মালফুযাত

Volume 2

মালফুযাত ১০১–২০০

🎤 ১০১

ওমরার সফরে মক্কা শরীফে এক আরব শেখ স্যারকে রাতে খাবার দাওয়াত দেন। মেজবানের দাওয়াত ও গাড়ীতে যাবার সুবিধা থাকায় স্যার সহ চারজন ঐ আরব শেখের দাওয়াতে শরীক হয়। খানা শেষে ফেরার সময় ঐ আরব শেখ (মেজবান) স্যারকে একটা প্যাকেটের মধ্যে করে হাদীয়া দেন। স্যার নিয়ে ঐ প্যাকেটটি এক সাথীর হাতে দেন, পরে ফিরে ঐ হাদীয়ার প্যাকেট খোলা হয়, বড় অংকের টাকা হাদীয়া ছিল। স্যার সাথীদের একজনকে বলেন, এটাকে চার ভাগ করে নাও, ঐ প্যাকেটের হাদীয়াকে (রিয়ালকে) চার ভাগ করে চার জনে নেওয়া হলো, প্রত্যেকের ভাগেই প্রায় ৪০/৫০ হাজার টাকার সমপরিমাণ আসে। স্যার বললেন, হাদীয়া বন্টন করতে হয়। আরব শেখ স্যারকে হাদীয়া দিয়েছেন, স্যার একাই নিতে পারতেন, স্যার একা নিলেন না, সাথীদের একজনের দ্বারা সমানভাবে ভাগ করে এক অংশ নিলেন।

🎤 ১০২

স্যার একবার বলেন, যদি কেউ বলে, এককথায় ইসলাম কি, এককথায় ইসলাম হলো আল্লাহ তায়ালার মহব্বত। হজরত মাওলানা ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহির একটা কথা, আল্লাহ তায়ালার মহব্বতের পরেই মানুষের জন্য সবচেয়ে দামী হলো মমিনের মহব্বত। মানুষের মহব্বতের ব্যাপারে যুহুদ করো না, বে-পরওয়া হয়ো না। ওমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আহত হবার পর ঘরে নিয়ে আসা হলো, ঘরে নিয়ে আসা হলেই সর্বপ্রথম মদীনায় (শহরের বিভিন্ন গলিতে) লোক পাঠালেন, যাও দেখে আসো আমার এই অবস্থায় মদীনার লোক কি খুশি নাকি নারাজ? মানুষের খুশি অখুশির পরওয়া উনি করছেন। উনাকে বলা বলো, না আমিরুল মুমিনিন, খুশি না, আপনার এই অবস্থায় সবাই খুব ব্যথিত, কান্নাকাটি করছে। এই খবর শুনে হজরত ওমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, আলহামদুলিল্লাহ, আমি জালিম নই। আব্দুল কাদির জিলানি রহমতুল্লাহি আলাইহির একটা কথা, আগের উম্মতের জন্য যদি চল্লিশজন লোক একজনের জন্য সাক্ষি দিতো যে এই লোকটা ভালো, তাহলে তার সাক্ষি গ্রহণ করা হতো। মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের জন্য যদি দুইজন লোকও সাক্ষি দেয় যে এই লোকটা ভালো, তাহলে আল্লাহ তায়ালা সেই সাক্ষি গ্রহণ করে তাকে মাফ করে দেন। স্যার বলেন যে নাফরমানরা এই মহব্বত পায়না। স্যারের ছোট বেলায়, অনেক আগে, সিলেটে এক ডাকাত মারা গেছে, তো রাস্তায় ছোট ছোট বাচ্চারা খুশিতে হাত তালি দিচ্ছে, যে ওই ডাকাত মারা গেছে, ওই ডাকাত মারা গেছে। ছোট বাচ্চারা হয়তো ওকে ব্যক্তিকে চেনেও না, ডাকাতিও বোঝে না, কিন্তু ওর মারা যাওয়াতে হাত তালি দিচ্ছে, খুশি প্রকাশ করছে। ফেরাউনের কথা আছে, ফেরাউনের মারা যাওয়াতে না আসমানের কেউ কেঁদেছে, না জমিনের কেউ কেঁদেছে, আফসোস করেছে। আল্লাহ তায়ালা যাকে ভালো বাসেন, তার কথা আসমানে ঘোষণা করে দেন, আসমানওয়ালারা জমিনে ঘোষণা করে দেন, জমিনের সবাই তাকে মহব্বত করে। নবীরা দুনিয়াতে এই মহব্বতের লাইন নিয়ে এসেছিলেন, আল্লাহ তায়ালার মহব্বত, ও মানুষের মহব্বত বাড়ানো।

🎤 ১০৩

স্যারের সরাসরি ছাত্র, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ভাই রিয়াজ মোর্শেদ বলেন, স্যার আমাদের ক্লাসে আসলে ক্লাসের শিক্ষার্থীরা সবাই অভ্যাস মতো শিক্ষক প্রবেশ করায় দাড়িয়ে যায়। স্যার প্রথম ক্লাসে প্রথম দিন এসেই বলে দিয়েছিলেন যে আমার ক্লাসে আমি প্রবেশ করার পর কাউকে দাঁড়াতে হবে না (দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে না)। একবার দিনাজপুর সফরে আবুল কালাম আজাদ ভাই দিনাজপুর ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণরত ইমামদের মধ্যে কথা বলার জন্য স্যারকে নিয়ে সেখানে যান। স্যার ক্লাসে প্রবেশ করার সাথে সাথে ইমামগণ এবং সেখানকার অফিসাররা সবাই দাঁড়িয়ে গেলেন। স্যার কথা বলার শুরুতেই জিজ্ঞেস করলেন, আমি প্রবেশ করার সাথে সাথেই আপনারা যে দাঁড়ালেন, এই দাঁড়ানো কি শরীয়তে জায়েজ কিনা? স্যারের এই প্রশ্ন শুনে সবাই একটু ইতস্তত করছিলো, কিছু বলছিলো না, কিছুক্ষণ পরে একপাশ থেকে একজন ইমাম বললেন, জায়েজ না, নাজায়েজ, বাকী সবাই চুপ। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, যদি জায়েজ নাই হয়ে থাকে তাহলে দাঁড়ালেন কেন? শরীয়ত কি বাইরে একটা আর ভিতরে আরেকটা, কিতাবে (জানার জন্য) একরকম, আর আমলের জন্য আরেক রকম হুকুম?

🎤 ১০৪

এক বয়ানে স্যার বলেন, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার মানুষকে ডাকেন শুদ্ধ জীবনের দিকে, আর মানুষ দৌড়ায় দক্ষতার দিকে। মানুষ নিজেকে মূল্যবান বানাতে চায়, আর বড় ভুল করে যে দক্ষতা দিয়ে বানাতে চায়, তার কাজের দক্ষতা দিয়ে সে মূল্যবান হতে চায়। দক্ষতার দ্বারা তার নিজের জীবন মূল্যবান হয়না, সে মূল্যবান জিনিষের উৎপাদনকারী হয়। একজন কুমার মাটিরপাত্র বানায়, সে যদি দক্ষ কুমার হয় তাহলে শুদ্ধ (সুন্দর) পাতিল বানাতে পারে, নিজে শুদ্ধ (সুন্দর) হয় না। সে হচ্ছে দক্ষ, সে দক্ষ কুমার, ওর কৃত্তি শুদ্ধ (সুন্দর) পাতিল, যার মূল্য বড় সাময়িক, কিন্তু এই কৃত্তির কারণে সে শুদ্ধ মানুষ হবে না । নিজ গুণেও মানুষ মূল্যবান হয় আর উৎপাদনের গুণেও মানুষ মূল্যবান হয়। ফুল ফল নিজ গুণে নিজ দাবিতে মূল্যবান, গোবর উৎপাদনের গুণে মূল্যবান। কৃষকরা গোবরকেও মূল্যদিয়ে কিনে, গোবরেরও মূল্য আছে, কিন্তু গোবরের যে মূল্য আছে, সেই মূল্য তার নিজ গুণের কারণে নয় যে গন্ধ খুব ভাল, সুন্দর, এইজন্য কেউ গোবর কিনে না, বরং সুন্দর ফুলের উৎপাদনের সহায়ক। ফুলকে যে কিনে, ফুলের নিজের গুণের কারনে কিনে, ফুল নিজে সুন্দর, তার নিজ গুণে। সম্পূর্ণ দক্ষতার পথ মানুষকে শুদ্ধ উৎপাদনের সহায়ক বানায়, শুদ্ধ মানুষ বানায় না। যতদিন পর্যন্ত ঐ উৎপাদন আছে, ততদিন তার মূল্য আছে। গোবরের মূল্য সবার কাছে নয়, শুধু কৃষকের কাছে আর তার চাষের মৌসুমে। অন্য কারো কাছে মূল্য নেই, আর কৃষকের নিকটও মৌসুম পার হয়ে গেলে, এখন আর সারের দরকার নয়, এখন তার কাছে আর গোবরের কোন মূল্য নেই। কিন্তু ফুল ফল এগুলো সবার কাছে, সবসময় মূল্যবান। একজন দক্ষ ডাক্তার শুধু রুগীর কাছে মূল্যবান যতদিন পর্যন্ত সে রুগী, একজন শুদ্ধ মানুষ সবার কাছে, সবসময়, সর্বকালে মূল্যবান। এই জন্যে নবীরা যে পথ এনেছেন ঐ পথে যারা মূল্যবান হয় তারা তখনও মূল্যবান ছিলেন, আজও মূল্যবান, কেয়াম পর্যন্ত মূল্যবান থাকবেন। আবুবকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু, ওমর রাদিয়াল্লাহ আনহু, সব সাহাবারা, তখনও মূল্যবান ছিলেন, আজও মূল্যবান আর ভবিষ্যতেও থাকবেন। তারা যে পথ দেখিয়ে গেছেন সেই পথ আজও মানুষের জন্য বড় ফায়দা দিয়ে যাচ্ছে। আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম যে পথ এনেছেন সেই পথে একজন মানুষ নিজ দাবীতে মূল্যবান হয়, শুদ্ধ জীবনের জন্য মূল্যবান হয়। জীবনকে যদি আমরা শুদ্ধ করতে পারি আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করছেন, দুনিয়াতেও ভাল জীবন দেবেন আখেরাতেও ভাল জীবন দেবেন।

🎤 ১০৫

১০৫। একবার এক কথা প্রসঙ্গে স্যার বলছিলেন, একজন মেহমান বাসায় থাকা মানে একটা লাশ থাকা। মেহমান বাসায় থাকার কারণে মেজবান বা মেজবানের ঘরের লোকজন স্বাধীন থাকেন না, মেহমানের দিকে নজর রাখতে হয়, ইচ্ছেমতো যেকোন কিছু করতে পারেন না। ঘরে লাশ থাকলে যেমন সবকাজ ঠিকমতো করা যায় না, স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়, নিয়মিত কাজকর্ম স্থগিত থাকে, এরকম মেহমান থাকা পর্যন্ত মেজবানের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। মেজবানের বাসায় খাবার খেয়ে, যদি যাবার হয়, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাওয়া, এত দীর্ঘ সময় অবস্থান না করা যাতে মেজবানের জন্য কষ্টের কারণ হয়। فَاِذَا طَعِمۡتُمۡ فَانْتَشِرُوۡا وَلَا مُسۡتَاۡنِسِيۡنَ لِحَـدِيۡثٍ খাবার শেষ হলে চলে যাও, কথাবার্তায় লিপ্ত হয়ো না।

🎤 ১০৬

আমাদের এক ভাই (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) ঢাকায় আরেক ঘনিষ্ঠ সাথীর প্রতিষ্ঠানে চাকুরীতে যোগদান করেন। একথা স্যারের সাথে আলোচনা হচ্ছিল, কিছু কথা প্রসঙ্গে তখন স্যার বললেন বন্ধুর এমপ্লয়ি হওয়া ঠিক নয়।

🎤 ১০৭

এক বয়ানে স্যার বলছিলেন, মানুষের প্রধান পরিচয় হলো সে মহব্বত করে, আর মহব্বতের ক্বদর করা জানে। এক জামানায় মানুষ জাহাজে যেতো, এখন এরোপ্লেনে যায়, জাহাজের চেয়ে সময় অনেক কম লাগে, আরামে যাওয়া যায়, ভাল বিকল্প, এখন আর পানি জাহাজে যেতে রাজি নয়, এরকম বিকল্প পছন্দ করা সহজ ও সম্ভব। কিন্তু যদি কেউ দেশের মধ্যেই বা অন্য কোন দেশে আরো সুন্দর করে একটা কাবার মতো জিনিষ বানায়, এখানে যাওয়া সহজ আর থাকা খাওয়ার ভাল বন্দোবস্তও থাকে, তো মক্কা শরীফ গিয়ে হজ্জ্ব না করে এখানে যে কাবার মতো জিনিষ বানানো হয়েছে, ঐটার তওয়াফ করা যাক, হজ্জ্ব হয়ে যাবে, না এইটা সম্ভব না। আগে জাহাজে যেতে এখন প্লেনে যাও, ঐটার তো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করলে, আর এইটার বিকল্প করতে অসুবিধা কি? ঐটার বিকল্প হতে পারে, কারণ প্লেনে চড়া কোন লক্ষ্য বা কোন মাকসাদ নয়, মাকসাদ (লক্ষ্য) হাসিল করবার জন্যে একটা উপলক্ষ্য। উপলক্ষ্য পরিবর্তন করা যায় কিন্তু আল্লার ঘর তওয়াফ করা এইটা কোন কিছুর উপলক্ষ্য নয়, এইটা আল্লারই সাথে মহব্বতের প্রকাশ, এইখানে কোন বিকল্প হতে পারে না। অনেক বেতন দিয়ে অসুস্থ মায়ের জন্যে নার্স রাখা হয়েছে, নার্সের মেজাজও বেশি ভাল নয়, রাগ বেশি, অসুস্থ মায়ের উপরও রেগে যায়, কিন্তু যেহেতু মায়ের সেবা যত্নের প্রয়োজন, আর সব ধরণের যত্ন ছেলে করতেও পারছে না, আবার কিছু কিছু যত্ন এমন ধরণের যেগুলোর কিছু জ্ঞান দরকার যেমন ইনজেকশান দেওয়া ইত্যাদি। যেহেতু ঐ নার্স এই ব্যাপারে দক্ষ, প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত, প্রেসার দেখা ইত্যাদি অনেক গুলো জিনিষ পারে, যার কারনে মায়ের যত্নের জন্য বেতন দিয়ে নার্স রাখা হয়েছে, যদিও ঐ নার্সের মেজাজ অনেক খারাপ। অরেক জন নার্স পাওয়া গেলো সেও দক্ষ, বরং দক্ষতার দিকে আরো বেশি, মেজাজও ভাল, যদি পায় ওরকম তাহলে বদলিয়ে নিবে। বেশী ভাল নার্স পাওয়া গেছে, বেতনও কম মেজাজও ভাল, তো একেই রাখি, আগেরটাকে বাদ দিয়ে দেই, এইটা স্বাভাবিক । কিন্তু এইটা হবে না যে এই মা তো বিছানায় পড়ে আছে, বিছানায় পেশাব পায়খানা করে একে রেখে তো বেশি সুবিধা হচ্ছে না, এই মাকে বাদ দেই আর আরেক মা যোগাড় করি। ঐটা হবে না, কারণ ঐটা মহব্বতের আর মহব্বতের ব্যাপারে কোন বিকল্প হয়না। মায়ের মহব্বত লক্ষ্য, লক্ষ্যের সাথে মহব্বতের সম্পর্ক, ঐটার বিকল্প হয়না, কিন্তু ঐ মহব্বতের মাকসাদ পুরা করবার জন্যে তার যত্ন করা একটা জরুরত, নার্স রাখা, যেটা উপলক্ষ্য আর এই উপলক্ষ্যের বিকল্প হতে পারে।

🎤 ১০৮

একবার এক কথা প্রসঙ্গে স্যার বলছিলেন, বিবিরা (বউ) ভেতর থেকে নিয়্যত তৈরী করে দেয়, পেছন থেকে প্ররণা দেয়। যেমন যতলোক বাজারে ঘুরছে এর একটা বড় অংশ খেলনা গাড়ীর মতো, পেছন থেকে বউ বাড়ী থেকে স্প্রিং দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। খেলনা গাড়ী ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং করে আগাচ্ছে দেখা যায়, কিন্তু পেছন থেকে কেউ স্প্রিং দিয়ে দিয়েছে। বউ বাড়ী থেকে স্প্রিং দিয়ে দিয়েছে, এখন ওই ব্যক্তি মার্কেট টার্কেট যা কিছু করছে, যতো ধরনের বাজার সদাই করছে তার পেছনে স্প্রিং দেওয়া আছে। একটা মানুষ বাড়ী বানাচ্ছে, এই বাড়ী বানানোর কথাটা দুই চার বছরে ওর অন্তরে গেঁথে দিয়েছে ওর বউ। যখন ও বাড়ী বানানোর কথা মেনে নিয়েছে, শুরু করে দিয়েছে, তখন বউ চা বানাচ্ছে, বউ রান্নাঘরে ব্যস্ত। সাহেব বাড়ী বানাচ্ছে ঠিকই কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ভেতরে এই নিয়্যত পুশে দিয়েছে বউ।

🎤 ১০৯

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মোস্তফা কামাল স্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম পাড়া এলাকায় থাকতেন। একদিন বিকেলে জুবেরী ভবনে স্যারের সাথে উনার দেখা হলে পরদিন সকালে উনার বাসায় নাস্তার দাওয়াত দেন। সকালে নাস্তার পর স্যার উঠে চলে আসতে লাগলে উনি স্যারকে বলেন, আরে মুসফিক ভাই আপনি চলে যাচ্ছেন? আপনাকে তো এমনি এমনি দাওয়াত দেইনি। স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, কেন? মোস্তফা কামাল স্যার বললেন আমি আপনাকে এইজন্য দাওয়াত দিয়েছি যে ওদেরকে (উনার সন্তানদের দিকে ইঙ্গিত করে) কিছু বলবেন, ওরা নামাজ কালাম কিছু পড়ে না। ওদেরকে কিছু বলে যান। স্যার বললেন আপনি বাপ, আপনি বাপ হয়ে আপনার কথা শুনে না, তো আমি কে যে আমার কথা শুনবে? একথা বলে স্যার বের হয়ে গেলেন।

🎤 ১১০

সায়ীদ আবুবকর ভাই একদিন স্যারকে জিজ্ঞেস করেন (১৯৯৬/৯৭), স্যার কাশ্মীরে মুসলমান নির্যাতিত হচ্ছে, এই ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি? স্যার উত্তরে বলেন, কাশ্মীরে আমাদের বড় মেহনত ছিল, প্রচুর কাজ হচ্ছিল। কিন্তু কিছু লোভী মুসলমান ফল পাকার আগেই ফলটা পারতে গেলো, আর মেহনতও নষ্ট হয়ে গেলো।

🎤 ১১১

এক মোজাকারায় স্যার বলেন দ্বীনি মতামতের ব্যাপারে নিরপেক্ষ অবস্থান, বেদ্বীনির আলামত। অনেকে বলে থাকেন কোন পক্ষেই যাবার দরকার নেই, নিরপেক্ষ থাকো, আমরা নিজেদের মধ্যে ঝামেলা চাই না, আমরা নিরপেক্ষ। পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরপেক্ষ হলো ফুটবল, ওকে ২২ জনই লাথি মারে, এদিকে ১১ জন ওদিকে ১১ জন, যেহেতু ও নিরপেক্ষ, ২২ জনেরই লাথি খায়, কারণ ও ফুটবল, ও নিরপেক্ষ। নিরপেক্ষ বলতে দ্বীনের মধ্যে কোন অবস্থান নেই, হক্বের উপর থাকতে হবে। সারা দুনিয়া আমার বিপক্ষে গেলেও আমি নিরপেক্ষ থাকবো না, হক্বের উপর থাকবো। নিরপেক্ষ অবস্থান, সবার সাথেই তাল মিলিয়ে চলা, দ্বীনদারীর কমতির কারনে হয়। ফাজায়েলে ছাদকাত এর কথা উল্লেখ করে বলেন, সবার কাছে যে ভালো, ওর দ্বীনদারীতে সমস্যা। ৫০ জন সিদ্দিকিনের মর্যাদা দেওয়া হবে তাকে, যে সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারতো, সবার মন জয় করতে পারতো, কিন্তু তা করে না, নিরপেক্ষ থাকে না। ও সবার কাছে ভালো হতেই পারে না, হয় মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লামের শত্রু হবে, না হয় ফেরাউনের শত্রু হবে। আর ফেরাউনের শত্রু হলে মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লামের বন্ধু হবে, এবং মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লামের শত্রু হলে ফেরাউনের বন্ধু হবে। একসাথে দুজনেরই বন্ধু হতে পারে না, দ্বীনের মধ্যে তালমিলিয়ে চলার অবস্থান নেই।

🎤 ১১২

একবার স্যার বলেন, আমার জীবনের সবচেয়ে উত্তম মেহমানদারী হলো এক মুচীর (জুতা সেলাই করনেওয়ালা) মেহমানদারী। একসময় পাকিস্থানে ইফতারীর পূর্ব মূহুর্তে বাজারে গেলাম কিছু ইফতারী কিনতে, সুবিধামতো খাবারের দোকান পাচ্ছি না, রাস্তার পাশের এক মুচির নিকট খাবারের দোকানের খোঁজ করছিলাম। এরই মধ্যে ইফতারীর সময়ও হয়ে গেছে। উনি আমাকে বললেন বসো, জুতা ঠিক করার জিনিষ পত্রের বাক্স থেকে একটি পুটলি বের করে আমাকে বাক্সের উপর বসতে দিলেন। উনি পুটলি থেকে একটা শুকনা রুটি বের করলেন, রুটিটা দুই ভাগ করে অর্ধেক আমাকে দিলেন আর অর্ধেক উনি খেলেন, উনিও রোজা ছিলেন। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে উত্তম মেহমানদারী।

🎤 ১১৩

একবার এক ভাই তার বিবির কথা উল্লেখ করে স্যারকে জিজ্ঞাসা করেন, প্রসবকাল ঘনিয়ে এসছে, কি আমল করবো, আল্লাহ পাক সামগ্রিক সহজ করেন, কি আমল করা যায়। স্যার বলেন, তোমার বিবিকে- ربي يسر ولا تعسر وتمم علينا بالخير. এটা বেশী বেশী পড়তে বলবে, এবং যখন একেবারে সময় উপস্থিত হয়, তখন ও এই দোয়া যেনো বার বার পড়তে থাকে। ওই ভাই বলেন, আমার বিবি পরে বলছিলো যে ব্যাথার সময় আমি এই দোয়া ১০ বার পড়া শেষ করার আগেই বাচ্চা খালাশ হয়ে যায়।

🎤 ১১৪

আমাদের এক সাথী তার এক আত্মীয়ের কথা স্যারকে বলছিলেন, ঐ আত্মীয় হজ্জ্বের সফরে জেদ্দায় নেমেই অসুস্থ হয়ে যায়। পাশেই হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য এরই মধ্যে ৯/১০ জিলহজ্জ্ব পার হয়ে যায়, তার আরাফাতে যাওয়া হয় না। হজ্জ্বের পর ঐ সাথী জেদ্দায় ঐ আত্মীয়ের খোঁজ নিতে এসে দেখেন উনি হাসপাতালেই আছেন, তার হজ্জ্ব আর হয় না, পরে সুস্থ হয়ে ফিরে আসে। এই কথা শুনে স্যার বলেন, হয়তো তার মর্যাদা আল্লাহ পাকের কাছে অনেক বেশী, আল্লাহ পাক এর উসিলায় তাকে আরো তরক্কী দান করবেন, অথবা এর বিপরীত, আল্লাহ পাকের কাছে আরাফার দিনে আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হবার যোগ্য হয়তো সে না।

🎤 ১১৫

এক মোজাকারায় স্যার বলেন, সময় উপার্জন করার জিনিষ, সময় উপার্জন করতে হবে। আমরা যেমন অর্থ সম্পদ উপার্জন করি, তেমনি সময়টাও উপার্জন করতে হবে। আব্দুল আজিজ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি আছর মাগরীবের মাঝখানে এক খতম কোরআন শরীফ পড়তেন, এটা তার উপার্জন করা সময় বা সময়ের বরকত, উনি এটা আল্লাহ পাকের নিকট থেকে চেয়ে নিয়েছেন। ইমাম শাফেঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি রমজানে ৬১ খতম কোরআন শরীফ পড়েছেন, দিনে এক খতম, রাতে এক খতম, এবং তারাবীতে এক খতম, এভাবে ৩০ দিনে ৬১ খতম পড়তেন। ওসমান রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু রাতে এক খতম করতেন। আল্লাহ ওয়ালারা অল্প সময়ে অসংখ্য কাজ করতেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহমতুল্লাহি সম্পর্কে উনার ছাত্র হাফেজ ইবনুল কাইয়ূম রহমতুল্লাহি বলেন, আমাদের ওস্তাদ একরাতে যেটা লিখতেন, আমরা ৭ দিনে সেটার কপি লিখে শেষ করতে পারতাম না। হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একা যে কাজ করেছেন, আমাদের ১০টা মন্ত্রণালয় সেই কাজের আন্জাম দিতে হিমশিম খেয়ে যাবে, কিভাবে সম্ভব, কিভাবে পারলেন, তাদের সময় ছিল উপার্জন করা সময়।

🎤 ১১৬

ভাই আমানুল্লাহ বলেন, একবার স্যারের সাথে আমরা ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) গিয়েছিলাম (১৯৯৩/৯৪), স্যারের এক ছাত্র উনার বাসায় আমাদেরকে দাওয়াত দেন, উনার বাসায় খানা খাওয়ার জন্য। উনার বাসায় যাবার আগে স্যার আমার হাতে ৫০০ টাকা দিয়ে বললেন, কিছু মিষ্টি নিয়ে নিয়ো। জোহরের নামাজের পর সবাই খানা খাওয়ার জন্য উনার বাসায় গেলাম। মেজবান যে ভাই, যার বাসায় গিয়েছি, তার এক ছেলে জন্ম থেকে ২০ বছর, বিছানায় পরে আছে অসুস্থ অবস্থায়, বিছানায় পেশাব পায়খানা করে, উঠা চলাফেরা কিছু করতে পারে না, তার কোন শক্তিই নাই। এই দীর্ঘদিন যাবত তার মা বাবাই সমস্ত খেদমত করে আসছে, একথা বলতে বলতে সেই ভাই কাঁদতে লাগলো, জন্ম থেকেই ছেলে এরকম, কোন চলাফেরা করতে পারে না, এই ছেলের খেদমতের কারণে তারা কোথায়ও যেতেও পারে না। ওই ভাইয়ের কথা শুনে স্যারের চোখে পানি ছল ছল করছিলো, স্যার তখন খালি একটা কথা বললেন, তোমাদের এই সন্তানের কারণে তোমাদের, বাপ-মা এর মর্যাদাকে আল্লাহ পাক বাড়িয়ে দিবেন।

🎤 ১১৭

এক মোজাকারায় স্যার বলেন, ইসমাঈল শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি, এবং উনার পীর যিনি বালাকোটের ময়দানে উনার আমীর ছিলেন, সৈয়দ আহমদ শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি, এই দুইজনের মধ্যে ময়দানে কোন একটা শরয়ী ব্যাপারে মতের এখতেলাফ (মতপার্থক্য) হয়েছিলো। পরে সৈয়দ আহমদ শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহির রায় টাই সঠিক প্রমাণিত হলে ইসমাঈল শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পীর সৈয়দ আহমদ শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহিকে বলেন, আজকের পর থেকে আমি আর কোন ব্যাপারে আপনার বিরোধীতা করবো না। মুরিদের এই কথা শুনে সৈয়দ আহমদ শহীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, এটা হলো - الشرك في النبوه. এটা জায়েজ নেই। বিরোধীতা যদি শরাআন করতে হয় তাহলে করতেই হবে, কোন ব্যাক্তিকে নবীর জায়গায় স্থান দেওয়া যাবে না। আপনার বিরোধীতা করবো না মানে আপনার ভূল হতে পারে না, পীর সাহেব বা আমীরের ব্যাপারে এই আক্বীদা রাখা যাবে না। এই মর্যাদা শুধু নবীর, সাধারণ মানুষের ব্যাপারে এই আক্বীদা রাখা যাবে না।

🎤 ১১৮

এক মোজাকারায় স্যার বলেন, চোখের উপর যেমন শরীয়তের আহকাম আছে যে এটা দেখা যাবে এটা দেখা যাবে না, যবানের উপর শরীয়তের আহকাম আছে এটা বলা যাবে এটা বলা যাবে না, সত্য কথা বলো, মিথ্যা বলো না, গীবত করো না, কানের উপর যেমন আহকাম আছে, তেমনি চিন্তার উপরও শরীয়তের আহকাম আছে যে এ বিষয়ে চিন্তা করা যাবে এ বিষয়ে চিন্তা করা যাবে না। تَفَكَّرُوا فِي الْمَخْلُوقِ، وَلَا تَفَكَّرُوا فِي الْخَالِقِ আল্লাহ পাকের সৃষ্টির ব্যাপারে চিন্তা করো, আল্লাহর ব্যাপারে চিন্তা করো না।

🎤 ১১৯

এক ভাইয়ের হতাশামূলক কিছু কথার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে কিছু তরগীবি কথা বলতে গিয়ে স্যার বলেন, দাওয়াতের কাজের একটা বড় ফজিলত হলো এই কাজের মাধ্যেমে আল্লাহ তায়ালা তোমাকে মানুষের আক্রমন থেকে, মানুষের ক্ষতি থেকে হেফাজত করবেন। মানুষের আক্রমনের একটা আক্রমন হলো শারীরিক আক্রমন, তাকে আঘাত করলো, গুলি করলো, মেরে ফেললো ইত্যাদি। প্রধান আক্রমন হলো, তার চিন্তার উপর আক্রমন, তার চিন্তাকে বিক্ষিপ্ত করে দিবে। বিদয়াতী বাতিল আক্বীদা তার চিন্তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া, গোমরাহী চিন্তা, যা তার নাগালের মধ্যে না এমন চিন্তা, অনর্থক চিন্তা, যে চিন্তা তার করনীয় না এমন চিন্তার মধ্যে লিপ্ত করে দেওয়া ইত্যাদি। এই চিন্তা থেকেই খারেজী, রাফেজী, মুতাজিলা এরকম বাহাত্তর ফেরকা পয়দা হয়েছে। এই চিন্তার আক্রমণ সবচেয়ে বড় আক্রমন, শারীরিক আক্রমন করে মেরে ফেললো, তো সে শহীদ হয়ে যাবে, কিন্তু যদি চিন্তার উপর আক্রমণ করে, তার চিন্তাকে বিক্ষিপ্ত করে তাকে গোমরাহ বানাবে, তাকে আমল থেকে সরাবে, তাকে তবলীগ থেকে সরাবে, তাকে ঈমান থেকে সরাবে, তাকে মুরতাদ বানাবে। বিভিন্ন জামানায় আল্লাহ ওয়ালারা মানুষকে চিন্তা করতে শিখিয়েছেন। দাওয়াতের মেহনত যে করবে আল্লাহ তায়ালা মানুষের এই চিন্তার আক্রমন থেকেও তাকে রক্ষা করবেন। یٰۤاَیُّهَا الرَّسُوۡلُ بَلِّغۡ مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ ؕ وَ اِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلۡ فَمَا بَلَّغۡتَ رِسَالَتَهٗ ؕ وَ اللّٰهُ یَعۡصِمُکَ مِنَ النَّاسِ হে রাসূল, আপনার উপর যা কিছু নাজিল হয়েছে তার তাবলীগ করেন। আপনি যদি না করেন তাহলে রেসালতের দায়িত্ব আদায় করলেন না, আর মানুষের আক্রমন থেকে আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করবেন। এই দাওয়াতের মেহনতের বড় ফজিলত, এই মেহনত তাকে মানুষের আক্রমন থেকে, শারীরিক আক্রমন থেকে, চিন্তার আক্রমন থেকে রক্ষা করবে।

🎤 ১২০

স্যারের একটা পারিবারিক প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেন, আমি যখন বাসা থেকে বাইরে বের হবার জন্য তৈরী হতাম তখন আমার মেয়েরা (৫/৭ বছর) চেয়ারের উপর টুল, টুলের উপর পিঁড়ি, এইসব দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিতো, যেতে দিবে না, বাইরে বের হতে দিবে না। এই কথা বলতেই স্যারের চোখে পানি চলে আসে। ওদেরকে ওই সময় পেছনে রেখেই জোর করে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতাম। স্যার বলেন ওদেরকে একেবারেই সময় দেওয়া হয়নি, ওদের হক্ক ঐভাবে আদায় করা হয়নি।

🎤 ১২১

মনির ভাই (বরিশাল) বলেন একবার এক সফরে ট্রেনে যাবার সময়ে হিলি স্টেশনের কাছাকাছি এসে ট্রেনের লাইনের কিছু সমস্যার কারণে লম্বা সময় ট্রেন দাড়িঁয়ে ছিল। স্যার তখন ট্রেন থেকে নেমে লাইনের পাশেরই এক মসজিদে নামাজ পড়ে বসে ছিলেন। সেখানকার দুএক লোক যারা ঐসময় মসজিদে ছিলেন। মসজিদে উপস্থিত এক ভাইয়ের সাথে স্যার কিছু কথা বলে তাকে সফরের জন্য (চিল্লার) তাসকিল করলেন। ঐ ভাই তার কিছু অসুস্থতার কথা বলে বলেন এসব সমস্যার জন্য ইচ্ছা থাকার পরও চিল্লায় যেতে পারি না, মেহনত করতে পারি না। ঐ ভাইয়ের অসুস্থতার বর্ণনার সময় বার বার বিভিন্ন কথায় স্যার উনাকে প্রতিবারই বলছিলেন বেশী বেশী সূরা ফাতিহা পড়।

🎤 ১২২

স্যার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন ১৯৭৪ সালে, কিছুদিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব ও ৭৪ সালেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমাম হিসেবে যোগদান করেন। সেই ১৯৭৪ থেকে ২০১২, প্রায় ৩৮ বছর ইমাম সাহেব স্যারকে দেখে এসেছেন। চাকুরী জীবনের বেশীর ভাগ সময়ই স্যারের রাজশাহীতে (বিশ্ববিদ্যালয়ে) নিজস্ব কোন বাড়ী, কোয়ার্টার বা থাকবার জায়গা ছিল না। কখনও কেন্দ্রীয় মসজিদের ভেতরে, কখনও মসজিদের বারান্দায়, কখনও মোয়াজ্জেম সাহেবের কামড়ায় (ওজু খানার পাশে পশ্চিম দক্ষিণ কোনার রুম), কখনও ইমাম সাহেবের বাসায় থেকেছেন। মোয়াজ্জেম সাহেব (হাফেজ শাহজুল ইসলাম সাহেব) বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন ১৯৮৫ সালে, সেই হিসেবে উনিও মোটামুটি স্যারকে পেয়েছেন প্রায় ২৭ বছর, লম্বা সময় স্যারকে দেখে এসেছেন। এই সময়কালের একটা বড় অংশ স্যার রাজশাহীতে থাকলে মসজিদেই থাকতেন, উনারা একসাথেই থেকেছেন। ইমাম সাহেব ও মোয়াজ্জেম সাহেব এই উভয় হজরতই স্যার সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, মসজিদের কাজে মসজিদের খাদেম, নাইট গার্ড, মালি সবাই মসজিদে থাকতেন, এই ২৭/৩৮ বছরের জীবনে কখনও স্যার কোন খাদেম বা কোন মালি বা কোন প্রহড়ীকে একবারের জন্যও কাউকে কোন আদেশ করেননি যে সুইচটা অন করে দাও, বা সুইচটা অফ করে দাও, বা কার্পেটটা বিছিয়ে দাও, বা আমার ব্যাগটা এনে দাও, বা মসজিদের দরজাটা খুলে দাও। উনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এখানে মসজিদেই থেকেছেন কিন্তু কখনই কোন কর্মচারীকে কোন ব্যাপারে কোন ধরনের আদেশ করেননি।

🎤 ১২৩

হাফেজ শাহজুল ইসলাম সাহেব বলেন, মসজিদে একবার এক গার্ড অসুস্থ হয়ে পড়লে স্যার আমাকে ১০,০০০ টাকা বের করে দিয়ে বলেন উনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করেন।

🎤 ১২৪

ভাই সোহেল বলেন, ২০০১/০২ সালের দিকে স্যারের সাথে আমার পরিচয়ের প্রথম দিকে টাঙ্গাইলের একটা জেলার এস্তেমায় স্যারের সাথে সফর ছিল। বাসে একসাথে যাত্রাপথে “আল্লাহুম্মা আংতাস ছহিবু ফিস ছাফারি .. .. ..” একটু একটু করে সফরের এই দোয়াটা সম্পূর্ণটা আমাকে মুখস্ত করালেন। আবার এস্তেমার শেষে স্যারের কাছে বিদায় নেবার জন্য গেলে স্যার যে মুসাফাটা আমার সাথে করলেন, সম্পূর্ণ হাত দিয়ে আমার সম্পূর্ণ হাতটায় ধরে মুসাফাহ করলেন, ঐ মুসাফাহটা আমার কাছে এখনো মনে পড়ে, আমার কাছে মনে হচ্ছিল অনেক মায়া নিয়ে স্যার বিদায় দিচ্ছেন।

🎤 ১২৫

হজরত মওলানা ইউসূফ রহমতুল্লাহি আলাইহির কথা উল্লেখ করে স্যার এক মোজাকারায় বলেন, একসময় দেশের কোন এক পত্রিকায় তাবলীগের বিরুদ্ধে বড় এক আর্টিকেল কেউ একজন লিখেছে। ইউসূফ রহমতুল্লাহি আলাইহি বাংলাদেশে আসলে কাকরাইলে তাবলীগের কেউ একজন উনাকে সেই আর্টিকেল দেখিয়ে আর্টিকেলের বিষয়বস্তু আলোচনা করছেন। উত্তরে উনি বলেন, যে লিখনেওয়ালা সে লিখেছে বসে বসে, যে পড়নেওয়ালা সে পড়বে শুয়ে শুয়ে, আর তোমরা তো হাঁটছো, এই হাটনেওয়ালাদের সাথে ওরা পারবে না।

🎤 ১২৬

ইঞ্জিনিয়ার শামসুর রহমান ভাইয়ের জামাতে স্যার নূসরতে গিয়েছিলেন। মহল্লায় এক খুছুছি গাসতে উনি স্যারকে নিয়ে যান, গাসতে কথাবার্তার এক পর্যায়ে শামসুর রহমান ভাই বলেন, আপনার এসব (অমুক অমুক দুনিয়াবী যোগ্যতা) যদি দ্বীনের কাজে ব্যবহার হয় তাহলে দ্বীনেরও ফায়দা হবে, আপনার যোগ্যতারও সঠিক (দ্বীনি) ব্যবহার হলো, দ্বীনের কাজে ব্যবহার হলো। একজন সাধারণ মানুষ যার এসব যোগ্যতা নেই সেতো মানুষকে বুঝাতেও পারে না, আল্লাহ পাক আপনাকে এতো এতো যোগ্যতা দিয়েছেন সেগুলোকে একটু দ্বীনের কাজে ব্যবহার করেন। এর দুইদিন পর জামাত ফিরে আসার সময় মসজিদ থেকে বের হয়ে সাথীরা একজন একজন করে বাসে উঠছে, ঐ মুহুর্তে স্যার শামসুর রহমান ভাইকে ডেকে বললেন, তুমি যে দাওয়াত দিয়েছিলে ঐটা ও দুনিয়ারই দাওয়াত ছিল।

🎤 ১২৭

টাংগাইল জেলার ঘাটাইল মার্কাজে একসময় কিছু সমস্যা চলছিল, কাজের তরতীব ইত্যাদি নিয়ে শুরার সাথীদের মাঝে সম্পর্কের দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে কাজের ক্ষতি হচ্ছিল। ২০০০ সালের জানুয়ারী মাস, ইঞ্জিনিয়ার শামসুর রহমান ভাই তখন ঘাটাইলে চিল্লার সফরে ছিলেন, মার্কাজের হালত সামনে আসায় তিনি সমাধানের উদ্যোগ নেন, স্যার উনার জামাতের নুসরাতে ঘাটাইল আসলে উনি স্যারকে উক্ত ফিকিরে যুক্ত করেন। স্যার স্থানীয় সাথীদের সাথে বসেছেন, আলোচনা মোজাকারা করেছেন, আল্লার মেহেরবানীতে কিছু দিনের মধ্যে সাথীদের মধ্যে দূরত্বও কমে আসে, কাজের অনুকূল পরিবেশও তৈরী হয়। সমস্যা সমাধানের এক পর্যায়ে কাজের তরতিবের লাইনে কিছু সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, সাথীদের সাথে মোজাকারা ও আলোচনায় স্যার ছিফাতের লাইনে, কাজের লাইনে, আমলের লাইনে অনেক কথাবার্তা বলেছিলেন, কিন্তু স্যার কাজের তরতীবের লাইনে (যেখান থেকে সমস্যার উৎপত্তি হয়েছিল) কোন কথাবার্তা বলেননি। কি সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার তা সামনে স্পষ্ট থাকা সত্তেও স্যার নিজে সিদ্ধান্ত না দিয়ে সাথীদের মাধ্যমে তৎকালীন জেলা জিম্মাদার মাওলানা আব্দুল হাই সাহেবকে তাকাজা দিয়ে এনে, তার মাধ্যমে উক্ত বিষয়ে ফয়সালা করান। ঘাটাইলের স্থানীয় সাথী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিল ভাই বলেন, এটা এভাবে করো এটা এভাবে করতে হবে, স্যার নিজে এসব ব্যাপারে একটি কথাও বলেননি।

🎤 ১২৮

নাটোরে নতুন সূরার ফায়সালা হবার পর মাওলানা আবুল কালাম আজাদ সাহেব এবং মাওলানা মনিরুল কাইয়্যূম সাহেব সূরার সাথীদের মধ্যে অর্ন্তভূক্ত হয়েছেন তা স্যারকে জানানো হলে স্যার উনাদের সাথে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ সাহেবের সাথে যোগাযোগ করে উনাদের সাথে দেখা করার জন্য স্যার রাজশাহী থেকে জোহর নামাজের পর রওনা হয়ে আছর নামাজের পূর্বেই বনপাড়া উপজেলা মসজিদে পৌঁছে যান। নামাজের পর হজরত মাওলানাদ্বয়ের সাথে মসজিদের এক কোনে বসে কিছু কথা বলেন, কথার এক পর্যায়ে হজরত মাওলানা আবুল ফাত্তাহ সাহেবের কথা উল্লেখ করে স্যার বলেন মাওলানা সাহেবের আব্বা যিনি খুব আল্লাহ ওয়ালা ও হুশিয়ার মানুষ ছিলেন, উনার আব্বার এক কথা উনি স্যারকে শুনিয়েছিলেন। উনার আব্বা একসময় উনাকে বলেন, তোমাদের এই তাবলীগের কাজ এখন সারা দুনিয়ায় পৌঁছে গেছে, দুনিয়ার কোনায় কোনায় জামাত যাচ্ছে, দেশের কোনায় কোনায় থেকে সারা দুনিয়া থেকে জামাত আসছে, সাথী বাড়ছে, তোমরা পুরানা হয়ে যাচ্ছো, সাথীদের কাছে মুরব্বী হয়ে যাচ্ছো, সাথীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হালত নিয়ে তোমাদের কাছে আসবে, তোমাদের কাছে পরামর্শ চাইবে। সাধারণ সাথীদেরকে গুরুত্ব দিবে, তাদেরকে সময় দিবে, তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনবে, তাদের হালতকে সামনে রেখে দোয়া করবে। কিন্তু সাবধান, হুট করে সমাধান দিতে যাবে না, কারণ সমাধান দেবার যোগ্যতা তোমাদের নাই। সমাধান দিয়ে গিয়ে তোমরা সমস্যা বাড়িয়ে দিবে, তবলীগের এই মেহনতে এখন তোমরা পুরানা ঠিকই কিন্তু সাথীদের বিভিন্নমুখী হালতের সমাধান দেবার মতো ঐ তরবিয়ৎ তোমাদের হয়নি। সমাধান দেবার যোগ্যতা তাদের ছিল, একথা বলে উনার আব্বা হজরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গঙ্গুহী রহমতুল্লাহি আলাইহির এক ঘটনা বলেন। গঙ্গুহী রহমতুল্লাহি আলাইহির এক খাদেমের নিকটস্থ এক মহিলার প্রতি খুব আসক্তি হয়ে উঠেছিল। নির্দিষ্ট দিনে খাদেম রাতে হজরতের ঘুমানোর পড় ঐ মহিলার সাথে দেখা করতে যায়। নির্দিষ্ট গোপন জায়গায় একত্রিত হবার পূর্ব মুহুর্তে বাইরে আকাশে খুব বিজলী ও গর্জনের আওয়াজ শুরু হলে খাদেমের মনে ভয় হয়ে যায় যে হজরত মাওলানা হয়তো ঘূম থেকে জেগে উঠবেন আর তাকে খুজবে, এই ভয়ে সে পরবর্তী দিনে দেখা করার কথা বলে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে বের হয়ে চলে আসে। এসে দেখে যে হজরত মাওলানা ঘুমাচ্ছেন, তো সে যাত্রায় তার ভয় দুচ্ছিন্তা কেটে যায়। পরিকল্পনা মতো দ্বিতীয়বার আবার সে মহিলার নিকট গেলে একই রকম ঘটনার সৃষ্টি হয়, আবারো খুব ভয় পেয়ে ফিরে গিয়ে দেখেন যে হজরত মাওলানা সেদিনও ঘুমাচ্ছেন। পরিকল্পনামতো তৃতীয় দফায় গেলে সেবার পূর্বের থেকে বেশী মেঘের গর্জন ও ঝড় শুরু হলে আবারও তার দ্বীলে ভয় হয়ে যায় যে হুজুর জেগে যাবে আর জেগে আমাকে কাছে পাবে না, তো তাড়াতাড়ি দৌড় দেয়, গিয়ে দেখে হুজুর বসে মোরাকাবায় ধ্যানে মগ্ন। পেছন থেকে হুজুরকে ঐসময় মোরাকাবায় দেখে তার দ্বীলে এমন এক অনুশোচনার সৃষ্টি হয় যে তার দ্বীল থেকে সেই আসক্তি একেবারে কেটে যায়, পরবর্তীতে সে বলে ঐ দিনের পর থেকে আর কোন সময় মেয়ে মানুষের প্রতি বিশেষ কোন আগ্রহ অনুভব করিনি। সমাধান দেবার যোগ্যতা উনাদের ছিল।

🎤 ১২৯

একসময় স্যার হাসান হাবীব ভাইয়ের বাসায় গেলে উনি স্যারের কাছে বাসা পরিবর্তন করার পরামর্শ চাইলেন, বাসাটা অফিসের কাছে নেবার জন্য, উনার বাসা ছিল অফিস থেকে খানিকটা দূরে শহরতলীতে। স্যার জানতে চাইলেন কেন, উনি জানালেন অফিসটা শহরের মধ্যে, তোলারাম কলেজের পার্শ্বে, এলাকার নাম কলেজ রোড, সেখানে নিতে চাই, স্যার আবার জিজ্ঞেস করেন, কেনো। উনি উত্তর দিলেন, অফিসে যাওয়া আসায় অনেক সময় চলে যায়, বাসাটা অফিসের কাছে থাকলে এই যাওয়া আসার সময়টা বেঁচে যেতো, যা সাথীদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ গাসত ফিকির ইত্যাদিতে ব্যবহার করতে পারতাম। স্যার খুব স্পষ্টভাবে বললেন দরকার নাই। উনি একটু পরে আবার বললেন, এখন যেখানে বাসা নিতে চাই সেটা মার্কাজের কাছে, পায়ে হেঁটে মার্কাজে যাওয়া যাবে, মার্কাজে কিছু সময় দেয়া, মার্কাজের তাকাজা পুরা করা সহজ হবে। স্যার বললেন দরকার নাই, এখানেই থাকো। উনি একটু পরে আবার বললেন এখানে তো গ্রাম এলাকা, অশিক্ষিত সাধারণ লোকজনের বাস, আমি যেখানে বাসা নিতে চাচ্ছি সেটা কলেজ পাড়া, সরকারী কলেজ, কলেজ পাড়া মসজিদ এলাকা, ছাত্র শিক্ষকদের মধ্যে মেহনত করা সুবিধা হবে। স্যার আবারও বললেন, দরকার নেই এখানেই থাকো। কিছুক্ষণ পর উনি আবার বললেন, অফিস থেকে বাসায় দিনে ২/৩ বার যাওয়া আসা করতে হয়, দূরে হবার কারণে বেশ রিক্সাভাড়া খরচ হয়, বাসাটা ওখানে নিলে এই রিক্সাভাড়াটা লাগতো না, বেচে যেতো। স্যার তখন জিজ্ঞেস করেন, তুমি যদি বাসা পরিবর্তন করো, তাহলে কতো টাকা সেভ হবে। উনি উত্তর করলেন, কমপক্ষে ৬০ টাকাতো বাঁচবে (২০০৩/২০০৪ সালের কথা)। স্যার এবার বললেন, তাহলে বাসা পরিবর্তন করে ফেলো। উনি একটু আগ্রহের সাথে স্যারকে তখন জিজ্ঞেস করলেন, রিক্সাভাড়া বাচানোর জন্য বাসা পরিবর্তন করতে পারি, কিন্তু দ্বীনের মেহনতের এতোগুলি ফায়দার কথা বললাম আপনি বাসা পরিবর্তন করতে রাজী হলেন না! স্যার তখন বললেন, যে দ্বায়ী, যে মেহনত করনেওয়ালা, তার জায়গা পরিবর্তন হলে তাবলীগের কাজ বাড়বে কমবে এরকম না, যেখানে থাকবে ও ওখানেই করবে, ওখান থেকেই সব কাম করবে, আর যদি করতে পারে তাহলেই সে দ্বায়ী। এসমস্ত পরিবর্তন করে সে মনে করে অনেক তবলীগ করবো কিন্তু বাস্তবে সে আর তবলীগ করতে পারে না। দ্বায়ী যেখানে থাকবে ও সেখানেই কাজ করবে, কাজের মেজাজ এরকম যে ও যেখানেই থাকবে সেখানেই তার মেজাজ তাকে কাজ করাবে। তোমার টাকা বাচবে, হ্যাঁ এজন্য বাসা পরিবর্তন করতে পারো, কিন্তু মেহনতের কোন লাভ ক্ষতির চিন্তা করে বাসা পরিবর্তন করে তুমি বেশী তবলীগ করবে, বাস্তবে তা হয়না।

🎤 ১৩০

একবার স্যার বলেন, একে অন্যের উপর যে জুলুম করে এব্যাপারেতো মানুষ কিছু না কিছু হলেও জানে, কখনও কখনও মনে করে যে আমি জুলুম করছি বা করেছি কিন্তু নিজের উপর যে নিজে জুলুম করে এ ব্যাপারে তার কোন কনসেপ্টই (ধারণা) নাই। সাধারণত বয়ানে মোজাকারায় কথাবার্তায় স্যার ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করতেন না, বলা যায় এরূপ ব্যবহার স্যারের মেজাজের খেলাফ ছিল। কিন্ত এক্ষেত্রে কথায় একটু ভাড় দিয়ে স্যার ‘কনসেপ্ট’ শব্দটা দুই বা তিনবার ব্যবহার করেন। ‘তার কোন কনসেপ্টই নাই।’ মানুষ কি গভীরভাবে অন্যের দোষত্রুটি নিয়ে চিন্তা করে, চর্চা করে অথচ নিজেকে ভুলে যায়। নিজের ইচ্ছায় নিজেকে মনমতো চালাচ্ছে। নিজের জুলুমটাই যে সবচেয়ে বেশী, নিজের ইচ্ছা, নিজের অহংকার, নিজের পরিচিতির মোহ, লোভ, কতৃত্বপরায়ণতা ইত্যাদি এইসব নিজের উপর জুলুমের কারণেই সে দুনিয়া আখেরাতে মসিবতের মধ্যে পড়ে, তার জীবন অশান্তিময় হয়, কিন্তু নিজেকে কখনো সে দোষ দেয় না।

🎤 ১৩১

একবার স্যার বলেন, মানুষের সামনে মৃত্যু যে কতবড় বিভিষীকা একজন কাফের সে কখনো কল্পনাই করতে পারে না। মুমিনের সামনে তা নয়, মৃত্যুতো তার জন্য আনন্দ। একজন কাফের কিছুই ভাবতে পারছে না, কি হবে, কোথায় যাবে, কতবড় অন্ধকার, কিছুই সে কল্পনা করতে পারে না, তার কল্পনা পর্যন্ত আসেই না, মৃত্যু কি, কিছুই তার সামনে নাই। তোমার কলিগকে জিজ্ঞাসা করো, ও এড়িয়ে যাবে যে ভাই ওসব বাদ দে আয় চা খাই। কিন্তু একজন মুমিনের সামনে এরকম না।

🎤 ১৩২

একবার রাজশাহী উপশহর মার্কাজ মসজিদ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে হেঁটে হেঁটে আসার পথে স্যার কথাপ্রসঙ্গে বলেন, সুন্দর বক্তৃতা, সুন্দর কথা, সুন্দর উপস্থাপনা এগুলো একটা চিত্রকর্ম বা একটা সুন্দর সঙ্গিত বা একটা শিল্পকর্ম ছাড়া আর কিছু না, এর বিশেষ কোন মূল্য নাই, যদি না এর ভিতরে ঐ রূহানিয়াত না থাকে। লিওনার্দো দ্যা ভিনচির চিত্রকর্ম মোনালিসা বা রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা ধরো সোনার তরী কবিতা, বা কোন শিল্পীর আকা একটা ছবি, এগুলোর যেমন একটা মূল্য আছে একটা সাহিত্যিক মূল্য, চিত্রকর্মের, সৌন্দর্যের একটা দুনিয়াবী মূল্য। স্যার বলেন এই যে বক্তৃতা দিলাম মার্কাজে, মনে করো সুন্দর উপস্থাপনা, সুন্দর কথা, সুন্দর উপমা, সুন্দর দর্শনতত্ত্ব, এটার মধ্যে যদি এখলাস, রূহানিয়াত, দাওয়াতের ফিকির না থাকে, তাহলে রবীন্দ্রনাথের ঐ কবিতার মতো দুনিয়াবী শৈল্পিক মূল্য ছাড়া এটার আর কোন মূল্য নাই।

🎤 ১৩৩

ইউসূফ রহমতুল্লাহি আলাইহির কথার উদৃতি দিয়ে একবার স্যার বলেন, সবচেয়ে মিথ্যুক হলো মানুষের চোখ। ও আসলটা দেখায় না। আগে কি, পড়ে কি, হক্বীকত কি দেখায় না, সবচেয়ে মিথ্যাবাদী হলো মানুষের চোখ। একজন যুবক এই মুহূর্তে তাকে সুঠাম দেহে আমরা দেখছি, বিশ বছর পরে সে কি বৃদ্ধ হবে, না ক্যানসার হবে, না মরে যাবে তা আমরা দেখছি না। ধন সম্পদ, রাজত্ব, বিলাসিতা, কর্তৃত্ব এর চমকটা সে দেখায়, কিন্তু এর হাক্বিকত টা সে দেখায় না, আগের পরের টা সে দেখায় না। সকালের রাজা বিকালের ফকির, এখনকার দাপটি কিছুক্ষণ পরের লাশ, বর্তমানের বিলাসিতার আসবাব কিছুদিন পরের অশান্তি, এগুলো সে দেখায় না। পরের কি অবস্থা, পরিণতি কি, এইটা তাকে দেখতে দেয় না।পাহাড় সমুদ্র ইত্যাদি সারা দুনিয়াকে চোখ দেখে কিন্তু নিজের চেহারাকে দেখতে পারে না, নিজেকে দেখতে ওর আয়না লাগে।

🎤 ১৩৪

স্যার একবার সায়ীদ আবুবকর ভাইয়ের বাসায় (ঝিনাইদহ) গেলে উনি স্যারের সাথে কথার মাঝে উনার ছেলেকে হাফেজ বানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন। স্যার হিফস প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শেক সাদী রহমতুল্লাহি আলাইহির কথার উদ্বৃতি দিয়ে বলেন, কোরআন শরীফ হিফস রাখাটা মরুভূমিতে উটের মতো, উটকে যদি আবদ্ধ বা রশি দিয়ে বেঁধে না রাখা হয় তাহলে মরুভূমিতে উট হারিয়ে যায়। কোরআন শরীফ ও যদি নিয়মিত তেলাওয়াত না করা হয় তাহলে হাফেজের নিকট থেকে কোরআন শরীফ হারিয়ে যায়। একমাস পড়লাম আরেকমাস পড়লাম না, একবছর খুব ভালো পড়লাম, আরেক বছর অন্য ব্যস্ততায় পড়া হলো না, তো হিফজ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়, নিয়মিত তেলাওয়াত করতে হয়।

🎤 ১৩৫

এক মোজাকারায় স্যার বলেন, নামাজ আল্লাহর জন্য হলে সেটা নামাজ হবে, কুরবানী আল্লার জন্য হলে সেটা কুরবানী হবে। আল্লাহ পাকের জন্যই যদি আমল না হয় তাহলে অনেক বড় আমল আর আমল থাকে না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে অবস্থান, সফর, জেহাদ ইত্যাদি থাকার পরও মোনাফেকদের সাহাবী বলা যাবে না। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে মোনাফেকেরা নামাজ পড়েছেন, একসাথে থেকেছেন, জেহাদে গেছেন তাদের এই অংশগ্রহনকে আমল বলা যাবে না। তাদের নামাজ নামাজ ছিল না, তাদের জেহাদ জেহাদ ছিল না। ইবলিসের এবাদতের কমি ছিল না, হাজারো লাখো বছরের এবাদত তাকে ফেরেশতাদের উপরে উঠিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার এবাদতকে এবাদত বলা যাবে না। ও তো আল্লাহর সামনেই আল্লাহ পাকের এবাদত করেছে কিন্তু তার নাপাক জজবা তাকে আবেদ থেকে অহংকারী বানিয়েছে, ইবলিস বানিয়েছে, ওর এবাদত এবাদত ছিল না, এবাদত বলা যাবে না।

🎤 ১৩৬

একবার আশরাফ আলী থানভী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর এক মেছালের উদৃতি দিয়ে স্যার বলেন, একব্যাক্তির ছাপা খানার ব্যবসা, নিজেকে কিছু বিশেষ জ্ঞান সম্পন্ন মনে করে, প্রায়ই ছাপাখানায় প্রকাশনার কাজে নিজে থেকেই কিছু সংশোধন করে দেয়। একবার এক ব্যাক্তি তাকে কোরআন শরীফ ছাপাতে দেয়, কোরআন শরীফ, আল্লাহর কালাম, এখানেতো আর কোন সংশোধন করবে না, যেভাবে আছে এভাবেই ছাপিয়ে দিবে তার বিশ্বাস। ডেলিভারীর দিন ছাপানো কোরআন শরীফ নিতে গিয়েছে, যদিও তার বিশ্বাস কোরআন শরীফে নিজে থেকে কোন পরিবর্তন করবেন না, তারপরেও তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু আবার সংশোধন করেননি তো? উনি বললেন, ভাই কালামে পাকের মধ্যে ইহুদী, খীষ্ট্রান, ইসলামের শত্রুরা ফেরাউনের নাম, কারুনের নাম, আবু লাহাবের নাম এরকম বড় বড় কাফেরদের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে, পাক কালামের মধ্যে এসব কাফেরের নাম, ওগুলো আমি একটু সংশোধন করে দিয়েছি। ভাই তো কি সংশোধন করলেন? কালামের পাকের মধ্যে থেকে ওই কাফেরদের নামগুলো বাদ দিয়ে তোমার নাম আর আমার নাম লিখে দিয়েছি। আমরা কাফেরতো না বরং ঈমানী আমালের সাথে থাকি, মুসলমান হিসেবে দাবী রাখি। যেকোন কিছুকে ও একটু সংশোধন করতে চায়, কিছু পন্ডিতি করে দেয়। এরকমের কিছু মানুষ আছে যারা নিজেদের কিছু বিশেষ মর্যাদার মনে করে এবং সবক্ষেত্রে নিজের কিছু কৃতিত্ত্ব দেখাতেও পছন্দ করে। সবক্ষেত্রেই কিছু কমি আছে তার নজরে সে দেখে, কিছু ভূল তার নজরে পড়ে, যেহেতু ও সবকিছু একটু ফ্রেস চায়, নিজের কিছু দর্শন না ঢাললে তো আর ফ্রেস পাচ্ছে না, যেকোন কিছুতে একটু সংশোধন চায়, নিজের কিছু চিন্তা ভাবনা, নিজের কিছু দর্শন, কিছু পন্ডিতি ও রাখতে চায়।

🎤 ১৩৭

এক ভাইয়ের ব্যবসার চিন্তা ভাবনার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেন, একজন বিড়ালের চামড়া রপ্তানি করতে চায়, লাভজনক ব্যবসা, বিরাট রপ্তানির খাত, বিড়ালের ফার্ম দিবে, বিড়ালের বিশাল ফার্ম, বিড়াল খাবে কি, সুন্দর আইডিয়াও ঠিক করে নেয়, ও ইঁদুরের ফার্ম দিবে, তো ইঁদুর খাবে কি, তার জন্য তো বিশেষ ব্যবস্থার আর দরকার পড়বে না, বিড়ালের চামড়া বের করতে গিয়ে ইদুঁরের যে গোসত রক্ত থাকবে সেগুলো ইদুঁর খাবে। বিড়াল ইদুঁর খাবে, ইদুঁর বিড়াল খাবে, মাঝখানে আমার বিশাল প্রফিট। কি আজিব ব্যবসার আইডিয়া, কি সহজ ও কি সুন্দর ব্যবসা! বড় বড় ব্যবসার চিন্তা ভাবনা করা সহজ, প্ল্যান করা সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। প্রাসঙ্গিক কথায় স্যার আরো বলেন, মার্কেটিং কি, মার্কেটিং হলো সাহারা মরুভূমির মধ্যে প্রচন্ড গড়মের দিনে কম্বল বিক্রি করা। প্রচন্ড গড়মের দিন, জায়গা হলো মরুভূমি, বিক্রি করছে কম্বল, বিক্রিও বেশ হচ্ছে, ও মার্কেটিং করছে।

🎤 ১৩৮

এক মোজাকারায় স্যার বলেন, হত দরিদ্র ব্যক্তি, বয়স্ক বৃদ্ধ, আবার দ্বীনি যোগ্যতা এরকম যে কালেমাটাও ঠিকমতো বলতে পারে না, এরকম ব্যাক্তিকে লক্ষ্য করে মাওলানা মনজুর নোমানী রহমতুল্লাহি আলাইহি একবার ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি কে প্রশ্ন করলেন, এদেরকে দিয়ে আপনি কি করবেন, এরা আপনার কি কাজে লাগবে, এরা আপনার মেহনতে কিভাবে সহায়তা করবে, কালেমা ই জানে না, ও কি তবলিগ করবে। হজরত মাওলানা ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন আমি তো এদেরকেই চাই। সে আল্লাহ পাকের রাস্তায় চলতে থাকবে, হোচঁট খাবে, আহ বলে উঠবে, কোন আহ যে আল্লাহ কবুল করবেন। ঐ কোন আহ কে কবুল করে আল্লাহ পাক হেদায়েতের দরজা খুলে দেবেন। বয়ানের মধ্যে কাঁন্না করা স্যারের স্বভাব বিরূদ্ধ ছিল, সাধারণত স্যার বয়ান বা কথাবার্তার মধ্যে কাদঁতেন না, কিন্তু এই কথা বলার সময় “কোন আহ যে আল্লাহ কবুল করবেন” স্যার কান্না সংবরণ করতে পারেন নাই, স্যারের চোখে পানি চলে আসে। স্যার বলেন, মাওলানা ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি এর দৃষ্টি, একজন মানুষ যখন খুজঁতে থাকে তখন তার দৃষ্টি কেমন হয়, আমরা একজন কামলা লোক, ফকির লোক, অসুস্থ লোক, বৃদ্ধ লোক, মূর্খ লোক, তার ভেতর কিছুই হয়তো দেখতে পাব না, কিন্তু মাওলানা ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি তার মধ্যে কতবড় সম্পদ দেখছেন। চলতে ফিরতে এদের কোন আহ যদি আল্লাহ পাকের দরবারে কবুল হয়, তো আল্লাহ উম্মতের হেদায়েতের ফায়সালা করবেন। এই যে দৃষ্টিভঙ্গি, এই দৃষ্টি, সহজ ও স্বাভাবিক জিনিষ না।

🎤 ১৩৯

মুজাদেদ্দে আলফেসানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর কথার উল্লেখ করে একবার মাহফুজুর রহমান ভাই বলেন যে আল্লাহ পাক আমাকে সমস্ত জাহেরী এলম দান করলেন, তারপর সমস্ত বাতেনী এলেম দান করলেন, তারপর হাকীক্বতের মাকামে আল্লাহ আমাকে উঠালেন, তারপরও আল্লাহ পাক আমাকে তরক্বী দান করলেন যা প্রকাশ্যে বলা যাবে না। এরপরও আমি তিনটা দোয়া করি, আয় আল্লাহ আমাকে সুন্নতের অনুসরণের তওফীক দাও, আমাকে সুন্নতের জীবন দাও, সুন্নতের উপর মৃত্যু দাও । একথা বলে উনি স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, একজন মানুষের পক্ষে সমস্ত জাহেরী এলেম অর্জন করা কিভাবে সম্ভব, দেওবন্দেই আছে চার লাখ কিতাব, এতো তফসীর, এতো হাদীস, এতো কিতাব, এতো এতো জাহেরী এলম অর্জন একজন মানুষের পক্ষে কিভাবে সম্ভব, ফাতহুল বারী ৫২ খন্ড, কানজুল উম্মাল ৮ খন্ড, মুসনদে আহমাদ ৪০ খন্ড, এই ৪০ খন্ড পড়তেইতো ৪০ বছর কেটে যাবার কথা, জাহেরী সব এলেম উনি হাসিল করলেন কিভাবে। মাহফুজ ভাইয়ের কথা শেষ হতে না হতেই স্যার উত্তর দিলেন, একজন মানুষের পক্ষে অর্জন করা, অর্জন করে ফেলা তো সম্ভব নয়, কিন্তু আল্লাহ পাক যদি দান করেন তাহলেতো সম্ভব, আল্লাহ কাউকে দান করলে তারজন্য পাওয়া সম্ভব।

🎤 ১৪০

পাকিস্থানের রাইউন্ড মার্কাজ মসজিদে স্যার মুজা পড়ে ছিলেন, ভাই আব্দুল ওয়াহাব সাব দেখে স্যারকে একটু ধমকের সূরে বললেন, তুমি বুড়া হয়ে গেছো যে মুজা পড়েছো। তারপর থেকে স্যার পারতপক্ষে আর মুজা পড়তেন না। একথা যখন স্যার শুনাচ্ছিলেন, তখন মাহফুজুর রহমান ভাই বললেন, স্যার আপনি এখনতো বুড়া হয়ে গেছেন, এখন মুজা পড়তে পারেন। স্যার বললেন মুজা একধরনের বিলাসিতা। মাহফুজুর রহমান ভাই বললেন, মুজা বিলাসিতা না স্যার, আমার বোনারপাড়া বাজারে ১০ টাকায় ২ জোড়া মুজা পাওয়া যায়, রিক্সাওয়ালারাও মুজা পড়ে, মুজা বিলাসিতা না। স্যার বললেন, তুমি যতই যাই বলো- মুজা বিলাসিতা। স্যারের চামড়ার একজোড়া মুজা ছিল, কিন্তু কঠিন শীতের মধ্যেও স্যারকে মুজা পড়া দেখা যেতো না, কনকনে শীতের মধ্যে সফরে, চিল্লার সফরে একদিনের জন্যেও স্যারকে মুজা পড়া দেখা যায় নাই। তবে স্যার ফ্রান্সে ও আমেরিকায় যাবার পূর্বে ব্যাগে চামড়ার মুজা জোড়া নিতে দেখেছি, সম্ভবত লম্বা প্লেনের যাত্রায় ওজুর সুবিধার জন্য যাত্রাকালীন সময়ে মুজা পড়তেন।

🎤 ১৪১

স্যারের জীবনের শেষ দিকে স্যার যখন পড়চা (রোখ) ছাড়া জামাতে সফর করছিলেন (২০১৫ সালের আগস্ট মাস), পড়চা না থাকার কারণে প্রায়ই বিভিন্ন মসজিদ থেকে স্থানীয় সাথীরা জামাতের সাথে খারাপ আচরণ করে মসজিদ থেকে বের করে দিচ্ছিলেন। অন্ধ অনুকরণ এবং দ্বীনি আহকামের চেয়ে উসূলকে প্রাধান্য দেওয়ার কুফলের ব্যাপারে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে স্যারের এই সফরকে (রোখছাড়া) তাবলীগের মুরব্বীরা সেই সময় ফিতনা হিসেবে অভিহিত করেন যার ফলে সাধারণ সাথীদের মধ্যে স্যারের জামাতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়ে যায়। এমনকি, কিছু এলাকায় স্থানীয় সাথীদের অত্যাচার এতটাই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এমন ব্যক্তিরাও, যারা কখনো তাবলীগের কাজে সময় দেননি, তারা এসব আচরণ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। পরপর তিনটি মসজিদ থেকে জামাতকে বের করে দেওয়ার পর পুরান ঢাকার খাজে দেওয়ান মসজিদে স্যার জামাতসহ থাকতে সক্ষম হন। পরদিন স্যার এই মসজিদে মুজাকারায় বলেন, জালিমের ব্যাপারেও শুভকামী হওয়া উচিত, খায়ের খাঁ হওয়া উচিত। প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা যে করে, সে শুভকামী নয়, তার অমঙ্গল কামনা করে এবং তার অমঙ্গল দেখলে আনন্দিত হয়। যদি আমাকে কেউ মসজিদ থেকে গালাগালি করে, লাথি মেরে বের করে দেয়, এবং পরে আমি খবর পাই যে সেই ব্যক্তি রাস্তায় দুর্ঘটনায় পড়ে তার পা ভেঙে ফেলেছে, তখন আমার কী করা উচিত? যদি মনে মনে বলি ‘আলহামদুলিল্লাহ, বেশ হয়েছে’, এটি আল্লাহওয়ালাদের বৈশিষ্ট্য নয়। তাহলে তো আমরা একই জমির ফসলের মতো হলাম (একই রকম চাহিদা), সে ঐদিক থেকে মারছে আর আমি এই দিক থেকে মারছি (সে তার এক চাহিদাকে সামনে রেখে আচরণ একভাবে প্রকাশ করেছে, আর আমি ঐ একই চাহিদাকে সামনে রেখে আমার আচরণ আরেকভাবে প্রকাশ করছি, তার অমঙ্গল দেখে আনন্দিত হচ্ছি), আমাদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? তার এই পা ভাঙ্গার কথা শুনে, বিপদ দেখে আমার মনে দুঃখ হয়, তার প্রতি সহানুভূতি জন্মায়, তার জন্য চিন্তাফিকির করি, দু’আ করি তাহলেতো ঠিক আছে (রহমতুল্লিল আ’লামীন এর কাম করনেওয়ালার লক্ষ্য হবেতো ঐ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিফাত অর্জন করা যা বন্ধু ও শত্রু সবার প্রতি রহমত ও দরদের চিন্তা জাগাবে। নবীওয়ালা কাম করনেওয়ালা ব্যক্তির অন্তরে এমন দয়া ও মমত্ববোধ থাকবে, যা শত্রুর জন্যও কল্যাণ কামনা করতে উদ্বুদ্ধ করবে, তার লক্ষ্য হবে মানুষের হিদায়াত ও মঙ্গল নিশ্চিত করা, প্রতিহিংসা বা বিদ্বেষ না। বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা যেমন স্বাভাবিক, তেমনই শত্রুর প্রতি রহম ও কল্যাণের দোয়া করাও একজন দায়ী’র পরিচয়)।

🎤 ১৪২

এক মুজাকারায় স্যার বললেন, "ইতাআত" অর্থাৎ মুরুব্বীদের মানা, তাঁদের সম্মান করা এবং শ্রদ্ধা করা এমন হওয়া উচিত যেন তা শরীয়তের মাপকাঠিতে গ্রহণযোগ্য হয় (অন্ধ অনুকরণ, যা বললো তাই মানলাম এরকম না হয়)। নমশূদ্ররা যেমন ব্রাহ্মণদের অন্ধভাবে মেনে চলে, আমাদের মানা তেমন হওয়া উচিত নয়। কারণ, যদি শুধুমাত্র মানার মাধ্যমে জান্নাত পাওয়া যেত, তাহলে নমশূদ্ররা প্রথমেই জান্নাতে প্রবেশ করত। কেননা, পৃথিবীর ইতিহাসে তাদের মতো এরকম ইতাআতের উদাহরণ আর কোথাও নেই। কিন্তু সেই মানা তাদের জান্নাতের বদলে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার একটি জামাত পাঠিয়েছিলেন। সেই সফরের সময় জামাতের আমীর একটি কুন্ডলিতে আগুন জ্বালিয়ে জামাতের মামুরদের নির্দেশ দেন সেই আগুনে ঝাঁপ দিতে। কিন্তু মামুররা কেউই সেই নির্দেশ মানেননি। সফর শেষে তাঁরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই ঘটনা জানালে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি তোমরা সেই আগুনে ঝাঁপ দিতে, তাহলে সেখান থেকে আর কোনোদিন বের হতে পারতে না। অর্থাৎ, সেই আগুন তাদের জন্য জাহান্নামের আগুনে পরিণত হতো। এই ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগে থেকে মামুরদের সাবধান করেননি যে এই আমীর হয়তো একটু 'পাগলা' হতে পারেন, এরকম কোন সাবধান করেননি। বরং আমীরের পদ এবং তাকে মানার নির্দেশ ঠিক সেভাবেই ছিল যেভাবে ইতাআতের নিয়ম বলা হয়েছে। আমীরকে মানার সীমানা কোথায় শেষ, সেটি শিক্ষা দেওয়ার জন্য আল্লাহ তা’আলা এই ঘটনার ব্যবস্থা করেছিলেন। স্যার বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ হলে হয়তো বলতাম, এই আমীরকে নির্বাচন করাটাই ভুল হয়েছে। কিন্তু যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এই আমীরকে নির্বাচন করেছিলেন, তাই এটি শিক্ষা দেওয়ার জন্য আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে একটি বিশেষ উদাহরণ ছিল। এর মাধ্যমে এই উম্মতকে শেখানো হয়েছে যে, শুধু মানার শিক্ষা নয়, বরং কোথায়, কতটুকু এবং কীভাবে মানা, এবং কোথায় মানা উচিত নয়, কোথায় ইতায়াত করা যাবে না, সেটিও শেখা জরুরি।

🎤 ১৪৩

স্যার একবার আরব জামাত নিয়ে চট্টগ্রামের এক গ্রাম এলাকায় সফরে ছিলেন। সেখানে এক গরিব সাথী জামাতের সাথে সময় দিচ্ছিলেন এবং নুসরত করছিলেন। তার মহল্লায় যখন জামাত পৌঁছাল, তিনি জামাতকে মেহমানদারির জন্য দাওয়াত দিলেন। স্যার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি দাওয়াত দিচ্ছো কিভাবে? সাথী উত্তর দিলেন, এটা আমার দাওয়াত নয়, এটা চেয়ারম্যান সাহেবের দাওয়াত। চেয়ারম্যান হলেন এলাকার একজন ধনী ব্যক্তি। স্যার আবার প্রশ্ন করলেন, তিনি কোথায়? সাথী জানালেন, তিনি আসেননি, শুধু আমাকে তার পক্ষ থেকে বলতে বলেছেন। পরে স্যার জানলেন, স্থানীয় সাথীরা চেয়ারম্যানকে গিয়ে ধরেছেন, উনাকে বুঝিয়ে দাওয়াত দিতে রাজি করিয়েছেন (বিদেশী জামাত, আরব জামাত, ভাল মেহমানদারী করা দরকার)। তখন স্যার ঐ সাথীকে বললেন, এই দাওয়াত আমরা খাব না। এরপর স্যার তাকে বললেন, তুমি নিজের দাওয়াত দাও, আমরা তোমার দাওয়াত গ্রহণ করব। আমরা চিনি ও সূজি কিনে দেব, তুমি চিনি দিয়ে সূজি পাক করে দিবে, আর তুমি আটার ব্যবস্থা করে রুটি বানিয়ে দিবে। তার নিজের জন্য এতটুকুর এন্তেজাম কঠিন হয় নাই, সে খুব সাদরে রুটি নিয়ে এলো, মাত্র বিশটি রুটি দিয়ে সাথীর মেহমানদারিও হয়ে গেল। সেই একই জামাতে, আরেক এলাকায় এক গরিব সাথী খুব ইচ্ছা করলেন জামাতকে দাওয়াত খাওয়ানোর। স্যার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি নিজে কতটুকু করতে পারবে? সাথী উত্তর দিলেন, আমি একটি মুরগি কিনতে পারব। স্যার বললেন, ঠিক আছে, তুমি মুরগি কিনে রান্না করো, আমরা চাল ডাল পাকাবো। স্যার এই কথা বলার সময় কেঁদে ফেললেন, সাথী যখন মুরগি রান্না করে নিয়ে এলেন, তখন হয়তো ছয় মাস পর তার বাসায় একটি মুরগি রান্না হলো। স্যার বললেন, তোমার দাওয়াত আমরা গ্রহণ করেছি, খাবার প্লেট প্রস্তুত করার সময় সেই মুরগির তরকারি থেকে প্রথমে কিছু গোশত ও ঝোল সাথীর বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো, যেন তার পরিবারও সেই খাবার খেতে পারে। স্যার এই ঘটনাটি বলার সময় বলেছিলেন, মেহমানদারি করা খুব সহজ, মেহমানদারি হবে ব্যক্তিগত, কোনো চান্দাবাজি করে বা অন্যের ওপর চাপিয়ে মেহমানদারি হয়না।

🎤 ১৪৪

এক ভাই স্যারকে জানালেন যে তিনি বিয়ের জন্য একটি মেয়ে দেখতে যাবেন কিনা তা নিয়ে দ্বিধায় আছেন। তিনি জানালেন যে মেয়ের ভাইয়ের সাথে তার দীর্ঘদিনের পরিচয় আছে। ভাইটি খুবই আদবওয়ালা, ভালো আখলাকের অধিকারী এবং তাবলিগের সাথী। মেয়ের মামা ও আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই তাবলিগের ভালো মুবাল্লিগ। মেয়ের পরিবারের পরিবেশও দ্বীনি। তাদের বাড়িতে তালিম হয়, মহল্লার মাসতুরাতের তালিমে মেয়ের মা এবং মেয়েও অংশগ্রহণ করেন। বাড়িতে পর্দার চর্চা রয়েছে এবং সুন্নতের আমল অনুসরণ করা হয়। মেয়ের বাবা একজন সুন্নতের উপর আমলকারী ব্যক্তি এবং একটি ব্যাংকের স্থানীয় শাখার ম্যানেজার। পাত্রী দেখার আগে তিনি সবদিক থেকে খোঁজখবর নিয়েছেন এবং যতটুকু জেনেছেন, তা তার পছন্দ হয়েছে। এখন মেয়ে দেখা হলে এবং পছন্দ হলে বিয়ে চূড়ান্ত করার ইচ্ছা রয়েছে। মেয়ে পক্ষ থেকেও ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। যাবতীয় পরিস্থিতি শুনে স্যার কিছুক্ষণ (২০-২৫ সেকেন্ড) নীরব থাকলেন। এরপর আস্তে শব্দে, একটি ছোট্ট বাক্যে উত্তর দিলেন, “এটা থাক।” (সম্ভবত স্যার ওই ভাইয়ের জন্য ব্যাংকার পরিবারের সম্বন্ধকে পছন্দ করেননি)। এ প্রসঙ্গে এক ভাই তার অভিজ্ঞতা এরকম জানিয়েছেন, “আমার নিজের জানা আছে ব‍্যাংকার বাবার মেয়েকে স্যার বিয়ে করার পরামর্শ দিয়েছেন, নিজে বিয়ে পড়িয়েছেন, ব্যাংকার পরিচিত ব্যক্তির কাছে গাশতে গেছেন। তবে কিছু খেতে দেখিনি।”

🎤 ১৪৫

এক ভাই তার বিয়ের ব্যাপারে এলাকার একটি প্রস্তাব নিয়ে স্যারের সাথে পরামর্শ করতে এসেছিলেন। ভাইটি জানান, তার মহল্লার এক সাথী একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। মেয়েটির বাড়ি পার্শ্ববর্তী মহল্লায়। যদিও মেয়েটির বাসায় তেমন দ্বীনি পরিবেশ নেই, তবে মেয়েটি বড় আমলের পাবন্দ। মহল্লার মাসতুরাতের তালিমে অংশগ্রহণ করে ধীরে ধীরে তার মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। এখন সে পরিবারিক আধুনিকতা ছেড়ে দিয়ে খাস পর্দার আমল করে। এমনকি হাত ও পায়ে মুজা পড়ে এবং তাহাজ্জুদ নামাজ নিয়মিত আদায় করে। মেয়েটির বাসায় বেশ কিছু ভালো প্রস্তাব এসেছে, যার মধ্যে ছেলেদের অবস্থান আর্থিকভাবে মজবুত। তবে মেয়েটি প্রত্যেকটি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। তার শর্ত হলো, ছেলে যদি সুন্নতের উপর আমলকারী না হয় এবং তিন চিল্লাওয়ালা না হয়, তাহলে সে বিয়েতে সম্মতি দেবে না। এই বিষয়টি নিয়ে তার পিতা-মাতা (যারা দ্বীন সম্পর্কে অতটা সচেতন নন) বেশ পেরেশান। তারা মনে করছেন মেয়ে ভালো ভালো প্রস্তাব নাকচ করে দিচ্ছে। মাসতুরাত মহলে এই ভাইয়ের সম্পর্কে মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে, এবং মেয়েটি এই প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছে। মেয়েটি ভাই-বোনদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট, বাকিদের বিয়ে হয়ে গেছে। তার পিতা একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা এবং থানার সাবেক ওসি। যদিও পরিবারে দ্বীনি পরিবেশ নেই, তবে মেয়ের দ্বীনদারী এবং আমল সম্পর্কে জানা তথ্যে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। ভাইটি স্যারের কাছে জানতে চান, মেয়েটিকে দেখতে তিনি যাবেন কিনা। স্যার সবকিছু শুনে সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বললেন, অনেক সময় পিতা-মাতার বা অভিভাবকের উপার্জন, খারাপ আমল, খারাপ অভ্যাস, কিংবা জুলুম ইত্যাদি ভবিষ্যৎ বংশধরদের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। (সম্ভবত স্যার এই মন্তব্যের মাধ্যমে পুলিশ পরিবারের এই প্রস্তাবটি এড়ানোর জন্য ঐ ভাইকে পরোক্ষভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন)।

🎤 ১৪৬

এক ভাই বিয়ের একটি প্রস্তাব নিয়ে স্যারের সাথে পরামর্শ করতে এসেছিলেন। তিনি জানালেন, প্রস্তাবটি মেয়ের পক্ষ থেকেই এসেছে, এবং সব দিক থেকেই তা তার পছন্দ হয়েছে। মেয়ের পরিবারে দ্বীনি পরিবেশসহ অন্য কোনো ক্ষেত্রেই কোনো কমতি নেই। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি তিনদিন এস্তেখারা করেছেন। তার ধারণা, স্বপ্নে যা দেখেছেন তা এই প্রস্তাবে অগ্রসর হওয়ার অনুকূল ইঙ্গিত দেয়। তিনি তার স্বপ্নের বর্ণনা দিয়ে স্যারকে বিস্তারিত জানান। স্বপ্নে তিনি মেয়ের বাসায় গেছেন। বাস্তবে মেয়েদের বাসা যেমন, স্বপ্নে তা আরও বড় এবং উন্নত দেখেছেন। বাস্তবে মেয়ের বাসার উপরে টিনের চালা থাকলেও, স্বপ্নে বাসাটি ছিল ছাদ ঢালাই করা এবং বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি সাজানো-গোছানো ও পরিপাটি। স্বপ্নে তিনি দেখেছেন, মেয়ের পিতা তাকে অনেক সম্মান ও আপ্যায়ন করছেন এবং বিভিন্ন রকম খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। তবে স্বপ্নে মেয়ের পিতার মুখে দাড়ি ছিল না, যেখানে বাস্তবে তার মুখে লম্বা দাড়ি রয়েছে। এই স্বপ্ন দেখে তিনি মনে করেছেন এটি একটি ভালো ইঙ্গিত, এবং স্যারের চূড়ান্ত মতামত পাওয়ার জন্য তিনি এসেছেন। স্যার তার স্বপ্নের বর্ণনা শুনে সরাসরি হ্যাঁ বা না বলেননি। বরং তিনি এইভাবে নিজের নেতিবাচক মতামত প্রকাশ করলেন, “এই প্রস্তাব ছাড়া এই মুহূর্তে তোমার সামনে কি আর কোনো বিকল্প প্রস্তাব আছে, যেটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা যায়?”

🎤 ১৪৭

স্যার সোবহানবাগ বা ধানমন্ডীতে থাকাকালীন ঢাকায় অবস্থান করলে কাকরাইলে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। কাকরাইল মসজিদে শবগুজারীতে অংশগ্রহণ করতেন এবং একসময় প্রতি বৃহস্পতিবার এশার নামাজের পর ছাত্রদের সাথে বসার একটি বিশেষ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কাকরাইল মসজিদের দ্বিতীয় তলার উত্তর পার্শ্বে ছাত্রদের খোঁজখবর নিতেন, কথা বলতেন এবং তাদের দ্বীনি বিষয়ে উৎসাহ দিতেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা পড়াশোনা শেষে অনেকে শবগুজারীর জন্য কাকরাইলে এসে এশা পড়তো এবং এশার পর স্যারের এই বৈঠকে অংশ নিত। এই বৈঠক দিন দিন জনপ্রিয় হতে থাকে, এবং ছাত্রদের ভিড় বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মুরব্বীদের পক্ষ থেকে স্যারকে এ ধরনের বৈঠক না করার ব্যাপারে তাকিদ দেওয়া হয়। তবুও স্যার কাকরাইলের সাথে তার সম্পর্ক বজায় রাখতেন। ঈদের নামাজ কাকরাইলে পড়তেন, রমজানের তারাবীহ নামাজ কাকরাইলে পড়তেন। ঢাকায় পৌঁছে তিনি কোনো রকম ব্যাগটা রেখেই সরাসরি কাকরাইলে চলে যেতেন। কখনও কখনও ধানমন্ডি থেকে হেঁটে ফজরের নামাজ পড়তে কাকরাইলে যেতেন, আবার কখনও এলাকায় ফজরের নামাজ শেষ করে কাকরাইলে সকাল ৮টার মাশওয়ারায় অংশ নিতে হেঁটে যেতেন। স্যারের কাকরাইলের সাথে এই গভীর সম্পর্ক অনেকের জন্য ঐসময় দৃষ্টান্ত হয়ে ছিল। এক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেছিলেন, “একটা সময় কাকরাইলের (মুরব্বীদের) সাথে গভীর সম্পর্ক ছিল, যেটা এখন আর নেই।” তিনি একটি উদাহরণও দেন। স্যার বলেছিলেন, মেয়ের আক্বীকার জন্য তিনি কাকরাইলের মুরব্বীদের জানিয়েছিলেন যে আক্বীকা কাকরাইলে দেওয়ার ইচ্ছা। কিন্তু মুরব্বীদের পক্ষ থেকে তাকে পরামর্শ দেওয়া হয়, “তুমি বাসায় আক্বীকা দাও, নিজের লোকদের মধ্যে আক্বীকা করো।” বাসায় ফিরে স্যার বলেছিলেন যে তিনি আক্বীকা বাসাতেই করবেন। তখন বাসা থেকে প্রশ্ন করা হয়, “তুমি তো বলেছিলে কাকরাইলে আক্বীকা দিবে, কেন বাসায় করছ?” স্যার জবাবে বলেন, “কাকরাইল থেকে বলেছে, আপন লোকদের সাথে আক্বীকা দিতে।” তখন বাসা থেকে বলা হয়, “তোমার আপন তো কাকরাইলই, কাকরাইলেই আক্বীকা দাও।” সেই সময় স্যার কাকরাইলের সাথে এতটাই গভীর সম্পর্ক রাখতেন যে পরিবারও কাকরাইলকে তার আপনজন বলে মনে করত।

🎤 ১৪৮

চাপাইনবাবগঞ্জ সোনামসজিদ বর্ডার দিয়ে একবার স্যার ভারতের সফরের উদ্দেশ্যে (১৯৯৪/৯৫) রওনা হন। তবে, বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন স্যারকে আটকে দেয়, ফলে ফিরে আসতে হয়। সোনামসজিদ চেকপয়েন্টে মসজিদে বসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা হয়েছিল এই আশায় যে স্যারের পাসপোর্টটি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ছেড়ে দেবে। সেই সময় অপেক্ষারত অবস্থায় মসজিদে বিভিন্ন কথাবার্তার মাঝে মাহফুজ ভাই স্যারকে জিজ্ঞেস করেন, “স্যার, হজরতজ্বী নাকি বিশ্ব এস্তেমা বন্ধ করতে চাচ্ছেন?” স্যার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেন, “আমি জানি না।” কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর স্যার বললেন, “আমি হজরতজ্বীকে যতটুকু জানি, এই লেভেলে উনি আসবেন না (উনার পক্ষ থেকে এই ধরনের কোনো কথা বলা হবে না)।” মাহফুজ ভাই তখন প্রশ্ন করেন, “কেন?” স্যার বলেন, “এই এস্তেমা চালু করা, বন্ধ করা, এস্তেমার এন্তেজামি সিদ্ধান্ত নেওয়া এগুলো হজরতজ্বীর কাজ নয়।” এরপর মাহফুজ ভাই আবার প্রশ্ন করেন, “হজরতজ্বী তো গোটা দুনিয়ার আমীর, এগুলো উনার কাজ না হলে উনার কাজটা কী?” তখন স্যার খুব দৃঢ়তার সাথে উত্তর দেন, “উনি একজন দায়ী, উনি দাওয়াত দেবেন, এক মহান দায়ী, দাওয়াত দেওয়াই উনার কাজ (এই ধরনের বন্ধ করা বা চালু করা, এই লেভেলের কাজে উনারা থাকেন না, এস্তেমার মধ্যে একজন দায়ীর কাজ সীমিত নয়। দায়ীর কাছে এস্তেমা হওয়া বা না হওয়া তেমন বড় গুরুত্ব বহন করে না, তার মূল দৃষ্টি ও মনোযোগ দাওয়াতের ওপর। দায়ীর মূল কাজ দাওয়াতই এবং এটাই তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব)।”

🎤 ১৪৯

মাশোয়ারার শুদ্ধতার জন্য এবং কাকরাইলের বিভিন্ন হালতের কারণে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে স্যার সতর্কতামূলক কিছু বলাবলি শুরু করেন এবং শুদ্ধতার মেহনত শুরু করেন। তখন থেকেই তিনি তার প্রত্যেকটি পদক্ষেপের বিষয়ে—কি করছেন, কীভাবে করছেন, করার পর কী প্রতিক্রিয়া এসেছে এবং এরপর করণীয় কী—এসব বিষয় হযরতজ্বী এনামুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহিকে জানাতেন। হযরতজ্বী রহমতুল্লাহি আলাইহির সঙ্গে স্যারের এতটাই গভীর সম্পর্ক ছিল যে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়েও তিনি হযরতজ্বীকে জানাতেন। একইভাবে, কাকরাইলের বিভিন্ন হালত এবং সেখানে তিনি কী করছেন তাও জানাতেন। ঐ সময় স্যার এমন কোনো কাজ করেননি যার বিষয়ে তিনি নিযামুদ্দিনে (হযরতজ্বীকে) অবগত করেননি। একবার নিযামুদ্দিন থেকে ক্বারী জহির সাহেব কাকরাইলে এসেছিলেন। সেখান থেকে তাকে মাদ্রাসায় পাঠানো হয় বয়ানের জন্য। কিন্তু সেই সময় মাদ্রাসায় পরীক্ষা চলছিল, ক্বারী সাহেব এতে কিছুটা বিরক্ত হন। (তিনি অল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন, তার সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার করা যেতো এবং উপযুক্ত মজমায় তাকে কাজে লাগানো যেতো। উপযুক্ত মজমায় ব্যবহার না করে মাদ্রাসার অনেক তাকাজা বুঝিয়ে উনাকে কাকরাইলের বাহিরে পাঠানো হয় ঐ সময় যখন মাদ্রাসাগুলোতে পরীক্ষা চলছিল)। পরে, কয়েকজনের মধ্যে ক্বারী সাহেব স্যারের প্রসঙ্গে খুব খুশি হয়ে বলেছিলেন, "এই সুন্দর চেহারার ছেলেটি এসে সবকিছু লিখে হযরতজ্বীকে জানিয়ে দিয়েছে।"

🎤 ১৫০

এস্তেমার পর হজরতজ্বী এনামুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন কাকরাইলে অবস্থান করতেন, তখন তিনি সাধারণত কাকরাইলের উত্তর প্রান্তে খানার কামরায় আছর থেকে মাগরিব পর্যন্ত বসতেন। এ সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার জিম্মাদার সাথীরা কাকরাইলে এসে থাকতেন এবং আছরের পর হজরতজ্বীর সামনে বসার সৌভাগ্য লাভ করতেন। তাঁর সামনে বসে থাকাটাও সাথীরা একটি আমল হিসেবে বিবেচনা করতেন। স্যার তখন কাকরাইলের বিভিন্ন হালতের শুদ্ধতা নিয়ে মেহনত করছিলেন। এই প্রচেষ্টার কারণে সারা দেশেই স্যারের কাজ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। এমন একদিনের ঘটনা, আছরের পর পুরো কাকরাইলের মজমা ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। লোকজন ভরপুর সেই মজমার পেছন দিক দিয়ে স্যার হেঁটে হজরতজ্বীর কাছে গেলেন। গিয়ে হজরতজ্বীর হাতে একটি চিঠি দিলেন। তখনই মজমায় গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। এত লোকের ফিসফিসানিতে শব্দের প্রতিধ্বনি যেন কান তালা লাগিয়ে দেওয়ার মতো হয়ে উঠেছিল। মাগরিবের পর সবুজ ভাই (শাহারুল হুদা) স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, মজমায় এত গুঞ্জন শুরু হলো আপনার আচরণ দেখে। আপনি হজরতজ্বীর কাছে কী দিলেন? সবার ধারণা, আপনি হয়তো নতুন কোনো নালিশ করতে গেছেন।” স্যার হালকা হেসে বললেন, “না, না, এটা আমার আহলিয়ার নালিশ। কয়েক বছর আগে সে হজরতজ্বীকে চিঠি লিখেছিলো যেন আমি বাসায় যথেষ্ট সময় দিই। হজরতজ্বী তখন বলেছিলেন, ভাই মুসফিক, তোমার আহলিয়াকে সময় দেওয়া দরকার। তবে আমি সেভাবে সময় দিতে পারিনি। এবার সে আবার হজরতজ্বীর কাছে অভিযোগ করেছে যে, আপনি সময় দিতে বলেছিলেন, কিন্তু উনি এখনও আমাকে যথেষ্ট সময় দেন না।” এই কথা শুনে ঐসময় সেখানে উপস্থিত সবাই হাসতে শুরু করেন। এরপর সবুজ ভাই স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, আপনি কাকরাইলে যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন, যার কারণে হাজী সাহেব (আব্দুল মুকিত সাহেব) এর সঙ্গে মতবিরোধ হচ্ছে, এসব কি আপনি হজরতজ্বীকে জানিয়েছেন?” স্যার উত্তর দিলেন, “আমি প্রত্যেকটা পদক্ষেপ চিঠি দিয়ে হজরতজ্বীকে জানিয়েছি।” তখন সবুজ ভাই আবার জানতে চাইলেন, “হজরতজ্বী কী জবাব দিতেন?” স্যার বললেন, “এটা একটি উসূল, যদি মুরিদ কোনো সমস্যার কথা, হালতের কথা, পীরকে জানান বা পরামর্শ চান, আর পীর সাহেব যদি সম্মত হন, তাহলে সাধারণত কোনো জবাব দেন না। তবে যদি বিপরিত কিছু বলার থাকে, তিনি জানান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হজরতজ্বী চুপ থাকতেন, যা আমার পদক্ষেপের প্রতি উনার সমর্থন বুঝতাম। আমি চিঠি পাঠানোর এবং তার উত্তর আসার জন্য যে সময় লাগত, সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম এবং প্রতিটি পদক্ষেপ হজরতজ্বীকে জানাতাম। কি করছি এবং পরবতীর্তে কি করতে যাচ্ছি সব কিছুই হজরতজ্বীকে জানায়েছি।” স্যার এবং হজরতজ্বীর সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে পারিবারিক ও তুচ্ছ বিষয়েও স্যার উনাকে জানাতেন। এমনকি স্যারের আহলিয়া নিজের অভিযোগ স্যারের হাতেই হজরতজ্বীর কাছে পাঠাতেন, কারণ তাঁদেরও দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে এটি যথাযথভাবে পৌঁছাবে এবং এর কোনো খেয়ানত হবে না। আর স্যার এমন কোনো কাজ ঐসময় করেননি, যার বিষয়ে নিযামুদ্দিনে হজরতজ্বীকে জানাননি।

🎤 ১৫১

একবার এক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার বলেছিলেন, "অতি আনুষ্ঠানিকতা ও উদ্দেশ্যমূলক খাতির-যত্ন, যেখানে কোনো সৎ উদ্দেশ্য নেই, সেটি দ্বীনের চেতনাবিরোধী এবং পরিত্যাজ্য। অনেকের মধ্যে মুরব্বীদের প্রতি অতি মেহমানদারীর প্রবণতা দেখা যায়, অথচ নিকট আত্মীয়দের খোঁজখবর নেয় না, গরীব প্রতিবেশীদের কখনও কিছু খাওয়ায় না, কিন্তু মুরব্বীরা এলে জান-প্রাণ উজাড় করে তাদের খাওয়ায়। এটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এমন আচরণ এক ধরনের ঘুষের মতো, যেখানে কোনো দ্বীনি উদ্দেশ্য থাকে না, বরং অন্য কোনো স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এটি করা হয়।" স্যার আরও বলেন, "অনেকে মুরব্বীর সাথে মুসাফাহ করার জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, মুরব্বীর খেদমতে চাকরি বা ব্যবসা ফেলে ছুটে আসে। অথচ তাদেরই ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কেউ হয়তো দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে, তাকে দেখার জন্য একবার যাওয়ার সময় পর্যন্ত তারা বের করতে পারে না। এই ধরনের আচরণের মাকসাদ আসলে কী? দ্বীনের নামে প্রদর্শনমূলক কাজ, প্রকৃত দীনদারিত্ব ও প্রকৃত দায়িত্ববোধের পরিচয় না।"

🎤 ১৫২

রংপুরের জিম্মাদার ইউনূস ভাইয়ের সাথে স্যারের গভীর মহব্বতের সম্পর্ক ছিল। ইউনূস ভাইয়ের এন্তেকালের পর উনার ছেলে উনার ফাইলপত্রের মধ্যে স্যারের লেখা একটি দীর্ঘ চিঠি খুঁজে পান। এটি ৮০’র দশকের শেষের দিকে লেখা হয়েছিল। চিঠিতে কাকরাইলের বিভিন্ন হালতের বিস্তারিত বিবরণ ছিল এবং যেসব বিষয় সংশোধন করা প্রয়োজন, সেগুলো উল্লেখ করা হয়েছিল। স্যার দীর্ঘদিন ধরেই গোপনে বিভিন্ন জিম্মাদার ও দায়িত্বশীল সাথীদের কাছে কাকরাইলের বিভিন্ন হালত তুলে ধরতেন। উদ্দেশ্য ছিল, নিজেদের মধ্য থেকেই এসব সমস্যার সমাধানের প্রয়াস চালানো, তিনি চেয়েছিলেন, সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা যেন দায়িত্বশীল সাথীদের ভিতর থেকেই অনুভূত হয় এবং তারাই উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসেন।

🎤 ১৫৩

রুয়েটের কিছু ছাত্র স্যারের সাথে সম্পর্ক রাখত এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ও বিভিন্ন মজমায় স্যারের বয়ান শুনতে আসত। কিন্তু সেখানকার কিছু শিক্ষক, যারা রাজশাহী মারকাজের মুরব্বী ছিলেন, এ বিষয়টি পছন্দ করতেন না। তারা স্যারের সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য ওই ছাত্রদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করতেন। এমনকি পরীক্ষায় তাদের কম নম্বর দেওয়া, এবং আলাদাভাবে ডেকে ভয় দেখিয়ে নম্বর কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন। এর ফলে কিছু মেধাবী ছাত্রও ভালো পরীক্ষা দেওয়ার পরেও খারাপ রেজাল্ট পেয়েছিল। একদিন রুয়েট ক্যাম্পাসে হাঁটার সময় এ প্রসঙ্গ উঠলে স্যার খুবই খারাপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। স্যার বলেন, দাওয়াতের মতো একটি মহান কাজকে এরা কোথায় নামিয়ে নিয়েছে, কোথায় ব্যবহার করছে। চূড়ান্ত প্রকার নারাজীর সাথে বলেন, কোথাকার কাজ এরা কোথায় নামিয়ে নিয়েছে, পবিত্র এই কাজকে ব্যক্তিগত বিদ্বেষে ব্যবহার করছে, কতবড় লজ্জাজনক। দাওয়াতের পবিত্র কাজকে এভাবে অপব্যবহার করা স্যারের কথায় এতটাই গর্হিত মনে হচ্ছিল যে তিনি হয়তো কখনো কল্পনাও করেননি যে কেউ এ পর্যায়েও নামতে পারে। দাওয়াতের কাজের নাম নিয়ে এতোটাই নিচে নামা যায়। স্যারের চেহারায় ঐসময় প্রচণ্ড বিরক্তি এবং হতাশার ছাপ স্পষ্ট ছিল।

🎤 ১৫৪

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেট মসজিদের ইমাম সাহেব হুজুরের বাসা অনেক দূরে থাকায় ফজরের নামাজে বেশীরভাগ সময় আসতে পারতেন না, মসজিদের মুয়াজ্জেম হাফেজ আব্দুল আজিজ ভাই হুজুরের অনুপস্থিতিতে নামাজ পড়াতেন (গেটের পূর্ব পার্শ্বে টিন শেড মসজিদ থাকাকালীন)। আব্দুল আজিজ ভাই জানান, ফজরের নামাজের পর তিনি সূরা হাসরের শেষ আয়াতগুলি মুসল্লিদের নিয়ে মসকের মতো করে পড়তেন—তিনি পড়তেন, তারপর মুসল্লিরা পড়তেন। একদিন নামাজের পর স্যার উঠে এসে উনার পাশে বসে খুব বিনয়ীভাবে আস্তে স্বরে বলেন, আব্দুল আজিজ, আমল হিসেবে এভাবে দৈনিক এটা না করলেই ভাল হয়, নিয়মিত এভাবে আমালে বিদআত হবার শংকা থাকে, শিখানোর জন্য কয়েকদিন করা যেতে পারে, তবে নিয়মিতভাবে এটি আমল হিসেবে চালু না করাই ভালো (স্যার তখন কাজল ভাইয়ের সাথে জুবেরী ভবনে থাকতেন ও ফজরের নামাজ কাজলা গেট মসজিদে পড়তেন)।

🎤 ১৫৫

দ্বীনের চেয়ে রাজনীতিকে প্রাধান্য দেয়, দ্বীনের বিধান প্রতিষ্ঠার নামে নিজেদের স্বার্থকে আগে রাখে, ইসলামের নামে এরকম কিছু রাজনৈতিক প্রচেষ্টা আছে, যাদের মূল লক্ষ্য দ্বীন কায়েমের নামে ক্ষমতা দখল। প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা চা খেতে খেতে আলোচনা হচ্ছিল, সেইসব রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মানসিকতা তুলে ধরে স্যার এক উদাহরণ দেন। স্যার বলেন, একজন গাজাখোর টয়লেটে গেল, গিয়ে দেখল, টয়লেটের মাঝের মল বের হবার (নির্গমনের) ছিদ্রটি ফাঁটা, আবার বদনার নিচেও ফুটো, পানি ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে ভাবল, যদি আগে টয়লেট সেরে নেয়, তাহলে ততক্ষণে বদনার ফুটো দিয়ে পানি শেষ হয়ে যাবে, পরে আর পানি পাওয়া যাবে না। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল—আগে পানির কাজটা (সৌচকার্য) সেড়ে নেই, পরে টয়লেট সারব। পানিও নষ্ট হলো না, পানির ব্যবহার হয়ে গেলো আর পরে তো টয়লেট সেরেও নিবো! দ্বীনের শিক্ষা হলো, আগে ব্যক্তিগতভাবে দ্বীন মেনে চলতে হবে, নামাজ-রোজা, আখলাক ও তাকওয়ার চর্চা বাড়াতে হবে। দ্বীন কায়েমের নামে ক্ষমতা দখলকে মুখ্য লক্ষ্য বানালে, প্রকৃতপক্ষে তা দ্বীন প্রতিষ্ঠা নয়, বরং রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণে পরিণত হয় (আগে ক্ষমতা নিশ্চিত করি, পরে দ্বীন কায়েম হবে; আগে শাসনক্ষমতা হাতে নেই, পরে ইসলামী বিধান বাস্তবায়ন করব; আগে কোরআনের আইন চাই বলে জনসমর্থন আদায় করি, আক্বীদা আমল শুদ্ধ করার চিন্তা পরে করা যাবে; আগে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিশ্চিত করি, দ্বীনদারীর ব্যাপারে পরে চিন্তা করা যাবে; ক্ষমতার মোহে পড়ে এরকম মানসিকতা নিয়ে দ্বীনকে পেছনে ঠেলে দিলে প্রকৃতপক্ষে তা দ্বীন কায়েমের নয়, বরং ব্যক্তিস্বার্থের প্রচেষ্টা হয়ে দাঁড়ায়; চরিত্র ও আমলের সংশোধন ছাড়া ইসলামের নামে ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা, ইসলামী মূল চেতনার পরিপন্থী)।

🎤 ১৫৬

ঢাকা আশুলিয়ায় জামাত চলছিল, ফজরের নামাজের পর স্যার বাসায় যাবেন, স্যারকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য স্যারের সাথে বের হয়ে পথিমধ্যে আমাদের এক ভাই, যার ছোট বোন মেধাবী এবং একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে, স্যারের কাছে তার বোনের জন্য দোয়া চান, এভাবে বলেন, "স্যার, আমার বোনের জন্য একটু হেদায়েতের দোয়া করবেন।" স্যার তার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিলেন না, কিছুক্ষণ চুপ থেকে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করলেন। এরপর স্যার বললেন, "পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি যত্নবান হতে বলো, তিন কুলের আমল (তিন কুল পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে মাসেহ করা) সকাল—বিকাল করতে বলো। যখন নামাজ থাকবে না, তখন বেশি বেশি দরূদ শরীফ ও ইস্তিগফার পড়তে বলো।"

🎤 ১৫৭

এক সফরে স্যারকে এক ভাই বাসায় দাওয়াত করেন। দাওয়াতে স্যারের সঙ্গে প্লেটে কাজল ভাইও শরিক ছিলেন। সেই সময় স্যার অসুস্থ ছিলেন। কিছুদিন পূর্বেই তিনি হার্টের অসুস্থতা নিয়ে রিয়াদে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং স্থানীয় আরব সাথীরা স্যারকে রিয়াদের হাসপাতালে ভর্তিও করিয়েছিলেন। স্যারের খাওয়া—দাওয়ার ব্যাপারে অনেক বিধিনিষেধ ছিল, যা বিস্তারিতভাবে কাজল ভাই জানতেন। রাজশাহীতে একসঙ্গে থাকার সুবাদে কাজল ভাই স্যারের সুবিধার দিকে বিশেষভাবে নজর রাখতেন। খাবার পরিবেশনের সময় মেজবান স্যারের দিকে ডিম দিলে, কাজল ভাই স্যারের ডিম না খাওয়ার বিধি জানার কারণে তা স্যারের দিক থেকে সরিয়ে নেন। স্যার তখন কাজল ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, "কেন উঠিয়ে নিলে?" কাজল ভাই বললেন, "স্যার, আপনার ডিম খাওয়া যাবে না, আপনার নিষেধ আছে।" স্যার তখন বললেন, "আল্লাহ আমাকে ডিম খাওয়াতে চান, আর তুমি আমার রিজিক নিয়ে টানাটানি কর!" যদিও স্যার তখন আর ডিম খাননি, তবে তিনি খুব পরিষ্কারভাবে একথা বলেছিলেন। আরেকবার, কোনো এক বাসায় স্যার দাওয়াত খেতে গিয়েছিলেন। মেজবান পোলাও রান্না করেছিলেন, আবার মেহমানদের সুবিধার কথা (অনেকে তেলের কারণে পোলাও খেতে চান না) চিন্তা করে ভাতও রেখেছিলেন। খাবার পরিবেশনের সময় পরিবেশনকারী স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, "স্যার, পোলাও দেবো নাকি ভাত দেবো?" স্যার তখন বললেন, "আল্লাহ পোলাও খাওয়াতে চান, আর তুমি ভাত দিতে চাও!" সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশনকারী সেই ভাই স্যারের প্লেটে পোলাও দেন এবং স্যার পোলাওই খান।

🎤 ১৫৮

রাজশাহীতে তখন মার্কাজ মসজিদ ছিল ষষ্ঠীতলায় (সম্ভবত রাজশাহীর প্রথম মার্কাজ)। বৃহস্পতিবার শবগুজারিতে স্যার মার্কাজে ছিলেন, এবং শুক্রবার সকালে স্যারের চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাওয়ার ফয়সালা ছিল। চার জেলার জোড়সহ তিন দিনের প্রোগ্রাম ছিল। সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাওয়ার জন্য মার্কাজ থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে স্যার দেখেন, স্যারের আহলিয়া স্যারের শিশু বাচ্চা (বড় মেয়ে) এবং একটি সুটকেস নিয়ে মার্কাজে হাজির। (স্যার তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাড়ায় ফ্যামিলি কোয়ার্টারে থাকতেন)। স্যারের আহলিয়া বলেন, "তুমি তাবলিগে (শবগুজারির জন্য বাসার বাইরে থাকার পর আবারও তিন দিনের জন্য) যেতে চাও, যাও, কিন্তু বাচ্চাকে নিয়ে যাও। এর দায়িত্ব তোমার।" স্যার যখন একথা শুনাচ্ছিলেন তখন বলেন, "এ কথা ওর ভালোভাবে জানা ছিল যে সন্তানের নফকার দায়িত্ব পিতার, আমিও জানি।" কথা না বাড়িয়ে (আল্লাহর রাস্তায় সময় ব্যয় করার ব্যাপারে পরিবারের সাথে কোনো আপস না করে) স্যার তৎক্ষণাৎ বাচ্চাকে কোলে নিয়ে নেন, এবং সঙ্গে আনা সুটকেসটিও নিয়ে নেন। বাচ্চাকে নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এলাকায় হৈচৈ পড়ে যায়—"শিশু বাচ্চাকে নিয়ে তাবলিগে এসেছেন!" পরিস্থিতি এমন হয় যে, কে বাচ্চাকে নেবে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়! কেউ হাফ বেলা, কারো বাসায় এক বেলা, এভাবে তিন দিন ধরে বিভিন্ন বাসায় বাচ্চা থাকলো, আর স্যার তিন দিনের আমল সম্পন্ন করলেন। স্যার বলেন, "আমি যখন ফিরে আসি, তখন আমারও তিন দিন হলো, বাচ্চারও তিন দিন হলো!

🎤 ১৫৯

একবার এক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার বলেন, আল্লাহওয়ালারা মাঝে মাঝে যে দুনিয়াবি কাজ করে থাকেন, তা আসলে প্রয়োজনের কারণে করছেন তা না। অনেক সময় পারিপার্শ্বিক লোকজনের কথাকে এড়ানোর জন্য কিছু কাজ করেন (কিছু কাজের শেকল ধরে থাকেন)। আবার, অনেক সময় মানুষ ভুল ধারণা করে বসে যে সে কেবল হাদিয়ার ওপর চলে বা তার হাদিয়া ছাড়া চলবে না। তাই ঠেকায় পড়ে (এরকম কথাকে ঢাকার জন্য) কিছু দুনিয়াবি ব্যস্ততা ধরে রাখেন। নিজের চাহিদা বা প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও, সমাজের কারণে কেউ কেউ কথনও কখনও কাজ (চাকরি ব্যবসা ইত্যাদি) ধরে রাখেন।

🎤 ১৬০

মদীনা হারাম শরিফে স্যার রমজানে ইতেকাফে ছিলেন। কিছু ফ্রেঞ্চ আরব সাথী স্যারকে দেখে তাদের জামাতে (মসজিদের বাইরে হোটেলে) কিছু মুযাকারা করার জন্য দাওয়াত দেন। রাতে তারাবির পর খাবার-দাবারের পর মাঝরাতে ১টায় সবাই হোটেলে ফিরবে জানিয়ে সেই সময়ে স্যারকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। দিনে রোজা, জোহরের পর বাইরে আরেক আরব জামাতে যাওয়া হয়েছিল, তেমন বিশ্রাম নেওয়া হয়নি, রাতে লম্বা তারাবি, তারপর আবার বাইরে হচ্ছিল বৃষ্টি। শরীরও ক্লান্ত ছিল, বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। বাইরে বৃষ্টির কারণে হাঁটতে হাঁটতে ওই ফ্রেঞ্চ আরবদের জামাতে এত রাতে যেতে কোনোভাবেই মন চাইছিল না। স্যারের সাথে শাহ আলম ভাই (সিলেট), ডা. ওবায়দুল্লাহ (নাটোর) সহ আরও কয়েকজন ভাই ছিলেন। তারাবির পর যখন স্যার ওই ফ্রেঞ্চ জামাতে যাওয়ার জন্য দাঁড়ালেন, তখন আমাদের এক সাথী ক্লান্ত শরীরে তারাবির নামাজরত অবস্থায় ঘুমের ঘোরে দেখা তার স্বপ্নের কথা বললেন। তিনি দেখেন, আমাদের কিছু সাথীসহ আরও কিছু লোক সম্পূর্ণ সবুজ রঙের পাগড়ি, জুব্বা, পায়জামা পরিহিত অবস্থায় মসজিদের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন, একজন আরেকজনের সাথে কথা বলছেন। এই স্বপ্নের কথা স্যারকে বলার পর স্যার মুচকি হাসলেন এবং বললেন, শবে কদর হবার লক্ষণ। বলেই হাঁটা শুরু করলেন। ভাবলাম, হয়তো স্যার মসজিদের কোনো এক কোণে নামাজে দাঁড়াবেন। কিন্তু শবে কদরের রাত বলে, নামাজ, জিকির, তেলাওয়াতে মশগুল না হয়ে, বরং স্যার মসজিদ থেকে বের হয়ে ওই জামাতের উদ্দেশ্যে বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটা শুরু করলেন। ক্লান্তির কারণে আবার বৃষ্টিতে ভিজে যেতে মন চাইছিল না, আবার শবে কদরের কথা শুনে মনে হচ্ছিল কিছু নামাজ ও তেলাওয়াত করি। কিন্তু স্যারের বের হয়ে হাঁটা শুরু করার কারণে আমাদের বেশিরভাগ সাথিই স্যারের সাথে রওনা দিলেন। ওই জামাতে স্যার দীর্ঘ সময় মুযাকারা করেন। ২০-২২ জন ফ্রেঞ্চ সাথী ছিলেন। বয়ানের পর স্যার তাশকিল করেন। সাথীরা আল্লাহর রাস্তায় সময় দেওয়ার জন্য নিয়ত করেন। লম্বা সময় সেখানে লেগে যাবার কারণে মসজিদে ফিরে আসতে আসতে কিয়ামুল লাইলের জামাত প্রায় শেষের দিকে চলে গিয়েছিল। স্যারের সাথে মসজিদে ফেরার সময় মনে হচ্ছিল—আমরা নামাজ, তেলাওয়াত, জিকির ইত্যাদিকে আমল মনে করি। কিন্তু স্যার শবে কদরের লক্ষণ নিশ্চিত হয়েই দেখালেন—দাওয়াতের কাজ, অন্যের কল্যাণের জন্য চিন্তা করা, মানুষকে দ্বীনের কথা বলা—এগুলোও বড় আমল, অনেক বড় ইবাদত, এগুলো আমলের বাইরে নয়।

🎤 ১৬১

সফরে মদিনায় পৌঁছানোর পর, হারাম শরিফে (মসজিদে নববী) জিয়ারতে যাওয়ার পূর্বে বাসায় স্যার সাথীদের নিয়ে কিছু মুযাকারা করেন। মুযাকারার এক প্রসঙ্গে স্যার বলেন, হারাম শরিফের দেয়ালে সূরা মুহাম্মদ সম্পূর্ণ লেখা আছে। মদিনায় অবস্থানকালীন, হারাম শরিফে দৈনিক সূরা মুহাম্মদ তেলাওয়াত করা যায়, তা খুব ভালো হবে।

🎤 ১৬২

একদিন নামাজের পরে স্যার মসজিদে নববীতে বসে ছিলেন। আমি স্যারের পাশে বসে হারাম শরীফের কোনো এক এন্তেজামের দায়িত্বে থাকা জিম্মাদার ব্যক্তির দাঁড়ি না থাকার বিষয়টি স্যারকে এভাবে বললাম যে, “উনাকে দেখলাম একেবারে ক্লিন শেভ।” স্যার আমার কথা শুনে আমার দিক থেকে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন। স্যারের চেহারায় একটু বিরক্তির ভাব ছিল, গম্ভীর মনে হচ্ছিল। তিনি আমার কথার প্রসঙ্গে কোনো কিছু বললেন না, একেবারে চুপ থাকলেন। স্যারের এই নীরবতা, গম্ভীরতা এবং আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া—এসব দেখে আমার মনে হলো, তিনি যেনো আমাকে এই উত্তরই দিলেন: “তুমি কি এসব দেখতে এখানে এসেছো? এর দ্বারা তোমার লাভ বা ক্ষতি কী? তুমি বরং নিজের চিন্তা করো।”

🎤 ১৬৩

একদিন মসজিদে নববীর মূল অংশের ঠিক উত্তরে—যেখানে ওপরে তাবু, ছাদ নাই- স্যারের সঙ্গে বসে ছিলাম। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল স্যারের সঙ্গে রিয়াজুল জান্নাতে যাই। কিন্তু সরাসরি স্যারকে বলার সাহস হচ্ছিল না। তখন রিয়াজুল জান্নাত সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, কোনো রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজন ছিল না। ইচ্ছা হলে যতবার খুশি রিয়াজুল জান্নাতে কিংবা আসহাবে সুফফার অংশে যাওয়া যেত। তবে ভিড় অনেক হতো। দায়িত্বশীলরা একটু পরপর জিকির তেলাওয়াতে মশগুল মানুষদেরকে অনুরোধ করতেন বের হয়ে যেতে, যাতে অন্যরাও সুযোগ পান। সরাসরি না বলে আমি ইচ্ছেটা ঘুরিয়ে জানানোর চেষ্টা করলাম। সেখানের ফজলত টা স্যারের কাছে এভাবে জিজ্ঞেস করি — “আমার ঘর (রওজা) ও মিম্বরের মধ্যবর্তী জায়গাটি জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান… এরকম কিনা?” স্যার দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন— ”হাঁ ঠিক, তবে ওই বাগান থেকে যদি বের হয়ে যায়, সেখান থেকে যেনো বের না হয়!” মনে হচ্ছিল এই ছোট্ট কথা দিয়ে স্যার সম্পূর্ণ জীবনের নিয়ত কে শেখাচ্ছেন, ছোট্ট বাক্যে যেন জীবনের নিয়ত শেখানো হচ্ছিল। জান্নাতে যে প্রবেশ করবে, সে আর বের হবে না। স্যারের কথাটুকু শুধু জায়গাটির ফজিলতের প্রতি ইঙ্গিত ছিল না, ছিল জান্নাতি জীবনের আকাঙ্ক্ষার এক গভীর আত্মিক প্রেরণা, মনে হচ্ছিল এক চিরস্থায়ী আত্মিক নিয়ত শেখাচ্ছেন স্যার, আল্লাহর নৈকট্য একবার পেলে আর তা যেন হারিয়ে না যায়। জান্নাতি অবস্থান থেকে আর যেন বের না হও, জান্নাতের কোনো গেট যখন খুলে যায়, তখন আর ফিরে যেতে না হয়। এমন নিয়ত করে নেয়া যেন এমন কোনো কাজ না হয়, যা সেই জান্নাতি অবস্থান থেকে সরিয়ে দেয়। (স্যার হয়তো বলতে চেয়েছিলেন, রিয়াজুল জান্নাহ শুধু একটি স্থানের নাম না, একটি আত্মিক অবস্থান, একটি চিরকালের গন্তব্যের ক্ষণিক স্বাদ। এখান থেকে এমন নিয়ত হয়ে যায়, যার দ্বারা আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো কাজ আর না হয়, কখনোই এমন কিছু না করে যা সেই জান্নাতি অবস্থান থেকে সরিয়ে দেয়)।

🎤 ১৬৪

স্যারের সাথে যতবার রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রওজা মোবারক জিয়ারতের জন্য যাওয়ার সুযোগ আল্লাহ পাক দিয়েছেন, প্রত্যেকবার একই অবস্থা দেখেছি। বাবুস্‌সালাম দিয়ে প্রবেশের আগেই স্যার খুব ছোট ছোট কদমে, ধীরে ধীরে অগ্রসর হতেন। মুখে বিশেষ কোনো তাসবীহ বা দোয়া উচ্চারণ করতে দেখেছি মনে পরে না, তবে চেহারায় এক ধরনের পরিবর্তন দেখা যেত—মনে হতো, সে মুহূর্তে উনি আমাদের কাউকে চিনেন না। হুজুরের মিম্বার অতিক্রম করে যতই সামনে অগ্রসর হতেন, ততই স্যারের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ত এবং অনেকটা শিশু বাচ্চার মতো বেচাইন হয়ে উঠতেন। আঁ আঁ ধরনের কান্নার শব্দ ক্রমে বাড়তে থাকত। কখনও কখনও মনে হতো, স্যারের বুক ধড়ফড় করে নিঃশ্বাস গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে—বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতেন। রওজা মোবারক যত কাছে হতো, ততই এই উ উ আঁ আঁ কান্না আরও প্রবল হতো। কখনো কখনো মুখ গুঁজে কান্নার শব্দ শোনা যেত। রওজার সামনে সাধারণভাবে বা জোরে সালাম দিতে দেখেছি—এমনটা মনে পড়ে না। খুব আস্তে, অথবা কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চারা যেভাবে কথা বলে ওই স্বরে সালাম দিতেন। কখনও কখনও কান্নার হিসকির মাঝেই সালাম দিতেন—বোঝাই যেত না। রওজা মোবারক পার হয়ে যত সামনে অগ্রসর হতেন, কান্নাও তত বেড়ে যেত। ভিড় কম থাকলে, কখনও রওজার দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় দাঁড়ানোর সুযোগ পেলে সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে যেতেন, যতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হতো থাকতেন, রওজার দিকে চোখ না তুলে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, চোখ দিয়ে পানি গড়াতে থাকত। কখনো কখনো সেখানে হাত তুলে দোয়া করতেন, দোয়ার মধ্যেই কখনও হিসকির সাথে, কখনও গলা চেপে কান্না করতে থাকতেন। রওজার গেট দিয়ে বের হওয়ার সময়ও সেই কান্না—উঁ উঁ করে বাচ্চার মতো হেসকির সঙ্গে চলতে থাকত। রওজা মোবারক থেকে বের হওয়ার পরেও অনেকক্ষণ পর্যন্ত কাঁদতে থাকতেন। এর ব্যতিক্রম কখনো দেখিনি। রওজা মোবারক থেকে বের হওয়ার পর সেসময়ে যদি জান্নাতুল বাকী খোলা থাকত, তবে সেখানে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যেতেন। কখনো কখনো স্যারের কান্না হাঁটতে হাঁটতে জান্নাতুল বাকী পর্যন্তও চলতে থাকত। কি এক চাহিদা, কি এক ব্যথা, কত আবেগ, কি এক সম্পর্ক, কত গভীর ভালোবাসা স্যারের সেই কান্নার মধ্যে প্রকাশ পেত—যেসব ভাই স্যারের সঙ্গে জিয়ারতে গিয়েছেন, সবাই তা নিজ চোখে দেখেছেন।

🎤 ১৬৫

ভাই ডাক্তার সফিউল্লাহ সাহেব (নওগাঁ) বলেন, এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর স্যারের কাছে পরামর্শ চেয়ে বললাম, স্যার, আমাদের অনেক বন্ধু ব্র্যাক-এ ভালো বেতনে চাকরি করছে। ব্র্যাক-এর হেলথ সেক্টর আছে, তারা হেলথ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রোগ্রামে কাজ করছে। বড় এনজিও, বেতনও অনেক ভালো। ওদের কিছু সার্কুলার বা অফার আছে—চাকরিতে আবেদন করব কি না, বা জয়েন করব কি না, সে বিষয়ে। স্যার আমার কথা শুনে বললেন, শোনো, এতটুকু তো বোঝা থাকা দরকার তোমাদের, কিছু প্রশ্ন আছে, যা করাটাই অনুচিত—সব প্রশ্ন করা যায় না। তোমাদের তো কিছু ব্যাপার জিজ্ঞাসা না করেই জানা থাকা উচিত। এনজিওরা এই দেশে দুইটা প্রজেক্ট নিয়ে মাঠে নেমেছে: এক, সুদকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা; আরেক হলো মুসলমানদের মেয়েদের ঘর থেকে বের করা। এই দুইটা টার্গেট নিয়ে বিভিন্ন প্রজেক্টে মাঠে নেমেছে ওরা, ওরা ওদের এই টার্গেট বাস্তবায়নের কাজ করে চলছে। এখন তুমি ওদের সঙ্গে কাজ করতে যাবে কিনা, এই ব্যাপারে পরামর্শ চাওয়াও তো ঠিক না।

🎤 ১৬৬

ভাই ডা. শফিউল্লাহ বলেন, এর কিছুদিন পর স্যারের সাথে বিয়ের ব্যাপারে পরামর্শ করলাম—কোথায় বিয়ে করব, কেমন পরিবার হলে ভালো হয়, পড়াশোনা কেমন হলে ভালো, দীনদারি কেমন হওয়া উচিত, আর আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো কেমন হওয়া ভালো, একটা মেয়ে নির্বাচন করতে হলে দীনি এবং দুনিয়াবি দিক থেকে কুফু মেলানোর ব্যাপারে কীভাবে ভাবতে হবে—এসব বিষয়েই আলোচনা করলাম। স্যার বললেন, “এই বিষয়টা নিয়ে অত বেশি চিন্তা করার দরকার নেই। আল্লাহ পাক যেটা মিলিয়ে দেন, মোটামুটি হলেই চলবে। মাকে দেখিয়ে নিও, আব্বা-আম্মাকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিও।” স্যার আরও যোগ করলেন, “মেয়েরা হচ্ছে বাঁকা হাড়ের তৈরি—এইটাকে সোজা করতে যাওয়া যাবে না। আব্বা-আম্মাকে সঙ্গে নিয়ে মোটামুটি চলবে মনে হলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিও।” সাথে স্যার একটি দোআও শিখিয়ে দিলেন—হযরত মূসা (আঃ) এর সেই বিখ্যাত দোআ, যা তিনি মাদয়ানের কূপের পাশে বসে আল্লাহর কাছে করেছিলেন: رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ (হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাযিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী)। স্যার বললেন, “এই দোআটা বেশি বেশি করে পড়তে থাকো।”

🎤 ১৬৭

একদিন জামাতের সময় না থাকায় হারাম শরীফে না গিয়ে বাসার (হোটেল) নিকটবর্তী মসজিদে নামাজে যাই। জামাতের আগেই পরিচয় হয় সেখানের ইমাম সাহেবের সাথে (বাংলাদেশী, এবং বাংলাদেশের নামকরা এক কওমী মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন), জামাতের একামত সংক্ষিপ্তভাবে (প্রথমে আল্লাহু আকবার ২ বার, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ১ বার আশহাদু আন্না মুহামম্মাদার রসুলুল্লাহ ১ বার এভাবে) ইমাম সাহেব নিজেই দিলেন, নামাজ পড়ালেন যা হানাফী ধারা অনুসরনে মনে হলো না। নামাজের পর আমি স্যারকে বললাম, ইমাম সাহেব ...... মাদ্রাসার ছাত্র, আর ঐ মাদ্রাসায় পড়াশুনার পরতো লা-মাজহাবি হবার কথা না, নিশ্চয়ই হানাফী হবার কথা? স্যার বললেন, হ্যাঁ, এখানে (মক্কা শহর/ সৌদি আরব) বাংলাদেশি এবং আরাকানি অনেক আলেম ও ইমাম—তারা নিজেদের হানাফি মাজহাব ছেড়ে দিয়ে “সালাফি” (লা-মাজহাবি) হয়েছেন শুধুমাত্র চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য (যেখানে স্থানীয়ভাবে সালাফী ধারা বেশি প্রচলিত, সেখানে ইমাম, মুয়াজ্জিন বা ধর্মীয় কাজে নিযুক্ত হতে গেলে হানাফী মত বা অন্যান্য মাজহাব অনুসরণের ক্ষেত্রে চাপ পড়ে, যদি তারা হানাফি পদ্ধতিতে ইমামতি করেন, বা হানাফী মাসয়ালা মতো আমল করেন, তাহলে চাকরি চলে যাওয়ার ভয় থাকে)। কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ আবার চাপে পড়ে আকীদা ও আমলের ব্যাপারে নমনীয়তা দেখাতে গিয়ে ধীরে ধীরে একেবারে ধারা পরিবর্তন করে ফেলেন। এধরণের অবস্থান দ্বীলকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়। প্রথমে ফিকহী নমনীয়তা, পরে আকীদাগত স্খলন—শেষ পর্যন্ত এমন জায়গায় দাঁড়ায়, যেখানে ধর্ম একটি ‘চাকরি’র অংশ ছাড়া কিছুই থাকে না। স্যার এ আলোচনায় খুব স্পষ্ট করে বললেন, “এই রুচি ও কৃত্তিকলাপ ইমান ধ্বংসের মতো, কখনও কখনও অনেক দূর পর্যন্ত নিয়া যায়”। পরবতীর্তে স্যার একথার এভাবে ব্যাখ্যাও করেন, এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ পরিণতি হচ্ছে শুরুটা হয় ফিকহী বিষয়ে নমনীয়তা দিয়ে, পরে তা আকীদার বিরুদ্ধ অবস্থানে গিয়ে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধাহীন হয়ে পড়ে, নিজেকে “সরাসরি কুরআন-হাদীস বুঝি” ভাবতে শুরু করে। ক্রমান্নয়ে ধর্মকে পেশার সাথে মেলাতে গিয়ে দ্বীনের মূল উদ্দেশ্য ও রুহানিয়াত থেকে বিচ্যুত হয়। এই পরিবর্তন দুনিয়াবি সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে হলে তা এক প্রকার কপটতা (নাফাক)-এর রূপ ধারণ করে, পয়সার কাছে বিক্রি হয়ে যায়।

🎤 ১৬৮

স্যার একবার বলছিলেন, যে অপচয় করে, সে অবশ্যই কৃপণতা করবে, আর যে কৃপণতা করবে, সে অপচয় করতেও বাধ্য। যে অপচয় করে, সে কৃপণ হবেই, আর যে কৃপণ, সে অপচয়ে লিপ্ত হবেই। নিজের ঘরে দুই লাখ টাকার কার্পেট কিনে বিছাচ্ছে, সেই কার্পেটের ওপর গরিব প্রতিবেশীকে বসিয়ে তার দুঃখের কথা শুনবে না, কারণ সে গরিব—তাকে বসাবে না। অপ্রয়োজনীয় জায়গায় খরচ করা, নিষিদ্ধ জায়গায় খরচ করা হলো অপচয়; ও কার্পেট কিনলো লাখ টাকায় এটা অপচয়, আর গরিব প্রতিবেশীকে একশো টাকা দিতে পারল না—এটা কৃপণতা। বন্ধুর শালার বিয়েতে পাঁচ হাজার টাকা খরচ করবে, কিন্তু ভাগ্নির ছেঁড়া জামা দেখে পাঁচশো টাকা দিয়ে নতুন জামা কিনে দেবে না। অপচয় আর কৃপণতা একে অন্যের ছায়া; অপ্রয়োজনে খরচ করবে, তো সে প্রয়োজনে হাত গুটিয়ে রাখবে, আর যে প্রয়োজনে চোখ বুজে, সে বিলাসিতায় চোখ মেলে থাকবে। গরিব আত্মীয় বা গরিব প্রতিবেশী অসুস্থ— এক কেজি বড়ই বা সাগরকলার একটা ছড়া নিয়ে দেখতে যাবে, কিন্তু ওষুধের টাকাটাও দেবে না। অথচ বউকে নিয়ে যাবে সিঙ্গাপুর ঘুরতে—অপ্রয়োজনীয় ট্যুর, দামি শপিং—সবই চলছে নিয়মিত। যে অপ্রয়োজনীয় জায়গায় খরচ করে, সে প্রয়োজনীয় জায়গায় খরচ করতে পারবে না—সে কৃপণ হবে, কৃপণতা করবেই। আর সঠিক জায়গায় খরচ না করলে? তার টাকাতো আছে—সে খরচ করবেই, খরচ করবে ভুল জায়গায়, খরচ হয়ে যাবে বেজায়গায়। লাখ টাকার চাকরি করে, পকেট যে একদম খালি এমন না, গাড়ি-বাড়ি আছে, কিন্তু যে খালা, যে ফুপু কোলে করে বড় করেছে, তাঁর হাতে তুলে দেয় পঞ্চাশ টাকা—আর নিজেকে ভাবে বড় দানবীর! বড় খোঁজ-খবর লেনেওয়ালা! আমাদের এই কৃপণতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে—বড় দুঃখ আর বেদনাভরা কণ্ঠে কথাগুলো বলেছিলেন স্যার।

🎤 ১৬৯

হজরত ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহির শেখ (হজরত মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী) এসেছেন দিল্লিতে। তিনি অবস্থান করছিলেন নিজামুদ্দিন থেকে দুই ক্রোশ (চার মাইল) দূরে। ওই সময় হজরত ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি এতটাই অসুস্থ ছিলেন যে তাঁর জন্য নিজামুদ্দিনের দোতলা থেকে নিচে নামা নিষেধ ছিল, তিনি এতটাই দুর্বল ছিলেন। সেই অবস্থায়, কোনো এক ফাঁকে কাউকে কিছু না বলে তিনি হেঁটে চার মাইল দূরে তাঁর শেখের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। স্যার এক মোযাকারায় এই ঘটনা উল্লেখ করে বলেছিলেন— উনারা তাঁদের জীবনকে সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করেছেন। স্যার তখন দুইটি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন: “Maximum Utilize”। স্যার বলেন, ”উনারা তাঁদের জীবনের ম্যাক্সিমাম ইউটিলাইজ করেছেন।” এ প্রসঙ্গে স্যার একটি দৃষ্টান্ত দেন, যেমন আখের রস বিক্রেতা রস বের করার জন্য আখকে মেশিনে ঢুকিয়ে চিপে রস বের করেন। একবার চিপে বের করার পরও সে আবার সেটিকে মেশিনে ঢোকায়। এভাবে দু’বার, তিনবার, চারবার, পাঁচবার— যতক্ষণ না এক ফোঁটা-দুই ফোঁটা রসও বের হওয়া বন্ধ হয়, ততক্ষণ সে আখটিকে ভাঁজ করে আবার মেশিনে চিপে যায়, দুইভাজ করে দেয় চারভাজ করে দেয়, শেষ পর্যন্ত আখের মধ্যে আর কোনো রস না থাকা পর্যন্ত সে তা করে যায়। ঠিক তেমনভাবেই, হজরতরা তাঁদের জীবনের সব রস— সময়, মেধা, অর্থ, সম্পদ, চিন্তা, শরীরের শক্তি, দেমাগের শক্তি, দীলের শক্তি— সবকিছু দীনের ময়দানে ঢেলে দিয়েছেন। জীবনের কোনো ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা তারা বাকী রাখেননি, তাঁদের জীবনের প্রতিটি অংশ, প্রতিটি সম্ভাবনা তাঁরা দ্বীনের খেদমতে সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করেছেন, Maximum Utilize করেছেন।

🎤 ১৭০

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অফিসার মাজহারুল মান্নান ভাইয়ের ট্রান্সফারের বিষয়টি অনেক দিন ধরেই ঝুলে ছিল। বিগ্রেডিয়ার (অব.) মোসাহেদ চৌধুরী ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে, উনি স্যারের কাছে পরামর্শ চান, মোসাহেদ চৌধুরী সাহেবের কাছে ট্রান্সফারের জন্য সুপারিশ করতে যাবেন কি না। স্যারের সঙ্গে মোসাহেদ সাহেবের অনেক দিনের পরিচয় ও ভালো সম্পর্ক ছিল। তাছাড়া তাবলিগের মেহনতের সুবাদে মাজহারুল মান্নান ভাইয়ের সাথেও তাঁর পূর্বপরিচয় ছিল। স্যার তখন মাজহারুল মান্নান ভাইকে বলেছিলেন, “সুপারিশ তো দূরের কথা, উনাকে এগিয়ে গিয়ে সালাম পর্যন্ত দেবে না, এখন এটাও ঘুষ। কাকরাইলে উনি যেদিকে ওজু করবেন, তুমি অন্যদিকে ওজু করবে যেনো হঠাৎ তাকানো ও দেখা সাক্ষাৎ না হয় (মাশওয়ারা, শবগুজারি ইত্যাদিতে দেখা হবার সম্ভাবনা থেকেও বিরত থেকো)।”

🎤 ১৭১

সায়ীদ আবুবকর ভাইয়ের বিসিএসের প্রথম পোস্টিং হয় ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলায় অবস্থিত লালন শাহ সরকারি কলেজে। একে তো ছোট কলেজ, উপজেলা পর্যায়ে অবস্থিত, তার উপর দীর্ঘদিন ধরে কোনো ট্রান্সফার হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, একটু বড় শহরের ভালো কোনো কলেজে গেলে ভালো লাগতো। একসাথে যোগদান করা কলিগদের অনেকেই উনার সামনে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে ভালো কলেজে ট্রান্সফার নিয়ে নিয়েছে। এক সময় স্যার ঝিনাইদহে উনার বাসায় গেলে স্যারকে জানান, "স্যার, ছোট কলেজ, অনেকদিন হয়ে গেল, ভালো লাগছে না, অনেকেই এর মধ্যে ভালো ভালো কলেজে ট্রান্সফার নিয়ে নিচ্ছে।" স্যার তখন উনার কথার জবাবে প্রশ্ন করেন, "ওরা কি তোমাকে বেতন কম দেয়?" সায়ীদ ভাই বললেন, “না, বেতন তো কম দেয় না।” তখন স্যার বললেন, “আল্লাহ পাক যেখানে সহজে রিজিকের ব্যবস্থা করে রেখেছেন, সেখানেই থাকো।”

🎤 ১৭২

এক সফরে মদীনা মুনাওয়ারায় কিছুদিন আমাদের এক ভাই বিথুন ভাইয়ের বাসায় থাকা হয়েছিল। মসজিদে নববী (হারাম শরীফ) থেকে বাসাটি বেশ দূরে ছিল— ‘তারিক আল-আয়ুন’ বা ‘তরিখে আইয়ুন’ এলাকার ওই বাসা থেকে হেঁটে হেঁটে হারাম শরীফে আসতে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট লেগে যেতো। বাসা থেকে হারাম শরীফে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে যাতায়াতের জন্য যথেষ্ট আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে বের হতে হতো। তীব্র রোদের ভেতর মাঝে মাঝে আমি গাড়িতে উঠতে চাইলে স্যার কখনো নিষেধ করতেন না, তবে নিজে কখনো গাড়িতে উঠতেন না; কষ্ট করে হেঁটেই যেতেন। স্যারের এই পায়ে হাঁটার দৃঢ় অভ্যাস আমাদের মাঝেও এক ধরনের প্রেরণা জাগিয়ে তুলত—আমরাও তখন আর গাড়িতে উঠতাম না। একদিন স্যার কিছুটা অসুস্থ ছিলেন, আমরাও ক্লান্ত। জোহরের নামাজের জন্য আগেভাগেই আমি নিচে নেমে গাড়ির ব্যবস্থা করে রাখি, রোদ আর ক্লান্তি এড়াতে একটু আরামেই যেন হারামে পৌঁছানো যায়—এই চিন্তা থেকেই। ভাবলাম, স্যার গাড়ি দেখে নিশ্চয়ই কিছু বলবেন না, গাড়িতে উঠেই যাবেন। কিন্তু স্যার নিচে নেমে গাড়ির দিকে একবার তাকালেন, আমাকে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছু না বলেই সোজা রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করলেন। প্রথমে বুঝতেই পারিনি—স্যার তো হাঁটতেই শুরু করে দিয়েছেন! যখন দেখলাম স্যার বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছেন, আমি গাড়িওয়ালাকে বিদায় দিয়ে স্যারের পিছু পিছু হাঁটা ধরলাম। সেই মুহূর্তে এক গভীর শিক্ষা হৃদয়ে গেঁথে গেল—হারামে নামাজ পড়তে যাওয়া যেন স্যারের কাছে শুধু ইবাদত নয়, তা যেন এক আত্মশুদ্ধির সফর। কষ্ট করে হাঁটার মাধ্যমেই যেন স্যার সেই সফরকে পূর্ণাঙ্গ করে তুলতেন। এরপর ওই সফরে আর কখনো স্যারকে গাড়িতে যাওয়ার প্রস্তাব দিইনি, এমনকি নিজেও আর গাড়ির কথা ভাবিনি। স্যারের পেছনে পেছনে হেঁটেই হারামের পথে যাত্রা করতাম।

🎤 ১৭৩

স্যার একবার বলেছিলেন, অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাক হয় যার বাহ্যিক কারণ হিসেবে নানা কিছু বলা হয়—রান্নায় অদক্ষতা, কথাবার্তায় সৌজন্যের অভাব, শাশুড়ির সাথে বিরোধ, সব কিছু বলে বলে করাতে হয় ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে এগুলো মূল কারণ নয়। বিচ্ছেদের আসল শিকড় থাকে অনেক গভীরে—মন ও অন্তরের সূক্ষ্ম অমিল ও অসন্তোষে, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রকাশ পায় না, এমনকি ভুক্তভোগী নিজেও তা স্পষ্ট বুঝতে বা বলতে পারে না। ধীরে ধীরে মনে জমে থাকা বিরক্তি, ক্লান্তি আর মানসিক দূরত্ব সম্পর্ককে ভেঙে দেয়। দৃশ্যমান সব অভিযোগের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অন্য গভীর ও অজানা অস্বস্তি, অন্তরের সেই গহীন কোণে, যেখানে ভাষা হয়তো পৌঁছাতে পারে না, যুক্তিতর্ক কাজ করে না, সেই কারণটুকু স্বয়ং ভুক্তভোগীও অনেক সময় সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারে না। বাহ্যিক আচরণ ও অভিযোগগুলো ওই গভীর সমস্যার ক্ষুদ্র বহিঃপ্রকাশ। স্যার বুঝাতে চেয়েছিলেন, সম্পর্কের সমস্যা বোঝার জন্য কেবল বাহ্যিক দোষের দিকে তাকানো যথেষ্ট নয়; দরকার অন্তরের গভীরে কী ঘটছে তা অনুভব করার চেষ্টা। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শুধু দায়িত্ব পালন নয়, হৃদয়ের আন্তরিক সম্পর্ক, সহমর্মিতা ও বোঝাপড়া জরুরি। কোনো টানাপোড়েন বা বিচ্ছেদ দেখলে তার বাহ্যিক কারণগুলোকে একমাত্র সত্য না ধরে সংবেদনশীল মন দিয়ে ভেতরের অজানা অস্বস্তি, অব্যক্ত কষ্টগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হয়। বাহ্যিক উপসর্গ নয়, ভেতরের ব্যথার মূল উৎস খুঁজে বের করতে পারলে সমাধানের পথ পাওয়া সহজ হয়।

🎤 ১৭৪

একদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে স্যার বসেছিলেন। এক ছাত্র এসে বলল, স্যার, লেখাপড়ায় মন বসে না। অনেক চেষ্টা করছি, কিন্তু কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছি না, কী করবো? ঐ ভাইয়ের কথা শুনে স্যার বললেন, "মন বসানোর মূল বিষয় হলো আখেরাত, আখিরাতের চিন্তা। তোমার নামাজ সুন্দর হবে, নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করতে থাকবে, তাসবিহ—তাহলীলের প্রতি যত্নবান হবে, তো দ্বীল প্রশান্ত হবে। সামনে কবর আছে, কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে আল্লাহ সামনে দাড়িঁয়ে। নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে সেই দিনের জন্য, এই ভাবনাগুলোতে মনকে বসানো, দ্বীল লাগানো, মনোযোগ স্থির করা। আসল মনোযোগ বসবে এই আখিরাতের চিন্তায়, আমলের চিন্তায়। বাকি লেখাপড়া করতে হয় করবা, পড়াশুনা করার জন্য এখানে এসেছো, করে নিবা, আল্লাহ পাক তাতেই বরকত দান করবেন ইনশাআল্লাহ (এটা দ্বীল লাগানোর বিষয় না, বা এতে আলাদা করে মন বসানোর কিছু নেই)।”

🎤 ১৭৫

একবার স্যার বলেছিলেন—“ইয়াকুব নানুতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি (সম্ভবত এই নাম বা অন্য কোন বুজুর্গের কথা) কখনো অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে যেতেন, ডাক্তার যখন ওষুধের প্রেসক্রিপশন দিতেন, তখন তিনি ওষুধের দাম জেনে নিতেন এবং সেই পরিমাণ অর্থ সদকা করে দিতেন।” এরপর স্যার বললেন—এখানে একটা ‘মাপ’ আছে— ‘ঐ পরিমাণ অর্থ’ (চিকিৎসা যত খরচসাপেক্ষ, সদকার পরিমাণও যেন সে অনুযায়ী হয়)। এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার আরও বলেছিলেন—“প্রফেসর নাদের আলী খান সাহেব—এর কাছে কেউ একবার বিশেষ এক অবস্থার কথা বলছিলেন এবং বললেন, ‘আমি এই পরিমাণ জিকির করি এই ব্যাপারে।’ তখন তিনি শুনে বললেন— এই পরিমাণ হলে চলবে না, আরেকটু বাড়াতে হবে (এই পরিমাণ জিকির ঐ পরিস্থিতি কভার করবে না)।” স্যার বলেন—প্রত্যেকটা বিষয়ে একটা নির্দিষ্ট ‘মাপ’ আছে। কেউ যদি সাত লাখ টাকার চিকিৎসা করে, আর সদকা করে মাত্র সাত টাকা— আবার বলে, ‘সাআআআত টাকা সদকা ও তো করলাম!’ এই মাপ তো যথেষ্ট হলো না। ছদকার এক্বিন পয়দা করার জন্য মাপকে তো ঠিক করতে হবে, স্যার বলেন ৭ লাখ টাকা ছদকা করে ৭ টাকার ঔষধ কিনতে যাই দেখি কি হয় (যখন সাত লাখ টাকা সদকা করে আর সাত টাকার ওষুধ কেনে, তখনই সেই সদকার প্রকৃত শক্তির প্রতি এক্বিন প্রকাশ পায়)!

🎤 ১৭৬

হজের এক সফরে আমাদের জামাতে থাকা এক সাথী একটি অদ্ভুত এবং উদ্বেগজনক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। সফরের বিভিন্ন পর্যায়ে, কখনো ব্যাগের ভেতর, কখনো ব্যাগের পকেটে, কখনো জামার পকেটে, আবার কখনো বালিশের নিচে কিংবা কোনো কিছু সরানোর পর — তিনি দেখতে পান মেয়ে মানুষের লম্বা চুলের গুচ্ছ বা চুলের পুটলি। বার বার এরকম পাওয়ার পর বিষয়টি তার কাছে খুবই অস্বাভাবিক মনে হলেও, কারো সঙ্গে তা বলেননি, নিজে নিজে বিস্মিত ও আতঙ্কিত হয়ে প্রতিবারই তা ফেলে দিতেন। মিনায় অবস্থানকালে, একদিন তাবুর ভেতর নিজের বিছানার পাশে, আবারো বালিশের নিচে চুলের সেই একই ধরণের গুচ্ছ আবারো দেখতে পেয়ে তার উদ্বেগ বাড়ে, এবারও সে তা বাইরে ফেলে দেয়। এরপর যখন মিনার আমল শেষ করে সবাই মক্কায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তিনি ব্যাগ গোছানোর সময় একইভাবে ব্যাগের ভেতর, ব্যাগের পকেটে ও বিছানার নিচে আবার চুলের দলা দেখতে পান। এবার আর চুপ থাকতে না পেরে বিষয়টি স্যারের সঙ্গে শেয়ার করেন। স্যার গভীর মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনেন, সেই ভাই নিশ্চিত করে বলেন, এই ব্যাগ আমি উপুড় করে সব কিছু বের করেছিলাম, যেখানে এসব থাকার কথা না, সেখানে বারবার এভাবে চুল পাওয়া অস্বাভাবিক। আমাদের সারির তাবুগুলো পুরুষদের জন্য নির্ধারিত, সেখানে কোনো নারীর প্রবেশের সুযোগই ছিল না—এমন অবস্থায় এই চুলগুলো কোথা থেকে আসছে, তা ভাবনার বিষয়। এ কথা শুনে স্যার কিছুক্ষণ চুপ থাকেন, যেহেতু জামাতের অনেকেই তখন মক্কা রওনা হয়ে গিয়েছিলেন, বাকি সাথীরাও তাড়া দিচ্ছিলেন রওনার জন্য, কিন্তু স্যার তাদের অনুমতি দিয়ে নিজে ওই ভাইয়ের সঙ্গে থেকে যান। আমরা আরও ৪—৫ জন স্যারের সঙ্গে থেকে যাই। স্যার ওই ভাইকে বললেন, “চুলের এই দলাগুলো তাবুর বাইরে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখো।” এরপর তিনি নিজে পাশে বসে দীর্ঘ সময় ধরে নীরবে কিছু দোআ পড়তে থাকেন। তিনবার এভাবে দোআ পড়ে চুলগুলো এপিঠ—ওপিঠ করে একটা কাঠি দিয়ে নিজ হাতে উল্টিয়ে উল্টিয়ে তাতে ফুঁ দেন। তারপর আগুন ধরিয়ে সেগুলো পুড়িয়ে দেন। স্যার কোনো তাড়াহুড়া না করে, একজন সাথীর অজানা ও অদৃশ্য সমস্যার প্রতি যে আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেন, তা আমাদের হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়, ঐ ভাইয়ের ঐ পরিস্থিতিকে স্যার হালকাভাবে দেখেননি। একজন সাথীর একান্ত সমস্যাকে অবহেলা না করে, বরং যথাসম্ভব সময় নিয়ে, সতর্কতা ও নিরবতায়, দোআ পরেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি বা মক্কায় ফেরার তাড়াহুড়া স্যারের মধ্যে তখন দেখা যায় নাই। ওই ভাই পরবর্তীতে জানান, এরপর থেকে হজের ঐ সফরের বাকী দিনগুলোতে আর কোনো ঐরূপ চুলের দলা পাইনি, এবং সেই অস্বস্তিকর, আতঙ্কের পরিস্থিতিও আর ফিরে আসেনি।

🎤 ১৭৭

আমাদের এক ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় বিনোদপুর মির্জাপুর এলাকার একটি মেসে একা এক রুমে থাকতেন। মেসের রুমে তিনি এক অদ্ভুত এবং ভয়ানক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছিলেন, যা কেবল মানসিক নয়—দেহগতভাবেও তাকে বিপর্যস্ত করে তুলছিল। এক শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বসে ঐ ভাই নিজের অভিজ্ঞতা স্যারকে বলতে শুরু করলেন। কয়েক মাস ধরেই এই সমস্যা চলছিল, তবে ইদানীং তা এমন মাত্রায় পৌঁছেছিল যে, রাতে ঘুমানো তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। রুমের দরজা বন্ধ করে শুতে গেলেই, ঘুম ঘুম ভাব আসতে শুরু করলেই তিনি অনুভব করতেন—কোনো এক অজানা সত্তা যেন তার হাত কিংবা পা চেপে ধরছে, এমন শুরু হলে তখন উনি আর চোখ খুলতে পারতেন না। কখনো দুই হাত, কখনো পায়ের গোড়ালির ওপর, আবার কাত হয়ে শোয়া অবস্থায় শরীরের ওপরের হাত বা কনুইয়ের ওপর চেপে ধরে থাকে। তাঁর বর্ণনায় একটি বিষয় ছিলো খুব স্পষ্ট—তিনি ঠিক অনুভব করতে পারতেন যে, কেউ একজন আছে। মাঝে মাঝে সংকল্প করেন, আজকে তোমাকে ধরবো আর দেখেই ছাড়বো তুমি কে। এক পাশ হয়ে শোয়া থাকা অবস্থায় যখন অজানা সত্তা তার শরীরের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তিনি নিচের হাত দিয়ে কৌশলে তার হাত ধরে ফেলতেন। তিনি বলেন, আমি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে এত শক্ত করে তার হাত ধরতাম, যেনো সে পালাতে না পারে। আমি অনুভব করতাম আমি কারো মানুষের মতো হাত ধরে ফেলেছি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখনই তিনি ওই অজানা হাতটি ধরতেন, সেটি ধীরে ধীরে বাতাসের মতো, একটি ফোলানো বেলুন থেকে হাওয়া ছাড়ার মতো মিইয়ে গিয়ে উধাও হয়ে যেত। শরীরে প্রচণ্ড কাতুকুতু ও শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা চলত যতক্ষণ না সে তাকে ছেড়ে দিত, সেই মুহূর্তগুলোতে মনে মনে আয়াতুল কুরসী এবং লা হাওলা ওয়ালা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পড়তেন, ধীরে ধীরে সে ছেড়ে দিতো ও শরীরের অস্বস্তিকর কাতুকুতু ভাব কমে যেয়ে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতো, তখন ঔ ভাই ছোখ মেলতে (দেখতে) পারতেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমের ভাব আসলে চোখ বন্ধ হবার সাথে সাথেই আবারো সে আসতো ও পুনরায় একই অবস্থা হতো। এই অবস্থা দিনে দিনে এত ভয়াবহ রূপ নেয় যে, এক রাতে একাধিকবার—৫, ৬, ৭ বার পর্যন্ত এমন ঘটতে থাকত। ঘুম তখন যেন শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। মসজিদে জামাতে বা বন্ধুদের সাথে থাকলে এই সমস্যাগুলো হতো না—শুধু ওই একা ঘরের মধ্যেই তা ফিরে ফিরে আসত। স্যার মনোযোগ দিয়ে সব শুনেন, এবং বিন্দুমাত্র আতঙ্ক বা বিস্ময় প্রকাশ না করে শুধু বলেন, “প্রতি শুক্রবার সূরা কাহাফ তিলাওয়াত শুরু করো, ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ পাক হেফাজতের ব্যবস্থা করবেন।”সেদিন ছিল শুক্রবার, সেই দিন থেকেই ওই ভাই নিয়মিত সূরা কাহাফ পড়া শুরু করেন। ভাইটি বলেন, আশ্চর্য হলেও সত্য, এক সপ্তাহের মধ্যেই সেই ভয়ংকর অবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে আর কখনো সেই অভিশপ্ত অনুভূতি ফিরে আসেনি। এই ঘটনার পর তাঁর ভেতরে সূরা কাহাফের প্রতি এমন এক গভীর আস্থা জন্ম নেয় যা কেবল অভিজ্ঞতাজাত, মুখে নয়—হৃদয়ের গভীরে গাঁথা। স্যার যে সেদিন তাঁর সমস্যার কথা শুনে অবাক হননি, সেটিও ওই ভাইয়ের মনে গেঁথে যায়। তিনি ভাবেন, হয়তো স্যার তাঁর জন্য গোপনে দোয়া করেছিলেন। কিংবা হয়তো সূরা কাহাফের পাঠ ছিলো এমন এক প্রেসক্রিপশন, যার প্রতি ছিলো স্যারের অবিচল আস্থা, আল্লাহ পাকের ইচ্ছাতে সেটাই হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ প্রতিকার।

🎤 ১৭৮

এক ভাই বিদেশ থেকে পড়াশুনা শেষে ফিরে আসার সময় একটি ব্যবসা শুরু করেন। আল্লাহর রহমতে শুরুতেই তিনি প্রায় ৫০ লাখ টাকার লাভ করেন। এমন অপ্রত্যাশিত লাভে তিনি কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে যান—এতো টাকা নিয়ে তিনি কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সেই সময় টঙ্গী ইজতেমায় বিদেশিদের একটি টেন্টে ভাইয়ের দেখা হয় স্যারের সঙ্গে। তিনি স্যারকে বললেন, "স্যার, আমি প্রথম ব্যবসা করলাম, আর প্রথম ধাপেই ৫০ লাখ টাকা লাভ হলো, এত টাকা একসাথে হাতে পেয়ে বুঝতে পারছি না কী করবো।" তিনি ভাবছিলেন, স্যার হয়তো এই অর্থ কীভাবে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, সেসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেবেন—কোনো সদুপদেশ, পরামর্শ, বা দুনিয়া—আখেরাতের কল্যাণে অর্থ ব্যবহারের আলোচনা হবে। কিন্তু স্যারের জবাব ছিল একেবারে সরল, কিন্তু অত্যন্ত গভীর: “খরচ করে ফেলো।” ভাই মনে করলেন, "স্যার হয়তো বুঝলেন না আমি কী জানতে চাচ্ছি, আমি তো ভাবছিলাম স্যার কোনো গঠনমূলক উপদেশ দেবেন।" তিনি সেই পরামর্শ হৃদয়ে ধারণ করতে পারি নাই, মনে হলো স্যারের পরামর্শটা ‘অসংগত’। ভাই বলেন, “আমার আব্বাও জীবনে একসাথে এত টাকা দেখেননি। তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন, হয়তো সর্বোচ্চ ৫—৭ লাখ টাকা একসাথে দেখেছেন। আর আমি জীবনের প্রথম ব্যবসাতেই ৫০ লাখ টাকার লাভ করে ফেললাম। মনে মনে ভাবছিলাম, স্যার নিশ্চয়ই এই অর্থের ভালো ব্যবহার নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেবেন। কিন্তু স্যারের পরামর্শ ছিল— ‘খরচ করে ফেলো’। তখন মনের ভেতর থেকে কথাটি গ্রহণ করতে পারছিলাম না, মনে হচ্ছিল, এতো বড় পরিমাণ অর্থ হেলায় খরচ করে দেওয়ার কথা কীভাবে বলেন!” কিন্তু সময়ের ব্যবধানে, জীবন ও স্যারের বয়ানগুলো পড়ে ও শুনে বুঝতে পারি, বুঝে আসে—সেই সময় স্যারের কথার ভেতরে ছিল এমন এক হিকমত, যা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায়নি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জীবনকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আমি তখন সম্পূর্ণ আসবাববিহীন জীবন যাপন করতাম—টানাপোড়েন, দুঃস্থতা, আল্লাহর উপর নির্ভরতা, নামাজে কান্না, দোয়ায় আস্থার জিন্দেগি। যখন ৫০ লাখ টাকা পেয়ে গেলাম, তখন শুরু হলো প্ল্যান, খরচের হিসাব, বিনিয়োগ, বিজনেস সম্প্রসারণ, আরও কোটির প্ল্যান। ধীরে ধীরে সেই আসবাবহীন জীবন থেকে চলে এলাম আসবাবনির্ভর জীবনে। আল্লাহর উপর নির্ভরতা কমতে থাকলো। এখন বুঝি, স্যারের সেই ‘খরচ করে ফেলো’ উপদেশটা ছিল যেন আমাকে সেই আসল বুনিয়াদে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা। যদি আমি সে সময় সেই অর্থ খরচ করে ফেলতাম, তাহলে হয়তো আমার হৃদয় সেই আগের মতোই নির্ভরশীল থাকতো আল্লাহর উপর (দুনিয়ার আসবাব যখন হাতের মুঠোয় আসে, তখন বিশ্বাসের ভিত্তি না থাকলে সেই আসবাবই আমাদের আত্মার দিক পরিবর্তন করে দেয়। কখনো কখনো, আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন হয় আসবাব থেকে ফাঁকা থাকার)।

🎤 ১৭৯

স্যার বলতেন, অন্যের দোষের জন্য, অন্যের গুনাহের জন্য নিজেকে দায়ী মনে করতে পারা—এটা হলো পূর্ণতার কামাল। আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার চূড়ান্ত স্তর, এখানে এমন এক অবস্থায় পৌঁছে, যেখানে একজন বান্দা আল্লাহর কাছে এতটাই নরম, এতটাই দায়িত্বশীল ও বিনয়ী হয়ে যায় যে: সে অন্যের গুনাহ দেখলে নিজেকে দায়ী মনে করে, অন্যের দুর্বলতা দেখলে নিজের আত্মসমালোচনা করে, নিজের ঈমান, দাওয়াহ ও আখলাককে দায়ী করে, এবং আল্লাহর দরবারে নিজের গুনাহ মনে করে কাঁদে, যদিও সেই গুনাহ তার নিজের না। এটি সেই উচ্চতম ইহসানের স্তর, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্রে পূর্ণভাবে প্রকাশিত ছিল এবং পরে সেই ধারা ও আদর্শে মাশায়েখগণ আল্লাহ ওয়ালাগণ চলেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন, তবুও তিনি বারবার উম্মতের জন্য কান্না করতেন, এটা ছিল তাঁর ‘উম্মত—প্রেম’ আর বিনয়ী হৃদয়ের নিদর্শন, উম্মতের ভুলের বোঝা নিজের মনে করতেন। “পূর্ণতার কামাল” হলো আত্মশুদ্ধি, বিনয়, জবাবদিহির অনুভব এবং উম্মতের হালতের দায় নিজের উপর নেওয়ার সেই মহত আধ্যাত্মিক গুণ—যা আল্লাহর নিকটত্বের চূড়ান্ত নিদর্শন। তার দৃষ্টিভঙ্গি এমন হয় যে, সমাজে বা অন্যের জীবনে যদি কোনো বিপথগামিতা বা গুনাহ ঘটে, তাহলে তিনি নিজেকেই জিজ্ঞাসা করেন— আমি তার উপকার করতে পারিনি কেন, বা আমার ভেতরের ফসাদের কারনে কি তার/তাদের এই বাহ্যিক ফসাদের কারণ? স্যার বলেন, এই দৃষ্টিভঙ্গি “নাফস” (অহম/আত্মমগ্নতা)—এর বিপরীত, মানুষ সহজে বলে, “ওর ভুল”, “ও গুনাহগার”, কিন্তু যিনি কামালের পথে আছেন তিনি বলেন, হয়তো আমি যদি আরও খাঁটি হতাম, তাহলে সে মানুষটার ঈমান আমল সুন্দর হতো, ও হয়তো এই হালতের মধ্যে পড়তো না। এই দৃষ্টিভঙ্গি অহংকার ভেঙে দেয়, আত্মসমালোচনায় অভ্যস্ত করে, আর সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা মমতা ও ভালবাসা জাগায়। যিনি এই স্তরে পৌঁছান, তিনিই ‘আল্লাহর ওয়ালী’ হওয়ার পথে চলছেন—দ্বীনের প্রকৃত দাঈ, তার হৃদয়ে আছে করুণা, দায়িত্ব, বিনয়, আত্মশুদ্ধির দৃঢ় নিয়্যত ও প্রজ্ঞা। অন্যের গুনাহকে নিজের দোষ মনে করার এই আত্মদায়িত্ববোধই কামালিয়াতের পূর্ণতায় পৌঁছায়।

🎤 ১৮০

স্যার একবার বলেন, টঙ্গীর ইজতেমায় হযরতজী এনামুল হাসান সাব রহমতুল্লাহি আলাইহি—এর কামরায় বসা ছিলেন। টেন্টের বাইরে, সম্ভবত উত্তর পাশের রাস্তা বা মাঠ বা নদীর ওপার থেকে বাঁশির শব্দ ভেসে আসছিল। হযরতজী রহমতুল্লাহি আলাইহি সেই বাঁশির আওয়াজ শুনেই ব্যাথার মনে বলে উঠলেন: আমারই গুনাহের কারণে আজ এই বাঁশি বাজছে। এটা ছিল উনার আত্মজ্ঞান ও আত্মসমালোচনার এক নিয়মিত প্রকাশ। হযরতজী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজের অন্তরের দোষ ও কমতিকে এমনভাবে অনুভব করতেন, যেন দুনিয়ার প্রতিটি গাফলতি ও গুনাহের পেছনে তাঁর কোনো না কোনো দায় থেকে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষের পক্ষে কল্পনাও করা কঠিন। স্যার আরও বলেন—সারা দুনিয়া থেকে হযরতজী রহ.—এর কাছে চিঠি আসত, যাতে বিভিন্ন হালত, অভিযোগ, গাফলতি ও বেউসুলির কথা লেখা থাকত। উনি সেইসব চিঠি রাতের বেলা সামনে নিয়ে বসতেন এবং কাঁদতেন, হায় আল্লাহ! এই সমস্ত গন্ডগোল, বেউসুলি, হালাত—সবই আমার পাপের ফল। আমি আমার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারিনি, এ জন্যই দুনিয়াজুড়ে এ অবস্থা। দীর্ঘ সময় ধরে ইস্তেগফার করতেন, নিজের দোষ স্বীকার করতেন, কাঁদতেন। স্যার বলেন, অন্যের গুনাহকে নিজের দোষ মনে করা, এই আত্মদায়িত্ববোধই কামালিয়াতের পূর্ণতায় পৌঁছায়। একবার ভারতের এক ছোট ইজতেমায়, রাত গভীর, সব সাথী ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু হযরতজী রহমতুল্লাহি আলাইহি মাঝরাতে বসে কাঁদছেন। আল্লাহ পাক যদি কিয়ামতের দিন আমাকে জিজ্ঞেস করেন—তুমি তোমার সাথীদের তাহাজ্জুদের লোক বানাতে পারলে না কেন? তারা সারারাত ঘুমিয়ে কাটাল—তখন আমি কী জবাব দেব? হযরতজী নিজে তাহাজ্জুদ পড়তেনই, কিন্তু অন্য কেউ না পড়লে উনার তাতে কি আসে যায়, উনি নিজের ওপরই দায় চাপাচ্ছেন। যেন তাবলীগের সমস্ত হালত, উম্মতের সমস্ত অবস্থা—সব তাঁর আমানত, সব তাঁর জবাবদিহিতার বিষয়। যিনি সত্যিকারের পূর্ণতা বা ‘কামাল’—এর পথে আছেন, তিনি নিজের আমল বা বাহ্যিক সফলতাকে কেন্দ্র করে অহংকার করেন না।

🎤 ১৮১

স্যারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল দোহার এলাকার এক পুরোনো সাথী, ১৯৭২ সালে একত্রে চিল্লা দিয়েছেন, স্থানীয় আলীয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও তবলিগের জিম্মাদারও ছিলেন। একবার স্যার তাঁর বাড়িতে বেরাতে যাওয়ার প্রোগ্রাম করেন এবং কয়েকজন সাথীও স্যারের সঙ্গে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন। তিনি এলাকার একজন প্রভাবশালী ও সচ্ছল ব্যক্তি ছিলেন, শুক্রবার জুম্মার দিন উনার বাসায় যাওয়া হয়। জুম্মার নামাজের পূর্বে চা—নাস্তার ব্যবস্থা ছিল। নামাজ শেষে যখন মেহমানরা বাসায় প্রবেশ করেন, বাসার বড় মেহমানখানায় ডান পাশে ডাইনিং রুম, বাম পাশে ড্রয়িং রুম, দুই রুমই ছিল প্রশস্ত এবং প্রায় ১০/১২ জনের চলাফেরা, খাওয়া—দাওয়া ও বিশ্রামের জন্য উপযুক্ত। জুমার নামাজের সময় মেজবানের ঘরের মহিলারা ডান পাশের রুমের ডাইনিং টেবিলে খাবার সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছিলেন। মেজবান, যিনি তবলিগের জিম্মাদার ও স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী, বিষয়টি দেখে কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করেন—ঘরওয়ালারা পাশের ঘরে মেঝেতে দস্তরখানে খাবার সাজিয়ে রাখলেই ভালো হতো, ডাইনিং টেবিলে খাবার পরিবেশন, মেজবান কিছুটা বিচলিত হন। তিনি স্যারের নিকট প্রস্তাব রাখেন, "স্যার, খাবারগুলো পাশের ঘরে মেঝেতে এনে দস্তরখানে খাওয়ার ব্যবস্থা করবো কি?" উনার এই প্রশ্নে স্যার সরাসরি বলেন, “না,” এবং কোনো দ্বিধা না করেই সোজা গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে পড়েন। স্যারের দেখাদেখি অন্য সাথীরাও ডাইনিং টেবিলে বসে যান এবং টেবিল চেয়ারেই খাওয়া—দাওয়া সম্পন্ন হয়। এই দৃশ্য সফরের সাথী হাসান হাবিব ভাইকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি স্যারকে পরে জিজ্ঞেস করেন, “আমি তাবলীগে লাগার পর বহুবার বিভিন্ন বিবাহ অনুষ্ঠান বা কমিউনিটি সেন্টারে মাটিতে বসে খেয়ে দেখিয়েছি যে এটি সুন্নত তরীকা। অথচ আজ আপনি (আপনার মতো ব্যাক্তি) নিজে টেবিল চেয়ারে খেলেন? আমরা অনেক সময় অপারগ হয়ে বাইরে হোটেলে ডাইনিং টেবিলে খানা খাই, কিন্ত সেখানে অপশন ছিল, একেবারে অপারগ না, এবং যার বাসা, মেজবান জিজ্ঞাসও করলেন যে মেঝেতে আনবে কিনা, রীতিমতো ইচ্ছুক হয়েই গেলেন।” ভাই বলেন, স্যার আমার মনের কথাটা আমার প্রশ্নটা বুঝলেন, যদিও আমি স্পষ্ট করে বলতে পারিনি, স্যার কিছু কথা বলে এমন পূর্ণাঙ্গ উত্তর দিলেন, যাতে আমার প্রশ্নের সমাধান মিলেছিল। স্যার বলেন, “শরীয়তে মেহমান ও মেজবানের উপর আলাদা আলাদা হুকুম আছে। মেহমানের আদব হলো, মেজবানকে লজ্জা না দেওয়া এবং কষ্ট না দেয়া। মেজবান যদি ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখেন, আর আমি বলি ‘না, আমরা মেঝেতে খাবো’, তাহলে তার জন্য লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়াতো। আর খাবার সরিয়ে এনে নতুন করে মেঝেতে পরিবেশনের প্রয়াস তার জন্য কষ্টকর হতো। এজন্য আমি দ্রুত গিয়ে টেবিলে বসে পড়লাম, যাতে তার সেই মানসিক অস্বস্তি দূর হয়ে যায়, সে যেন স্বস্তিতে থাকেন, লজ্জাও না পান, কষ্টকরও না হয়।” স্যার আরও বলেন, “তুমি যদি সুন্নত আদায়ের নিয়তে মেঝেতে বসতে চাইতে, কিন্তু মেজবান লজ্জা বা কষ্ট পেত, তাহলে সুন্নত আদায়ের ঐ নেকীকে ঢেকে ফেলতো মেজবানকে লজ্জা দেবার ও পেরেশান করার গুনাহ। কারো বাড়িতে মেহমান হলে খেয়াল রাখার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মেজবান যেন কষ্ট বা লজ্জায় না পড়ে।” (এটা শরীয়তের আদব ও আকলসঙ্গতও, শরীয়তের নির্দেশনা কেবল বাহ্যিক রীতি—পালনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের সম্মান, অনুভূতি, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষাকেও গুরুত্ব দেয়।)

🎤 ১৮২

স্যার একবার বলেন, একজন আলেম হজ্জের উদ্দেশ্যে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে মক্কা মুকাররমা যান। হারাম শরিফে প্রবেশের পর তিনি ও তাঁর স্ত্রী তাওয়াফ ও অন্যান্য ইবাদতের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে—যখন সবাই কাবা শরিফের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে দোয়া—মুনাজাতে লিপ্ত, তখন ওই আলেমের স্ত্রী আশ্চর্য হয়ে বলতে থাকেন: “কাবা কোথায়? আমি তো কাবা দেখতে পাচ্ছি না!” আশপাশের সবাই বিস্ময়ে বলেন, “এই যে সামনে, এটাই তো কাবা শরিফ!” কিন্তু তিনি বারবার একই কথা বলেন—“আমার চোখে কাবা পড়ছে না!” এ এক গভীর রহস্য! আশপাশের লোকজন তাকে বারবার বুঝান, “এই যে সামনেই তো কাবা!” কিন্তু তাঁর চোখে কাবা শরিফ ধরা পড়ছে না। এই ভয়ংকর ও অস্বাভাবিক অবস্থার কারণে আলেম অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হন। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, সেই নারী কালো জাদুর (سِحْر) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একজন আলেমের স্ত্রী হওয়ার সুবাদে স্থানীয় মহিলারা যখন ইন্তেকাল করতেন, তখন তাদের গোসল করাতে তিনি এগিয়ে আসতেন। কিন্তু গোসলের সময় কৌশলে এই পবিত্র দায়িত্বের আড়ালে মৃত নারীদের কাফনের ভেতরে তাবিজ রেখে দিতেন, মৃত নারীদের কাফন পড়ানোর সময় গোপনে লাশের মধ্যে, বা মুখগহ্বরে, বা শরীরের গোপন অংশে নিজের বানানো তাবিজ ঢুকিয়ে দিতেন, যেগুলো তার জাদুর কাজে ব্যবহার করতেন, তার জাদুবিদ্যার কাজে ব্যবহৃত হতো। এই অপকর্ম বহু বছর ধরে সে করে আসছিল, অথচ লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। স্যার বলেন, হজে গিয়ে সে এই জঘন্য কাজের পরিণতি দুনিয়াতেই প্রত্যক্ষ করল—আল্লাহ তাআলা তার চোখ থেকে কাবা শরিফকে গায়েব করে দিলেন, কাবা শরিফ তাঁর দৃষ্টিসীমা থেকে গায়েব হয়ে যায়। দ্বীনী খেদমতের নাম করে যারা কুফরি বা হারাম কাজে জড়িয়ে পড়ে, হারাম কাজের শাস্তি কখনো কখনো দুনিয়াতেই প্রকাশ পায়। ঘটনার তিন দিন পর ঐ মহিলা মৃত্যুবরণ করেন।

🎤 ১৮৩

স্যার একবার বলেন, তাবলিগের অনেক পুরনো সাথী, যারা চিল্লা, তিন চিল্লা ও অনেক বছর মেহনত করার পর হঠাৎ করে তাবলিগের কাজ থেকে সরে যান—এর পেছনে অনেক কারণের মধ্যে এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, তাবলিগের কাজ করলেও নিয়তের গভীরে দুনিয়াবী কোনো উদ্দেশ্য বা চাওয়া লুকিয়ে থাকে। যখন কেউ দুনিয়াবী কোনো লক্ষ্য নিয়ে তাবলিগের কাজে যুক্ত হন, তখন সেই উদ্দেশ্য যদি পূর্ণ হয়ে যায় তো কাজ ছেড়ে দেয় (তিনি ভাবেন, ‘আমার তো যা চাওয়া ছিল, তা পেয়েই গেছি’, তখন কাজ ছেড়ে দেন)। আর যদি উদ্দেশ্য পূর্ণ না হয়, তখনও হতাশ হয়ে তাবলিগ ত্যাগ করেন। কোনো ছাত্র যদি ভালো রেজাল্টের আশায় তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত হয়, রেজাল্ট ভালো হলেও সে কাজ ছাড়ে, কারণ তার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে গেছে, আর যদি রেজাল্ট খারাপ হয়, তাহলে তো ছাড়বেই। কেউ যদি ব্যবসার উন্নতির জন্য তাবলিগে সময় দেয়, উন্নতি হলে তাবলিগ ত্যাগ করে, না হলেও ত্যাগ করে। চাকরির জন্য বা প্রমোশনের আশায় তাবলিগে আসে, প্রমোশন হলেও ত্যাগ করে, না হলেও ত্যাগ করবে। তাবলিগের মেহনতে টিকে না থাকার বা নিয়মিতভাবে কাজ না করার বহু কারণের মধ্যে এটি একটি মারাত্মক কারণ—এই অশুদ্ধ নিয়ত। গুরুত্বপূর্ণ নজর দেবার বিষয় হলো: তাবলিগের কাজে কেন আমি যুক্ত হয়েছি, কেন আমি তাবলিগ করছি, আমার নিয়ত কী? শুদ্ধ নিয়ত না হলে, দায়িত্ব থেকে না হলে, কাজ দীর্ঘস্থায়ী হয় না, এক সময় থেমে যায়। দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয় না, কারণ যার উদ্দেশ্য দুনিয়া, সে কাজকে ‘আত্মিক দায়’ নয়, বরং ‘সুযোগ হিসেবে’ দেখে, ফলে কাজের ধারাবাহিকতা থাকে না। যে মেহনতটা হলো একান্তই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, দ্বীলের গভীরে অন্য উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকলে মেহনতের আত্মিক স্বাদ চলে যায়, খুশু—খুযু হারিয়ে যায়, এক পর্যায়ে মেহনতটা ‘বোঝা’ মনে হয়। وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ আল্লাহর জন্য যে কাজ, সেখানে অনুকূল প্রতিকূল ফলাফলের পরোয়া থাকে না। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মেহনত করলে উত্থান—পতন, সফলতা—বিফলতা—সবই সহনীয় হয়ে যায়, ক্লান্তি আসলেও তা ধৈয্যে পরিণত হয়। কারণ উদ্দেশ্য তখন ‘রেজাল্ট’ নয়, বরং رِضَا بِالْقَضَاءِ (রাযা—বিল—কাযা)। এখানে সব হালতে আত্মিক স্থিরতা ও আনন্দ থাকে, অন্তরে এক ধরনের প্রশান্তি থাকে যে, “আমি আল্লাহর নির্দেশ পালন করছি,”। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মেহনত না হলে উত্থান বা পতন উভয় অবস্থায়ই মেহনতে ক্লান্তি নিয়ে আসে।

🎤 ১৮৪

স্যার বলতেন: তাবলিগের মেহনত ছেড়ে দেওয়ার সাধারণ মানে আমরা বুঝি, কেউ দোকানে বসে গেলো, কিংবা জমির কাজে এতটা মগ্ন হয়ে গেলো যে তাবলিগের জন্য সময়ই বের করতে পারছে না। তার জীবন থেকে চিল্লা, গাশত, তালিম, দাওয়াত—এসব একে একে মুছে যেতে থাকে। স্যার বলেন, আরেকটি সূক্ষ্ম রকমের “কাজ ছেড়ে দেওয়া” আছে, যা সাধারণভাবে আমাদের চোখে পড়ে না। অনেকে মনে করে, মারকাযে বসে তাবলিগের ম্যানেজমেন্ট সামলাচ্ছে—এটাই হচ্ছে দাওয়াতের বড় কাজ, বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল দাওয়াতের কাজ থেকে দূরে সরে যাওয়া। দাওয়াতের কাজ এবং এর ম্যানেজমেন্ট—এ দুটি এক নয়, দাওয়াতের কাজ এক জিনিষ আর এর ম্যানেজমেন্ট আরেক জিনিষ। স্যার বলেন, তাবলিগের কাজ থেকে দূরে সরে যাওয়ার এই সূক্ষ্ম রূপ হলো—ম্যানেজমেন্টে ব্যস্ত থেকে মূল মেহনত থেকে ছিটকে পড়া। অনেক সময় এটি এত সূক্ষ্মভাবে ঘটে যে বোঝাও কঠিন হয়, এতোবড় তাকাজার আনজাম দিচ্ছে সে মনে করে, তার ম্যানেজমেন্ট কেন্দ্রিক জজবা তাকে বুঝতে দেয় না। চিল্লা তিনদিন লাগায় না, গাসত তালিম দাওয়াতের ফিকির নাই, কিন্তু মাশোয়ারা মেম্বার মার্কাজ সামলানোতে খুব ব্যস্ত, সে ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আছে, আসলে এও কাজ ছেড়ে দিয়েছে, বসে গেছে, পার্থক্য শুধু কেউ বসেছে দোকানে, আর ও বসেছে মারকাযে। ও ভাবে— আমি তো মারকাযের তাকাজা নিয়েই আছি, অথচ মূল দাওয়াতি আমল, চিল্লা, গাশ্ত, তালিম, দাওয়াত—এসবের কোনোটার ধারে কাছেও নেই, সেও বসে গেছে, শুধু ভিন্ন আঙ্গিকে। এরকম কিছু সাথী মূল দাওয়াতি আমলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে কেবল প্রাসঙ্গিক কিছু ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিজেকে গুম করে ফেলে। স্যার এপ্রসঙ্গে ডাক্তারদের শিক্ষকদের উদাহরণ দিতেন। নিজে ডাক্তারি করা, রোগী দেখা, রোগী রোগ স্বাস্থ্য ঔষধ অবস্থা ইত্যাদির সাথে বাস্তব সম্পর্ক, রোগীর আপডেট নেওয়া, প্রেসক্রিপশন করা ইত্যাদি এগুলোতো ডাক্তারি। অপরদিকে রোগী, রোগ, ঔষধ ইত্যাদির সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে ডাক্তারদের ফাইল, প্রমোশন, বদলি, হাসপাতালের বিল্ডিং এর ইট বালু সিমেন্ট নিয়ে ব্যস্ততা বা এ জাতীয় ম্যানেজমেন্টের চেয়ারে নিজেকে বন্দি করে ফেলা আরেক জিনিষ, সেই ডাক্তার আসলে চিকিৎসা থেকে সরে গেছে। হাসপাতালের পরিবেশে থাকার কারণে মানুষ ভাবে— এ তো অনেক বড় ডাক্তার, বড় চেয়ারে বসা দেখে ভুল ধারণা তৈরি হয়। অথচ বাস্তবে হয়তো গত ২০ বছরে তিনি একজন রোগীকেও দেখেননি। একই কথা শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও, শিক্ষকতা এক জিনিষ আর অনেক বড় শিক্ষা অধিদপ্তরের আমির হওয়া ভিন্ন জিনিষ। যিনি ছাত্রদের পড়ান, পড়ালেখার সাথে মিশে আছেন—তিনি শিক্ষক। পড়ানোর ময়দান থেকে সরে গিয়ে শুধুই শিক্ষা অফিসের বড় দায়িত্ব সামলানো, অফিসিয়াল চেয়ার, ফাইল—প্রশাসনে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা— সেটাও মূল শিক্ষকতার মেহনত থেকে সরে যাওয়া। তাকে আর শিক্ষক বলা হয় না, নির্দিষ্ট কিছু ব্যবস্থাপনার চেয়ারে সে বসে গেছে। মারকাজে বসাটা বোঝা যায় না, এই “বসে যাওয়া” তাবলিগি পরিবেশে বিধায় চোখে পড়ে না বলে সেটা বুঝা কঠিন হয়, ওতো তবলিগের ম্যানেজমেন্টেই আছে, সহজে ধরা পড়ে না, কিন্তু এটাও কাজ থেকে বসে যাওয়াই, মূল কাজ থেকে দূরে সরে যাওয়া। ম্যানেজমেন্ট, দায়িত্ব, বড় মেম্বার—এসব কখনো মূল মেহনতের বিকল্প হতে পারে না।

🎤 ১৮৫

স্যার একবার বলেছিলেন: অনেক সময় আল্লাহ পাক বান্দার কোনো বিশেষ গুনাহ, যেমন পিতা মাতার নাফরমানি ও বেয়াদবির কারণে, তাঁকে দাওয়াতের মেহনতের ময়দান থেকে সরিয়ে দেন। অনেক সময় মেহনতের পরিবেশ থেকে সে পুরোপুরিই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আবার অনেক সময় মানুষ বাইরে থেকে ভাবে, সে তাবলিগ করছে; কিন্তু ভিতর থেকে আল্লাহ তাকে সরিয়ে নিয়েছেন। স্যার একটি বাস্তব মেছাল দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন— কেউ যদি পিতা—মাতার সাথে বেয়াদবি করে, তাদের অসন্তুষ্ট করে, যেমন সে তিনদিনের জামাতে যাওয়ার নিয়ত করল, তার পিতা বললেন—"এখন যেও না।" সে বলল—“আমি যাবই।” তিনদিনে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পিতার সাথে এই ভাষায় কথা বলা—"যাবই"—এটা শরীয়তের গণ্ডিতে পড়ে না, শরীয়তের দৃষ্টিতে অবশ্যই দোষনীয়। তিন দিন যাবে, চলে যাও, গোপনে চলে যাও, তিন দিন যাওয়াও ছাড়া যাবে না, আবার পিতার সাথে বেয়াদবিও করা যাবে না। যারা পিতা—মাতার সাথে বেয়াদবি করে, পিতামাতার নাফরমানি করে, তারা শেষ পর্যন্ত তাবলিগেও টিকে থাকতে পারে না। আমাদের একজন ভাই, যাঁর পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে স্যারের ভালো ধারণা ছিল, তিনি একদিন স্যারের কাছে এসে পরামর্শ করলেন যে তিনি তিন চিল্লায় যেতে চান। স্যার তাকে শর্ত দিয়ে বলেছিলেন: "তুমি তিন চিল্লায় যেতে পারো, তবে তোমার মাকে রাজি করিয়ে যেতে হবে। মা যেন খুশি মনে তোমাকে পাঠান। তাকে খুশি করে সম্মতি নিয়ে তারপর তুমি যাও।" স্যার বলেন, পিতা—মাতার সাথে বেয়াদবি বড় গুনাহ, যা তাবলিগের বরকত থেকেও বঞ্চিত করে দেয়, এমনকি সে শেষ পর্যন্ত তাবলিগের মেহনতে টিকে থাকতে পারে না, হয়তো কিছুদিন তাবলিগ করেও কিন্তু মূল মেহনতের নকশা তার কাছ থেকে হারিয়ে যায়। এটাই দাওয়াতের আসল রূহ, দাওয়াত হলো ইখলাস, দুআ, বিনয় আর শরীয়তের সকল সম্পর্ক ঠিক রেখে আল্লাহর পথে চলা। আল্লাহর পথে চলতে হলে, আল্লাহর বান্দাদের হক আদায় করেই চলতে হবে। পিতা মাতা তাঁরা আমাদের দুনিয়ার দরজা। তাদের সাথে নাফরমানি করে তাদেরকে অসন্তুষ্ট রেখে দাওয়াত, আমল আসলে টেকে না।

🎤 ১৮৬

স্যার একবার বলেন, অনেক সময় আমরা বলি, “অমুক ভাই তাবলিগে যায় না।” কিন্তু এই কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আসলে বাস্তবতা হলো, তাকে আল্লাহ পাক তাবলিগে নিচ্ছেন না, তাকে সাসপেন্ড করে রেখেছেন, তাবলিগের এ মোবারক মেহনত থেকে, তাকে বঞ্চিত করে রেখেছেন। স্যার বলেন, কেউ নিজে থেকে না যাওয়ার মতো মনে করলেও, প্রকৃতপক্ষে সে যাচ্ছে না কারণ আল্লাহ তার দ্বীল থেকে ডাকে সাড়া দেওয়ার তৌফিক কেড়ে নিয়েছেন। এটা একটা বড় ধরণের মাহরূমিয়াত (বঞ্চনা)। তার কোন গুণাহের কারণে, বদ আখলাকির কারণে, তাকাব্বুরির কারণে, দুনিয়ার তলবের কারণে, লোভের কারণে, রিয়া, আত্মপ্রদর্শন, গাফলতি ইত্যাদির কারণে আল্লাহ পাক তাকে বঞ্চিত করে দেন এই মোবারক মেহনত থেকে। এই বঞ্চনার পেছনে থাকে এমন কোনো গভীর নাফরমানি। যখন কোনো বান্দাকে আল্লাহ তাঁর পথে আসার তাওফিক থেকে বঞ্চিত করেন, সেটা তার জন্য এক মহাবিপদ, এই অবস্থাকে অবহেলা করা উচিত নয়। তাবলিগের মেহনত থেকে দূরে থাকা মানেই কেবল কাজ না করা নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক প্রকার বিরক্তি, গজব বা সতর্কবার্তা — যে তিনি তার বান্দার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, যা গভীরভাবে ভাববার বিষয়, বড় ভয়ের ব্যাপার। নিজের আমল, ইখলাস ও আখলাকের দিকে গভীরভাবে নজর রাখতে হবে, যেন আমরা দ্বীনের এই মোবারক কাজ থেকে মাহরূম হয়ে না যাই।

🎤 ১৮৭

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আদিল ভাই বলেন, আমার যখন অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়, তার কিছুদিন পর স্যার সালাম বরকত ও কামালউদ্দিন হল মসজিদে একটি প্রোগ্রামে এসেছিলেন। নামাজের পূর্বে আমি এবং ফয়জুল হক ভাই (বর্তমানে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষক) স্যারের পাশে বসে ছিলাম। ফয়জুল হক ভাই স্যারকে জানালেন, "আদিল অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে।" স্যার কিছুক্ষণ নীরব থেকে তারপর বললেন: “যে কোনো কিছু পেয়ে সন্তুষ্ট তার সন্তুষ্টির ভিত্তি খুব দুর্বল, আর যে না পেয়ে সন্তুষ্ট— সেটাই প্রকৃত সন্তুষ্টি।” স্যার বোঝালেন যে, সন্তুষ্টি বা الرِّضَا হলো এক অভ্যন্তরীণ অবস্থা, যা মানুষকে আল্লাহর ফয়সালার ওপর আত্মিক প্রশান্তি ও নিরাপত্তা দেয়। মানুষ যদি তখনই খুশি হয় যখন তার মনমতো কিছু অর্জিত হয়— যেমন উচ্চ ফলাফল, নাম, খ্যাতি, পদ— তখন তার এই খুশি খুবই ভঙ্গুর। কারণ যখন সে তা পাবে না, তখন সে অস্থির হয়ে যাবে, হতাশ হবে, বা ক্ষোভে আক্রান্ত হবে। স্যার বুঝিয়ে দেন যে, যে মানুষ শুধুমাত্র সফলতার মুহূর্তেই খুশি হয়, তার খুশি ক্ষণস্থায়ী ও অস্থির, যে শুধু প্রাপ্তিতেই খুশি হয় আসলে সে প্রকৃত সন্তুষ্টি লাভ করতে পারেন না। যে ব্যক্তি না পাওয়ার মধ্যেও সন্তুষ্ট থাকে, সে আসলে নিজের আত্মাকে আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছে। তার সন্তুষ্টি নির্ভর করে না বাইরের কিছু অর্জনের ওপর, বরং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে, সেটিই প্রকৃত শান্তি ও পরিপূর্ণতা। স্যারের কথায় প্রকাশ পায় যে: এই রিযা বা সন্তুষ্টি আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় ঈমানদারদের এক গুণ, এটা এমন এক মাকাম (আধ্যাত্মিক স্তর), যেখানে মানুষ অর্জনহীন অবস্থাতেও আত্মতৃপ্ত থাকে।

🎤 ১৮৮

হযরত মাওলানা সাইয়েদ আহমদ খান রহমতুল্লাহি আলাইহি—এর একটি মূল্যবান কথা উদ্ধৃত করে স্যার একবার বলেন: “এই যুগের মানুষ আল্লাহ পাকের হুকুম জানে, কিন্তু হুকুমের মাত্রা বোঝে না”। কখন কোন আমল কতটুকু করা উচিত—সে জ্ঞান তার নেই। কেউ ফরজ ছেড়ে দিয়ে নফল শক্ত করে নিচ্ছে। কেউ হজের সুন্নত আদায়ের জন্য ফরজ নামাজ ছেড়ে দিচ্ছে। কেউ ‘হজরতজি আসছেন’ ‘হজরতজি আসছেন’ বলে এমনভাবে সম্মান জানাচ্ছে যে, ডানে—বামে থাকা কয়েকজন মানুষকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে। অথচ হজরতের ইস্তেকবাল ও সম্মানেরও একটা সীমা আছে, যা খেয়ালেই নাই। সে জানে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে হবে, কিন্তু কোথায় কতটুকু তা জানে না। মা উপবাস, অথচ প্রতিবেশী চাচিকে দান করছে; প্রতিবেশী অনাহারে, অথচ মুরব্বিদের জন্য বিরিয়ানী কাবাব বানাচ্ছে। মহব্বত করতে হবে—তা জানে, কিন্তু কতটুকু করতে হবে তা জানে না। তাহাজ্জুদ পড়বে নাকি বিছানায় অসুস্থ পিতার খেদমত করবে, কোনটার প্রাধান্য কোন অবস্থায় কতটুকু, এই মাত্রাজ্ঞান তার নেই। ঘৃণা করতে হবে জানে, কিন্তু কোথায় সীমা টানতে হবে তা জানে না। আয়—ব্যয়ের হিসাব নেই, ব্যয় করছে আয়ের নিশ্চয়তা ছাড়া, আবার আয় করছে ব্যয়ের নিয়ম ছাড়া। জীবনজুড়ে তার এই ‘মাত্রাজ্ঞান’—এর অভাব স্পষ্ট। সে বুঝে না বিবিকে কতটুকু মহব্বত করতে হবে, আবার মাকে কতটুকু ছাড় দিতে হবে। একদিকে স্ত্রীর হক আছে, অন্যদিকে মায়ের হক আছে—কিন্তু কোনটাকে কোথায় প্রাধান্য দিতে হবে তা জানে না। শরীয়তের প্রতিটি হুকুম ও আমলের একটি নির্ধারিত সীমা ও মাত্রা রয়েছে। এই ‘মাত্রাজ্ঞান’—ই হচ্ছে জীবনের ভারসাম্য, আর সেই ভারসাম্যই হচ্ছে জীবনের সৌন্দর্য, তার জীবন। এই সীমা অতিক্রম করলেই ফিতনা সৃষ্টি হয়, হক নষ্ট হয়, আমল নষ্ট হয় এবং সম্পর্ক বিনষ্ট হয়, জীবন পেরেশান হয়।

🎤 ১৮৯

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল কোর্ট মসজিদে এসএসসি জামাতের নূসরতে জামাতের ছাত্রদের নিয়ে স্যার মোজাকারা করছিলেন। মোজাকারায় স্যার বলেন, মানুষের অভ্যাস ও আচরণ অনেকটাই নির্ভর করে তার পরিবেশ ও সে যে কাজে নিয়োজিত থাকে তার ওপর। স্যার এক বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন, রাখাল হাল চাষ করে, লুঙ্গি পরে এবং হুক্কা খায়। এখন প্রশ্ন আসে—হাল চাষ করার মতো কষ্টকর কাজে হুক্কা কি আদৌ উপযোগী? বা লুঙ্গি পরে হাল চাষ করা কতটা সুবিধাজনক? বাস্তবতা হলো, হাল চাষে যেহেতু দৌড়াতে হয়, মাটি ভাঙতে হয়, সেখানে প্যান্ট হলে চলাফেরা সহজ হতো, আবার হুক্কার পরিবর্তে সিগারেট বা বিড়ি হলে বহন করাও সহজ হতো। তবুও সে হুক্কা খায় এবং লুঙ্গি পরে, কারণ সে পরিবেশ তাকে এই অভ্যাসে অভ্যস্ত করে তুলেছে। অন্যদিকে, একজন অফিস কর্মচারী, যিনি সারাদিন বসে থাকেন, তাঁর জন্য হুক্কা খাওয়াই সুবিধাজনক এবং লুঙ্গি পরলে হয়তো আরামদায়ক হতো। কিন্তু তিনি সিগারেট খান ও প্যান্ট পরেন। কেন? কারণ, তিনি যে পরিবেশে আছেন, সেই পরিবেশই তাকে এই আচরণে অভ্যস্ত করেছে। কৃষক যদি অফিসে বসতে শুরু করে, কিছুদিন পরই দেখা যাবে, সে নিজে থেকেই প্যান্ট পরতে শুরু করেছে। আবার, একজন অফিসার যদি কৃষিকাজ শুরু করে, কিছুদিনের মধ্যে দেখা যাবে, তিনিও লুঙ্গি পরে নিয়েছেন। কেননা, পরিবেশ এবং কাজের ধারা মানুষকে ধীরে ধীরে উপযুক্ত অভ্যাস ও আচার শেখায়। স্যার বলেন, আমরা যদি দ্বীনের কাজকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরি, তাহলে দ্বীনি আমল, দ্বীনি অভ্যাস, দ্বীনি আখলাক (আচরণ) ধীরে ধীরে আমাদের জীবনে অটোমেটিকভাবে আসতে থাকবে। যেমনভাবে পরিবেশ একজন কৃষক বা একজন অফিসারের পোশাক—অভ্যাস ইত্যাদি পরিবর্তন করে দেয়, ঠিক তেমনিভাবে দ্বীনের পরিবেশ ও দ্বীনের কাজ আমাদের পরিবর্তন করে দিতে পারে। যখন আমরা দাওয়াতের এই কাজের সাথে মজবুতভাবে সম্পৃক্ত হবো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের, নবীজির আনুষঙ্গিক গুণাবলি—সদাচরণ, ইনসাফ, ত্যাগ, ধৈর্য, সঠিক পথে চলা—এসব আপনাআপনিই ধীরে ধীরে আমাদের জীবনে প্রবেশ করতে থাকবে। তাবলিগের এই কাজকে—নবীজির কাজকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে, আমরা যদি নেক কাজে অটল থাকি, নেক পরিবেশে থাকি, তাহলে দ্বীনদারী আমাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।

🎤 ১৯০

এক মুজাকারায় স্যার বলেন—আমাদের জীবনের বেশিরভাগ কাজ, বেশিরভাগ প্রচেষ্টা অনেক সময় অনর্থক হয়ে যায়, যার কোন স্থায়ী ফল বা প্রয়োজনীয়তা থাকে না। এই প্রসঙ্গে স্যার খড়ির চুলার উদাহরণ দেন, খোলা খড়ির চুলায় যে তাপ উৎপন্ন হয় তার প্রায় ৭০—৭৫ শতাংশ তাপ একেবারেই অপচয় হয়ে যায়, কেবলমাত্র ২৫—৩০ শতাংশ ব্যবহারিক কাজে লাগে—যেমন রান্না বা গরম করার কাজে। আল্লাহ তায়ালা যে কর্মশক্তি, সময় ও মেধা দিয়েছেন, আমাদের জীবনে তার অনেক বড় অংশই অপচয় হয়ে যায় অপ্রয়োজনীয় চিন্তা, অর্থহীন ব্যস্ততা ও লক্ষ্যহীন কর্মে। خَلَقَ الْإِنْسَانَ فِي كَبَدٍ মানুষের জীবন মূলত একটি কষ্টের নাম, সংগ্রামের নাম, কিন্তু সেই সংগ্রাম যদি সঠিক পথে না হয়, তবে তা শুধুই অপচয়, পরিণামে যা মানুষের জন্য ব্যর্থতা নিয়ে আসে। স্যার পিরামিডের উদাহরণ তুলে ধরেন, মানব ইতিহাসে বিরল এক নিষ্ঠুর অপচয়ের প্রতীক। হাজার হাজার শ্রমিক, অপরিমাণ অর্থ, অপরিসীম সময়, শ্রম, মেধা, স্থাপত্য—জ্ঞান—সবকিছু ব্যয় করা হয়েছে, শুধুমাত্র একটি কবর বানানোর জন্য! অথচ একটি কবরের জন্য চার হাত মাটিই যথেষ্ট ছিল। সেই বিশাল কাঠামো আজ ইতিহাসের গৌরব বলে দেখে, বাস্তবে তা মানুষের সীমাহীন অপচয়, অহংকার ও উদ্দেশ্যহীন নির্মাণের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত, সেই অপচয়ের ক্ষতিপূরণ আজ কোনভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের জীবনেও অনেকসময় এরকম পিরামিড আসে, লক্ষ্যহীনভাবে, চিন্তা—পরিকল্পনা ছাড়াই মেধা, শক্তি ও সময়ের বলি দেই নির্দিধায়। জীবনকে লক্ষ্যপূর্ণ করতে, অহেতুক কর্মকাণ্ড ও চিন্তা থেকে নিজেকে বাঁচাতে, আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে প্রতিটি শক্তি ও সময় ব্যয় করার ফায়সালায় আসা, যে এই জীবন শুধুই সাজানোর জন্য নয়, বরং হিসাব দেওয়ার জন্য। জীবনের সর্বশক্তি খরচ করে এমন পিরামিড গড়ে না তুলি যার প্রকৃত কোন মূল্য বা কোন প্রয়োজনই হয়তো নেই, মূল্যবান জীবনের এমন নিষ্ঠুর অপচয় না হয়। অপচয় শুধু খাদ্যে, অর্থে নয়—মেধা, সময়, চিন্তাশক্তি ও কর্মশক্তির অপচয়ও চরম ক্ষতির কারণ, জীবনের প্রতিটি কাজের উদ্দেশ্য থাকা উচিত এবং সেই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আখিরাতমুখী ও নেক আমলে অবদান রাখা।

🎤 ১৯১

স্যার বলতেন, “সব সমস্যার সমাধান ইসলামে নেই”, ও নিজের কল্পনায় একটা ভার্চুয়াল সমস্যা বানিয়ে রেখেছে, কাল্পনিক অনেক বড় সমস্যা তৈরি করে রেখেছে, ‘এই সমস্যার সমাধান ইসলাম দেবে?’ ইসলাম বাস্তব সমস্যার সমাধান দিবে। ওর চিন্তা থেকে সমস্যা এসেছে, ওই সমস্যার সমাধান ইসলাম দেবে না। ইসলাম জীবনের প্রকৃত সমস্যার সমাধানের জন্য এসেছে। মানুষের জীবনে যেসব বাস্তব সংকট, মানবিক প্রশ্ন, ন্যায়—অন্যায়, হালাল—হারাম, জীবনযাপন, নৈতিকতা— এসবই ইসলাম সমাধান করে। ইসলাম কখনও মানুষের কল্পনায় বানানো এক ফাঁপা সমস্যার উত্তর খুঁজে বেড়ায় না। এমন প্রশ্নের উত্তর ইসলাম দেবে না, যা বাস্তব সমস্যা নয়, কল্পনার অবাস্তব প্রশ্ন। ইসলাম ঐ জীবনব্যবস্থা যা মানুষকে তার বাস্তব জীবনের প্রশ্নে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দেয়। অবাস্তব, কল্পনানির্ভর বা মস্তিষ্ক—সৃষ্ট প্রশ্ন ইসলামের উদ্দেশ্যের মধ্যে পড়ে না, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কাল্পনিক প্রশ্ন তোলে, কল্পনার ভয় তৈরি করে, কল্পিত সমস্যায় হাবুডুবু খায়, সে নিজেরই ধোঁকার শিকার। স্যারের ভাষায়, কল্পনার ভয় সৃষ্টি করে জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা নিজের জন্যই ধোঁকার কারণ। বাস্তব প্রশ্নের সমাধান ইসলামে খোঁজা, কল্পনার সমস্যার ঘোরে পড়ে জীবনকে পেরেশান না করা।

🎤 ১৯২

স্যার বলতেন, “বড়র কথাকে বিনা বিচারে গ্রহণ করা এবং ছোটর কথাকে বিনা বিচারে বর্জন করা এই দুইটাই ক্ষতির কারণ।” স্যার বলেন, অনেক সময় বড়দের মুখ থেকেও ভুল কথা বের হতে পারে, ভুল সিদ্ধান্ত আসতে পারে, আর কখনো একজন ছোট, অখ্যাত বা নতুন সাথির কথাতেই হক থাকতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কাউকে কেবল তার পদ, বয়স, বড় দায়িত্ব বা খ্যাতির কারণে অন্ধভাবে অনুসরণ করা উচিত নয়; আবার কাউকে কেবল ছোট, অখ্যাত, গরীব, বা অশিক্ষিত বলে উপেক্ষাও করা উচিত নয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মতামত থেকেও ফিরে এসেছেন বয়সে বা অবস্থানে ‘ছোট’ এমন তরুণ সাহাবীর কথা শুনে, নিজের ফয়সালা পরিবর্তন করলেন। উনি তো সবথেকে বড় মুরব্বী, অহংকার করে তাকে পাত্তাই দিলেন না, এরকম না। অপরদিকে অন্ধ অনুসরণে বা মানুষকে ভুলের ঊর্ধ্বে মানলে, তার ভুলকেও দ্বীন বানিয়ে ফেলে। বড়রা ভুল করতে পারে না, এই বিশ্বাসই একটি ভুল ধারণা। হক বা সত্যের মানদন্ড ব্যক্তি না বরং আল্লাহ পাকের কালাম ও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন। যে হককে চেনে, সে বুঝে নেয় কথার ওজন; আর যে মুখ (মানুষ) দেখে চলে, সে অনেক সময় হক থেকেও বঞ্চিত হয়।

🎤 ১৯৩

পাকিস্থানের জিম্মাদার হাজী শফি কুরাইশি সাহেব এর কথা উল্লেখ করে স্যার একবার বলেন উনার এন্তেকালের কিছুদিন পূর্বে একলোক এসে উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইসলামে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান কি? উনি খুব দৃঢ়তার সাথে উত্তর দেন: "ইসলামে কোনো অর্থনৈতিক সমস্যা নেই।" নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো দারিদ্র্য বা অভাবকে সমস্যা হিসেবে দেখেননি, বরং তিনি এটাকে একটি পরীক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যিনি আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া করছেন চাচ্ছেন, দারিদ্রতা, মিসকিনি, উনি এই সমস্যার কি সমাধান দেবেন! এপ্রসঙ্গে স্যার আরো বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার প্রতি আসক্তিকে (وَهْنُ) সমস্যা হিসেবে দেখেছেন, কিন্তু দারিদ্র্যকে নয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম অভাবগ্রস্ত হয়ে আবু আইয়ূব আনসারী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু—এর ঘরে যাচ্ছেন, নিজেও ক্ষুধার্ত অবস্থায়। কিন্তু কখনো আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেননি, "আমাদের এই দারিদ্র্যের (অর্থনৈতিক সমস্যার) সমাধান খুঁজতে হবে।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাম ফিরিয়ে দেখেন, এক সাহাবি ক্ষুধার কারণে নামাজে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছেন। কতদিন খাওয়া হয়নি, যার কারণে নামাজের ভেতরেই অজ্ঞান হতে হয়েছে! কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের এই কঠিন অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য কি উদ্যেগ নিলেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দারিদ্র্য বা ক্ষুধাকে সমস্যা হিসেবেই উপস্থাপন করেননি। বরং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমরা যদি জানতে আল্লাহর কাছে এই অবস্থার বিনিময়ে কী পুরস্কার আছে, তাহলে আরও অভাব ও ক্ষুধা কামনা করতে।” মরুভূমির তপ্ত সফরে পানি শেষ হয়ে গেলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সহ সাহাবায়ে কেরাম সবাই আছেন। পানির প্রয়োজন ছিল অপরিসীম। কিন্তু কেউ চিন্তাও করেনি এক মনজিল পরেই এই সমস্যা হতে পারে, সম্পূর্ণ জামাত এতোবড় সমস্যায় পড়তে পারেন! উট জবাই করে সাহাবারা তার নাড়িভুঁড়ি শরীরের সঙ্গে লাগিয়ে গরম থেকে স্বস্তি নিচ্ছেন। এক মনজিল পর যে পানি শেষ হতে পারে এইটা কারোরই মনে থাকবার কথা না? মরুভূমির সফর এতোগুলো সাথীর পানির যে প্রয়োজন হবে, এতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে এতো বেখেয়াল সবাই, কারো মাথায় এই চিন্তা এলো না? আল্লার নবী এই সমস্যা হতে পারে তার কি ফিকির করে গিয়েছিলেন? এতোবড় গূরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে পূর্ব থেকে কোন প্রস্তুতি নেই। এজাতীয় সমস্যা, অর্থনৈতিক সমস্যা, এগুলো কোন ব্যাপারই ছিল না, কোন চিন্তার বিষয়ই না। হ্যাঁ, টাকা এসেছে জাকাত দিতে হবে, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো এই দারিদ্র্য, ক্ষুধা বা অর্থনৈতিক সংকটকে ‘সমস্যা’ আখ্যা দেননি। বরং তিনি এ অবস্থাকেই ভালোবাসতেন। যিনি একটা জিনিষ পছন্দ করছেন উনি ঐটা থেকে পরিত্রানের জন্য সমাধান দেবেন? এর প্রমাণ: "اللهم أحيني مسكينًا، وأمتني مسكينًا، واحشرني في زمرة المساكين" “হে আল্লাহ! আমাকে মিসকিন অবস্থায় জীবিত রাখুন, মিসকিন অবস্থায় মৃত্যু দিন, এবং কিয়ামতের দিন মিসকিনদের সাথে আমার হাশর করুন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দারিদ্র্যকে সমস্যা হিসেবে দেখেনইনি। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবি সফওয়ান ইবনে উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু—কে ছেঁড়া চাদরে দেখে কেঁদে ফেলেন। তার আগে তিনি বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “অচিরেই তোমাদের দুনিয়া প্রসস্থ হয়ে যাবে।’’ সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করেন, ‘‘তাহলে কি আমরা তখন ভালো অবস্থায় থাকব?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “না, তোমরা এখনই ভালো আছো।” ইসলামে অর্থনৈতিক সমস্যা সমস্যা নয়, বরং দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা কে আল্লাহর নবী আসল সমস্যা হিসেবে দেখেছেন। যিনি অভাবকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামত হিসেবে দেখছেন, দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত থাকা ও আখেরাতমুখী জীবন চাচ্ছেন, উনি এই সমস্যার সমাধানের কি চেষ্ঠা করবেন! নিজের ক্ষুধা, সাহাবাদের কষ্ট কিছুই ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখেননি। বরং তিনি এই অবস্থা চেয়েছেন, ভালোবেসেছেন, দোয়া করেছেন এই অবস্থায় জীবন ও মৃত্যু কামনা করেছেন।

🎤 ১৯৪

স্যার এক বয়ানে বলেন, আল্লাহ পাক নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ এবাদতের পরেই অনর্থক কাজ থেকে বেচে থাকার কথা বলেছেন। "قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ، الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ... وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ" জীবন, সময়, ও সম্পদ, সবই আল্লাহর কাছে বিক্রয় করা। অবান্তর আলোচনা, অর্থহীন বিনোদন, ফাহেশা কথাবার্তা, খেল তামাশা, মিডিয়া পত্রিকা ইত্যাদিকে জীবনের অংশ বানিয়ে নিয়েছি। দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন لغو (লাঘু) যা থেকে আল্লাহ পাক বাচতে বলছেন, এমন কথা, কাজ, সময় কাটানো বা আচরণ-যা দ্বীন দুনিয়া, কোনো দিক থেকেই উপকার বয়ে আনে না।। স্যার বলেন, প্রতিটি দিনের প্রতিটি মুহূর্ত দিয়ে আমরা আসলে এক ধরনের লেনদেন করছি, আমরা কী দিচ্ছি আর কী পাচ্ছি, এই হিসেবেই নির্ধারিত হবে আমাদের পরিণতি লাভ না ক্ষতি। মুমিনের সময় ও মনোযোগ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিবদ্ধ থাকে, কেবল ফলপ্রসূ কাজই সে করবে। বড় দামি এই জীবনের প্রতি মূহুর্ত দিয়েই আমি কেনা বেচা করছি, দিন শেষে এই ব্যবসার হিসেবে আমি লাভবান না লোকসানের মুখে!

🎤 ১৯৫

গাইবান্ধার একজন পুরানা মুরব্বী নুরুল হোসাইন সাহেব, হাইস্কুল শিক্ষক ছিলেন, যিনি ‘নুরুল বিএসসি’ নামে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে যেমন এলাকায় সম্মানিত ছিলেন, তেমনি দ্বীনের কাজে তবলিগের সাথেও জড়িত ছিলেন। তিনি একবার বলেন, স্যার সম্পর্কে আগে থেকেই জানা থাকলেও কখনো কাছ থেকে দেখা বা একসাথে বসার সুযোগ হয়নি। একবার স্থানীয় সাথীদের সাথে ইজতেমায় গিয়েছিলাম। মাঠে স্যার আমাদের জামাতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন আমরা শুকনা চিড়া গুড় খাচ্ছিলাম। আমি স্যারকে দেখে মুসাফাহা করে বললাম, ‘স্যার, একটু আমাদের সাথে খান।’ ধারণা ছিল, তিনি সৌজন্যবশত হাসিমুখে ধন্যবাদ দিয়ে চলে যাবেন। কিন্তু স্যার একদম আপনজনের মতো কোনো দ্বিধা ছাড়াই বসে পড়লেন এবং আমাদের সঙ্গে ঐ সাদাসিদে শুকনা চিড়া গুড় খেতে শুরু করলেন। উনি বলেন, এতো বড় মুরব্বি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কিন্তু বিনয়ের এমন চমৎকার ব্যবহার আমি জীবনে কম দেখেছি, এ আচরণ অন্তরে দাগ কেটে যায়। দ্বীনদার মানুষকে তার অহংকারহীন ব্যবহারেই চিনা যায়, লৌকিকতা ছাড়া সাদাসিদে চলাফেরা ও বিনয়ই একজন দ্বীনদার ব্যক্তির শান। এই ঘটনা ঐ নুরুল বিএসসি স্যারের মনে গভীর প্রভাব ফেলে ও এলাকায় ফিরে উনি তবলিগের কাজে যত্নশীল হন। তিনি বলেন, স্যারের ওই বিনয়ী ও আন্তরিক আচরণ আমার জীবনে এক শিক্ষা হয়ে গিয়েছিল, বড় হওয়া মানে যে অহংকার নয়, বরং আরও বেশি বিনয়ী হওয়া। উনার ভাষায়, স্যার কোনো দ্বিধা না করে থপ করে বসে পড়লেন, আর চিড়া গুড় খেতে শুরু করলেন, একদম আপনজনের মতো, কল্পনাও করিনি যে উনার মতো একজন মুরব্বি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অচেনা একজনের কথায় এমন সহজভাবে বসে যাবেন (নিজেকে বড় মনে না করে সাধারণ মানুষের সাথে দ্বীল থেকে মহব্বতের ব্যবহার করা, এই ব্যবহারে মানুষ দ্বীনের দিকে আকৃষ্ট হয়, হৃদয় নরম হয় এবং দ্বীনের সৌন্দর্য প্রতিফলিত হয়)।

🎤 ১৯৬

স্যার একবার প্রফেসর সানাউল্লাহ সাহেবের একটি ঘটনার কথা বলেন, যিনি সৌদি আরবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো বেতনের চাকরির সুযোগ পান। বেতন ছিল আকর্ষণীয় এবং তিনি মনে করেন, এটি দুনিয়ারও লাভ, দ্বীনেরও লাভ, দ্বীনদার মানুষ হিসেবে তিনি মনে করেছিলেন, এতে দুনিয়ার উপকার তো হবেই, সেই সঙ্গে আরবের মাটিতে থেকে দ্বীনের মেহনতের ফিকিরও করতে পারবেন। তিনি পরামর্শ নিতে হজরতজ্বী এনামুল হাসান সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি এর নিকট যান। বিস্তারিত শুনে হজরতজ্বী জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কত দিনের জন্য যাচ্ছো? ইন্ডিয়ায় ফিরে আসবে, নাকি সেখানেই থেকে যাবে?” তিনি বলেন, “হ্যাঁ, কয়েক বছর পর ফিরে আসব।” তখন হজরতজ্বী শুধু এটুকু বলেন, “সৌদি থেকে ফিরে এসে এখানে তো আর ওখানকার মতো বেতন পাবে না।” স্যার বলেন, হজরতজ্বী খুব কম কথা বলতেন, কিন্তু তাঁর সেই সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে এতটা গভীরতা ছিল যে, সানাউল্লাহ সাহেব বুঝে যান, আসলে এ সিদ্ধান্তে দ্বীনের প্রকৃত লাভ কতটুকু তা তিনি নিজেই উপলব্ধি করে ফেলেন। তিনি আর সৌদি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই চাকরিতে যাননি। স্যার বলতেন, দ্বীনের মেহনত শুধুই করার বিষয় নয়, বরং কেমন করে করা হচ্ছে সেটাই প্রধান। মাঝে মাঝে মানুষ দ্বীনের খেদমতের আড়ালে এমন পথ বেছে নিতে চায়, যেখানে দুনিয়ার মোটা লাভ থাকে, অথচ তা অজান্তেই ইখলাস ও ইস্তিকামাত কে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে। স্যারের ভাষায়, যাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা খুশু দেন, তারা বড় লম্বা ভাষণ ছাড়াই ছোট্ট একটি কথাতেই নিজের করণীয় বেছে নিতে পারেন, তারা এমন সামান্য কথাতেও নিজেদের পথ পেয়ে যান। দ্বীনের কাজ করার ইচ্ছা থাকলেই যথেষ্ট নয়, সঠিক নিয়্যত, পরিপূর্ণ ইখলাস ও আল্লাহওয়ালাদের সঙ্গ ও পরামর্শ খুব জরুরি।

🎤 ১৯৭

স্যার এক মোজাকারায় বলেন, এমন কিছু লোক দেখা যায়, অশিক্ষিত, দুশ্চরিত্র, স্মাগলার, ঘুষ, জালিয়াতি ইত্যাদির মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে। দ্বীনের কোনো মেহনতে সে কখনো ছিল না, না তাবলিগি চিল্লা, না মসজিদের ইবাদত বা কুরআন হাদীসের কোনো তালিম। কিন্তু তাদের টাকা ও প্রভাব এত বেশি হয়ে যায় যে, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাদের সামনে নতজানু হয়ে পড়ে। স্যার উদাহরণ দিয়ে বলেন, এমন একজন, যিনি নিজে অশিক্ষিত হলেও অপরাধমূলক কাজ করে প্রচুর টাকা বানিয়েছেন, এখন সেই টাকার জোরে সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল তার এক ফোনেই উঠে দাঁড়ায়, তার পাঠানো ছাত্রকে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই ভর্তি করে নেয়। মাদ্রাসায় গেলে মোহতামিম সাহেব তাকে সামনে বসান, ওয়াজ মাহফিলে গেলে হুজুররা তাকে প্রধান অতিথির আসনে বসান, সভাপতির আসনে নিয়ে আসেন, এমনকি মসজিদে গেলে ইমাম সাহেব তাকে সম্মানের সাথে ইমামের পেছনে জায়নামাজ বিছিয়ে দেন। সে কাকরাইলে মারকাযে আসলেও সম্মানজনক পজিশন পায়। সে দেখে, টাকার জোর তো সবখানেই, টাকার কারনেই আজ সবখানে সম্মান! এইরকম দ্বীনের লাইনে যত উপরে উঠবে, ততই তার টাকার এক্বিন (বিশ্বাস) আরও বাড়তে থাকবে। সে মনে করে: আমি তো টাকার মাধ্যমে দুনিয়াও পেলাম, দ্বীনও পেলাম, প্রিন্সিপালও আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ায়, ইমাম সাহেবও সম্মান করেন, মার্কাজের মুরব্বিরাও আমাকে বিশেষ একরাম করেন! তার অন্তরে এক ভয়ানক বিশ্বাস জন্ম নেয়, “টাকাই সব কিছু, টাকা দিয়েই সব হয়, এই টাকাই তাকে দুনিয়ার সম্মান দিয়েছে, দ্বীনের ময়দানেও সম্মান দিয়েছে!” একবার এস্তেমার মাঠে আরব টেন্টে কাতারের প্রিন্স এসেছেন। তাদের সাথে কিছু বিতর্কিত ব্যক্তিকে একত্রে দেখে স্যার অত্যন্ত বেদনার সাথে বলেন, “এদের দুনিয়া তো গেলই, দ্বীনও গেল।” কারণ, তারা এখন তাবলিগের মাধ্যমে দ্বীন হাসিল করছে না, বরং টাকার জোরে তাবলিগে মর্যাদা অর্জনের মোহে বিভ্রান্ত। তারা দেখছে, তাবলিগের বরকতে তো কাতারের প্রিন্সদের পাশে বসছি! তাহলে এত কষ্ট করে তিনদিন, চিল্লা করার কী দরকার? টাকা কারনেই তো তাবলিগের শীর্ষ পর্যায়ে! তাবলিগে এসে কাতারের প্রিন্সদের সাথে আছি, কত বড় আলেম, কত বড় মুরব্বি, কত কত কুরবানি করনেওয়ালার এখানে এক্সেস নাই। এই টাকার কারণেই তো আমি আজ কাতারের প্রিন্সদের লেভেলে পৌঁছে গেছি, এই তাবলিগের বরকতে! যারা সারাজীবন নামাজ পড়েছে, চিল্লা দিয়েছে, তিন দিন দিয়েছে, তাদের অনেকে আবার অবাক হয়ে তাকায়, টাকা তাকে কত উপরে উঠিয়েছে! তো টাকার এক্বিন তার অন্তরে বসতেই থাকবে, যে টাকার মতো জিনিস কি আমি ছাড়তে পারি? টাকা দিয়ে দুনিয়াতো সুন্দর হয়ই, দ্বীনও পাওয়া যায়, আখেরাতও সুন্দর হয়! সমাজ তাকে দ্বীনের মঞ্চে যত সম্মান দেয়, তার অন্তরে ‘টাকার ঈমান’ ততই মজবুত হয়। টাকার কারণে দ্বীনের এত উপরে পৌঁছে গেছি! এভাবেই ধীরে ধীরে দ্বীনের চেহারা ও মূল উদ্দেশ্য তার কাছে বিকৃত হয়ে যায়। দ্বীনের মেহনতের ভিত্তি হলো ইখলাস, ইস্তিকামাত এবং ত্যাগ। যেখানেই টাকা দিয়ে দ্বীনের কাজের সম্মান বা পজিশন কেনা হয়, সেখানে দ্বীনের রূহ থাকে না। বরং এতে দ্বীন একপ্রকার ব্যবসায় পরিণত হয়।

🎤 ১৯৮

একবার প্রসঙ্গক্রমে স্যার বললেন, “যে ব্যক্তি কোনো গোপন মিশন নিয়ে চলে, তার বাহ্যিক আচরণ সাধারণত খুব চমৎকার হয়। সে জানে, যদি আখলাক সুন্দর না হয়, তাহলে মানুষকে প্রভাবিত করতে পারবে না, তার মিশন সফল হবে না।” স্যার উদাহরণ দিলেন, ধরো, এমন একটি সংগঠন যারা মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, দীনকে দুর্বল করতে চায়, এমনকি গভীরভাবে ধ্বংসাত্মক, ফেতনা, সৃষ্টিকারী কিংবা মুসলিম সমাজকে ভেতর থেকে ধ্বংস করার মিশনে নিয়োজিত, ওদের লিডারকে দেখলে তোমার মনে হবে, যেন কোনো আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ। তার বাহ্যিক আচরণ এমন হবে যেন সে একজন দ্বীনদার, সদাচারী, সুন্নাতপন্থী ব্যক্তি। তার আচরণে নবী রাসূলদের আদর্শের ছায়া দেখা যাবে, যেন বুঝাই যায় না সে ভিতরে ভিতরে কী এক ভয়ানক মিশন বহন করছে। তার কথা, আচরণ, চালচলন, সব কিছুতেই এক ধরনের নুরানিয়াত থাকবে। অথচ ভিতরে ভিতরে সে এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ওতো কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য বা মিশন নিয়ে কাজ করছে, ওর বাহ্যিক আচরণ খুবই মার্জিত, আকর্ষণীয় ও সুচিন্তিত হবেই। সে জানে, বাহ্যিক রূপ যত সুন্দর হবে, তার গোপন মিশন তত সহজে চলবে। স্যার আরও বলেন, পকেটমারদের যে লিডার, সে ইমামের পিছনে গিয়ে বসে, গায়ে বড় পাঞ্জাবি, মুখে দরদভরা কথা, কিন্তু রাত বারোটায় তার কর্মীরা এসে হিসাব দেয় কার কার পকেট কাটা হয়েছে। সমাজের সবচেয়ে বড় স্মাগলার হয়তো মসজিদ করছে, মাদ্রাসায় টাকা দিচ্ছে, ব্রিজ বানাচ্ছে, স্কুল করছে, ও নিজে হাতে কোন খারাপ কাজ না, রাতদিন সমাজসেবায় নিয়োজিত, কিন্তু ভিতরে ভিতরে পুরো চক্র চালাচ্ছে, সেই চক্রের পরিচালনার কাজ করে। এই ধরনের মানুষদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তাদের “বাহ্যিকতা” দিয়ে তাদের “বাস্তবতা” ধরা যায় না। কারণ তারা জানে, যদি বাহ্যিক আচরণ খারাপ হয়, তাহলে তাদের গোপন মিশন টিকবে না। তারা যে মিশনেই থাকুক না কেন, যত খারাপই হোক না কেন, তাদের আখলাক ও সামাজিক আচরণ এতটাই পরিপাটি ও আকর্ষণীয় হয় যে, সাধারণ মানুষ খুব সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে যায় এবং তাদেরকে অনুসরণ করতেও শুরু করে। যারা প্রকৃত দ্বীনদার, তাদের ভেতর, বাহির এক হয়। আর যারা বিশেষ প্রজেক্ট নিয়ে চলে, তাদের বাহ্যিক আখলাক, সৌন্দর্য এক বিশাল ষড়যন্ত্রের পর্দা হয়ে থাকে। তার বাহ্যিক আখলাক দেখে সাধারণের জন্য বুঝা বড় মুশকিল। এই কথাগুলোর মাধ্যমে স্যার চোখ খুলে দিতে চাচ্ছিলেন, যাতে আমরা বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে থাকা ফেতনা ও ধোঁকার জগৎ সম্পর্কে সচেতন হই এবং নিজের জীবনে সত্যিকারের ইখলাস ও ত্যাগের ভিত্তিতে দ্বীনের ওপর অটল থাকতে পারি। শুধু মিষ্টি কথা, মার্জিত পোশাক, দান, খয়রাত বা বাহ্যিক ভদ্র আচরণই দ্বীনদার হবার প্রমাণ নয়, ইখলাসের প্রমাণ নয়। প্রকৃত মুমিন হওয়ার জন্য দরকার সত্য, স্বচ্ছতা এবং ভেতরের নিষ্ঠা।

🎤 ১৯৯

একবার স্যার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করছিলেন। একবার একটি জামাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিল, জামাতের সাথীরা ছিলেন খুবই গরিব, সাদাসিধে, গ্রামের মানুষ। এমন সাথীও ছিলেন, যাঁরা জীবনে কখনো ইস্ত্রি করা জামা গায়ে দিয়ে দেখেননি, হয়তো একবারও ইস্ত্রি করা কাপড় পরার সৌভাগ্য হয়নি। গ্রামের সাদাসিধে গরিব মানুষ, ইস্ত্রি করা জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করার অবকাশ কই! স্যার ছাত্রদের তরগীব দেন, এই সাথীদের খেদমত করো, ভালো ব্যবহার করো যাতে তারা খুশি হন। ছাত্ররা তাদের জামাকাপড় লুঙ্গি বিছানার চাদর ইত্যাদি নিয়ে নিজ হাতে ধুয়ে, পরিষ্কার করে, পবিত্র করে, ইস্ত্রি করে, ভাঁজ করে সুন্দরভাবে গুছিয়ে তাদের হাতে তুলে দিল। স্যার বলেন, এই খেদমতে তারা এতটাই অভিভূত হয়েছিল যে চোখে পানি আর অন্তরে এক গভীর ভালোবাসা নিয়ে আনন্দে বলে ওঠে, “এরা তো শুধু জামা ধুয়ে দেয় না, ইস্ত্রিও করে দেয়!” স্যার বোঝাতে চাইছিলেন, কেবল কথার সৌন্দর্য নয়, খেদমত, বিনয় আর ভালোবাসার স্পর্শে যখন হৃদয় জয় করা যায়, সেটিই দাওয়াতের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ করে, দ্বীলকে আকর্ষণ করে, দ্বীল থেকে দোয়াকে টেনে নিয়ে আসে। এই ঘটনার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। স্যার বলেন, এরপর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র, শিক্ষক, এমনকি কর্মচারীদের মধ্যেও তাবলিগের কাজের প্রতি ভালো মনোভাব তৈরি হয়। পুরো ক্যাম্পাসে কাজ বেড়ে যায়, পরিবেশ বদলে যায়। এই ঘটনার মাধ্যমে স্যার এক গভীর সত্য প্রকাশ করতে চেয়েছেন, বিনয়, ভালোবাসা ও নিঃস্বার্থ সেবা হলো দাওয়াতের শক্তিশালী অস্ত্র, দাওয়াত শুধু কথায় নয়; খেদমতের মাধ্যমে হৃদয়ে জায়গা করে নিতে হয়।

🎤 ২০০

একবার স্যার বলেন, আমাদের দেশে এমন বহু তাবলিগি ভাই আছেন, যাদের জীবনে কেউ কখনও এক কাপ চাও খাইয়েছে কিনা সন্দেহ। এতটাই নিঃস্ব, এতটাই সাদাসিধে এ মানুষগুলো, যাদের গায়ে হয়তো কখনও দামি কাপড় উঠেনি, পায়ে কখনও দামি সেন্ডেল জোটেনি, কিন্তু দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ তারা করে যাচ্ছেন নীরবে, নিঃস্বার্থভাবে, নিরবিচারে। স্যার বলেন, এ দরিদ্র শ্রেণির মানুষেরা যখন তাবলিগের মাঠে থাকে, তখন সে কাজ সহজে নষ্ট হয় না। কারণ, এরা কাউকে দেখানোর জন্য করে না, পদ পদবি চায় না, বিনিময় প্রত্যাশা করে না, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তারা ত্যাগ করে, কষ্ট করে, সময় দেয়। তারা চিল্লা দেয়, তিনদিনে যায়, গাশত করে, নামাজ পড়ে, দোয়া করে, কান্নাকাটি করে। এদের অন্তরের খালিস নিয়তই হলো সেই শক্ত ভিত, যার ওপর ভর করে কাজ এগোয়, গড়ে ওঠে এক পবিত্র পরিবেশ। এমন ভিত থাকা সমাজে সহজে কোনো ফিতনা প্রবেশ করতে পারে না। অন্য এক সময় স্যার মিসরের কাজের প্রসঙ্গে বলেন, সেখানে তাবলিগের কাজের ভিত তৈরি হয়েছে উচ্চশিক্ষিত শ্রেণিকে কেন্দ্র করে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, শিক্ষিতরাই সেখানের কাজের মূল চালিকা শক্তি। তখন স্যার এক উপমা দিয়ে বলেন, আমাদের দেশের তাবলিগি কাজ অনেকটা সেই পিলারের মতো, যার নিচের ভিত্তি চওড়া এবং উপরের দিক সরু। এটি যেমন দেখতে সুন্দর, তেমনি স্থিতিশীলও, কারণ নিচের ভিত্তি মজবুত, সহজে হেলানো যায় না। পক্ষান্তরে, যদি ভিত্তিটা সরু হয় আর উপরের অংশ চওড়া হয়, যেমনটা কখনো কখনো শিক্ষিত শ্রেণিভিত্তিক কাঠামোতে দেখা যায়, তখন সামান্য ঝাঁকিতেই সেই কাঠামো ধ্বসে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। ​স্যার বোঝাতে চেয়েছিলেন, দাওয়াতের কাজকে টেকসই করতে হলে, ভিত্তিটা হতে হবে নিচ থেকে, খালিস নিয়তসম্পন্ন দরিদ্র ও সাধারণ শ্রেণিকে কেন্দ্র করে। কারণ, এই শ্রেণি সহজে ভেঙে পড়ে না, তারা পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল, তারা আল্লাহর উপর ভরসা রাখে,আর দোয়া কান্নাকাটিই তাদের ভিত্তি। সমাজে তাবলিগের কাজ যদি এমন শ্রেণির মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত হয়, তবে ফেতনা থেকেও সহজে রক্ষা পাওয়া যায়, এবং কাজটি বহুদূর এগিয়ে যায়। (দাওয়াতের ময়দানে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন খালিস নিয়ত, বিনয়ী অন্তর, এবং একনিষ্ঠ খেদমত। আর এসব গুণাবলি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সাধারণ, দরিদ্র, প্রান্তিক মানুষদের মধ্যেই। আমাদের উচিত এই শ্রেণির মূল্যায়ন করা ও তাদের উৎসাহ প্রদান করা, এবং তাদের অনুসরণে নিজের যাত্রাকে শুদ্ধ করা)।