ্কার। তিনি শুধু সন্তানের প্রয়োজনই বোঝেন না, বরং সেই প্রয়োজন পূরণ করতে পেরে তিনি নিজে আনন্দিত হন। স্যার বলেন, মা যখন বুঝতে পারেন বাচ্চা দুধ খেতে চাইছে তাই কাঁদছে, তখন তিনি তাকে দুধ দেন। এই কাজটি করতে তাঁর মনে কোনো বিরক্তি আসে না, বরং ভালো লাগে। আবার, বাচ্চা কান্না করছে তো মা টের পেয়ে যান ও কোলে উঠতে চাইছে, মা ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও, এমনকি নিজের জ্বর বা অসুস্থতা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়িয়ে তাকে কোলে তুলে নেন। এই কাজটিতেও তিনি পরম আনন্দ পান। এটিই হলো সন্তানকে গভীরভাবে চেনা। সাহাবায়ে কেরামের 'এলেম'ও ছিল ঠিক এমনই। তাঁরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যে থেকে আল্লাহ তাআলা তাঁদের কাছে কী চান, তা বুঝতে পারতেন। সেই চাওয়া পূরণের জন্য তাঁরা নিজেদের প্রস্তুত করতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছা পালনে এক গভীর আনন্দ অনুভব করতেন। এই সবকিছু মিলেই ছিল তাঁদের 'এলেম'। স্যার বিষয়টি পরিষ্কার করে দেন যে, আজকাল আমরা যেগুলোকে 'এলেম' বলি, যেমন বিভিন্ন হাদিস, তফসীর, ফিকাহ, ইত্যাদি এগুলো মালুমাতের বিভিন্ন শাখা, সেগুলো আসলে প্রকৃত 'এলেম'-এ পৌঁছানোর একটি পথ মাত্র, স্বয়ং 'এলেম' নয়। প্রকৃত 'এলেম' হলো আল্লাহর সাথে সেই গভীর সম্পর্ক, তাঁর ইচ্ছাকে বোঝা এবং তা পালনে আত্মিক তৃপ্তি ও আনন্দ লাভ করা।

🎤 ২৬০

স্যার বিভিন্ন বয়ান ও মোজাকারায় প্রসঙ্গক্রমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদীসটা বলতেন-- “আমরা নিরক্ষর উম্মত, লিখিও না, গুনিও (হিসাব করা) না।” “إنا أمة أمية، لا نكتب ولا نحسب” এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেন, আমরা যেসব উপকরণকে বর্তমানে 'এলেম' বলি, সেগুলো সাহাবাদের কাছে তেমনভাবে ছিল না। এর অর্থ এই নয় যে তাঁদের এলেম ছিল না, বরং তাঁদের এলেম ছিল এমন এক গভীর উপলব্ধি, যা প্রচলিত লিখন-পঠনের গণ্ডির ঊর্ধ্বে ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে সাহাবায়ে কেরাম যে এলেম অর্জন করেছেন, তার কোনো নির্দিষ্ট নাম, সুরত, সংখ্যা বা সংজ্ঞা ছিল না। সেখানে 'ফিকহ' বা 'হাদিস' নামক পৃথক কোনো বিষয় ছিল না, বরং সমগ্র জীবন ও দ্বীন ছিল তাঁদের এলেমের আধার।

🎤 ২৬১

স্যার বলেন, বর্তমানে কেউ যখন এলেম অর্জনের জন্য কোনো মাদ্রাসায় ভর্তি হতে যায় এবং তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, "আপনি কী শিখতে চান?", তখন যদি সে উত্তর দেয়, "আমি ফিকহ শিখতে চাই", তবে এই কথাতেই বোঝা যায় যে সে প্রকৃতপক্ষে এলেমের উপযুক্ত নয়। সে আসলে কিছু 'মালুমাত' বা তথ্য অর্জন করতে চায়। স্যার সহজভাবে বুঝিয়ে বলেন, মালুমাতের সঙ্গে এলেমের সম্পর্ক অনেকটা ঘাসের সঙ্গে দুধের সম্পর্কের মতো। ঘাস দুধের উৎস হতে পারে, কিন্তু ঘাস নিজেই দুধ নয়। ঘাস থেকে দুধ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং এর জন্য বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন, যা মানুষের জ্ঞানের প্রায় বাইরে। একটি ষাঁড় প্রচুর ঘাস খেলেও এক ফোঁটা দুধও দিতে পারে না। অন্যদিকে, গাভী দুধ দিতে পারে, তবে সব সময় নয়। গাভীর মধ্যে একটি বিশেষ 'হালত' বা 'কাইফিয়ত' থাকা চাই, গাভীর যদি অভ্যন্তরীণ সেই হালত থাকে, তবেই সে ঘাস থেকে দুধ উৎপন্ন করতে পারে। এই দুধ কোথা থেকে এসেছে? ঘাস থেকে নাকি গাভীর যোগ্যতা থেকে? এই প্রশ্ন রেখে স্যার বলেন, এই দুই বিষয়কে আলাদা করা কঠিন। স্যার উল্লেখ করেন, এখানে ঘাসের চেয়ে গাভীর যোগ্যতার অধিকার বেশি। কারণ গাভী অনেক সময় ঘাস ছাড়াও অন্যান্য জিনিস খেয়েও ভালো দুধ দেয়। আবার ছাগল সিগারেটের গোড়া, প্যাকেটের খোসা, এমনকি নাইলনের মোজা, দৈনিক পত্রিকা ইত্যাদি খেয়েও ভালো দুধ দেয়। এই দুধ আসলে আসে ছাগল বা গাভীর নিজস্ব বিশেষ যোগ্যতা বা বিশেষ হালাত থেকে। ঘাস বা অন্যান্য খানা উপকরণ কেবল সহায়ক মাধ্যম। স্যার বলেন, ইলমের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। কিতাব পড়তে পারা, ব্যাখ্যা করতে পারা, তথ্য সংগ্রহ করতে পারা, মালুমাত হাসিল হওয়া হতে পারে, কিন্তু যদি তার মধ্যে ইলম গ্রহণের যোগ্যতা না থাকে, ‘বিশেষ ওই হালাত’ না থাকে, তাহলে সত্যিকারের এলেম তার অন্তরে নাজিল হবে না। স্যার বোঝাতে চান, ঘাস একটা বাহ্যিক উপকরণ, কিন্তু আসল হলো প্রাণীর অন্তরীণ যোগ্যতা ও হালাত। সাহাবায়ে কিরাম ছিলেন নিরক্ষর, কিন্তু তাদের অন্তরে ছিল পরিশুদ্ধ, এবং কার্যকর ইলম। বই, বিভাগ ও মালুমাত কেবল বাহ্যিক উপকরণ, ইলম পাবার জন্য দরকার নিজের ওই বিশেষ হালাত (যোগ্যতা)। নয়তো মালুমাত কেবল ঘাসই থেকে যাবে, তা থেকে দুধ বের হবে না।

🎤 ২৬২

এক মোযাকারায় স্যার বলেছিলেন-- “তালিবে ইলম যদি তার অন্তরকে আগে খালি না করে, যদি সে মনে করে ‘আমি জানি’, ‘আমি বুঝি আমি কী শিখতে চাই’, তাহলে তার ইলমের আরম্ভই জাহালতের উপর ভিত্তি করে গঠিত। সত্যিকার তালিব তো সে-ই, যে জানে, ‘আমি জানি না’।” স্যার ব্যাখ্যা করলেন, সূরা বাকারা কীভাবে আল্লাহ তাআলা এলেমের এ পাঠ দিয়েই শুরু করেছেন: “আলিফ-লাম-মীম। এই সেই কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই”। স্যার বলেন, “الٓمّٓ”, এটা দিয়ে আমরা কী বুঝি? কিছুই না। কেউই কিছু বুঝে না। কিন্তু তারপরেই আল্লাহ বলছেন, “لَا رَيْبَ فِيهِ”, এতে কোনো সন্দেহ নেই! এখানেই এলেমের মৌলিক দর্শন নিহিত, আমি কিছুই জানি না, কিছুই বুঝি না, কিন্তু যিনি শিক্ষা দিবেন, তার উপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। কি শিখাবেন, কখন শিখাবেন, কিভাবে শিখাবেন, আমি কিছুই জানি না। আমি শুধু তার দরজায় দাঁড়িয়ে আছি, হাত পেতে আছি। স্যার তখন প্রসঙ্গ আনলেন, হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন এলেম হাসিলের উদ্দেশ্যে খিজির আলাইহিস সালাম-এর কাছে গেলেন, তখন কী বলেছিলেন? “তিনি বললেন, আমি কি আপনার অনুসরণ করতে পারি, যাতে আপনি আমাকে সেই এলেম শেখান, যা আপনাকে শিখানো হয়েছে?” هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَىٰ أَن تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًا স্যার ইঙ্গিত করলেন-- মূসা (আ.) বলেননি, “আপনি যে এলেম অর্জন করেছেন, তা আমাকে দিন”। বরং বলেছেন, “مِمَّا عُلِّمْتَ”, “যা আপনাকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে”। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি কোনো নির্দিষ্ট বিষয় চাননি, বলেননি, ‘আমাকে এইটা শিখান’, বরং বললেন, ‘আপনাকে যা দান করা হয়েছে, তা থেকে কিছু আমাকে দিন’। স্যার বোঝান, এটাই তো সত্যিকারের তালিবের ভাষা, “আমি জানি না আমি কী শিখব, আপনি জানেন।” স্যার বলেন, ধরে নেওয়া যাক, মুআয ইবনে জাবাল রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু যিনি সাহাবীদের মধ্যে বড় মুফতি হিসেবে পরিচিত, যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে প্রশ্ন করতেন, “তুমি কী শিখতে চাও?” তিনি কখনো বলতেন না, “আমি ফতোয়া শিখতে চাই” বা “আমি ফিকহ শিখতে চাই”। বরং তার উত্তর হতো, “আমি জানি না”। এই আলোচনায় স্যার একটি মৌলিক আদবের দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন-- “যে তালিব ওস্তাদকে বলে, ‘আমাকে হাদীস শিখান’, সে তো ওস্তাদকেই নির্দেশ দিচ্ছে। তাহলে ওস্তাদ কে? আর তালিব কে? যে নিজেই বলে দেয় ‘আমি কী শিখতে চাই’, সে তো নিজেরাই শিক্ষক হয়ে বসে আছে! তালিব হবে সে-ই, যে নিজের অন্তর খালি করে, বলে, ‘আপনি যা যথার্থ মনে করেন, তাই আমাকে শিখান।’ তবেই সে শিখবে।” ইলমের দরজায় প্রবেশ করতে হলে আগে নিজের ”জানি” দাবিকে ছেড়ে দিতে হয়। ”জানি না”, এই স্বীকারোক্তি দিয়েই ইলমের যাত্রা শুরু হয়। স্যার স্পষ্ট করেন, যিনি জানেন না, এবং জানেন তিনি জানেন না, তার জন্যই উম্মুক্ত থাকে আল্লাহর হিদায়াতের দরজা।

🎤 ২৬৩

স্যার এলেমের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন: এলেম মানে তথ্য জমা বা তথ্য জানা (মালুমাত) নয়, এলেম হচ্ছে আল্লাহ পাকের সাথে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা। যে সম্পর্ক যার যত বেশি গভীর হবে, সে নিজেকে এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে তত বেশি অযোগ্য মনে করবে। প্রকৃত এলেমের অধিকারী ব্যক্তি নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অধিক সচেতন থাকেন এবং অহংকারমুক্ত হন। এপ্রসঙ্গে আলোচনায় স্যার খলিফা হজরত ওমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহুর “খুতবাতুল জাবিয়াহ” থেকে প্রসঙ্গ আনেন। (সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের পার্শ্ববর্তী এক ঐতিহাসিক এলাকা, জাবিয়াহ। এই স্থানেই এক অবিস্মরণীয় খুতবা প্রদান করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা, হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। ইতিহাসে এই খুতবা পরিচিত “খুতবাতুল জাবিয়াহ” নামে।) সে সময় ইসলাম চতুর্দিকে বিজয় লাভ করছিল। একের পর এক এলাকা মুসলিম শাসনের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছিল। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিজিত অঞ্চলের বিভিন্ন বাহিনীর নেতৃস্থানীয় সাহাবিদের নিয়ে জাবিয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। স্যার খলিফা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, সেখানে খলিফা তার খুতবায় বলেন: "কোরআন শরীফ সম্বন্ধে যার কোনো প্রশ্ন আছে, সে যেন উবাই বিন কা'বের (রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু) নিকট যায় (আল্লাহ তা'আলা উনাকে কোরআনের বিশেষ জ্ঞান দান করেছিলেন)। ফিকাহ সম্পর্কে যার কোনো প্রশ্ন আছে, সে যেন মু'আজ ইবনে জাবালের (রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু) কাছে যায়। ফরায়েজ (উত্তরাধিকার আইন) বিষয়ে কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে, সে যেন যায়েদ ইবনে সাবেতের (রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু) কাছে যায়। আর যার টাকা-পয়সার দরকার আছে, সে যেন আমার নিকট আসে।" স্যার বোঝান, মুসলিম জাহানের সর্বোচ্চ বাক্তি হওয়া সত্ত্বেও হযরত উমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু নিজেকে ইলমের কোনো বিশেষ যোগ্যতার অধিকারী মনে করেননি। তিনি নিজেকে কোরআন, ফিকাহ বা ফরায়েজের মতো মৌলিক ইসলামী জ্ঞানগুলোর জন্য অযোগ্য মনে করে সাহাবায়ে কেরামের সেইসব বিশেষজ্ঞদের দিকে মানুষকে নির্দেশ করেছেন। অথচ তিনি ছিলেন ইসলামের এক স্তম্ভস্বরূপ, যার এলেম, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা আজও অতুলনীয়। দুনিয়াবি সম্পদ সম্পর্কে সাহাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্যার এভাবে বোঝান, সাহাবাদের যুগে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে, টাকা-পয়সা বা দুনিয়াবি সম্পদ 'সাধারণ' বা 'ফালতু' লোকের কাছে থাকে, আর তা কোনো 'ভদ্র লোকের' কাছে থাকা উচিত নয়। এই ধারণাটি তাদের দুনিয়াবিমুখতা এবং আখিরাতমুখী জীবনযাত্রার এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। হযরত উমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু নিজেও এই মানসিকতা ধারণ করতেন। উনার বক্তব্য স্পষ্টভাবে বোঝায়, তিনি এলেমের আসনে বসা নয়, বরং এলেমদারদের কদর করার আসনে ছিলেন। তাই তিনি বলেন: "টাকা-পয়সার জন্য যেন আমার কাছে আসে, কেননা আমি এইগুলি বহন করতে পারি।" অর্থাৎ, তিনি নিজেকে অর্থসম্পদের মতো (তুচ্ছ) দুনিয়াবি ভার বহনের জন্য যোগ্য মনে করতেন, কিন্তু ইলমের মতো মহৎ বিষয় নয়। তিনি নিজেকে ইলমের ব্যাপারে অযোগ্যই মনে করেছেন। ওমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহুর ইন্তেকালের পর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু বলেছিলেন: ❝আজ দুনিয়া থেকে এলেমের দশ ভাগের নয় ভাগ উঠে গেল।❞ কী অসাধারণ উক্তি! যে মানুষ নিজেকে এলেমের জন্য অযোগ্য ভাবতেন, তাঁর মৃত্যুতে সাহাবীরা এলেম হারিয়ে যাওয়ার শোক প্রকাশ করেন। এই উক্তিটি হযরত উমর রাদিআল্লাহু তাআলা আনহুর এলমের গভীরতা ও তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের এক সুস্পষ্ট প্রমাণ। অথচ উনি নিজে কখনও নিজেকে এভাবে দেখেননি, বরং সর্বদা বিনয়ের সাথে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন। স্যার স্পষ্ট করেন, এটাই হলো সত্যিকারের এলেম। স্যার এই আলোচনার মাধ্যমে এলেমের প্রকৃত মর্মকে এভাবে তুলে ধরেন: এলেম কেবল কিতাবি জ্ঞান নয়, বরং তা হলো, আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও বাধ্যতা, আল্লাহর বান্দা হিসেবে নিজের অযোগ্যতা উপলব্ধি করা, এবং আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হওয়ার জন্য প্রবল আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা। এই সব কিছু মিলেই গড়ে ওঠে সত্যিকারের 'এলেম'।

🎤 ২৬৪

স্যার এক বয়ানে 'এলেম' এবং 'জ্ঞান' (মালুমাত/ইনফরমেশন) এর মৌলিক পার্থক্য অত্যন্ত জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, এদের পাত্রই ভিন্ন। 'এলেম'-এর পাত্র হলো মানুষের ক্বলব (অন্তর/হৃদয়), আর 'জ্ঞান'-এর পাত্র হলো মানুষের দেমাগ (মস্তিষ্ক/ব্রেন)। এই পার্থক্য বোঝাতে স্যার একটি উপমা ব্যবহার করেছেন। একজন পাউডার দুধ আনার জন্য বাজারে যাচ্ছে কাগজের ঠোঙ্গা নিয়ে, আরেকজন গ্রামের এক সহজ-সরল মানুষ, যিনি পাউডার দুধ সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখেন না, একটি কাগজের ঠোঙ্গা নিয়ে বাজারে যাচ্ছেন দেখে তাকে জিজ্ঞেস করল, "ঠোঙ্গা নিয়ে কী আনতে যাও?" সে উত্তর দিল, "দুধ আনতে যাচ্ছি।" প্রশ্নকর্তা লোকটি স্বাভাবিক তরল দুধকেই দুধ হিসেবে জানে, তাই অবাক হবে, "দুধ আনতে যাচ্ছো? কাগজের ঠোঙ্গায় কীভাবে দুধ আনবে?" এই উপমার মাধ্যমে স্যার বোঝাতে চেয়েছেন যে, পাত্রের সাথে পাত্রে ধারণ করা বস্তুর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তরল দুধের জন্য কাগজের ঠোঙ্গা যেমন উপযুক্ত পাত্র নয়, তেমনি এলেমের জন্য মানুষের দেমাগ কোনভাবেই উপযুক্ত পাত্র নয়। এলেম ধারণের জন্য প্রয়োজন পবিত্র ক্বলব। এর বিপরীতে, জ্ঞানের পাত্র হলো মানুষের দেমাগ, ক্বলব নয়। স্যার বলেন, সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু বলেছিলেন, "যে কারো অনুসরণ করতে চায়, সে যেন সাহাবীদের অনুসরণ করে, যারা দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে গেছেন।" তাদের বৈশিষ্ট্য কী ছিল? ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন: * 'আব্বারাহা কুলুবান' (أَبَرَّهَا قُلُوباً): তাদের ক্বলব ছিল সবচেয়ে বেশি পাক (পবিত্র)। * 'আ'মাকাহা ইলমান' (أَعْمَقَهَا عِلْماً): তাদের এলেম ছিল সবচেয়ে বেশি গভীর। * 'আকাল্লাহা তাকাল্লুফান' (أَقَلَّهَا تَكَلُّفاً): তাদের জীবন ছিল সবচেয়ে বেশি সরল-সাদাসিধে। স্যার অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলেন যে, এই তিনটি কথার সাথে জাগতিক জ্ঞানের (পাণ্ডিত্য, দর্শন, গণিত ইত্যাদি) কোনো সম্পর্ক নেই। একজন খ্যাতিমান চোর-ডাকাত বা অপরাধীও অত্যন্ত প্রতিভাবান বিজ্ঞানী বা দার্শনিক হতে পারে, হয়েছেও। স্যার এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, মনের অপবিত্রতা বা ক্বলবের দূষণ জ্ঞান বা পাণ্ডিত্যের পথে কোনো অন্তরায় নয়। কিন্তু, ওইরকম একটি অপবিত্র ক্বলব দিয়ে ’এলেম' অর্জন করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা'আলা সেই ক্বলবেই এলেম ঢালেন, যা পবিত্র। ক্বলব যত বেশি পাক হবে, তত বেশি এলেম সেখানে প্রবেশ করবে। স্যার বলেন, এই তথাকথিত মালুমাতের উদ্দেশ্যই হলো দুনিয়াবি বিনিময়, হয় অর্থ, না হয় প্রতিপত্তি (খাতির)। অর্থাৎ, এই জ্ঞান কেন চাওয়া হয়? হয় টাকার জন্য, নয়তো সম্মান-প্রতিপত্তির জন্য। অন্যদিকে, আল্লাহর পক্ষ থেকে যে 'এলেম' আসে, তা যত বেশি কেউ অর্জন করে, সে তত বেশি অপরিচিতি পছন্দ করে। সে না টাকা চায়, না সম্মান চায়, বরং একমাত্র আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়াই তার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা। স্যার পরিষ্কার করেন, সম্পূর্ণ ভিন্ন এই দুটি জিনিস: একটি ক্বলবের পবিত্রতা ও আমলের প্রেরণা নিয়ে আসে, আর অন্যটি কেবল তথ্যের সমষ্টি এবং দুনিয়াবি স্বার্থের সাথে জড়িত।

🎤 ২৬৫

এলেমের গভীরতা কী, তা বোঝাতে স্যার আবু তালহা রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু, এর ঘটনা বর্ণনা করেন। একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে তিনি উপস্থিত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরআন শরীফের একটি আয়াত তেলাওয়াত করলেন: "لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ" [তোমরা কখনো পূর্ণতা (সচ্চরিত্রতা/পরহেযগারি) লাভ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা নিজের প্রিয় বস্তু আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো।] আবু তালহা রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু আয়াত শুনে তাৎক্ষণিকভাবে জিজ্ঞেস করলেন, "আল্লাহ তা'আলা কি আমাদের প্রিয় জিনিস চান?" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "হ্যাঁ।" তখন তিনি বললেন, "আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস হলো আমার বাগান 'বাইরুহা'।" এটি ছিল অত্যন্ত মূল্যবান একটি খেজুর বাগান, যেখানে সুপেয় পানির কূপও ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এই বাগানে যেতেন এবং এর পানি পান করতেন, যা বাগানটির মূল্য ও মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। আবু তালহা রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহু দৃঢ়চিত্তে বললেন, "এটিই আমার সবচেয়ে প্রিয়, আমি এটিই আল্লাহর রাস্তায় সাদকা করব।" এবং তিনি তা-ই করলেন। স্যার উল্লেখ করলেন, এলেমের গভীরতা এইটা, শুধু শুনলেন, তা বুঝলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আমল করলেন। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে তাকে বিশেষভাবে এই আমলটি করতে বলেছেন তা নয়, বলেননি। তিনি নিজেই নিজের নিকট তফসির করলেন, এই আয়াত তার জন্য নাযিল হয়েছে এবং তিনি এর ওপর আমল করতে আগ্রহী হলেন। স্যার এর বিপরীতে আধুনিক 'এলেম' বা তথাকথিত জ্ঞানচর্চার একটি চিত্র তুলে ধরেন। ধরা যাক কোনো আলেমকে উপরোক্ত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি হয়তো এর ব্যাখ্যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা দেবেন। আয়াতটি কখন নাযিল হয়েছে, এর শানে নুযুল কী, কোন কোন মুফাসসির এ বিষয়ে কী বলেছেন, তাদের অভিমত কী, এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা, এসব তথ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় পার করবেন। আর যদি তিনি এক ধাপ এগিয়ে থাকেন, তবে সেই ঘণ্টার পর ঘণ্টার বক্তৃতার জন্য বিশাল অংকের ফিও দাবি করবেন। স্যার বলেন, আবু তালহা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু কিছু বলেননি, বিস্তারিত তফসিরে যান নাই, তবে নিজের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দিলেন। এটাই ছিল এলেম, আয়াত শোনার সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ে গ্রহণ, এবং তৎক্ষণাৎ আমল। উনাকে কেউ বলেননি, “তুমি এই বাগান দান করো।” তিনি নিজেই হৃদয়ের গভীরতা থেকে বুঝলেন, আল্লাহ আমার কাছেই বলছেন। স্যার বলেন, “এটাই এলমের গভীরতা।”

🎤 ২৬৬

একটি বয়ানে স্যার বলেন, আল্লাহর কোনো নিয়ামত বা অনুগ্রহ যখন অন্তরে আনন্দ সৃষ্টি করে, সেই আনন্দই হলো শুকর বা শুকরিয়া (এটি শুধু মুখের “আলহামদুলিল্লাহ” নয়, বরং অন্তরের এক গভীর উপলব্ধি।) অনেক সময় মানুষ উত্তম কোনো জিনিস পায়, বড় এক নিয়ামতের মালিক হয়েও বুঝতে পারে না যে এটি আদৌ বড় কিছু। মূল্য উপলব্ধির অভাবেই সে শুকর আদায় করে না। অথচ যদি সে ঠিকমতো অনুধাবন করত, কি পেয়েছি, কে দিয়েছে, কত বড় সম্পদ, তাহলে নিশ্চয়ই তার অন্তর কেঁপে উঠত, চোখে পানি আসত, আর শুকরিয়া আদায় করত। এই প্রসঙ্গে স্যার এমন একটি গল্প বলেন, যা হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। এক দরবেশ, আল্লাহ পাকের ঘনিষ্ঠ বান্দা, বড় ওলি আল্লাহ ছিলেন। যিনি কয়েকদিন ধরে উপবাসে ছিলেন, ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছিলেন। শহরে কিছুই পাচ্ছিলেন না খাওয়ার মতো। তখন ভাবলেন, শহরের বাইরে চলে যাই, জঙ্গলে গিয়ে গাছের পাতা খেয়ে অন্তত পেট বাঁচাই। সেই যুগে শহরের চারপাশে উঁচু দেয়াল থাকত, প্রবেশ বা প্রস্থান ছিল নির্দিষ্ট গেট দিয়ে। দরজাগুলো পাহারায় থাকত। তিনি শহর ছাড়তে চাইলেন, কিন্তু দেখলেন গেট বন্ধ। জানতে চাইলেন, কেন? জবাব এলো, রাজা তার একটি প্রিয় বাজপাখি হারিয়েছেন, সেটি যেন বাইরে না পালিয়ে যায়, এই জন্য গেট বন্ধ রাখা হয়েছে। এই কথা শুনে ওই দরবেশ চমকে উঠলেন, “কি অবোধ লোক এই রাজা! পাখি তো আকাশপথে উড়ে যায়, গেট বন্ধ করে কীভাবে তাকে আটকাবে?” এই বিস্ময়ের সাথে সাথে তার মনে এক প্রশ্ন জাগে, “আল্লাহ্! এটা কেমন বণ্টন? আমার এতো জ্ঞান-বুদ্ধি, এলম-তাকওয়া থাকা সত্ত্বেও আমি তিন-চার দিন অনাহারে, আর এমন নির্বোধ একজন লোক দেশের বাদশা! এটা কি ইনসাফ?” তার অন্তরে এই চিন্তা উদিত হতেই, আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ইলহাম হলো। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো: “তুমি যদি এই বণ্টন পছন্দ না করো, আমি বদলে দিই? তুমি হয়ে যাও রাজা, অন্ধকার মস্তিষ্কের অধিকারী, বুদ্ধিবিবেকহীন; আর তোমার সমস্ত এলম, তাফাক্কুর, আমার দিকে ধাবমান হৃদয়, আমি ওই রাজার হাতে দিয়ে দিই? রাজি আছো?” এই ইলহাম শুনেই তার অন্তর কেঁপে উঠল। বুঝলেন, কী ভয়ানক ভুল ভেবেছিলেন। আল্লাহর বণ্টনেই যে শ্রেষ্ঠতা লুকায়িত, তা বুঝে তিনি তাওবা করলেন, ইস্তেগফার করলেন, কাঁদতে কাঁদতে বললেন: “আয় আল্লাহ! আমি তোমার বণ্টনে সন্তুষ্ট। তোমার বণ্টনই আমার জন্য সর্বোত্তম।” দৃষ্টি কোথায় থাকা দরকার, এইকথা বোঝাতে স্যার বলেন, মানুষ অনেক সময় যে জিনিসটি পায়নি, তার পেছনে বেশি মনোযোগ দেয়, দুঃখ পায়, আফসোস করে। অথচ আল্লাহ তাকে যে অফুরন্ত নেয়ামত দিয়েছেন, যার কোনো তুলনা নেই, তার দিকে তাকায়ই না। স্যার বোঝান, এই দরবেশ, তিনি ক্ষুধায় ছিলেন, খাবার ছিল না। কিন্তু তার অন্তরে ছিল আল্লাহর নূর, ইলম, চিন্তার গভীরতা, হৃদয়ের আলো। তিনি জানতেন কে তার রব, কেন তিনি পৃথিবীতে আছেন। তিনি ছিলেন সেই রাজা থেকে অযুত গুণে ধনবান। কিন্তু সাময়িক কষ্টে পড়ে তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন, আসল সম্পদ কি, আর কে দিয়েছেন তা। এই ঘটনাটির মধ্য দিয়ে স্যার শিখিয়ে দেন, শুকর শুধুমাত্র পাওয়া নয়, বরং উপলব্ধির ফল। অনেকেই পায়, কিন্তু অনুধাবন করে না। (যে উপলব্ধি করতে পারে, সে গরিব হলেও ধনবান; আর যে উপলব্ধি করে না, সে ধনবান হয়েও গরিব।)

🎤 ২৬৭

স্যার এক বয়ানে বলছিলেন, আল্লাহ তাআলার বড় একটি নিয়ামত মানুষের ওপর হলো তার এলেম। কিন্তু আমরা আজকাল এলেম বলতে যা বুঝি, ওই বাকপটুতা, বক বক করতে পাড়া, বলতে পারা, ব্যাখ্যা করতে পারা, যে যত বকতে পারে, সে তত বড় আলেম! যে যত আলোচনা করতে পারে, তাকে তত বেশি জানে বলে মনে করা হয়। যে যত কথা বলতে পারে, তার এলেমকে তত উচ্চমার্গীয় ভাবা হয়। তার বয়ান বক্তৃতা তাঁকে বাচাল করে তোলে, যেখানেই যায়, সেখানেই সে কথা বলতে চায়, যাতে মানুষ তাকে 'আলেম' মনে করে। যেন কথা না বললে আলেম বলেই গণ্য হবে না। স্যার বলেন এইটাকে দীনের ময়দানে, ইসলামে, এলেম বলা হয় না, এলেম মানে কেবল মুখে বলা নয়, বরং এলেম মনের একটা অবস্থার নাম, অন্তরের এক নিরব গভীর উপলব্ধি, হৃদয়ের একটি বিশেষ অবস্থা। এই প্রসঙ্গে স্যার এক মহামূল্যবান ঘটনা উল্লেখ করেন, যা সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, এর জীবনের এক মুহূর্ত থেকে নেওয়া। তিনি ছিলেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই, এবং তরুণ সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম, যাঁকে “তর্জুমানুল কুরআন” (কুরআনের ব্যাখ্যাকারী) এবং “হিবরুল উম্মাহ” (উম্মতের পণ্ডিত) বলা হতো। তখন তিনি ছিলেন বয়সে বৃদ্ধ, দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলেন। তখন একবার এক মজলিসে কিছু যুবককে উচ্চস্বরে আলোচনা করতে দেখলেন। তিনি তাদের কাছে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং সেখানে গিয়ে কিছু নসিহত পেশ করলেন। সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বললেন, "তোমাদের চেয়ে উত্তম ব্যক্তিদের আমি দেখেছি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এর সাহাবীগণ) অধিকাংশ সময়ে নীরব থাকতেন। তাঁরা বোবা ছিলেন না; বরং তাঁদের এলেমই তাঁদেরকে বোবা বানিয়ে দিয়েছিল (নীরব করে রেখেছিল)।” স্যার বলেন, সাহাবিদের নীরবতা ছিল অজ্ঞতার কারণে নয়, বরং অন্তর্দৃষ্টির কারণে। তাদের এলম এত গভীর ছিল, যে তারা প্রতিটি কথা বলার আগে বারবার চিন্তা করতেন, এই কথাটি আল্লাহর সামনে কতটা গ্রহণযোগ্য, এতে ফিতনা আছে কি না, অহংকার লুকিয়ে আছে কি না। ফলে অনেক সময় তারা বলার মতো কিছু থেকেও চুপ থাকতেন। ইলমের গভীরতা মানুষকে প্রতিটি কথা বলার আগে সতর্ক করে তোলে। এই সতর্কতার কারণে তার মনে হয়, নিজের ইলমের তুলনায় মুখের অনেক কথাই হয়তো অনর্থক। ফলে সে চাইলেও অনেক কথা বলতে পারে না। স্যার বোঝান, আল্লাহ তাআলা যাকে ইলম দান করেন, তাঁর এলেম তাঁকে আল্লাহর রাস্তা চিনিয়ে দেয়, শয়তানের ধোঁকা চিনিয়ে দেয়, রিয়ার গন্ধ আগেই ধরিয়ে দেয়। তার ইলম যত গভীর হয়, দ্বীনের পথে চলা তার জন্য তত সহজ হয়। তার এই জানাটাই (এলেম) তাকে নির্দেশনা দান করে নিরবতার, সংযমের ও আমলের পথে।

🎤 ২৬৮

জামালপুরের এক ভাই যিনি সাধ্যমতো দাওয়াতের মেহনত করতেন। ভাইটির মাঝখানে বাৎসরিক চিল্লায় এক ধরনের গ্যাপ (কাযা) হয়ে গিয়েছিল, তার বাৎসরিক চিল্লায় যেতে অসুবিধা হচ্ছিল, নানা পারিবারিক দায়িত্ব, ঝামেলা আর পারিপার্শ্বিক সমস্যার কারণে চাইলেও বের হতে পারছিলেন না। তিনি স্যারের সাথে পরামর্শ করতে এসেছিলেন। স্যার তাকে চিল্লায় জামাতে বের হয়ে যাওয়ার জন্য বললেন। স্যার তাকে গভীর মমতার সাথে বোঝালেন, স্যার বললেন, মানুষ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য যেমন প্রাণপণে ছোটে, যেভাবে প্রাণপণে দৌড় দেয়, এখন তোমার চিল্লায় বের হওয়ার জন্য ঐভাবে চেষ্টা করা দরকার, ছুটে বেরিয়ে পড়া দরকার। আল্লাহর পথে বের হওয়ার জন্য আমাদের এমন একনিষ্ঠতা ও প্রচেষ্টা থাকা উচিত।

🎤 ২৬৯

হজরত মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদাহরণ দিয়ে এক বয়ানে স্যার উল্লেখ করেন: কেউ যদি লাঠিকে সাপ দেখে, তবে সেই লাঠির প্রতি তার কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকবে না। আবার যদি সাপকে লাঠি দেখে, তবে সে ঐ সাপকেও ভয় পাবে না। অর্থাৎ, বস্তুর প্রকৃত হাকিকত বা এলম জেনে গেলে (অন্তরের দৃষ্টি খুলে গেলে) তার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যায়। স্যার বলেন, فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَىٰ, হঠাৎ উনার লাঠি এক চলমান সাপ হয়ে গেল (দ্রুতগামী, ভয়ঙ্কর চঞ্চল এক সাপ)। এই জিনিসটি মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এর জন্য এক বিশেষ এলেম হাসিল করার উসিলা ছিল। ঐ মুহূর্তে উনার উপর আল্লাহ তা'আলার একটি বড় হুকুম আরোপিত হয়েছিল। উনার লাঠি ছিল অতি প্রিয় এবং উপকারী জিনিস। তিনি এর উপর ভর করে দাঁড়াতেন, ছাগলের জন্য পাতা ঝরাতেন এবং আরও অনেক কাজে এটি ব্যবহার করতেন। এটি ছিল তাঁর নির্ভরতার প্রতীক। আল্লাহ পাকের ঐ হুকুমে তিনি এই প্রিয় ও নির্ভরশীল জিনিসটিকে বিনা দ্বিধায় যখন ছেড়ে দিলেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর এই ত্যাগকে কবুল করলেন এবং তাঁকে সবচেয়ে বড় জ্ঞান ও নিয়ামত দান করলেন, যা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। সেই জ্ঞান ও নিয়ামত হলো যে সেই জিনিসের হাকিকত (প্রকৃত সত্তা, গাইবের দেখা) উনাকে দেখালেন। স্যার বলেন, আল্লাহ তা'আলা যেরকম মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এর উপকারী ও ভরসার জিনিস বিসর্জন দেওয়াকে কবুল করে তাঁর চোখের পর্দাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। এ রকম জ্ঞান আল্লাহ তা'আলা অন্যান্য নবীদেরকেও দান করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও আসমান, জমিনের মালাকুত অর্থাৎ গাইবের জগৎ দেখিয়েছিলেন। وَكَذَٰلِكَ نُرِيٓ إِبْرَٰهِيمَ مَلَكُوتَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَلِيَكُونَ مِنَ ٱلۡمُوقِنِينَ এভাবে আমি ইব্রাহিমকে আসমান ও জমিনের মালাকুত (রহস্যময় জগৎ) দেখালাম, যেন সে দৃঢ় বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মেরাজে নিয়ে আল্লাহ পাক হাকিকত দেখিয়েছিলেন। এখানে স্যার ব্যাখ্যা করেন যে, দৃষ্টির অন্ধত্ব এবং অন্তরের অন্ধত্ব, এ দুটি ভিন্ন বিষয়। মানুষ কেবল চোখের দেখায় সীমাবদ্ধ থাকলে প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে পারে না। স্যার বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অন্তরের (কলবের) দেখা দেখিয়েছিলেন, যা বাইরের দৃষ্টির আড়ালে থাকা এক ভিন্ন সত্যের জগৎ। যখন আল্লাহ তা'আলা মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর হাতের লাঠি ফেলে দিতে বললেন, তিনি দ্বিধা না করে তা ফেলে দিলেন। আর যখন তিনি তা ফেললেন, তখন লাঠির মধ্যে এমন এক জিনিস দেখলেন যা তিনি পূর্বে কখনো দেখেননি। "فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَىٰ", এক চলমান সাপ। স্যার বলেন, আল্লাহ তা'আলা বড় মেহেরবানী করে আমাদের দ্বীন দান করেছেন। যত বেশি আমরা এই দ্বীনের পথে চলবো, আল্লাহর হুকুমের উপর আমল করবো, এবং প্রিয় জিনিসকে ছাড়তে পারবো (অর্থাৎ আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার করবো), আল্লাহ তা'আলা তত বেশি আমাদের চোখের পর্দাকে হটিয়ে দিবেন, আসবাবের (বস্তুগত উপায় উপকরণ) হাকিকত আমাদের সামনে খুলে দেবেন, এবং অজানা জিনিস আমাদেরকে জানবার তৌফিক দান করবেন। আর যখন এই শুদ্ধ জ্ঞান (এলেম) আসবে, তখন তাঁর জন্য পথ চলা সহজ হবে। এই জ্ঞান মানুষকে শুধু বাহ্যিক দৃষ্টি থেকে মুক্ত করে না, বরং অভ্যন্তরীণ সত্য ও রহস্য উন্মোচন করে, যা তাকে আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে এবং সকল পরিস্থিতিতে দৃঢ় থাকতে সাহায্য করে। স্যার বলেন, এই এলম লাভের কারণেই হযরত মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনি ইসরাঈলকে নিয়ে যখন সমুদ্র এবং ফেরাউনের বাহিনীর মাঝখানে পড়েছিলেন, তখন তিনি ভয় পাননি। কারণ তিনি সমুদ্রের হাকিকত জানতেন এবং ফেরাউনের বাহিনীর হাকিকতও জানতেন। সামনে সমুদ্র পেছনে ফেরাউনের বাহিনী, যেনো এক জাতাকলে দুই দিক থেকে চাপা খাওয়ার দশা, কিন্তু উনি খুব স্থির, উনি নিশ্চিন্ত, তাঁর অন্তরের দৃষ্টিতে সবকিছু পরিষ্কার ছিল, কোন বিচলিত ছিলেন না।

🎤 ২৭০

স্যার একবার বলেন, জ্ঞান এমন কিছু, যা কেউ অর্জন করে টাকার বিনিময়ে, পায় টাকার জন্য, কেউ মানুষের প্রশংসার জন্য। এই জ্ঞান বিক্রি হয়- বক্তৃতার মাধ্যমে, লেখার মাধ্যমে, সম্মেলনের মাধ্যমে। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে যে এলেম আসে, তা কেউ বিক্রি করে না, প্রকাশ করেও অহংকার করে না। বরং সেই ব্যক্তি চায়, “এই এলেম আমার হৃদয়ে থাকুক, আমি যেন আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারি।”

🎤 ২৭১

শাহ আলম ভাই বলেন: ১৯৯৫ সালের টঙ্গী ইজতেমায় আমি আমার শ্বশুরের (আনোয়ারুল আযীম সাহেব) সাথে দেখা করতে যাই। তখন তিনি বললেন-‘তুমি আসরের সময়ে এসো, আছরবাদ তোমাকে মুফতী জয়নাল আবেদীন সাহেব, ভাই আব্দুল ওয়াহাব সাহেব, পাকিস্তানের মুরব্বীদের সাথে দেখা করাবো।’ আমি শ্বশুরকে জানালাম-ইনশাআল্লাহ আসবো। পরে স্যারের কাছে এসে সব ঘটনা বললাম, এবং প্রশ্ন করলাম যে-এত বড় বড় মাপের মুরব্বীদের সাথে দেখা করা, তাদের কাছে যাওয়া, বা তাদের সাথে পরিচিত হওয়া আমার জন্য ঠিক হবে কিনা? আমি যাব কিনা? স্যার বললেন: ‘হ্যাঁ, যেতে পারো। তবে নিয়ত করবে, ওলামাদের সাথে সাক্ষাৎ করা ইবাদত, তাদের জিয়ারত করা ইবাদত। এবাদতের নিয়তে যেও।’ সাথে সাথে স্যার বললেন, ‘তবে একটা সতর্কতা আছে।’ শাহ আলম ভাই জানতে চাইলেন, ’স্যার, কী সতর্কতা?’ স্যার উত্তর দিলেন, “তোমার শ্বশুর যখন তাঁদের কাছে নিয়ে যাবেন, তাঁরা তোমার সাথে মুসাফাহা করবেন, কিছু হাদিয়া দিতে পারেন, কিছু নাস্তাও করাতে পারেন। তখন শয়তান যেন তোমাকে এই বুঝ না দেয় যে, ‘আমি আর সাধারণ শাহ আলম নই, আমাকে পাকিস্তানের আমীর হাদিয়া দেন, মুফতি জয়নাল আবেদীন সাহেব নাস্তা করান। আমি তো একটা বিশেষ পর্যায়ের, একটা বিশেষ লেভেলের সাথী, এতোবড় মুরব্বীদের সাথে চলা (নিকটবর্তী হওয়া)।’ এই ধরনের চিন্তা যদি অন্তরে আসে, তবে তা ধ্বংসের কারণ হতে পারে, এই ধরনের আত্মগর্ব বা মাকামের চিন্তা যদি অন্তরে জন্ম নেয়-তাহলে সারা জীবনের ধ্বংসের জন্য এটুকুই যথেষ্ট।” শাহ আলম ভাই বলেন: স্যার এভাবেই বোঝালেন-আমাদের দীল সবসময় কোন দিকে যাচ্ছে, সেটার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি। কারণ, আত্ম-অহংকার বা বিশেষত্বের অনুভূতি আমাদের ইবাদত ও দ্বীনের পথে বাধা তৈরি করে। দীল যেন সর্বদা আল্লাহমুখী থাকে, সেজন্য দীলের দিকে সতর্ক নজর রাখা দরকার।

🎤 ২৭২

একবার স্যার বলেন, কোন বিষয়ের আসল এলেম হলো ঐ বিষয় বা জিনিসকে তার প্রকৃত রূপে চেনা। এই এলেম অর্জন হয় ত্যাগের মাধ্যমে। যত বেশি প্রিয় জিনিস ত্যাগ করা যায়, আল্লাহর রাস্তায় মেহনত করা যায়, তত বেশি আল্লাহ সেই অন্তর, জ্ঞান (আসবাবের প্রকৃত রূপ), সেই হকিকতের দৃষ্টি দান করেন। مَثَلُ ٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُوا۟ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَوْلِيَآءَ كَمَثَلِ ٱلْعَنكَبُوتِ ٱتَّخَذَتْ بَيْتًۭا ۖ وَإِنَّ أَوْهَنَ ٱلْبُيُوتِ لَبَيْتُ ٱلْعَنكَبُوتِ ۖ لَوْ كَانُوا۟ يَعْلَمُونَ “যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্য অভিভাবক গ্রহণ করে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার মতো, যে একটি ঘর তৈরি করে। আর নিঃসন্দেহে সব ঘরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ঘর হলো মাকড়সার ঘর, যদি তারা বুঝত!” স্যার বলেন, বাহ্যিকভাবে তো সবাই জানে মাকড়সার জাল দুর্বল। এটা তো এমন কোনো অজানা তথ্য নয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলছেন: “لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ”, “যদি তারা জানত!” অর্থাৎ, এই জানাটা বাহ্যিক জানা নয়; এটি এমন এক জানার কথা, যা অন্তরকে কাঁপিয়ে তোলে, জীবন বদলে দেয়। এই জানাটা হলো, ফেরাউনের শক্তি, নমরুদের রাজত্ব, আমাদের টাকাপয়সা, ক্ষমতা, দুনিয়ার আড়ম্বর, সবই আসলে একেকটা মাকড়সার জালের মতো দুর্বল। বাহ্যিক চোখে এগুলো বড় ও শক্তিশালী মনে হয়, কিন্তু অন্তরের চোখ (হকিকতের দৃষ্টি) খুললে বোঝা যায়, এগুলো বাস্তবে কিছুই নয়। স্যার বলেন, আল্লাহ তাআলা হজরত মূসা আলাইহিস সালামকে এক চরম বাস্তবতা উপলব্ধি করিয়ে দেন। তিনি যে লাঠিকে এতদিন ধরে উপকারী জিনিস মনে করতেন, যেটা তাঁর প্রিয় ছিল, যেটার ওপর তিনি নির্ভর করতেন, আল্লাহ তা এক মুহূর্তে সাপ বানিয়ে দেন। কিন্তু এরপর আল্লাহ তাআলা সেই সাপও আবার লাঠি বানিয়ে দেন। এই এলেম পাওয়ার পর মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে সব কিছুর হকিকত পরিষ্কার হয়ে যায়। সাগর আর ফেরাউনের বাহিনী, দুই দিক থেকেই ঘেরা পরিস্থিতিতে তিনি একটুও ভয় পাননি। কারণ, তিনি জানতেন, এগুলোও তো সেই মাকড়সার জালের মতো, বাহ্যিক দৃষ্টিতে যতই বিশাল হোক না কেন। হজরত মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: إِنَّ مَعِىَ رَبِّى سَيَهْدِينِ “আমার সাথে আমার প্রভু আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।” স্যার খুব জোড় দিয়ে বলেন, লাঠি আসলে লাঠি নয়, আবার সাপও সাপ নয়। বাহ্যিক রূপ যেমন বদলে যায়, তেমনি বাস্তবতাও (আসবাবের কার্যকারিতা) একমাত্র আল্লাহর হুকুমেই নির্ধারিত হয়। হাকিকি এলেম এটাই শেখায়, কোনো কিছু নিজ থেকে কিছু নয়। না উপকারী, না ক্ষতিকর। সবই আল্লাহর হুকুমে কার্যকর।

🎤 ২৭৩

আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে আলিগড়ের প্রফেসরদের চার মাসের জামাত বাংলাদেশে এলে স্যার তাকাজা রেখে এক মাসের জন্য সেই জামাতের রুখ রাজশাহীতে নেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর মসজিদগুলোতে সেই জামাত থাকাকালীন স্যার ছামানা সহ জামাতের সাথে ছিলেন। জামাতের সাথী মুস্তাফা কামাল সাহেব বলেন, তাঁর (স্যারের) উপস্থিতির কারণে আমরা আমলের সময় খুব সতর্ক থাকতাম, কারণ তিনি তালিমের সঠিক সময়ে অজু ও নফল সেরে বসে পড়তেন। তিনি নিজের থেকে কিছুই বলতেন না এবং খুব বেশি চুপচাপ থাকতেন। আমরা ভাবতাম, উনি হয়তো কোনো টেনশনে আছেন, কিন্তু ছাত্রদের কাছে জানলাম-উনি স্বভাবগতই চুপচাপ থাকেন। তিনি আমাদের বয়ান উর্দু থেকে বাংলায় তরজমা করতেন, তবে নিজে থেকে বয়ান করতে রাজি হতেন না। সাথীদের পক্ষ থেকে উনার বয়ানের রায় দেওয়া হলে উনি বলতেন “এখানকার ছাত্ররা আপনাদের কাছ থেকে উর্দুতে বয়ান শোনার জন্য আগ্রহী হয়ে আছে।” আমরা কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতেন, যাতে আমাদের সন্তুষ্টি পূর্ণ হতো না। একদিন আমাদের আমীর সাহেব বললেন, আপনি কিছু বক্তব্য রাখুন আমাদের জামাতের সাথীদের জন্য, তখনও তিনি সহজে রাজি না হয়ে বললেন- “আমি আমার বন্ধুর কাছে শেখা পুরোনো সবক আবার স্মরণ করার জন্য আলিগড়ের উস্তাদ সানাউল্লাহর জামাতে জুড়েছি।” অনেক অনুরোধ করার পরে তিনি কিছু কথা বলেছিলেন।

🎤 ২৭৪

স্যার বলেন, আওয়াম (সাধারণ জনগণ) দলিলের দ্বারা নয়, মহব্বতের দ্বারা কাছে আসবে। আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম নিজেদের উম্মতগণকে দাওয়াত দিতেন দলিলের সাথে নয়, বরং মহব্বতের সহিত। দ্বীনের উপর মজবুত করার জন্য ফাযায়েলের সাথে দলিল পেশ করতেন। নিজের উম্মতের প্রতি সমস্ত নবীর অস্বাভাবিক মহব্বত ছিল, যা আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে বর্ণনা করেছেন। নিজের সন্তানের প্রতি যে মহব্বত হয় তার থেকেও অনেক বেশি মহব্বত উম্মতের প্রতি নবীদের হতো। এ কথা বলে স্যার নিজের একটি কারগুজারী শোনালেন। ফ্রান্সে থাকাকালীন এদিক-ওদিক থেকে সাক্ষাতের প্রচুর তাকাজা আসতেই থাকত। তখন খুব প্রয়োজন দেখা দিল একটি চার চাকার গাড়ির, যাতে যেকোনো সময় প্রয়োজন হলে সহজে ব্যবহার করা যায়। ওখানে তখন সুদ ছাড়া কিস্তিতে গাড়ি কেনা যেত। স্যার বলেন-প্রয়োজনের তাগিদে আমি তিন কিস্তিতে গাড়ি কিনে ফেললাম। সেই গাড়ি আমাদের খুব কাজে এলো। দুই কিস্তি পরিশোধের পর তৃতীয় কিস্তি দেওয়ার টাকা আমি জোগাড় করতে পারলাম না। কিস্তি জমা দেওয়ার শেষ তারিখ কাছাকাছি চলে আসায় খুব চিন্তিত হয়ে পড়লাম-গাড়ি হাতছাড়া হয়ে যাবে ভেবে। সানাউল্লাহ সাহেব এ কথা জানতেন না যে, গাড়িটি কিস্তিতে কিনেছি। আমাকে চিন্তিত দেখে সানাউল্লাহ বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগলেন কারণ কী। শেষে তাকে সব বললাম। শুনে আমার থেকেও বেশি সানাউল্লাহ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাকে চিন্তিত দেখে আমাদের এক আরব বন্ধু, যিনি প্রায়ই সাক্ষাত (গাস্তে রাহবারি) করাতেন, তিনি তার চিন্তার কারণ জানতে চাইলেন। তাকেও বলতে হলো। তখন আর কী, পরের দিনই ঐ আরব বন্ধু ও এক ফরাসি বন্ধু মিলে তৃতীয় কিস্তি পরিশোধ করে দিলেন এবং খুব খুশিও হলেন এই কারণে যে, তারা আমাদের কোনো কাজে আসতে পেরেছেন (এই উপকার করতে পেরে)। সেই কিস্তির টাকা পরবর্তীতে অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও তারা ফেরত নেননি। স্যার বলেন, দ্বীনের কাজ করনেওয়ালাদের আপোষের মধ্যে এত বেশি মহব্বত সৃষ্টি হয় যে একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের চিন্তাকে নিজের চিন্তা বানিয়ে নেয়। কথায় জোর দিয়ে স্যার বলেন-বলতেই হয়, অবশ্যই এমন হওয়া উচিত।

🎤 ২৭৫

মোহাম্মদপুরে মুফতি মনসুরুল হক সাহেব যখন জামিয়াতুল আবরার রাহমানিয়া নামে নতুন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন, তখন কোনো এক সময়ে স্যার সেখানে গমন করেন। (নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগ, সঠিক সাল তারিখ মনে নেই, শাহ আলম ভাই বলেন) মাদরাসার ওস্তাদদের একত্র করে মুফতি সাহেব স্যারকে কিছু কথা বলার অনুরোধ জানান। স্যার কথা শুরু করলে, মুফতি সাহেব নিজেও সামনে বসে মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকেন। স্যার তখন অত্যন্ত দরদভরা কণ্ঠে বলেন: “আপনারা আলেম-ওলামা, মাদরাসার খেদমতে নিয়োজিত। মাদরাসার নিজস্ব অনেক ব্যস্ততা ও দায়িত্ব আছেই। কিন্তু এর বাইরেও দাওয়াত ও তাবলিগের যে মেহনত চলছে, এই কাজের সাথেও আপনাদের যেকোনো ভাবে সম্পৃক্ত থাকা খুবই জরুরি। যদি আলেমসমাজের অংশগ্রহণ যথেষ্ট না হয়, তবে খুব শীঘ্রই এক বড় ধরনের ফিতনা ও মসিবতের সম্ভাবনা রয়েছে।” স্যার বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, তাবলিগের এই মেহনতে ওলামাদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই এই বিশাল দাওয়াতি মেহনত নিরাপদ, সঠিক দিকনির্দেশনা পূর্ণ এবং শরীয়তের ছায়াতলে থেকে অগ্রসর হতে পারবে। দাওয়াত ও তাবলিগের এই কাজ থেকে আলেমদের বিচ্ছিন্নতা আমজনতার মধ্যে ভুল ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। স্যার বলেন: “আজকে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আম জনতা, সাধারণ মুসলমানদের হাতেই চলছে। সাধারণ মানুষই তিন চিল্লা ইত্যাদি মেহনতের মাধ্যমে দীনের দিকে আসছে। এখন যদি ওলামায়ে কেরাম তাদের সাথে যথেষ্টভাবে জড়িত না থাকেন, তাহলে আমজনতা আস্তে আস্তে আলেমদেরকে নিজেদের কাজের অংশী মনে করবে না। তারা বুঝবে, ‘ওলামারা আলাদা, তারা তাবলিগের সাথে নেই।’ তখন স্বাভাবিকভাবে আমজনতা তাবলিগের তিন চিল্লাওয়ালাদের কে (সাথীদের) আসল মুরব্বি ভেবে নেবে। দীনী মাসআলা-মাসায়েল, শরীয়তের বিষয়গুলোও তারা সেখানেই জিজ্ঞেস করবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ভয় হচ্ছে, যদি কোনো ভুল-ভ্রান্তি বা শরীয়তের পরিপন্থী কিছু তাদের মধ্যে দেখা দেয়, আর আলেমগণ তখন লোকমা (সংশোধন) দিতে চান, তাহলেও তারা হয়তো সেই কথা গ্রহণ করবে না। বলবে, ‘এরা তো আমাদের সাথে নেই, তাবলিগের মানুষ না, বাইরের লোক।’ দীনি শরিয়তের গুরু আলেমসমাজের কথা এভাবে তাদের কাছে গুরুত্ব হারাবে।” স্যার তাগিদ দেন, দীনি সকল ব্যস্ততার পাশাপাশি যেকোনোভাবে তাবলিগের এই মেহনতে ওলামায়ে কেরাম দের সম্পৃক্ততা যথেষ্ট হওয়া দরকার, সময় করে শরিক হওয়া দরকার, খোঁজখবর রাখা দরকার। যাতে করে তাদের (আমজনতা) দীনদারি আলেমদের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে যখন আপনারা লোকমা দেবেন, তখন তারা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে।

🎤 ২৭৬

স্যার একবার সফর প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, আমরা অনেক সময় বলি, “আমি সফরে যাচ্ছি।” কিন্তু বাস্তবে আমাদের সফর আসল সফর নয়। আমাদের যাত্রার আগে থেকেই সবকিছু নির্ধারিত থাকে, কোথায় যাচ্ছি, কতদিন থাকব, কোথায় থাকব, কী খাব, কোন গাড়িতে উঠব, কখন ফিরব, সবই আগে থেকে ঠিক করা থাকে। আমরা শুধু সেই নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসারে পথ চলি। এই ধরণের যাত্রা মূলত পরিকল্পিত ভ্রমণ, এটি সফরের গভীর অর্থকে ধারণ করে না। আসল সফর হলো সেই যাত্রা, যেখানে অজানার পথে পদক্ষেপ নেওয়া হয়- যেখানে গন্তব্য নিশ্চিত নয়, পথের অবস্থা অনিশ্চিত, থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা অনির্ধারিত, এবং সময়ের সীমাও অজানা। এই অনিশ্চিত যাত্রাই মানুষকে আত্মসমর্পণ শেখায়, নিজের নয়, বরং আল্লাহর হাতে নিয়তি সঁপে দেওয়ার শিক্ষা দেয়। পথের সমস্ত ফলাফল, সাফল্য-ব্যর্থতা, বিপদ-আপদ, সুখ-দুঃখ সবকিছুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেয়। রাস্তা অজানা, মানচিত্র নেই, অনেক অনিশ্চয়তা আছে। তারপরও নিজের সব উদ্বেগ, পরিকল্পনা, নিরাপত্তা বা ফলাফল নিয়ে চিন্তা না করে আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে আত্মবিশ্বাসী হয়ে অগ্রসর হতে থাকে। এই প্রসঙ্গে স্যার “A Road to Makkah” বইয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, মুহাম্মদ আসাদ তাঁর আত্মজীবনীমূলক এই গ্রন্থে সেই সত্যটিই তুলে ধরেছেন। তিনি যখন ইসলাম গ্রহণের পর একা মরুভূমির পথে যাত্রা শুরু করেন, তখন তাঁর সামনে ছিল না কোনো সরকারি প্রোটোকল, না ছিল পূর্বনির্ধারিত পথ, না ছিল থাকার জায়গা, খাবার, কিংবা জীবনের নিশ্চয়তা। তবু তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন-একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে, সত্যের সন্ধানে, এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে। সেই অজানা পথেই তিনি প্রকৃত সফরের স্বাদ পেয়েছিলেন। মরুভূমির উত্তপ্ত বালু, পানির অভাব, জীবনের ঝুঁকি, এসবের ভেতর দিয়েই তিনি শিখেছিলেন সফরের আত্মিক অর্থ। তিনি বুঝেছিলেন, “সফর মানে কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়; বরং নিজের ভেতরের এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় পরিবর্তনের নামই সফর।” এমন সফর মানুষকে নম্র করে, তাওয়াক্কুল শিক্ষা দেয়, এবং আল্লাহর নিকটবর্তী করে। যে সফরে সবকিছু নিশ্চিত, সেখানে মানুষ নিজের ওপর নির্ভর করে, উপকরণের ওপর ভরসা করে; কিন্তু যে সফরে কিছুই নিশ্চিত নয়, সেখানে মানুষ আল্লাহর ওপরই ভরসা করতে শেখে, আর এই অবস্থাই মানুষকে প্রকৃতভাবে পরিণত করে “মুসাফিরে”।

🎤 ২৭৭

এক সফরে হযরত মাওলানা ইব্রাহিম আফ্রিকি দামাত বারাকাতুহু সাহেবের সঙ্গে সিলেট শহর থেকে জকিগঞ্জের পথে মাইক্রোবাসযোগে যাত্রা চলছিল। হযরতের সঙ্গীসাথীদের মধ্যে স্যারসহ কয়েকজন আলাদা একটি মাইক্রোতে ছিলেন। পথিমধ্যে দুই পাশে ছিল বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, দূরে সারি সারি পাহাড়, প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্য যেন চোখে ভাসছিল। দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে স্যার সিলেটের একটি প্রবাদ শুনালেন, “দিনে পাহাড়, রাতে জুই (আগুন), দেখিয়া না যাইয়া শুই।” (মানুষ অনেক সময় দূর থেকে যা দেখে, সেটাকেই বাস্তব বলে ধরে নেয়। কিন্তু দূর থেকে দেখা জিনিসের ভেতরের প্রকৃতি যেমন বোঝা যায় না, তেমনি বাহ্যিক সৌন্দর্য বা আকর্ষণ দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। দিনে যে পাহাড় এত সুন্দর লাগে, কাছে গেলে হয়তো তা কাঁটাঝোপে ভরা দুর্গম পাথর। আবার রাতে দূরে দেখা জুই বা আগুন, দেখতে উজ্জ্বল ও উষ্ণ মনে হলেও, কাছে গেলে তা দগ্ধ করে দেয়। স্যারের নিকট থেকে শোনা হযরত ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ-এর আরেকটি উক্তি ছিল, “আমাদের চোখই হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী;” কারণ এটি বাস্তবতা দেখে না, শুধু বাহ্যিক রূপ দেখে।) এভাবে মনে হচ্ছিল, স্যার যেন এই প্রবাদটির মাধ্যমে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে গভীর, বিচক্ষণ ও সত্যনিষ্ঠ। যা দেখি, তা যাচাই না করে গ্রহণ করা ঠিক নয়; যা শুনি, তা বুঝে না নিয়ে বিশ্বাস করা উচিত নয়। কেননা দুনিয়ার বহু বিষয় দূর থেকে আকর্ষণীয় মনে হলেও, কাছে গেলে তার আসল রূপ প্রকাশ পায়। আকর্ষণীয় জিনিস সব সময় কল্যাণকর হয় না; বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়, বরং বাস্তবতা যাচাই করে চলাই বুদ্ধিমানের পথ। প্রলোভনের আগে প্রজ্ঞা, এই চেতনা নিয়েই মুমিনকে চলতে হবে। ​ দ্রষ্টব্য: প্রবাদটির ব্যাখ্যা অংশটি স্যারের বক্তব্য নয়; তা নিজস্ব উপলব্ধি হিসেবে সংযোজিত হয়েছে।

🎤 ২৭৮

পায়ে হেঁটে চলার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেছিলেন- হাঁটা শুধু দেহের জন্য উপকারী নয়, এর ভেতরে আত্মারও বিশেষ উপকার নিহিত আছে। হাঁটার সঙ্গে “পৌরুষত্ব” (পৌরুষ), সাহস এবং দৃঢ়তার এক গভীর সম্পর্ক আছে। ‘رِجَالٌ’ (রিজাল) শব্দটি আরবি ভাষায় যেমন ‘পুরুষ’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি এর মূল অর্থের একটি দিক হলো ‘পা’ বা ‘যিনি পায়ে হেঁটে চলেন’। এখানে শারীরিক চলাচলের সঙ্গে মানসিক ও আত্মিক শক্তিরও এক গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “وَأَذِّنْ فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا” --মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দাও-তারা তোমার নিকটে আসবে পায়ে হেঁটে..., এখানে “رِجَالًا (রিজালান)” শব্দটি এসেছে ‘পায়ে হেঁটে আসা’ অর্থে। অর্থাৎ, যারা কষ্ট সহ্য করে, দৃঢ়তা ও ত্যাগের মনোভাব নিয়ে আল্লাহর পথে পদক্ষেপ গ্রহণ করে- তাদেরই ‘রিজাল’ বলা হয়েছে। অন্য স্থানে আল্লাহ পাক বলেনঃ “رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَن ذِكْرِ اللَّهِ” --এরা সেই পুরুষগণ, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ করে না। এখানে ‘রিজাল’ অর্থে এসেছে আল্লাহভীরু, সাহসী ও কর্মমুখর পুরুষগণ, যারা পৃথিবীর ব্যস্ততার মাঝেও আত্মার জাগরণ ধরে রাখে। হাঁটা মানে কেবল চলা নয়, এ হাঁটা কেবল একটি শারীরিক অনুশীলন নয়; এটি সাহস, দৃঢ়তা ও আত্মসংযমের এক প্রতীক। পায়ের গতি যেমন শরীরকে চাঙ্গা করে, তেমনি আত্মাকে উদ্দীপ্ত করে, হৃদয়ে সাহস সঞ্চার করে এবং আল্লাহর পথে চলার তাওফিক জাগায়। পায়দল জামাত এ এক রুহানি সফর; আত্মশুদ্ধি ও দৃঢ় ঈমানের পথে এক অনুশীলন।

🎤 ২৭৯

একবার এক মজলিসে স্যার প্রসঙ্গক্রমে এক ছোট বাচ্চা মেয়ের উদাহরণ দেন। স্যার বলেন- একটি ছোট মেয়ে বিয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখে, বউকে কী সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে! কেউ তার হাতে মেহেদি লাগাচ্ছে, কেউ মাথার টিকলি ঠিক করে দিচ্ছে, কেউ জামা ওড়না গুছিয়ে দিচ্ছে, কেউবা মুখে মিষ্টি তুলে দিচ্ছে। চারদিকে হাসি খুশি, আনন্দ উৎসব, গান-বাজনা, রঙ ছিটানো, বিশাল প্যান্ডেল, আলো ঝলমল, আত্মীয়-স্বজনের ভিড়-সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। ছোট মেয়েটির মনে তখন গভীর আনন্দ জেগে ওঠে। ঘরে ফিরে আম্মা-আব্বাকে বলে, “বিয়ে তো খুব মজার জিনিস! কত আনন্দের! আমাকেও বিয়ে দিয়ে দাও।” তার ঐ অবুঝ মনে বিয়ে মানেই সাজসজ্জা, গান-বাজনা, খাওয়া-দাওয়া আর আনন্দ উল্লাস। তাই সে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু স্বামী নামে যে একটি জিনিস আছে, সেটি সে জানে না, বোঝেও না। এই বিয়ে যে এক বড় জিম্মাদারী, এর প্রকৃত দায়িত্ব, ত্যাগ ধৈর্য ও আনন্দের মধ্য দিয়ে যে জীবনের গভীর বাস্তবতা-তা সে বোঝে না। ঐ চেপ্টারটাই তার সামনে নাই, বাহ্যিক আনন্দই সে দেখে, ভিতরের বাস্তবতা তার অজানা। স্যার বলেন, আমাদের দ্বীনদারীর অবস্থাও আজ ঐ ছোট মেয়েটির মতোই। স্যার ব্যথাভরা ভারী কণ্ঠে বলেন, আমাদের তাবলিগ, দ্বীনদারী, দ্বীনের নামে এই হরকত, সবই অনেকটা ঐ বাচ্চা মেয়ের মতো। ঐ ছোট মেয়েটি বিয়ের বাহ্যিক আনন্দে মুগ্ধ, কিন্তু প্রকৃত দায়িত্বকে বোঝে না; আমাদের অবস্থাও যেন এমন না হয়, যেন আমরা দ্বীনের বাহ্যিক রূপেই কেবল মুগ্ধ থেকে যাই। বিরাট মজমা, বিরাট বক্তৃতা, বিরাট প্যান্ডেল, বিরাট মিম্বর, বিরাট রিসেপশন, বিরাট হৈ-চৈ, বিরাট খাওয়া দাওয়া সবই আছে। কিন্তু আল্লাহ নামে যে কিছু আছে, আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টিই যে আসল লক্ষ্য, তা আমরা বুঝি না, অজানাই থেকে যায়। স্যার বলেন- আল্লাহর নাম আছে আমাদের জিহ্বায়, কিন্তু সেই ভালোবাসা ও সেই ভয় কোথায়? সেই আল্লাহর রঙ, যা দ্বীনের প্রকৃত প্রাণ তাই বা কোথায়? দ্বীনের নাম আমরা জানি, দ্বীনের বাহ্যিক রূপে মুগ্ধ হই, কিন্তু দ্বীনের মর্ম অনুধাবনের যথেষ্ট চেষ্টা থাকে না, দ্বীনের রূহকে বোঝার যথেষ্ঠ তাকিদ অনুভব করি না। এই চিল্লা, এই এস্তেমা, এই দৌড়ঝাঁপ, দ্বীনের নামে আমাদের এই মেহনত-বড় মজমা, বড় বক্তৃতা, সবই থাকে। কিন্তু এইসব আয়োজনে আল্লাহর সন্তুষ্টি, যা আসল উদ্দেশ্য, তা কোথাও যেন হারিয়ে যায়। তাবলিগের রঙ আমরা দেখি, এই আয়োজন, সাজ-সজ্জা, দৌড়ঝাঁপ, মেহনত-সবই বাহ্যিক রূপ; কিন্তু অন্তরের দিকের সেই বিশাল মেহনত, আল্লাহর সন্তুষ্টির তালিব হওয়া, এই মূল অধ্যায়টাই খোলা হয় না, ভুলে যাই।/p>

🎤 ২৮০

এক ভাই এক সময় একটি মেয়েকে বিয়ে করার বিষয়ে স্যারের কাছে পরামর্শ নিতে যান। মেয়েটির চরিত্র ভালো ছিল না। সেই ভাইয়ের উদ্দেশ্য ছিল, তাকে বিয়ের মাধ্যমে সঠিক পথে নিয়ে আসা। কিন্তু স্যার বিস্তারিত জানার পর তাকে সেখানে বিয়ে করতে খুব কঠোরভাবে নিষেধ করেন। পরবর্তীতে দেখা গেল, সেই সুন্দরী মেয়েটিকে অন্য একজন বিয়ে করলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার জীবন নানা দিক থেকে ভয়াবহ পেরেশানিতে ভরে ওঠে। অন্যদিকে সেই ভাই একজন নেককার, আলেমা মেয়েকে বিয়ে করেন। তার সংসার শান্তিময় হয়, তার সন্তানরা আজ হাফেজ হচ্ছে, আলেম হচ্ছে। গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে ওই ভাই বলেন, “সেই একদিনের স্যারের একটি মাত্র পরামর্শ আমার পুরো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। আমার চিন্তা-ভাবনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও জীবনযাত্রার দিক পরিবর্তন করে দিয়েছে।" এই প্রসঙ্গে স্যারের এক মোজাকারা ছিলো, স্যার বলেন “অনেক সময় একটি নসিহতের ওজন লাখো নেক আমলের চেয়েও বেশি হয়ে থাকে।” এই কথার ব্যাখ্যায় স্যার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করেন। উমাইয়া খেলাফতের খলিফা সোলেমান ইবনে আব্দুল মালিক (আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন) তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তাঁর যোগ্য ও নেককার উজির রজা ইবনে হায়াৎ রহমতুল্লাহি আলাইহি কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার পরে কাকে আমি খলিফা নিযুক্ত করে যাবো?” উজির রজা ইবনে হায়াৎ রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার, দূরদর্শী ও যোগ্য একজন উজির। তিনি খলিফাকে পরামর্শ দেন, “আপনি পরবর্তী খলিফা হিসেবে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে নিযুক্ত করুন।” খলিফা সোলেমান ইবনে আব্দুল মালিক উজিরের এই পরামর্শ গ্রহণ করেন। তিনি লিখিতভাবে ফরমানে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে পরবর্তী খলিফা মনোনীত করেন, তাতে সীলমোহর দেন এবং সেই সীলমোহরকৃত ফরমান উজির রজার হাতে অর্পণ করে ইন্তেকাল করেন। এর ফলাফল ইতিহাসে সুস্পষ্ট, ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর খেলাফত ইসলামের এক উজ্জ্বল স্বর্ণযুগে পরিণত হয়। এই ঘটনা উল্লেখ করে স্যার বলেন, “অনেক সময় এরকম একটিমাত্র পরামর্শ দীনের ময়দানে হাজারো লাখো নেক আমলের চেয়েও বেশি ওজন রাখে, বড় বড় দিনী খেদমতের থেকেও বেশি প্রভাব রেখে যায়।"

🎤 ২৮১

এক বয়ানে স্যার বলেন, এই দুনিয়াতে আত্মহত্যা করে শুধু মানুষ। গরু, ছাগল, বাঘ বা অন্য কোনো প্রাণী আত্মহত্যা করে না। কারণ তাদের মনের এমন চাহিদা নেই, যা অপূর্ণ হলে তারা নিজে থেকে মৃত্যু কামনা করবে। ক্ষুধার কারণে বাঘ হোক বা গরু হোক, খেতে না পেলে তারা দুর্বল হতে হতে মারা যায়। কিন্তু তারা কখনোই মনের কষ্টে বসে বসে নিজেকে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয় না। প্রত্যেক সৃষ্টি তার নিজ নিজ জ্ঞান, বুদ্ধি ও স্বভাব অনুযায়ী নিজের প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করে। মানুষও করে, জীবজন্তুও করে। তবে এখানে মৌলিক যে পার্থক্য, জীবজন্তুর প্রয়োজন সীমাবদ্ধ থাকে শুধু শরীরের চাহিদা পর্যন্ত-খাদ্য, পানি ও বিশ্রাম। এসব না পেলে তারা ধীরে ধীরে দুর্বল হয় এবং একসময় মৃত্যু বরণ করে। এর বাইরে তাদের আর কোনো অতিরিক্ত প্রয়োজন নেই। কিন্তু মানুষ ভিন্ন, মানুষের যেমন শরীর আছে, তেমনি আছে মন। আর এই মনও শরীরের মতোই প্রয়োজন দাবি করে, বরং অনেক সময় তার দাবি আরও গভীর ও সূক্ষ্ম। শরীরের প্রয়োজন পূরণ না হলে মানুষ বাঁচতে পারে না, খেতে না পেলে, পানি না পেলে, বিশ্রাম না পেলে মানুষ উপবাস ও পিপাসায় মারা যাবে। এই দিক থেকে মানুষ ও জীবজন্তু সমান। কিন্তু মনের প্রয়োজন পূরণ না হলে যা ঘটে, তা শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। মনের শান্তি, ভালোবাসা, মর্যাদা, উদ্দেশ্য ও আশার অভাব মানুষকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। তখন সে শুধু কষ্ট পায় না, অনেক সময় বাঁচতেই চায় না।

🎤 ২৮২

স্যার একবার বলেন, মানুষ সাধারণত অন্যের ওপর জুলুমকে খুব সহজে জুলুম হিসেবে চিনতে পারে। কারো হক নষ্ট করা, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করা, কারো সঙ্গে প্রতারণা করা, পাওনাদারকে বঞ্চিত করা, এসবকে মানুষ স্পষ্টভাবে জুলুম বলে বুঝে। অনেক সময় এমন জুলুম করলে নিজের ভেতর অনুশোচনাও আসে, মনে হয় আমি অন্যায় করেছি। সমাজেও এগুলোকে অপরাধ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষ নিজের ওপর যে জুলুম করে, সেটাকে অধিকাংশ সময় জুলুম বলেই মনে করে না। নামাজ ছেড়ে দেওয়া, জামাতে অবহেলা করা, গুনাহকে হালকা মনে করা, হারাম উপার্জন করা, মিথ্যায় অভ্যস্ত হওয়া, সময় নষ্ট করা, বিনোদনে ডুবে থাকা- এসবকে খুব সাধারণ ব্যাপার মনে করে। অথচ নিজের ওপর এমন বড় বড় জুলুম, যা প্রতিনিয়তই নিজের আখিরাতকে ভয়ঙ্কর করে তুলছে। মানুষের ধ্বংসের কারণ, জাহান্নামে যাওয়ার কারণ, আল্লাহ নন, আল্লাহর জুলুম নয়। মানুষ নিজেই নিজের ওপর জুলুম করে, নিজে নিজের আখিরাত ধ্বংস করে। স্যার তুলে ধরেন যে জুলুমের অর্থ কোনো জিনিসকে তার সঠিক জায়গা বা ব্যবহার থেকে সরিয়ে দেওয়া, যা তাঁকে বোঝালেও বুঝতে চায় না, নিজে থেকেও অনুভব করে না। ইবাদতের জায়গায় গুনাহ, আনুগত্যের জায়গায় অবাধ্যতা, আল্লাহর হক নষ্ট করা- বড় বড় জুলুম করছে কোনো অনুভূতি নাই। স্যার খুব জোর দিয়ে বলেন, অন্যের ওপর জুলুম এই ধারণাতো মানুষের আছে, কিন্তু মানুষ নিজের ওপর জুলুম করে, নিজের ওপর জুলুম এই কনসেপ্টই মানুষের নাই।

🎤 ২৮৩

একদিন রাজশাহী মারকাজে দেখা গেল, এক ভাইয়ের চুল বেশ অগোছালো। বহুদিন ধরে তেল বা চিরুনি ব্যবহারের কোনো চিহ্ন নেই। দেখে আরেক ভাই তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই, চুল আঁচড়ান না কেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “এই উম্মতের ফিকির, দ্বীনের তাকাজা, দাওয়াতের ব্যস্ততা- কখন চুল আঁচড়াবো?” এই কথা যখন স্যারের কাছে পৌঁছাল, স্যার গভীরভাবে বললেন, বড় ফিকির চোখে দেখা যায় না। প্রসঙ্গ আলোচনায় স্যার বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবনই উত্তম ফিকিরের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, যিনি রহমতুল্লিল আলামিন, সবচেয়ে বড় ফিকিরওয়ালা, সবচেয়ে বেশি উম্মতের দরদি, সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু, তবুও তিনি থাকতেন পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি, সুগন্ধি ব্যবহারকারী, চুল ও দাড়ির যত্নশীল। উনার চিন্তার গভীরতা, দাওয়াতের ব্যাপ্তি, উম্মতের জন্য কান্না- এর তুলনা করা যায় না। তবুও তিনি নিজের চুল আঁচড়াতেন, দাড়ি পরিপাটি রাখতেন, পোশাক পরিস্কার করতেন, কখনো আয়নায় বা পানিতে নিজের চেহারা দেখতেন, কখনো মাথার চুল মাঝখান দিয়ে সিঁথি করতেন। ফিকির হলো উম্মতের জন্য অন্তরের এক দরদ, আল্লাহর দ্বীনের জন্য ব্যাকুলতা, নিজের আমল ও পরকালের হিসাব নিয়ে চিন্তা, মানুষের হেদায়েতের জন্য ভেতরের কষ্ট। দিলের এই ফিকির সম্পর্কে আল্লাহ অবগত। এটা এমন এক জিনিস, যেটা মুখে বলা যায় না, চেহারায় সবসময় ধরা পড়ে এমনও নয়; কিন্তু আল্লাহর কাছে গোপন নয়, আল্লাহ ভালোভাবেই জানেন, আল্লাহ পাকের কাছে যা একেবারেই স্পষ্ট।

🎤 ২৮৪

স্যার এক মোজাকেরায় বলেন, আল্লাহওয়ালারা দোয়া করে কী পাচ্ছে, সেটা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের কাছে দোয়া করাটাই একটি আনন্দ, দোয়া করতে পারাটাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া। স্যার বলেন, আল্লাহওয়ালারা ফলের চেয়ে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেন। সাধারণ মানুষ দোয়া করে ফল পাওয়ার জন্য, আর আল্লাহওয়ালারা দোয়া করেন আল্লাহর জন্য। তাদের কাছে দোয়া কবুল হলো কি না, এটা মুখ্য বিষয় নয়; বরং দোয়া করতে পারাটাকেই তারা বড় নেয়ামত মনে করেন, কারণ এটাকেই তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে ডাকার আলামত হিসেবে দেখেন, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক অনুভব করেন। দোয়াকে তারা আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ, নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করার মাধ্যম এবং আল্লাহর সাথে কথা বলার মুহূর্ত হিসেবে দেখেন। দোয়ার সুযোগটাই তাদের কাছে আনন্দ, এই অনুভূতিটাই তাদের কাছে এক প্রশান্তি। ঠিক যেমন প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারলেই মন ভরে যায়, ফল কী হলো সেটা তখন গৌণ হয়ে যায়। স্যার বলেন, এই জায়গাটাই সাধারণ মানুষের সঙ্গে আল্লাহওয়ালাদের মূল পার্থক্য। সাধারণ মানুষ দোয়ার ফল দেখে, আর আল্লাহওয়ালারা দোয়ার মধ্যে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক অনুভব করেন।

🎤 ২৮৫

একদিন স্যারকে এক ভাইয়ের ঘটনা বলা হলো, তার স্ত্রী ছোট ছোট অবুঝ সন্তান ও স্বামীকে রেখে অন্য এক ছেলের হাত ধরে সংসার ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কিছুদিন পর তাকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়, আর সেই ভাই আবার তাকে (ঐ পালানো স্ত্রীকে) নিয়েই সংসার করছিলেন। তার বিস্তারিত শুনে স্যার বললেন, “যে ছেলের এই রুচি, তার সাথে কোনো রুচিসম্পন্ন মেয়ে তো সংসার করতে চাইবে না।” যে মানুষ খারাপ সম্পর্কের মাধ্যমে ঘর ভাঙার কাজে জড়ায়, সে আসলে নিজের চরিত্রের দুর্বলতাই প্রকাশ করে। এমন দুর্বল মানসিকতার মানুষের ওপর ভর করে শান্ত, নিরাপদ ও সম্মানজনক সংসার গড়া যায়-এই বিশ্বাস রাখা কঠিন। রুচিসম্পন্ন মানুষ সাধারণত এমন কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে চায়, যার মধ্যে উন্নত রুচিবোধ রয়েছে, যার ভেতরে আমানতদারি আছে, নৈতিকতা আছে, দায়িত্ববোধ ও সংযম আছে। একজন সত্যিকারের শক্তিশালী মানুষের নিজের চরিত্র শক্ত থাকবে, যেখানে উন্নত “রুচি” থাকবে; নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও চরিত্রের মান-এসবের গুরুত্ব তার কাছে থাকবে। এখানেই একজন পুরুষের আসল মর্যাদা, আর এখানেই একটি শান্ত ও স্থিতিশীল সংসারের ভিত্তি। একজন স্ত্রী যেমন চায় তার স্বামী পরিশ্রম করতে পারুক, পরিবারকে আগলে রাখতে পারুক, তেমনি সে চায় তার স্বামী মানসিকভাবে দৃঢ় হোক-রাগ, লোভ, পরিবেশের টান ও এমন কঠিন পরিস্থিতির সামনে যেন ভেঙে না পড়ে। এরপর স্যার বললেন, একজন নারী চায় তার স্বামী শারীরিক ও মানসিক-উভয় দিক থেকেই শক্তিশালী হোক। শক্তিশালী হওয়া মানে শুধু শরীরের জোর থাকা নয়; শক্তিশালী হওয়া মানে চরিত্রে দৃঢ় হওয়া, নৈতিকতায় স্থির থাকা। যে মেয়ের সংসার ভাঙতে দ্বিধা নেই, যে বউ এমন সম্পর্কে যায় যেখানে নিজের স্বামী-সন্তান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার কারণে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজে লজ্জিত হতে হয়-এমন চরিত্রের মেয়ে সম্পর্কে সাধারণভাবে ধারণা হয় যে তার নৈতিক বোধ দুর্বল, সে নিজের দায়িত্বের তোয়াক্কা করে না। সে যে ভবিষ্যতে বিশ্বাসযোগ্য সঙ্গী হবে, তা সন্দেহের মধ্যে পড়ে। এমন মেয়ের ওপর ভরসা করে জীবনসঙ্গী হিসেবে নিয়ে সংসার করা পুরুষের দুর্বল রুচিবোধের প্রমাণ। ভালো সংসারের জন্য শুধু শরীরের জোর নয়, চরিত্র, দায়িত্ববোধ, নৈতিকতার সাথে মানসিক দৃঢ়তাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। যার আত্মসম্মানবোধ নেই, দুর্বল রুচিসম্পন্ন, সামাজিক মূল্যবোধের গুরুত্ব নেই-এমন পুরুষের সাথে কোনো আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মেয়ে সাধারণত জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়ে শান্তি পাবে না-এই কথাটাই স্যার বোঝাতে চেয়েছেন। এই কথাগুলো দিয়ে স্যার কোনো গালি বা হেয় করেননি; বরং চরিত্রের মান (“রুচি” / “আত্মসম্মানবোধ”) নিয়ে একটি সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।

🎤 ২৮৬

এক বৈঠকে স্যার বলেন, নিজের ভেতরের অঙ্গীকার ঠিক থাকলে বাইরের পরিস্থিতি দ্বীনি কাজের পথে বড় বাধা হয় না। প্রাসঙ্গিক কথাবার্তায় স্যার বলেন, বিয়ের পর হজরত মাওলানা আবুল ফাত্তাহ সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি (যিনি স্যারের বিয়ের বিস্তারিত ব্যাপারে অবগত ছিলেন) স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এখন তো বিয়ে করেছ, তাহলে তবলীগের (দ্বীনি মেহনতের) কী হবে, আগের মতো দৌড়ঝাঁপ কি থাকবে?” স্যার বলেছিলেন, “আমার নেসাবের (চিল্লার) খুরুজ যদি ঠিক থাকে, তাহলে বউ আমাকে আটকাতে পারবে না (আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার ব্যাপারে যদি আমি নিজেই পাকা থাকি, তাহলে সংসার বা পারিবারিক ব্যস্ততা দ্বীনি কাজের পথে বাধা হবে না)।” এখানে স্যার পরিবার বা পারিপার্শ্বিক ব্যস্ততাকে দোষ না দিয়ে নিজের দায়বদ্ধতা ও দৃঢ়তার প্রয়োজনীয়তার কথাই বোঝান। স্যার বলেন, নিজের ভেতরের সিদ্ধান্ত যদি শক্ত হয়, তাহলে পরিবার, কাজকর্ম বা নানা ব্যস্ততা- এগুলো দ্বীনি দায়িত্ব পালনের পথে অজুহাত হয়ে দাঁড়ায় না। আমরা অনেক সময় দ্বীনি কাজের ধারাবাহিকতায় যে দুর্বলতা দেখা দেয়, তা বাইরের লোক বা পরিস্থিতির ওপর চাপিয়ে দিই; কিন্তু আসল দেখার বিষয় হলো, আমি নিজে কতটা সিরিয়াস এবং কতটা পাবন্দ। নেসাবকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে নেওয়ার ব্যাপারে স্যার এভাবে বুঝান যে, বাৎসরিক চিল্লা শুধু একটি সফর নয়; বরং এটা নিজের ভেতরে একটি দৃঢ় কমিটমেন্ট (নিয়ত/অঙ্গীকার) তৈরি করে। এই কমিটমেন্ট ঠিক থাকলে জীবনের অন্যান্য দায়িত্বের মাঝেও দ্বীনি কাজ চালিয়ে নেওয়া সহজ হয়। স্যার আরও উল্লেখ করেন, সংসার মানেই বাধা নয়। বিয়ে বা পরিবার হওয়া মানেই দ্বীনি কাজ বন্ধ হয়ে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। আমরা অনেক সময় বলি, “সময় নেই”, “পরিস্থিতি ভালো না”, “এখন সংসার আছে” ইত্যাদি। কিন্তু নিজের ভেতর থেকে অঙ্গীকার মজবুত হলে এই বাহ্যিক হালত বা প্রতিকূলতা অজুহাত হয়ে দাঁড়ায় না। দ্বীনি দায়িত্ব পালনের পথে যদি নিজের ভেতরের দৃঢ়তাকে মূল মাপকাঠি বানানো যায়, তাহলে বাইরের অবস্থা গৌণ হয়ে যায়।

🎤 ২৮৭

মৌলভীবাজার চিল্লার জামাতে থাকার সময় রংপুরের এক ভাই স্যারকে বলেছিলেন, “স্যার, আমাকে কিছু নসীহত করেন।” সাধারণত এমন সময়ে আমরা আশা করি, হয়তো অনেকগুলো উপদেশ, লম্বা কথা বা আলাদা আলাদা আমলের তালিকা শোনা যাবে। কিন্তু স্যার খুব সংক্ষেপে বললেন, দ্বীনের মেহনত করো- এটাই নসীহত। দ্বীনের মেহনতের ভেতরেই সব নসীহত অন্তর্ভুক্ত আছে। ওই ভাই বলেন, স্যারের কথা খুব ছোট ছিল, কিন্তু অর্থ ছিল অনেক বড়। যেন তিনি বলতে চাচ্ছিলেন, “তুমি যদি সত্যিই উপকার চাও, তাহলে দ্বীনের কাজে লেগে থাকো। বাকিটা আপনাআপনি ঠিক হতে থাকবে।” অন্য এক সময় স্যার প্রসঙ্গক্রমে বলেন, শুধু উপদেশ শুনলে অনেক সময় তার প্রভাব অল্প থাকে; কিন্তু দ্বীনের কাজে যুক্ত থাকলে সেই কাজই মানুষকে গড়ে তোলে। দ্বীনের কাজে নিজেকে লাগিয়ে দিলে ঈমান, আমল, আখলাক, ইখলাস, সব কিছুরই চর্চা হয়ে যায়। নিজের সংশোধন, সবর, ত্যাগ, আল্লাহর ওপর ভরসা, এসব গুণ বাস্তবে আমলে আসে। দ্বীনের মেহনত করতে থাকলে মানুষ নিজেই বদলাতে শুরু করে, নিজের ভুল ধরতে শেখে, আর ধীরে ধীরে নিজের আমল ও চরিত্র সংশোধন হয়। আমরা অনেক সময় নতুন নতুন নসীহত খুঁজি, অথচ দ্বীনের মেহনতের ভেতরেই মানুষের জন্য বড় নসীহত এবং কার্যকর আত্মগঠন লুকিয়ে আছে। স্যার আরো বলেন, কাজের মধ্য দিয়েই প্রকৃত তারবিয়াত ও পরিবর্তন আসে। তাই আসল নসীহত হলো নিয়মিত দ্বীনি আমল ও মেহনতের সঙ্গে লেগে থাকা, শুধু কথা শুনে আত্মতৃপ্ত হয়ে থাকা নয়।

🎤 ২৮৮

ছোট ছোট বিভিন্ন ঘটনার ভেতর দিয়ে স্যার শিখিয়েছেন- জীবনে যতটা দরকার, ততটাই রাখা; অভ্যাসের দাস না হয়ে প্রয়োজনকেই সামনে রাখা। খাওয়া, পরা, ব্যবহার সব কিছুর ক্ষেত্রেই সংযম আর সরলতা মানুষকে হালকা রাখে, খরচ কমায়, স্বাধীন করে, আর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখায়, স্যারের ব্যক্তিগত জীবন ছিল এই শিক্ষারই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। স্যার দীর্ঘদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। অনেক সময় ৫–৭ টাকার স্পঞ্জের স্যান্ডেল পায়ে দিয়েই ক্লাস নিতেন। একদিন স্যারের পায়ে বাটার স্যান্ডেল দেখে মাহফুজ ভাই জিজ্ঞেস করলে স্যার মুচকি হেসে বললেন, “ও বোধহয় মনে করেছে ওই স্পঞ্জের স্যান্ডেল আমার শানের খেলাফ, তাই এইটা কিনে দিয়েছে।” একবার আলীগড় ইউনিভার্সিটিতে সেমিনারে গিয়ে ফিরে আসার পর দেখা গেল, স্যারের পায়ে চকচকে এক জোড়া চামড়ার জুতা। জুতার কথা জিজ্ঞেস করতেই স্যার বললেন, “সানাউল্লাহ আমার আগের স্যান্ডেলগুলো ফেলে দিয়েছে। বলেছে, এইটা পরে সেমিনারে যাওয়া যায় না। তারপর দোকানে নিয়ে গিয়ে ১৫০ রুপি দিয়ে এইটা কিনে দিল।” কথাটার ভেতরে কোনো আক্ষেপ ছিল না; ছিল এক গভীর বন্ধুত্বের প্রকাশ আর বাস্তবতাকে সহজভাবে মেনে নেওয়ার মনোভাব। আরেকবার স্যার টায়ারের স্যান্ডেল কিনেছিলেন। কিছুদিন পর সেটা আর দেখা যাচ্ছিল না। জিজ্ঞেস করলে স্যার হেসে বললেন, “ওটা আসলে স্যান্ডেলের কাজ করে না। পায়ের তলায় কালি ধরে যায়, মেঝে নষ্ট হয়।” এই কথাটা বলতে গিয়ে স্যার দু’টা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে বলেন “purpose serve” করে না। স্যারের দৈনন্দিন জীবনে এই বিলাসিতাবিমুখ সাদাসিধে ভাবটা গভীরভাবে ধরা পড়ত। লুঙ্গির ছেঁড়া অংশ তিনি গামছা বা তোয়ালের মতো ব্যবহার করতেন। টাকা দিয়ে আলাদা গামছা কেনার নজির স্যারের জীবনে প্রায় দেখা যায়নি। অনেক সফরে সঙ্গে গামছাও থাকত না। গরমের দিনে শুক্রবারে গায়ের গেঞ্জি ধুয়ে, সেটাই দিয়ে শরীর মুছতেন, তারপর সেই ভেজা গেঞ্জিটাই পানি চিপে আবার পরে নিতেন। প্রয়োজনই ছিল স্যারের জীবনের মানদণ্ড; বাহুল্যের প্রতি কোনো টান তাঁর মধ্যে কখনোই দেখা যায়নি। একবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল মসজিদে পুরোনো ছাত্রদের সঙ্গে মুযাকারায় স্যার বিকেলের নাস্তা না করার ব্যাপারে তাগিদ দিলেন। আব্দুল ওয়াহাব ভাইয়ের কথা উদ্ধৃত করে বললেন, “সকালের নাশতাটাই আসলে ফালতু, দুই বেলা খাওয়াই যথেষ্ট। সকালে যদি নাশতা করোই, তাহলে চতুর্থ বেলা খাওয়ার আয়োজন করো না, বিকেলের নাস্তা বাদ দাও।” এরপর সেই গভীর কথাটা বললেন, “যে ঘুমের সময় বালিশ চায়, তার ঘুম এখনো আসে নি। আর যে রুটির সঙ্গে তরকারি চায়, তার ক্ষুধা এখনো লাগে নি। সে আসলে ক্ষুধার খানা খাচ্ছে না, খাচ্ছে অভ্যাসের খানা।” এভাবেই স্যার ছাত্রদের তাসকিল করতেন জীবনের খরচ কমিয়ে, প্রয়োজনের মধ্যে থাকার দিকে। তিনি বলতেন, “তিন সেটের বেশি কাপড় রাখবে না। দুই সেটেই হয়ে যায়, খুব বেশি হলে তিন সেট।” কাপড় ইস্ত্রি বা “ক্যালেন্ডার” করানো নিয়েও স্যার নিরুৎসাহ দিতেন, কারণ এতে অকারণে টাকা খরচ হয়, যা ছাত্রদের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এই জীবনধারাই ছিল স্যারের নীরব আরেক দাওয়াত- কমে তৃপ্ত থাকা, অপ্রয়োজনীয় ভার ঝেড়ে ফেলে হালকা হয়ে চলা। স্যারের সঙ্গে সফর করেছেন এমন সবাই তাঁর এই সাদাসিধে আমলের সাক্ষী এবং এই জীবনধারা সম্পর্কে সম্যকভাবে অবগত।

🎤 ২৮৯

গ্রীষ্মের ছুটিতে সাধারণত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে চিল্লার জামাত বেশি বের হতো। এ কারণেই ছুটির আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল মসজিদে ছাত্রদের জোর রাখা হতো। ভাই ফারুক বলেন, এমনি একবার চিল্লা থেকে ফিরে আসার পরও সেই বছর চিল্লার জামাতগুলোর কারগুজারি সামনে রেখে আবার ছাত্রদের জোর রাখা হয়। কারগুজারির আলোচনায় সফরের আমাল, খুরুজ ইত্যাদি কথা উঠছিল, ঠিক সেই ফাঁকে স্যার আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের এমন কোনো জামাত ছিল কি, যারা খেদমত ও আনুষঙ্গিক ব্যস্ততায় সময় বাঁচানোর জন্য তিন বেলার খানা দুই বেলা করেছে। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, “তিন বেলার খানা দুই বেলা কারা কারা করেছো?” ভাই বলেন, এই প্রশ্ন শুনে আমরা একটু অবাকই হয়ে গেলাম। কারণ এমন কথা সাধারণত ওয়াপসি হেদায়াতে বা মুযাকারায় তেমন শোনা যায় না। কেউ সাধারণত এটা জানতে চায় না। কিন্তু স্যার আমাদের দৃষ্টি ফেরালেন একেবারে মূল জায়গায়- দাওয়াতের কাজে সহজতা আনা, খরচ কমানো, আর নিজের নফসের আরাম কমিয়ে কাজকে প্রাধান্য দেওয়া। সফরের আগে থেকেই স্যার পায়ে দল চলার ব্যাপারে খুব তাগিদ দিতেন। চিল্লার শেষে এই যে মজমা হলো, সেখানেও স্যার আবার পায়ে চলার কথা জিজ্ঞেস করলেন। তখন এক জামাত তাদের কারগুজারিতে বলল, তাদের সফরে এমনও হয়েছে যে তারা রাত আড়াইটা থেকে দুপুর এগারোটা পর্যন্ত একটানা পায়ে হেঁটেছে। এমনকি তাদের মধ্যে এক সাথী ছিলেন, যিনি খোঁড়া ছিলেন। তবুও তিনি খোঁড়াতে খোঁড়াতে হেঁটেই পুরো পথ পায়ে চলেছেন। স্যার বলতেন, খাওয়া কমানো, খরচ কমানো, বাহন ছেড়ে পায়ে চলা- এসব শুধু বাহ্যিক আমল নয়; এগুলো নফস ভাঙার, ইখলাস বাড়ানোর, আর আল্লাহর ওপর ভরসা বাড়ানোর শক্ত প্রশিক্ষণও। স্যার চাইতেন, আমরা যেন কাজকে সহজ করার জন্য নিজের ওপর সহজতা না খুঁজি, বরং কোরবানীর সাথে (নিজের আরাম ছেড়ে) দ্বীনের কাজকে এগিয়ে নেই।

🎤 ২৯০

“মুসলমান”- আল্লাহ পাকের বান্দা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এর উম্মত- এই পরিচয়ের বাইরে যে লেবেলগুলো আমরা একে অপরের গায়ে লাগাই, স্যারের এজাতীয় পরিচয় ও শব্দ ব্যবহারের ব্যাপারে ছিল কঠোর আপত্তি। আমাদের মধ্যে দ্বীনি পরিভাষা হিসেবে বহুল ব্যবহৃত কিছু শব্দ আক্ষরিক অর্থে নিরীহই মনে হয়। কিন্তু স্যার বলতেন, এগুলো ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে ভেতরে দেয়াল তৈরি করে। তাবলিগি ভাই, পীর ভাই, আরাফাতি ভাই, সাংগঠনিক ভাই- এই ধরনের শব্দের ব্যবহারকে তিনি “দ্বীনি লেবেল দিয়ে বিভাজন” বলেই মনে করতেন। একবার কথার ফাঁকে এক ভাই “আরাফাতি ভাই” বলে সম্বোধন করলে স্যার সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “মুসলমান ভাই কোথায় গেল? তুমি কেন ‘আরাফাতি ভাই’ বলে আলাদা করছো?” আমরা অনেক সময় নেক নিয়তে এমন শব্দ ব্যবহার করি- আরাফাতি ভাই, পীর ভাই (একই পীরের মুরীদ বলে), তাবলিগি ভাই ইত্যাদি। কিন্তু স্যার বলতেন, “সবাই মুসলমান ভাই। তুমি এই তাবলিগি ভাই, এই পীর ভাই- এইভাবে বলেই তো মুসলমানদের মধ্যে ভাগ তৈরি করছো।” সাধারণ দৃষ্টিতে এই শব্দগুলো অনেক সময় কেবল আক্ষরিক অর্থেই বলা হয়, বাস্তব কোনো শত্রুতা বোঝাতে নয়। তবুও স্যার এগুলোকে শুধু অপছন্দই করতেন না, বরং খুবই গর্হিত মনে করতেন। প্রাসঙ্গিক আলোচনায় স্যার একবার বলেন, وَأَطِيعُوا اللّٰهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللّٰهَ مَعَ الصَّابِرِينَ “তোমরা যখন বিভক্ত হয়ে যাবে, তখন তোমাদের বাতাস বের হয়ে যাবে।” স্যার বলেন, বিভক্তি মানুষকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। বাহ্যিকভাবে লোকসংখ্যা বা সামর্থ্য থাকলেও, যদি ঐক্য না থাকে, তাহলে সেই শক্তির “হাওয়া” আর কাজ করে না। তিনি আরও বলতেন, নিজেদের মধ্যে দ্বীনি লেবেল ব্যবহার করে যদি আমরা আলাদা আলাদা পরিচয় দাঁড় করাই, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা আমাদেরই হয়। পরস্পর দ্বীনের নাম ব্যবহার করে গ্রুপ বানিয়ে বিভক্ত হলে মুসলমানদের শক্তি, প্রভাব ও মর্যাদা দীল থেকে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।

🎤 ২৯১

একবার স্যার বলেন, আমাদের তাবলীগের মেহনতে একটা কথা মাঝে মাঝে শোনা যায়- “জিজ্ঞেস করে করে চলি ভাই।” কথাটা শুনতে খুব দ্বীনি, খুব নিরাপদ মনে হয়। আসলেই, পরামর্শ করা সুন্নাত। একা একা সিদ্ধান্ত না নিয়ে অভিজ্ঞদের জিজ্ঞেস করা ভালো। এতে ভুল কম হয়, বরকত হয়, আর কাজেও শৃঙ্খলা থাকে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই কথাটাকে আমরা ঢাল বানিয়ে ফেলি নিজের চিন্তা থেকে পালানোর জন্য। তখন “জিজ্ঞেস করে চলা” আর পরামর্শ নেওয়া থাকে না, বরং হয়ে যায়-“আমাকে বলা না হলে আমি নড়ব না।” চারপাশের অবস্থা দেখেও সে চিন্তা করবে না, দায়িত্বটা বুঝেও এগোবে না, শুধু অপেক্ষা করবে- কখন ওপর থেকে নির্দেশ আসবে। স্যার বলেন, এতে করে মানুষের ভেতরের ফিকির আর দায়িত্ববোধ ধীরে ধীরে মরে যায়। দ্বীনি কাজেও আমরা যদি শুধু “বলা হয়েছে কি না” এই হিসাব করি, তাহলে কাজ তো হবে, কিন্তু নিজের ভেতর থেকে যে দায়বোধ, দরদ, চিন্তা-ওগুলো তৈরি হবে না। অথচ একজন মুমিনের কাজ শুধু আদেশ পালন করা না, বরং নিজের পরিবার, নিজের প্রতিবেশী, নিজের সমাজ নিয়ে ভাবা, কোথায় কী দরকার সেটা বুঝে এগিয়ে আসা। স্যার বলেন, “জিজ্ঞেস করে চলা” ভালো, কিন্তু “ভাবা (নিজে থেকে চিন্তা করা) বন্ধ করে দেওয়া” ভালো না। পরামর্শ হবে পথ দেখানোর জন্য, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত হওয়ার জন্য না। এই আলোচনায় স্যার আরও উল্লেখ করেন, অনেক সময় “জিজ্ঞেস করে করে চলি ভাই” কথাটা শুধু সরলতা বা শৃঙ্খলার জন্য বলা হয় না; অজান্তেই এটা একটা কন্ট্রোলের কালচার তৈরি করে ফেলে। মানে, যারা উপরে আছে তারা চায় নিচের মানুষগুলো বেশি না ভাবুক, বেশি প্রশ্ন না করুক, নিজের বিবেক বা বুদ্ধি না খাটাক-শুধু বলা হলেই যেন কাজ করে। এভাবে ধীরে ধীরে একটা মানসিকতা তৈরি হয়: আমি “আদেশ দেবো”, আর বাকিরা হবে “আদেশ পালনকারী”। ভাবা, বিচার করা, দায়িত্ব বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া-এই জিনিসগুলো যেন তাদের কাজ না। স্যারের কথার ভেতরের সতর্কবার্তাটা এখানেই। ইসলাম কখনোই এমন অন্ধ আনুগত্য শেখায় না, যেখানে মানুষ চিন্তা করা ছেড়ে দেয়। সাহাবারা পর্যন্ত প্রশ্ন করতেন: “এটা কি আল্লাহর হুকুম, না আপনার মত?” কারণ তারা বুঝতেন, ঈমান মানে শুধু মানা না, বুঝে মানা। যখন কাউকে সব সময় বলা হয়, “তীর হয়ে চলো, চুপ করে মেনে চলো, জিজ্ঞেস করে করে চল,” তখন সে ধীরে ধীরে নিজের দায়িত্ববোধ হারায়। এতে করে মানুষ চিন্তাশীল বান্দা না হয়ে যান্ত্রিক কর্মী হয়ে যায়। অথচ দ্বীন চায়, প্রতিটা মানুষ নিজের জায়গা থেকে ফিকির করবে, দায় নেবে, দায়িত্ব অনুভব করবে। স্যার বলেন, “জিজ্ঞেস করে চলা” যদি হয় শেখার জন্য, শুদ্ধ পথে থাকার জন্য-তাহলে ভালো। কিন্তু যদি এটা হয় মানুষকে চিন্তাহীন, প্রশ্নহীন, শুধু আদেশ পালনকারী বানানোর জন্য-তাহলে সেটা এক ধরনের ক্ষতিকর অভ্যাস, যা দ্বীনি মেহনতের প্রাণটাই দুর্বল করে দেয়।

🎤 ২৯২

একবার ফিজিক্স ল্যাবে এক ছাত্র স্যারকে জিজ্ঞেস করছিল প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের একটি সহজ বিষয় নিয়ে। কাজ ছিল- একটি বয়ামে রাখা চিনির ওজন বের করা। নিয়মটা খুব সাধারণ: আগে চিনিসহ বয়াম ওজন করতে হবে, তারপর খালি বয়াম ওজন করতে হবে, এরপর দুইটার পার্থক্য নিলেই চিনির ওজন পাওয়া যাবে। ঐ ছাত্রের খুব সিরিয়াস মুখে জিজ্ঞেস ছিল- খালি বয়ামের ওজনটা মাইনাস করলে চিনির ওজনতো পাওয়া যাবে, কিন্তু স্যার, বয়ামের ঢাকনাটা কী করব? এখন বয়ামের মুখ বা খাপটির (Cork) ওজন সে কী করবে? ছেলেটার প্রশ্ন শুনে স্যার একটু বিস্মিত হলেন। এটা ধরব, নাকি ধরব না (খাপটির ওজন)? স্যার অবাক হয়ে গেলেন। এই ছেলে মেট্রিক-ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে পড়ছে, বেশ কিছু ফিজিক্সও ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছে-তবু এমন বেসিক ব্যাপারে এমন প্রশ্ন! তার তো এতটুকু সাধারণ জ্ঞান থাকার কথা যে, ওজন করার সময় ঢাকনাটি হয় উভয় ক্ষেত্রেই রাখতে হবে, অথবা উভয় ক্ষেত্র থেকেই বাদ দিতে হবে। এত সহজ একটা ব্যাপার সে কেনো বুঝতে পারছে না, ছেলেটা কি বোকা! স্যার বলেন, আসলে ছেলেটা মেধাহীন নয়, বোকা না; সে মোটেও বোকা ছিল না। সমস্যা তার বুদ্ধির না, সমস্যা হলো- তাকে এমনভাবে অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে যে সে নিজে ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। প্রাইভেট কোচিং আর মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা তাকে ভাবতে শেখায়নি। সে শিখেছে ধাপে ধাপে ”কি করতে হবে” সেটা, কিন্তু ”কেন করতে হবে” বা ”নিজে ভেবে সমাধান কীভাবে বের করতে হয়”- এই জায়গাটা তার গড়ে ওঠেনি। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রাইভেট কোচিংয়ের ’শিখিয়ে দেওয়া’ ছক তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে ঠেকিয়েছে যেখানে সে নিজের বিবেক বা কাণ্ডজ্ঞান ব্যবহার করতে ভুলে গেছে। সে শুধু জানে ’আদেশ’ বা ’নিয়ম’ পালন করতে, কিন্তু সেই নিয়মের পেছনের যুক্তি বা ’ফিকির’ নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। স্যার বলেন, আমাদের দ্বীনি জীবনে বা তাবলীগের কাজেও আমাদের মধ্যে অনেক সময় এই একই মানসিকতা চলে আসে। আমরা এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে যাই যে, সব কিছুতেই ”জিজ্ঞেস করে করে চলি”- নিজে ভেবে, নিজের দায়িত্ব বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস কমে যায়।

🎤 ২৯৩

স্যার বলতেন, পরামর্শ করে চলা অর্থ এই নয় যে মানুষ তার নিজস্ব কাণ্ডজ্ঞান বা সহজাত দায়িত্ববোধ বিসর্জন দেবে। স্যার উদাহরণ দিয়ে একবার বলেন, ধরা যাক কারও ভাইয়ের বা ভাতিজার বা প্রতিবেশীর মেট্রিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এখন তার নিজের ফিকির থেকেই তো আসা উচিত যে, ভাইকে, ভাতিজাকে বা প্রতিবেশীকে কীভাবে আল্লাহর রাস্তায় বের করা যায়। এটা তার নিজের তাকাজা, নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই হওয়া উচিত। এখন কীভাবে তাকে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা যায়, কীভাবে তার ঈমান-আমলের চিন্তা করা যায়। এটা তো তার ঘরের মানুষ, তার আশপাশের মানুষ। এই দায়বোধ তার নিজের ভেতর থেকেই আসা উচিত, স্বাভাবিকভাবে তার নিজের ফিকির হওয়া উচিত ছিল। কাকরাইল থেকে তাকাজা বা নির্দেশ এলো ভাই এসএসসি পরিক্ষার্থীদের পেছনে মেহনত করি, জামাত বানিয়ে মার্কাজে পাঠাই। মার্কাজ থেকে সে এই তাকাজা পেলো তো তবেই সে নড়েচড়ে বসে। নিজের ভেতর থেকে যে ফিকির, যে দরদ, যে দায়বদ্ধতা- সেটা জাগে না। যেন সে শুধু আদেশ পালন করছে, চিন্তা করছে না। যেখানে এমন তাকাজা তার নিজের ভেতরকার ’ফিকির’ বা দরদ থেকে আসার কথা। আমাকে বলা হয়েছে, তাই আমি করছি, মারকাজ থেকে ’তাকাজা’ বা নির্দেশনা আসবে; তো আমি করবো; নির্দেশ আসছে তখন সেটাকে একটি যান্ত্রিক আদেশ হিসেবে পালন ও করছি। ব্রাহ্মণ আর নমঃশূদ্র এর উদাহরণ দিয়ে স্যার ঐ চিন্তা ও দাসের মনস্তত্ত্ব (আদিষ্ট হওয়া বনাম সহজাত ফিকির) ব্যাখ্যা করতেন। নিজের ভাই, প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের দ্বীনি ফিকির যদি নিজের ভেতর থেকে না আসে, তবে বুঝতে হবে আমরা আদিষ্ট হয়ে কাজ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এই মনস্তত্ত্ব অনেকটা প্রাচীন ব্রাহ্মণ সমাজব্যবস্থার ’আদেশ পালনকারী’ নমঃশূদ্র শ্রেণির মতো, যারা নিজেরা চিন্তা করে না, শুধু ওপরের নির্দেশ পালন করে। স্যার বলতেন, এই অভ্যাসটা খুব ক্ষতিকর যাতে মানুষ দায়িত্বশীল চিন্তাশীল বান্দা না হয়ে শুধু ”নির্দেশ মানা কর্মী” হয়ে যায়, এই অবস্থায় ধীরে ধীরে চিন্তা-ফিকির করার শক্তি হারিয়ে ফেলে। ইসলাম আমাদের ’আবদ’ বা দাস হতে বলেছে আল্লাহর, কিন্তু চিন্তার ক্ষেত্রে আমাদের দিয়েছে এক বিশাল সাম্রাজ্য।

🎤 ২৯৪

এক জামাতে ছয় নম্বরের মুজাকারা চলছিল। ‘একরামুল মুসলিমীন’ পয়েন্টের আলোচনায় একজন সাথী বলছিলেন, “.....সবচেয়ে বড় একরাম হলো একজন আল্লাহভোলা বান্দাকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করে দেওয়া, আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।....” মুজাকারার শেষ দিকে স্যার কিছু কথা বলেন। স্যার বলেন, আমরা সাধারণত “একরামুল মুসলিমীন” শব্দটি ব্যবহার করি। কিন্তু বিষয়টি একবচনে ধরলে- “একরামুল মুসলিম” বা “একরামে মুসলিম”- অর্থটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একরাম শুরু হয় একেকজন মুসলিমকে কেন্দ্র করে; এক একজন বান্দার সম্মান ও প্রয়োজনের খেয়াল রাখার মাধ্যমেই এর বাস্তব রূপ প্রকাশ পায়। স্যার বলেন, একজন আল্লাহভোলা মানুষকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করে দেওয়া অবশ্যই বড় একরাম। কিন্তু সেটা এত উচ্চস্তরের কাজ যে, তার জন্য আলাদা একটি বিষয় রয়েছে- “দাওয়াত ও তাবলীগ।” আল্লাহর পথে ডাকা, জান-মাল-সময় কোরবানি করে মানুষকে আল্লাহর সাথে পরিচিত করানো- এটা দাওয়াতের কাজ। তাই এই অংশটি দাওয়াতের পয়েন্টের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু “একরামে মুসলিম” বিষয়ে যে একরামের কথা বলা হয়েছে, তা মূলত মুসলিম ভাইয়ের পার্থিব প্রয়োজন পূরণ করা, তার উপকার করা, তার সম্মান রক্ষা করা- এই দুনিয়াবী দায়িত্বের কথা। স্যার বোঝান, একরাম মানে কেবল কিছু আদর্শিক কথা নয়; বরং ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো, তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো, অসহায়কে আশ্রয় দেওয়া, ঋণগ্রস্তকে সাহায্য করা, রোগীর সেবা করা, হক অনুযায়ী তার সম্মান করা, অন্যের পার্থিব প্রয়োজন সামনে রেখে সঠিক পরামর্শ দেওয়া- এসবই একরামের বাস্তব রূপ। স্যার বলেন, শরীয়তে এই একরামের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর তাকিদ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা শরীফে নিজের সম্পদ অসহায়, এতিম ও অভাবীদের পেছনে ব্যয় করেছেন। প্রথম যখন তাঁর উপর ওহী নাযিল হলো এবং তিনি ভীত হলেন, তখন হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন: আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অক্ষমের বোঝা বহন করেন, অভাবগ্রস্তকে সহায়তা করেন, মেহমানকে আপ্যায়ন করেন এবং সত্যের কাজে সাহায্য করেন- আল্লাহ আপনাকে কখনো অপমানিত করবেন না। এই কথাগুলো একরামেরই উজ্জ্বল উদাহরণ। স্যার বোঝাতে চেয়েছেন, আল্লাহভোলা বান্দাকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করে দেওয়া নিঃসন্দেহে মহত্তম কাজ- কিন্তু সেটা দাওয়াতের পয়েন্ট। আর একরামুল মুসলিমীন পয়েন্টে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মুসলিম ভাইয়ের পার্থিব প্রয়োজন পূরণ, তার কষ্ট লাঘব, তার সম্মান রক্ষা এবং তার পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে। স্যার বলেন, দাওয়াত মানুষের আখিরাতের মুক্তির পথ খুলে দেয়- এটি সর্বোচ্চ স্তরের কাজ। আর একরাম মানুষের দুনিয়াবী কষ্ট দূর করে, তার হৃদয়ে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে। এই দুই কাজের প্রত্যেকটির নিজস্ব স্থান ও গুরুত্ব রয়েছে; একটিকে আরেকটির সাথে গুলিয়ে ফেললে বিষয়টি অস্পষ্ট হয়ে যায় এবং বিষয়টির মূল মাকসাদ হারিয়ে যায়।

🎤 ২৯৫

একবার এক আলোচনায় মাহফুজ ভাই স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, বলা হয় দোয়ার চেয়ে সম্মানিত জিনিস আর নেই। দোয়া এত সম্মানিত কিভাবে?” স্যার উত্তরে একটি উদাহরণ দিলেন। বললেন, “ধরো, তুমি দেখলে তোমার এক বন্ধু বাজারে মানুষের কাছে হাত পেতে চাইছে। তার সম্পর্কে তোমার ধারণা কী হবে? আর যদি দেখো, সেই মানুষটিই মসজিদে এসে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে দোয়া করছে- তখন তার সম্পর্কে তোমার ধারণা কী হবে?” স্যার বললেন, মানুষের কাছে চাইলে মানুষ ছোট হয়ে যায়। আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু আল্লাহর কাছে চাইলে মানুষ সম্মানিত হয়। সামান্য ভিক্ষার কারণে, চাওয়ার কারণেই তার অবস্থান ছোট হয়ে যেতে পারে; তার কদর ও সম্মান কমে যেতে পারে। মানুষ যখন মানুষের কাছে মুখাপেক্ষী হয়, তখন তার মর্যাদা হ্রাস পায়। স্যার বলেন, “ঠিক এর বিপরীত হলো আল্লাহর কাছে চাওয়া। আল্লাহর কাছে সওয়াল করা মানুষের মর্যাদা কমায় না; বরং বাড়ায়। কেউ যদি আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে, দুই হাত তুলে দোয়া করে- তাকে দেখে মানুষের অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। কারণ সে মানুষের কাছে নয়, আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী হয়েছে।” স্যার বোঝান, মানুষের কাছে চাওয়ার মধ্যে অপমান আছে; আর আল্লাহর কাছে চাওয়ার মধ্যে সম্মান, এই কারণেই দোয়া একটি সম্মানিত আমল। মানুষ যখন আল্লাহর দরবারে নিজেকে অসহায় বানায়, তখনই সে প্রকৃত মর্যাদা লাভ করে। বান্দার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থাই হলো আল্লাহর সামনে নিজেকে ফকির বানানো- নিজের মালিকের দরবারে নিজের অসহায়ত্ব ও প্রয়োজন প্রকাশ করা।

🎤 ২৯৬

একবার স্যার বলেন, দ্বীনের ময়দানে কামাল বা পূর্ণতা হলো নকলের মধ্যে; আর দুনিয়ার ময়দানে কামাল হলো আবিষ্কারের মধ্যে । স্যার বলেন, দুনিয়ার জগতে মানুষ নিজের সৃষ্টিশীলতা, নতুন আবিষ্কার, নতুন তত্ত্ব ও নতুন চিন্তার মাধ্যমে বড় হয়। কেউ যদি নিজে একটি কবিতা লেখে, নতুন থিওরি দেয় বা নতুন কিছু উদ্ভাবন করে- সেটাই তার কৃতিত্ব। সেখানে অন্যের লেখা আবৃত্তি করলে বিশেষ কৃতিত্ব ধরা হয় না। দুনিয়ার ময়দানে “আমি কী করলাম”- সেটাই মূল্যায়নের বিষয়। কিন্তু দ্বীনের ময়দান ভিন্ন। এখানে পূর্ণতা আসে নিজের নতুন কথা বলায় নয়; বরং যত বেশি কুরআন, হাদিস ও পূর্বসূরি আলেমদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করা যায়, তত বেশি গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। এখানে “আমি বললাম” দিয়ে কথা শুরু হলে তার ওজন কমে যায়; আর “আল্লাহ বলেছেন”, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন”, “ফুকাহারা বলেছেন”- এভাবে কথা প্রতিষ্ঠিত হলে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এই রেফারেন্সসমৃদ্ধ ধারাবাহিকতাই দ্বীনের ময়দানে গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্ব সৃষ্টি করে। স্যার বলেন, দ্বীনের জগতে মৌলিকত্ব মানে নতুন কিছু উদ্ভাবন নয়; বরং বিশুদ্ধ উৎসের সাথে সংযুক্ত থাকা। যত গভীর রেফারেন্স, যত নির্ভরযোগ্য সূত্র- তত বেশি গ্রহণযোগ্যতা। এখানে কামাল নিজের আবিষ্কারে নয়; বরং আমানতদারিত্বের সাথে নকল ও সঠিকভাবে পরিবেশনের মধ্যে। স্যার আরও তুলে ধরেন, এর অর্থ এই নয় যে চিন্তা বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। বরং চিন্তা হবে উৎসের আলোকে; নিজেকে সামনে না এনে উৎসকে সামনে রেখে । দ্বীনের ময়দানে বড় হওয়া মানে নিজের নাম উঁচু করা নয়- বরং নিজেকে আড়াল করে কুরআন ও সুন্নাহকে সামনে আনা।

🎤 ২৯৭

স্যার একবার বলেন, সব অযোগ্যতা আসলে অযোগ্যতা নয়; কখনো তা ভিন্ন স্তরের সামর্থ্যের ইঙ্গিত। আমরা হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সম্পর্কে একটি প্রচলিত কথা বলে থাকি- তিনি জীবনের এক সময় বকরি চরাতেন, এমনকি কয়টি নিয়ে গেলেন আর কয়টি ফেরত আনলেন- সেটাও ঠিকভাবে হিসাব রাখতে পারতেন না; অথচ পরবর্তীতে অর্ধ জাহানের খলিফা হলেন। স্যার এই কথাটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতেন। তিনি বলেন, কখনো কখনো যে ব্যক্তি বড় দায়িত্বের উপযুক্ত, তার স্বভাব ও সামর্থ্য ছোট গণ্ডির কাজে প্রত্যাশিত ফল দেয় না। এটা অযোগ্যতা নয়; বরং ভিন্ন স্তরের যোগ্যতারই ইঙ্গিত। স্যার এক উদাহরণ দেন- একজন শিল্পপতি, যিনি বহু কারখানা পরিচালনা করেন, তিনি হয়তো একটি ছোট মুদির দোকানে বসে খুচরা বিক্রি করতে পারবেন না। এতে তার অযোগ্যতা প্রমাণ হয় না; বরং তার কাজের পরিসর ভিন্ন স্তরের। একটি বিশাল জাহাজ ছোট খালে চলতে পারে না- তাই বলে জাহাজ অক্ষম নয়। একজন বড় প্রফেসর, বড় গবেষক পিএইচডি থিসিস মূল্যায়ন করতে পারেন; কিন্তু কিন্ডারগার্টেনে A,B,C,D শেখাতে গেলে শিশুরা তার তার ক্লাসে আনন্দ পায় না; বা তার কাছে পড়ে সেইভাবে উপকৃত নাও হতে পারে। সেটি তার দুর্বলতা নয়; বরং তার দক্ষতার ক্ষেত্র আলাদা। স্যার ব্যবসার উদাহরণ দেন। ধরো, কারও পুঁজি ১০০ টাকা, সে সেই পুঁজিতে বাদাম কিনে ভেজে বিক্রি করবে; ট্রেনে বাদাম বিক্রি করবে, মোড়ে পান বিক্রি করবে, তো ওই পুজির ব্যবসা ভালভাবে চলবে লাভও হবে। কিন্তু যদি তার পুঁজি ১ লাখ হয়, তবে একই ছোট মোড়ে বসে ওই পানের ব্যবসা করলে তা টিকবে না। পুঁজি যত বাড়ে, ব্যবসার ক্ষেত্রও তত বড় করতে হয়। ১ কোটি টাকার পুঁজি নিয়ে ছোট হাটে বসলে ব্যবসা হবে না; ১০০ কোটির পুঁজি নিয়ে এই ছোট শহরে সীমাবদ্ধ থাকলে ব্যবসা জমবে না, বড় বাজারে ঢুকতে হবে। সামর্থ্য নিজেই মানুষকে বড় পরিসরের দিকে ঠেলে দেয়। স্যার বলেন, কখনো কখনো মানুষ নিজেকে ছোট কাজে মাপতে গিয়ে ভুল করে, অথচ আল্লাহ তাকে বড় দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। স্যার বলতেন, যোগ্যতার পরিসর ভিন্ন ভিন্ন। বড় সামর্থ্যকে ছোট গণ্ডিতে আটকে রাখা যায় না, এমনি বিশেষ সামর্থ্যকে সীমিত পরিসরে ব্যবহার করলে তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না।

🎤 ২৯৮

পড়াশোনা শেষ করার পর ভাই আব্দুল কাইয়ুম স্যারকে জিজ্ঞাসা করেন, “স্যার, চাকরির ব্যাপারে কী করব? অনেক জায়গায় শুনছি চাকরি পেতে হলে টাকা-পয়সা দিতে হয়। কেউ বলে এত টাকা লাগবে, কেউ বলে অমুকের সাথে দেখা করলে কাজ হবে। এ অবস্থায় কী করা উচিত?” ভাই বলেন, সে সময় আমার চাকরির খুব প্রয়োজন ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্কুলার হয়েছিল, আবার বিভিন্ন জায়গায়ও আবেদন করেছিলাম। চারদিক থেকে নানা ধরনের পরামর্শ আসছিল। কেউ বলছিল- অমুকের সাথে দেখা করো, তমুকের কাছে যাও, এত টাকা দিলে চাকরি হয়ে যাবে। এসব কথা শুনে আমি দ্বিধায় পড়ে স্যারকে জিজ্ঞাসা করলাম। স্যার উত্তরে সংক্ষিপ্ত কথা বলেন। স্যার বলেন: “যারা টাকা চায়, আসলে তাদের চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা নেই বলেই টাকা চায়।” স্যার বোঝান, অনেক সময় টাকা দাবি করা অক্ষমতারই লক্ষণ। এরপর তিনি বলেন, কেউ যদি পরামর্শ দেয় যে অমুকের সাথে দেখা করো বা তমুকের কাছে যাও, তাহলে দেখা করা যেতে পারে। মানুষের সাথে পরিচয় করা বা কথা বলা দোষের নয়; তবে টাকা দিয়ে চাকরি নেওয়া নয়। তিনি বলেন, “কেউ যদি কোথাও দেখা করার পরামর্শ দেয়, তাহলে যাও। সবার সাথে দেখা করো। সালাম দিয়ে বলো, আমি একজন প্রার্থী, আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি। বাস এতটুকুই; কিন্তু টাকা দিয়ে না।” শেষে স্যার বলেন, “তকদিরে থাকলে চাকরি হবে। আর তকদিরে না থাকলে টাকা দিলেও হবে না।”

🎤 ২৯৯

ভাই সাজ্জাদ বলেন, স্যারের সাথে আমার প্রথম দেখা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সে সময় আমি আরেক ভাইয়ের সাথে স্যারের কাছে বসেছিলাম। ওই ভাই স্যারের সাথে নামাজের কিছু মাসআলা নিয়ে আলোচনা করছিলেন, বিশেষ করে বিমানযাত্রার সময় নামাজ আদায়ের বিষয়ে। এই প্রসঙ্গেই কথাবার্তা চলছিল। হঠাৎ স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি সাধারণত রাত কয়টার দিকে ঘুমাও?” আমি বললাম, “স্যার, শুতে শুতে তো প্রায় রাত একটা বেজে যায়।” আমার কথা শুনে স্যার বললেন, “এটা তো ইহুদিদের তরিকা।” (মুসলমানের জীবনযাত্রা এমন হওয়া উচিত যে, রাতের সময় অকারণে জাগ্রত না থেকে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি বিশ্রাম নেওয়া যায় এবং ভোরবেলা ইবাদতের জন্য প্রস্তুত থাকা যায়।) স্যার সম্ভবত নসিহত হিসেবে বোঝাতে চেয়েছিলেন, মুসলমানের জীবনযাত্রা হবে সুসংগঠিত। রাত গভীর পর্যন্ত জেগে থাকা মানুষের মধ্যে অলসতা সৃষ্টি করে এবং অনেক সময় ফজরের নামাজ ও সকালবেলার বরকত থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়ে যায়।

🎤 ৩০০

এলেম ও জিকির সম্পর্কে স্যার একবার বলেন, সব নেক কাজ সব সময় একই স্তরের হয় না; সময়ভেদে অগ্রাধিকার বদলায়। এলেম মানুষকে সঠিক আমল চিনতে সাহায্য করে, আর জিকির হলো সেই সঠিক আমলে পূর্ণ একাগ্রতার সাথে নিজেকে নিয়োজিত করা। একজন মানুষ চাইলে এই মুহূর্তেই শত শত ভালো কাজের তালিকা করতে পারে, আবার শত শত খারাপ কাজের তালিকাও করতে পারে। যেমন কেউ জিকির করতে পারে, কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে, মানুষকে দাওয়াত দিতে পারে, অসহায়কে সাহায্য করতে পারে, রোগী দেখতে যেতে পারে, এভাবে অনেক ভালো কাজের কথা বলা যায়। ঠিক তেমনি অনেক খারাপ কাজের তালিকাও করা সম্ভব। স্যার বলেন, শয়তানের প্রথম চেষ্টা থাকে মানুষকে খারাপ কাজে জড়ানো। বড় খারাপ কাজে যদি সে সফল না হয়, তাহলে অন্তত ছোট কোনো খারাপ কাজে মানুষকে ব্যস্ত রাখতে চায়। আর যদি খারাপ কাজে জড়াতে না পারে, তখন সে অন্য কৌশল নেয়, ভালো কাজগুলোর মধ্যেই মানুষকে এমন কাজে ব্যস্ত রাখে, যা তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ; অথচ সেই মুহূর্তে যে কাজটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখান থেকে তাকে সরিয়ে দেয়। স্যার বলেন, শয়তান মানুষকে নেক কাজেই ব্যস্ত রাখবে, কিন্তু সেই কাজটি যেন ওই মুহূর্তের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় কাজ না হয়, সেটাই তার চেষ্টা। সে নেক কাজতো করছে, কিন্তু সেই মুহূর্তে আল্লাহ তার কাছ থেকে যে কাজটি চান, সেটি করছে না। স্যার বলেন, আমরা হালের তাকাযা যে বলি, এই প্রত্যেকটা মুহূর্তে আল্লাহ পাক আমার নিকট থেকে কি চাইছেন, ওই মুহূর্তের তাকাযাকে বুঝা- এইটা হচ্ছে এলেম। স্যার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ধরো মাগরিবের আজান হয়ে গেছে। এখন আমার জন্য সবচেয়ে উত্তম আমল কী? আবার হঠাৎ করে মা অসুস্থ হয়ে গেলেন, তখন সেই মুহূর্তে আল্লাহ আমার কাছে কী চান? ঐ মুহুর্তের হাজারো করনীয় নেক আমল থেকে আল্লাহর চাহিদার অগ্রাধিকার কোথায়? স্যার বলেন, এই মুহূর্তে আল্লাহ আমার কাছে কী চান- এটি বুঝতে পারার নামই হলো এলেম। আর সেই করণীয় আমলটি বুঝে নেওয়ার পর এমনভাবে তাতে আত্মনিয়োগ করা, যাতে অন্য অনেক নেক আমল আর তখন মনে না থাকে- এই একাগ্রতাকেই বলা হয় জিকির। স্যার বলেন, শরীয়তের একটি উসূল আছে: “اشتغال عن كل شيء” - সবকিছু থেকে মন সরিয়ে একটি কাজে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। তিনি বোঝান, যে মুহূর্তে যে আমল করণীয়, সেই আমলে এমনভাবে ডুবে যাওয়া যে অন্য সব সম্ভাব্য নেক আমল তখন মনে না থাকে, এটাই প্রকৃত জিকির। স্যার বলেন, শয়তান এই একাগ্রতা তৈরি হতে দেবে না। তালিমের সময় সে জিকিরের কথা মনে করাবে, জিকিরের সময় অন্য কাজের কথা মনে করাবে, দাওয়াতের সময় তিলাওয়াতের কথা মনে করাবে, আবার খেদমতের সময় দাওয়াতের কথা সামনে আনবে। এভাবে সে মানুষকে সর্বোত্তম কাজ থেকে সরিয়ে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ (সময়য়ের অগ্রাধিকার অনুযায়ী) নেক আমলে ব্যস্ত রাখতে চেষ্টা করবে।