মালফুযাত

Volume 1

মালফুযাত ১–১০০

🎤 ১

ফ্রান্সে স্যারের তাবলীগের মেহনত শুরুর দিকে প্যারিসে উনার অবস্থান স্থলের নিকটবর্তী দুটি খাবার হোটেল ছিল, যার একটি ছিল মুসলমানদের পরিচালিত এবং অন্যটি পরিচালিত হতো ইহুদীদের দ্বারা। মুসলমান পরিচালিত হোটেলটিতে রান্নাবান্নায় পাক নাপাকীর শরীয়তের সীমা রেখার অনুসরনে দুর্বলতা ছিল। কিন্তু ইহুদীদের হোটেলটিতে রান্নাবান্নায় হালাল হারামের বিষয়টি শক্তভাবে খেয়াল রাখা হতো। খাবার গ্রহনের জন্য কোন হোটেলে যাওয়া ভালো হবে তা জানার জন্য স্যার তৎকালীন সেখানকার বড় আলেম ও আল্লাহ ওয়ালা প্রফেসর হামিদুর রহমান সাহেবের নিকট এই সমস্যার বিষয়ে জিজ্ঞেস করেন। স্যার বলেন উনি আমাকে মুসলমানদের পরিচালিত হোটেলেই সতর্কতার সাথে খাবার গ্রহনের পরামর্শ দেন।

🎤 ২

এক বয়ানে স্যার বলছিলেন, কোরআন শরীফ স্পর্শ করতে শারীরিক পবিত্রতা লাগে, আর কোরআন শরীফ বুঝতে হলে আত্মার পবিত্রতা লাগে। এটা হুদাল্লিল মুত্তাকিইন, মুত্তাক্বিনদের জন্য হেদায়েতস্বরূপ।

🎤 ৩

এক বয়ানে স্যার বলছিলেন, আগন্তক দেখে বাসার কুকুর ঘেউ ঘেউ করলো, আর বাড়ীর মালিকের ইশারায় কুকুর থেমে গেলো। একবার বাসায় চোর দেখেও কুকুর ঘেউ ঘেউ শুরু করে, আর মালিকের ইশারা না পেয়ে চোরকে তাড়া করে। কুকুর এখানে মালিকের বন্ধু কে আর মালিকের শত্রু কে তা চিনে না, ব্যাক্তিগত (তার নিজস্ব জাতি সত্তার) কোন সম্পর্ক বিবেচনায় আনে না। মালিকের কারনেই বন্ধুত্ব আর মালিকের কারনেই শত্রুতা। বন্ধুত্ব আর শত্রুতা উভয়ই যেনো মালিকের (আল্লাহর) জন্য হয়, মালিকের সন্তুষ্টির দিকে রেখে হয়, ব্যাক্তিগত জজবা, সম্পর্ক, শত্রুতা কোনটা যেনো প্রাধান্য না পায়।

🎤 ৪

নাটোর হাজীপাড়া মসজিদে পুরাতন সাথীদের মধ্যে এক মুজাকারায় স্যার বলছিলেন, বিয়েতে অনেকে কনের হাতে, মেয়ের হাতে মেহেদী লাগান। আর এই জন্য যেই মহিলা শীলপাটা দিয়ে মেহেদী বাটে সে বার বার নিজের হাতের দিকে তাকায় আর দেখে তার নিজের হাত রঙিন হচ্ছে কিনা। যে মেহেদী ঐ বাটনেওয়ালার নিজের হাত রাঙাতে পারে না, সেই মেহেদী কনের হাতও রাঙাতে পারবে না। আর ঐ বাটনেওয়ালা মহিলা যদি নিজের হাতের দিকে না তাকিয়ে মেহেদী বেটেই যায় আর যথারীতি ঐ বাটা মেহেদী পাতা কনেকে লাগানো হলো, আর দেখা গেলো হাত রঙিন হলো না, তখন প্রশ্ন আসবে আসলে ওটা মেহেদী ছিলো নাকি ঘাস ছিলো? আমরা মেহনত করি অন্যের উপর, অন্যের পরিবর্তন করার চেষ্ঠা করি। হুশিয়ার মানুষ হিসেবে নিজের দিকেও বার বার তাকানো যে এই মেহনত দ্বারা আমার কতটুকু পরিবর্তন হলো। যে মেহনত নিজের পরিবর্তন আনতে পারে না, সেই মেহনত অন্যের হেদায়েত আনবে কিভাবে।

🎤 ৫

শাহ আলম ভাই বলেন, স্যার এতোটাই সাধারণ ও স্বাভাবিক মেজাজের ছিলেন যে এস্তেমার মাঠে বিদেশীদের টেন্টে আরবদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে একটু ফ্রি হলে আমার পি.এইচ.ডি থিসিসের কারেকশনের জন্য দেখাতাম, আমিও স্যারকে দেখানোর সাহস পেতাম আর স্যারও ফ্রি হলেই বা বিশ্রামের সময় দেখে দিতেন। এরকম কথা স্যার কখনো বলেননি, এতোবড় এস্তেমা, সারা দুনিয়ার মানুষ দ্বীনের ফিকির নিয়ে একত্রিত হয়েছে, আমি এতো এতো ব্যাস্ত, বিদেশী মেহমানদের সাথে মোলাকাত ও দ্বীনি ফিকির নিয়ে আছি, আর তুমি কিনা এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই দুনিয়াবী ফিকির নিয়ে এখানে এসেছো।

🎤 ৬

একসময় আমার ঢাকা যাবার কথা শুনে লুৎফর ভাই (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক), উনার বিয়ের এক প্রস্তাব সম্পর্কে স্যারের মতামত জানার জন্য স্যারের সাথে দেখা করতে বললেন। স্যার ঐ সময় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে ঢাকায় ছিলেন, থাকতেন ঢাকা সোবহানবাগে। গাইবান্ধার এক ধনী ব্যবসায়ীর মেয়ের সাথে বিয়ের প্রস্তাব ছিল। স্যার বিস্তারিত শুনে বললেন, যে জিনিষ দেখে বিয়ে করা হয় বা বিয়ে দেয়া হয়, বিয়ের পর বিপরীত পক্ষের কাছে ঐ জিনিষের গুরুত্ব থাকে, দাপট থাকে, ঐ জিনিষের হেফাজতের ফিকির গালেব থাকে। আমি বললাম, স্যার একটু খুলে বললে আমার বুঝতে সহজ হবে। স্যার বললেন, মনে করো কেউ খুব সুন্দর দেখে বিয়ে করলো, বিয়ের পর ঐ মেয়ের সোর্ন্দয্যের বড়াই, রূপচর্চা, রূপচর্চার জিনিষ পত্রের ফিকির, রূপের কারণে অন্যদের তাচ্ছিল্য ইত্যাদি তার মধ্যে থাকবে। অনুরূপ কেউ যদি মেয়ের বিয়ের জন্য পদ দেখে জামাই নির্বাচন করে, বিয়ের পর সেই জামাইয়ের পদের বরাই থাকাটাই স্বাভাবিক। দুইপাশেই (ছেলে ও মেয়ে উভয় দিকে) নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই কথা, মাল দেখে বিয়ে করলে মালের, বংশ দেখে বিয়ে করলে বংশের গুরুত্ব দাপট ইত্যাদি থাকবে। দ্বীন দেখে বিয়ে করলেও দ্বীনের, দ্বীনদারীর হেফাজতের চিন্তা মাথায় থাকবে এবং দ্বীনদারীকেই বড় আকারে দেখবে।

🎤 ৭

মসজিদে নববীতে নামাজ শেষ করে বাসায় ফেরার পথে রাস্তার ধারে সুন্দর কিছু বিদেশি সুগন্ধি বিক্রি হতে দেখলাম। দৃষ্টিনন্দন বোতল, আকর্ষণীয় ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে মনে হলো কিনে নিয়ে যাই। দেশে ফেরার পর আমার কর্মস্থলের প্রধানকে একটি হাদিয়া দিতে পারলে ভালো হয়—এই নিয়তে স্যারের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করলাম। স্যার আমার কথার উত্তরে খুব হালকা ভঙ্গিতে মাথা একটু কাত করলেন, অল্পস্বরে, কিন্তু খুব গভীর মহব্বতের সাথে বললেন: ”থাক, কিনো না।” স্যারের কণ্ঠে ছিল না কোনো তিরস্কার, ছিল না কোনো নিরুৎসাহ। বরং অনুভব করলাম, এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যে স্যার যেন একটি গভীর দৃষ্টি ফুটিয়ে তুলছেন— ”এক উদ্দেশ্য নিয়েই চলো।” মনে হলো, স্যারের এই হালকা মাথা কাত করা ও সংক্ষিপ্ত শব্দ ‘থাক, কিনো না’ বহন করছিলো এক গভীর শিক্ষা। বৈধ হলেও সব কিছু গ্রহণযোগ্য (নেওয়ার) নয়, যখন উদ্দেশ্য ভালো হলেও অন্যান্য পথের মোহে চূড়ান্ত (এক) মনজিল হালকা হয়ে যাবার সম্ভবনা দেখা দেয়। স্যার যা বলেন নি, সেটাও অনেক কিছু বলে দেয়। স্যার সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছিলেন যে সব বৈধ কাজই সব সময় সব প্রেক্ষাপটে সমানভাবে কল্যাণকর নয়। কখনো এমনও হয়, বৈধ জিনিস থেকেও বেঁচে থাকাই অন্তরের জন্য বেশি নিরাপদ, যদি চূড়ান্ত উদ্দেশ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হয়। দুনিয়ার বৈধ সৌন্দর্যেও মোহ সৃষ্টি হতে পারে—সে মোহে পড়লে লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়, তাই আত্মার হেফাজতে অনেক বৈধ অবলম্বন থেকেও বিরত থাকা অনেক সময় হিকমতের কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

🎤 ৮

ফ্রান্সের জামাতের নুসরত ও সিংড়ার উপজেলা আমীর সাহেবের (যিনি অসুস্থ ও বিছানারত ছিলেন) সাথে দেখা করার জন্য সিংড়ায় যাবার প্রোগ্রাম হয়। দেখা সাক্ষাৎ শেষে সিংড়ার সাথীরা পুরানা সাথীদের জোড় উপলক্ষে অতিরিক্ত একদিন থাকার ফায়সালা করেন। ঐসময় কিশোরগজ্ঞ থেকে দুই ভাই স্যারের সাথে দেখা করতে সিংড়ায় আসেন। যাদের একজনের পরিবারের বিস্তারিত খোঁজখবর স্যার রাখতেন, উনি তাবলীগে সময় লাগানোর জন্য পিতার বিরাগভাজন ছিলেন। তার সাক্ষাতে ও কুশল বিনিময়ে স্যার তার অসুস্থ ও বয়স্ক পিতার শরীরের হালত জিজ্ঞাসা করেন। ঐ সাথী স্যারের জিজ্ঞাসার জবাবে উত্তর দিলেন, এখনতো আগের চেয়ে আরো মোটাতাজা হয়েছে। তার এই জবাব শোনার সাথে সাথেই স্যারের চেহারায় খুব রাগান্বিত হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়, খুব রাগের সাথে স্যার বলেন এমন ভাষা মানুষ গরু ছাগলের ব্যাপারে ব্যবহার করে, উনিতো তোমার পিতা। পিতার সম্পর্কে এমন তাচ্ছিল্যমূলক জবাবে স্যার এতটাই বিরক্ত ছিলেন যে, পরবর্তী দুই দিন স্যারের সাথে ঐ ভাইয়ের অবস্থানকালীন স্যার তার সাথে আর কোন কথা বলেননি।

🎤 ৯

রাইব্যান্ড থেকে ফেরার পথে অসুস্থ পুরানা মুরব্বী হাজী সেলিম সাহেব (মাওলানা ফাহিম সাহেবের পিতা) এর সাথে দেখা করার জন্য লাহোরে উনার বাসায় যাবার প্রোগ্রাম হয়। স্যারকে বাসায় নেবার জন্য উনি উনার নাতিকে দিয়ে গাড়ী পাঠিয়ে দিলে মার্কাজ থেকে গাড়ীতে চড়ে রওনা হই। মার্কাজ থেকে বের হয়ে অল্প দূরে (যেখানে রাস্তার দুইধারে অনেক দোকান ও বাজার) আসার পর আমি স্যারকে বললাম যে আত্মীয় স্বজনের জন্য কিছু হাদীয়া কিনতে চাই। স্যারের এজাজত নিয়ে আমি ও মাহবুব মোরশেদ (মার্কাজ থেকে আমাদের এগিয়ে দিতে এসেছিল) গাড়ী থেকে নেমে বাজার করতে বের হই। স্যার একা গাড়ীতে বসে ছিলেন ও গাড়ী আমার জন্য রাস্তার ধারে অপেক্ষা করছিলো। প্রায় পৌনে এক ঘন্টার বাজার সেরে গাড়ীতে এসে বসলাম, খুব ভয়ে ছিলাম এই ভেবে যে সফর থেকে ফেরার পথে রাস্তায় গাড়ী থামিয়ে এতো লম্বা সময় বাজার করায় স্যার নিশ্চয়ই খুব বিরক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে লাহোরে স্যারের জন্য মেজবান হাজী সেলিম সাহেব অপেক্ষায় আছেন। স্যার একা একা বসে ছিলেন, আবার মেজবানের সময় নষ্ট করলাম, ইত্যাদি ভেবে আমি ভয়ে ছিলাম। কিন্তু স্যারের মধ্যে রাগ বা বিরক্তির কিছু না দেখে আমি কি কি বাজার করলাম এবং কার জন্য কি কি নিয়েছি তা স্যারকে শুনালাম। স্যার জানতেন যে বিয়ের মাত্র ১৫ দিন পরেই ছিল আমার ঐ সফর। স্যার বড় মহব্বতের সাথে বললেন, বাসায় গিয়ে তুমি নিজেই সব বন্টন না করে কাকে কোনটা দিবে তা তোমার আম্মার সামনে সব রেখে তার পরামর্শ নিয়ে বন্টন করবে। ঐ সময় স্যারের ঐ পরামর্শটা ছিল আমার জীবনের জন্য একটা মাইলফলক।

🎤 ১০

শামসুজ্জামান ভাই (জামনগর, নাটোর) বলেন, একদিন বিকেলে স্যার দেখা সাক্ষাৎ ও সাথীদের খোঁজ খবর নিতে আমাদের হলে আসেন। দেখা সাক্ষাৎ শেষে আমি রাতে হলে থাকতে বললে স্যার নিঃসংকোচে খুব স্বাভাবিকভাবে আমাদের রুমে ছাত্রদের সাথে হলে থাকতে রাজী হয়ে যান। শেষ রাতে তাহাজ্জ্বুদের সময় স্যার বলেন আমি রোজা রাখতে চাই। আমি পাতিলে থাকা অল্প কিছু ভাত প্লেটে বেড়ে স্যারকে সেহেরী খাবার জন্য দেই। স্যার পাতিলটি নিয়ে পাতিলের ভেতরে চতুপার্শ্বে লেগে থাকা অবশিষ্ট সবগুলো ভাত এক এক করে তুলে প্লেটে নিয়ে নেন। পাতিলটা এভাবেই মুছা ও খালি হয়ে যায় যে একটি ভাতও অবশিষ্ট থাকে না যা পাতিল ধোয়ার সময় ফেলে দেয়া হতো বা নষ্ট হতো।

🎤 ১১

স্যারের সাথে হজ্জ্বের সফরে, স্যারের শেষ হজ্জ্ব, জেদ্দা এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষে ভেতরেই আমরা ফজরের নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে যাই। স্যার আমাকে সামনে যেতে বলেন নামাজ পড়ানোর জন্য। আমরা জামাতের জন্য দাঁড়ালে বিভিন্ন দেশের আরো অনেক হাজী জামাতে শরীক হলে জামাত অনেক বড় হয়ে যায়। আমি সময় কম ও হাজী সাহেবদের ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করার তাকাদা মনে করে প্রথম রাকাতে সূরা লাহাব এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা এখলাস দিয়ে নামাজ শেষে সালাম ফিরিয়ে জলদী বের হবার তৈয়ারীর জন্য দাঁড়ালে স্যার একটু নারাজীর স্বরে বললেন, “হজ্জ্বের সফর শুরু করলে অভিশাপ দিয়ে”। আমার কাছে তখন নিজিকে এই ভেবে অপরাধী মনে হচ্ছিল যে সূরা লাহাব ছাড়াওতো আরো অনেক ছোট সূরা ছিল।

🎤 ১২

এন্তেকালের কিছুদিন পূর্বে তাবলীগের চলমান সমস্যার ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক (অবঃ) মজ্ঞুর স্যার স্যারের সাথে দেখা করতে আসবেন শুনে মাহফুজ ভাই বললেন স্যার উনি তো ওয়াসিফের লোক (উনার সাথে কথা বলে খুব একটা সুবিধা হবে না)। মাহফুজ ভাইয়ের কথা শুনে স্যার বললেন এখন যদি ইনজিনিয়ার মাহফুজ হান্নানও (তাবলীগের চলমান সমস্যার ব্যাপারে প্রকাশ্য মাশোয়ারায় সমাধান চাওয়ার কারনে অনেক সাথীকে আটক রেখে যে নির্মমভাবে নির্যাতন করে এবং যার/যাদের প্রত্যক্ষ মদদে অনেক সাথীকে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে জেলে দেওয়া হয়) আসে এবং আমার সাথে কথা বলতে চায়, আমি তার সাথেও কথা বলবো।

🎤 ১৩

একবার স্যার বলেন, রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত জানার পরও এই দোয়া করেন, فَلا تَكِلـني إِلى نَفْـسي طَـرْفَةَ عَـيْن، وَأَصْلِـحْ لي شَأْنـي كُلَّـه “আয় আল্লাহ আমাকে এক মুহুর্তের জন্যও আমার নিজের উপর সোপর্দ কোরেন না, এবং আমার সমস্ত বিষয় আমার জন্য ঠিক করে দেন।” খোদ আল্লাহ তায়ালার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আল্লাহ পাকের ফায়সালা নিয়ে চলতো, নিজে নিজে চলতেন না। তো আমরা সাধারণ মানুষ, আমাদের নিজে নিজে ফায়সালা করে চলাতো গোমরাহী।

🎤 ১৪

শাহ আলম ভাই (শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক) বলেন, আমি যখন সিলেটে চাকরীতে যাই তখন স্যার আমাকে বলেন, মেহনতের জন্য বেশিরভাগ সময় ছাত্রদের সাথে দিবে, শিক্ষকদের পেছনে অতিরিক্ত সময় নষ্ট করবে না। সিলেট ওলামায়ে কেরামদের অঞ্চল, ওলামায়ে কেরামদের সাথে খুব সম্পর্ক গড়ার চেষ্ঠা করবে এবং তাদের খেদমতে বেশী বেশী হাজিরা দিবে। মাদ্রাসাগুলোতে ওলামায়ে কেরামদের সাথে সাক্ষাতের জন্য যাওয়া আসা করবে, ওলামা হজরতগনের নিকট থেকে ফায়দা নেওয়ার চেষ্ঠা করবে।

🎤 ১৫

শাহ আলম ভাই বলেন, মালয়েশিয়া যাওয়ার পূর্বে আমি স্যারের কাছে দোয়ার জন্য গেলে স্যার তিনটা নসিহত করেন। (ক) যাচ্ছো যাও, কিন্তু ফিরে আসার নিয়তে যাও, ওখানে থেকে যাওয়ার নিয়ত করবে না। আর বন্ধু পরিচিত যারা আছে তাদেরক তাশকিল করবে তারা যেনো দেশে চলে আসে। (খ) গাড়ী কিনবে না, নিজে পায়ে হেটে যতটুকু পারো গাসত করবে। (গ) প্রত্যেক নবীই নিজ ভাষায় নিজ কওমের উপর মেহনত করেছেন, মূল মেহনতটা নিজ ভাষায় নিজ কওমের উপর।

🎤 ১৬

একবার স্যার বলেন, পাকিস্থানের প্রথম জিম্মাদার শফিউল্লাহ কোরাইশী সাহেব এন্তেকালের পূর্ব মুহূর্তে বলেছিলেন, পৃথিবীতে এখন এতো বেশী অন্ধকার যে যেকেউ জোড়ে একটা চিৎকার দিক সেও কিছু অনুসারী পেয়ে যাবে, তার পাশেও কিছু লোক একত্রিত হয়ে যাবে।

🎤 ১৭

মাহফুজ ভাই বলেন, মসজিদে নববীতে আমরা নামাজের জন্য অপেক্ষা করছি, দেরী আছে নামাজের, আমি বললাম স্যার নামাজের সময়তো আছে জিয়ারত করে আসি। স্যার স্বাভাবিকের চেয়ে একটু উচুঁ গলায় রাগ প্রকাশ করে বললেন, জিয়ারত? এটা কি একটা তুচ্ছ জিনিষ? সময় আছে তাই জিয়ারত করতে গেলাম? স্যারের ধমক শুনে আমি চুপসে গেলাম, আমার চুপসে যাওয়া দেখে স্যার একটু তাছাল্লি দিলেন। বললেন ইনশাআল্লাহ আগামীকাল যাবো। মাহফুজ ভাই বলেন, মানে মনে করো আমি একটা কাজে গেলাম কাজটা হচ্ছে না বা দেরী হবে সময় আছে তো একটু দেখা করে যাই, আরেকটা হলো যে দেখা করার জন্যে যাওয়া। তার পরের দিন ফজরের নামাজের পরে প্রস্তুতি নিয়ে স্যার জিয়ারতে গেলেন, এইযে স্যার ওখানে গিয়ে কান্নাকাটি করতে শুরু করলেন আমার মনে হচ্ছিল স্যার কখন যেনো পড়ে যাবে, হিস্কি দিয়ে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কাঁদতেই থাকলেন, তারপর ভিড় যখন শুরু হয়ে গেলো তখন আমরা বের হয়ে গেলাম। তখন স্যার আঁ আঁ আঁ করতে করতে ছোট বাচ্চার মতো ফুপাঁতে ফুপাঁতে আধা মাইল দূরে জান্নাতুল বাকীর মধ্যে গেলাম প্রায় ওসমান রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর কবর পর্যন্ত স্যার ঐভাবে ফুপাঁতেই আছেন ফুপাঁতেই আছেন। মনে হচ্ছিল স্যার নিজের মধ্যে আর নাই।

🎤 ১৮

একবার এস্তেমার পর কাকরাইল মসজিদে নিজামুদ্দিনের মুকিম আলীগড়ের নাদের আলী খান সাহেবের সাথে স্যারের দেখা হলে উনি স্যারকে জিজ্ঞেস করেন, আয় মুসফিক তোমার সাথে আমার কতো বছরের পরিচয়? স্যার উত্তর দিতে একটু দেরী করছিলেন, উনি নিজেই উত্তর দেন, তোমার সাথে আমার ৩৮ বছরের পরিচয়। উনি আবার প্রশ্ন করেন, সুরমা কখন চোখে দেওয়ার উপযুক্ত হয়? উনিই উত্তর দেন, সুরমা চোখে দেওয়ার উপযুক্ত হয় যখন ওটা পেশা হয়, পিশতে পিশতে ওটা গুড়া হয়ে যায় তখন ওটা চোখে দেয়। পেশা হয়ে গেলে ওটা বুঝা যাবে কিভাবে, পরিপূর্ণভাবে পেশা হওয়ার আগ পর্যন্ত ওর ছোট ছোট দানা চিক চিক চিক চিক করতে থাকে, যতক্ষণ দানা চিক চিক চিক চিক করতে থাকে তখনও ওটা পেশা সম্পূর্ণ হয়নি। আরো পিশতে হয়, যখন একবারেই পিষ্ট হয়ে যায় তখন আর চিক চিক করে না। তো তুমি এখনও একটু চিক চিক করছো। আমি তোমাকে আর দুই বছর সময় দিলাম, এটা তোমার ওজিফা, তোমার এই চিক চিক যেনো আর না করে। তারপর উনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি বয়াত হয়েছো কোথাও? স্যার উত্তর করলেন, না। উনি বললেন এক্ষণি চলে যাও, জোবায়েরুল হাসান নিচে আছে, গিয়ে বলো আমি পাঠিয়েছি, তোমার কথা বলবে না, গিয়ে বলবে আমি পাঠিয়েছি, তোমাকে যেনো বয়াত করে নেন। স্যার উঠে জলদি জোবায়েরুল হাসান সাহেবের নিকট গিয়ে বয়াত হয়ে গেলেন। স্যারকে জোবায়ের সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, কি আমল করো তুমি? স্যার বললেন, কোরআন শরীফ মুখস্ত করি। উনি বললেন যেটা মুখস্ত করবা সেটা নফল নামাজে পড়বা, এটাই তোমার ওজিফা।

🎤 ১৯

মাহফুজ ভাই বলেন, এই কাজের ব্যাপারে, দাওয়াতের ব্যাপারে স্যার যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, স্যার যেসব হেদায়েত দিয়েছেন, সেসব তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন একেবারে ময়দানের ভেতরে থেকে। স্যার মাইলের পর মাইল হেটেছেন, সাধারন সাথীদের সাথে গাসত করেছেন, মেহনত করেছেন, খেয়ে না খেয়ে সাধারন মানুষের ময়দানে গ্রামে গ্রামে শহওে শহরে স্যার গিয়েছেন। উত্তর বঙ্গের এমন কোনো থানা নাই যেখানে স্যার যান নাই, এমন অনেক ইউনিয়ন আছে, প্রত্যন্ত গ্রাম যেখানে একেক জন সাথীর খোঁজে স্যার সেখানে পৌঁছেছেন এবং তাদেরকে তাদের বাধাকে দেখেছেন, তাদের সমস্যাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, এবং এই অভিজ্ঞতা তজরবা এবং স্যারের তার অন্তরের ব্যাথা দরদের ভিত্তিতে স্যার আমাদের হেদায়েত দিতেন, দিক নির্দেশনা দিতেন। কাজেই এইসব নির্দেশনার যে ওজন শুধু উচু মেম্বরে বসে থেকে বয়ানের মাধ্যমে ওইটা পাওয়া যাবে না। যারা সাধারন মানুষ থেকে দূরে, কাজের ময়দানে ৩০ বছর নাই, মেম্বর আর মাশোয়ারাই যার ময়দান, তিনি যে হেদায়েত দিবেন তিনি যে দিক নির্দেশনা দিবেন, মেম্বর থেকে যে হেদায়েত দিবেন এই দুই নির্দেশনার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য।

🎤 ২০

হজরতজ্বী এনামুল হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহির এন্তেকালের পরে একসময় মাহফুজ ভাই স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন স্যার নিযামুদ্দিন যাবেন না? স্যার তখন গভীর বেদনার সাথে বাহাদুর শাহ জাফরের ঐ শের বললেন, “লাগতা নাহী জ্বী মেরা উযরা দেয়ার মে” “ঐ গ্রামে আমার আর মন লাগে না যে গ্রাম উজার হয়ে গেছে”।

🎤 ২১

স্যারের জীবনের শেষ সময়ের আন্দোলনের শুরুতে একজন আলেম স্যারকে একসময় জিজ্ঞেস করলেন, এই যে লিফলেট, চিঠি পত্র বিলি করা হচ্ছে, তাবলীগের মুরব্বীদের দোষ ত্রুটি সাধারণ লোকদের সামনে আসছে, এরদ্বারা তো এই মেহনতের ক্ষতি হচ্ছে, মেহনত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের খারাপ ধারণা পয়দা হচ্ছে, এর দ্বারা আপনি কি চাচ্ছেন? স্যার তখন ইউসূফ রহমাতুল্লাহি আলাইহির কথা উল্লেখ করে বললেন, উনাকে কেউ একজন একসময় জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি এই যে বিদেশে জামাত পাঠাচ্ছেন, এতো এতো টাকা পয়সা খরচ করে জামাত বিদেশে সফর করছে, কিন্তু বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে যে জামাতগুলো গুটিকয়েক মুসলমানের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করে চলে আসছে, চিল্লা তিন চিল্লা সময় ব্যয় করে চলে আসছে। এর মাধ্যেমে বাস্তব কি ফায়দা আপনি দেখছেন? এসবের দ্বারা আপনি কি চাচ্ছেন? এর উত্তরে ইউসূফ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, এই সমস্ত সফরের দ্বারা একজন মানুষও যে দাঁড়িয়ে পেশাব করে সে যদি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নতের অনুসরণে বসে পেশাব করা শিখে নেয়, তো তাদের এই এতো এতো পয়সা খরচ উসূল হয়ে যাবে। ঐ এক সুন্নত এক মানুষের মধ্যে জিন্দা হওয়ার মোকাবেলায় এতো এতো সময় ব্যয় এতো টাকা পয়সা খরচ, কোন খরচ না। এই কথার ভূমিকা ধরে স্যার তখন বললেন, আজকে সারা দুনিয়াতে তাবলীগের এই হক্ক মেহনত চলছে, এর মধ্যে এই যে লিফলেট বিলি করা হচ্ছে, এর দ্বারা সাময়িক কিছু ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু এর চেয়ে অনেক বেশী মারাত্মক হলো আকীদাগত ক্ষতি। আমভাবে মানুষ মনে করে, তাবলীগের সাথীরা মনে করে যে মুরব্বীদের ব্যাপারে কথা বলা যাবে না এবং মুরব্বীদের ভূল ধরা যাবে না। এরকম আকীদা তো নবীদের শানে প্রযোজ্য, নবীরা মাসুম ছিলেন। নিজের অজান্তেই মুরব্বীদেরকে নবীদের পর্যায়ে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা বিরাট আকীদাগত সমস্যা। তাবলীগের মধ্যে বিরাট এই মজমার এই যে আকীদাগত ক্ষতি, তার মোকাবেলায় এই লিফলেট বিলি করার যে ক্ষতি তা ক্ষতিই না। যদি আমাদের এই চিঠিপত্র ও লিফলেট বিলির দ্বারা সাময়িক কিছু ক্ষতি হয়েও যায়, আর এর মাধ্যেমে একজন মানুষও তার আক্বীদার ব্যাপারে সচেতন হয়, তো আমাদের পোষায় যাবে, পয়সা উসূল হয়ে যাবে (ইউসূফ রহমাতুল্লাহি আলাইহির কথার সাথে মিল রেখে বললেন)।

🎤 ২২

একবার স্যার বলেন, বাংলাদেশের তবলীগের কাজটা মাথার মতো। তাবলীগের পপুলেশনের প্রায় এক তৃতিয়াংশ বাংলাদেশের, সারা দুনিয়াতে দুই তৃতিয়াংশ। তারপর এখানে বিশ্ব এস্তেমা হয়, সমস্ত দুনিয়া থেকে খুব সহজে এখানে একত্রিত হতে পারা যায়। সংখ্যার দিক থেকে বিশ্ব এস্তোমার কারনে বাংলাদেশের তবলীগের কাজটা এখন মাথার পর্যায়ে, ইন্ডিয়া পাকিস্থানের কাজ দুই হাতের মতো। মাথা যদি নষ্ট হয়ে যায় তো কাজ নষ্ট হয়ে যাবে।

🎤 ২৩

সায়ীদ আবুবকর ভাই বলেন, আমার মার্স্টাস পরীক্ষা শেষ হলে একদিন স্যার ও উপশহরের কর্ণেল আনোয়ারুল আলম সাহেব আমার সাথে দেখা করতে আসেন। স্যার কর্ণেল সাহেবকে বলেন ওর পরীক্ষা শেষ, আল্লাহর রাস্তায় বের হতে পারে। কর্ণেল সাহেব আমাকে বিভিন্ন কথা বলে বের হবার জন্য বেশ তশকীল করলেন। আমি বললাম আমি একটা কলেজে কেবল যোগদান করেছি, ক্লাস শুরু করেছি, এই মুহুর্তে যাওয়াতো মুশকীল হবে। উনি বললেন কলেজের চাকরী ছেড়ে দিয়ে যাও, ছাত্র জীবন শেষ করলে এখন আগে ৩ চিল্লা দাও, আল্লাহ চাহে তো এর চেয়ে বড় চাকরীও আল্লাহ দিতে পারে। তো আমি চাকরী ছেড়ে বের হবার নিয়ত করলে উনি বলেন মুসফিক সাহেবতো ঢাকায় যাবেই, তুমি উনার সাথেই কাকরাইলে চলে যাও।

🎤 ২৪

সায়ীদ আবুবকর ভাই বলেন, মার্স্টাস পরীক্ষা শেষে ৩ চিল্লার জন্য কাকরাইলে যাবার সময় স্যারের সাথেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। ১৯৯৮ সালের জানুয়ারী মাসের কথা। ঐ সময় সরাসরি রাজশাহী থেকে ঢাকা ট্রেন যোগাযোগ ছিল না, রাজশাহী থেকে সিরাজগঞ্জ এবং সিরাজগঞ্জঘাট থেকে রেলের ফেরীতে নদী পার হয়ে ওপারে সংযোগ ট্রেনে উঠে ঢাকা যেতে হতো। ট্রেনের ঐ যাত্রাপথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের এক ছাত্রের সাথে পরিচয় হলো, একসাথে পাশে বসে যেতে যেতে কথাবার্তায় স্যার ওর সাথে বেশ খাতির করে ফেললো। আমের মৌসুম ছিল, ওর লাগেজসহ সাথে আরো তিনটা বড় বড় ফজলি আমের কার্টুন ছিল। যেগুলোর একটা ছিল বেশ বড়, ১মন বা এর বেশী ওজন হবে আর অন্য ২টা কার্টুন ২০ কেজি বা তার বেশী ছিল। ছেলেটা তার আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুদের জন্য আমগুলো নিয়ে যাচ্ছিল। ট্রেন সিরাজগঞ্জ ঘাটে এলে ওর ঐ কার্টুনগলো ট্রেন থেকে নামানো হলো। যেগুলো নিয়ে ঘাট পর্যন্ত বেশ রাস্তা হেটে ফেরীতে উঠাতে হবে। ছেলেটা বহনের জন্য কুলি খুঁজতে লাগলো। সুবিধামতো কুলি না পেয়ে বেশ পেরেশান ছিল কেননা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাত্রীরা ফেরীতে উঠে গেলে ফেরী ছেড়ে দিবে। তখন স্যার আমাকে বললো যে আমার ব্যাগটা নাও, আমার এক হাতে আমার নিজের ছামানার ব্যাগ ছিল, অন্য হাতে স্যারের ব্যাগটা নিলাম। ঐ ছেলের আমের বড় কার্টুনটার কাছে গিয়ে স্যার হঠাৎ করে তাকে বললো “ধরো”। ও কিছু না বুঝেই ধরলো ও স্যার সেটা মাথায় নিয়ে হাটা শুরু করলেন। বাকী ২টা ছোট কার্টুন ঐ ছেলেটা দুই হাতে নিয়ে ফেরীতে উঠলো। ফেরী থেকে নামা ও ওপারে সংযোগ ট্রেনে উঠার সময়ও একই ঘটনা। সায়ীদ ভাই বলেন আমার এখনো চোখে ভাসে স্যার যখন ঐ বিশাল আমের কার্টুন মাথায় নিয়ে হেটে চলছিল মাঝে মাঝে স্যারের মাজা বেঁকে যাচ্ছিল ওজনের ভাড়ে।

🎤 ২৫

কল্যাণপুরের মুরাদ ভাই বলেন, কল্যাণপুর হাউজিং সোসাইটি জামে মসজিদে আমরা বেশ কিছু নওজোয়ান মহল্লায় মেহনত করতাম। ৯১/৯২ সালের কথা, সোসাইটির কমিটি তাবলীগের মেহনতের খুব বিরোধী ছিল। মহল্লায় জামাত নিয়ে আসা ও গাসতের নিষেধাজ্ঞা ছিল, খুব মোজাহাদার মধ্যে আমাদের মেহনত করতে হতো। মহল্লার ঐ বিরূপ পরিবেশে মেহনতকারী নওজোয়ানদের উৎসাহ দেবার জন্য আমার বড় ভাই ডাক্তার মোয়াজ্জেম হোসেন একবার স্যারকে মহল্লায় নিয়ে আসেন। স্যার মহল্লায় সব সাথীদের নিয়ে বসেছেন, সবাই রায় দিচ্ছে, কাজ নিয়ে সাথীরা কিভাবে আগে বাড়তে পারে, এরপর স্যার কিছু কথা বলবেন। ঐ সময় আমার একটা রায় ছিল এরকম যে পরিবেশটা মোখালেফ, আমাদের চলতে ফিরতে উঠতে বসতে সামান্য ভূল হলে সোসাইটি এটাকে বড় একটা ইস্যু বানিয়ে ফেলবে। তাই আমার রায়ে আমি বললাম যে সাথীরা আমরা যারা মহল্লায় আছি খুব সমঝদারীর সাথে সতর্কতার সাথে চলা দরকার, প্রত্যেক সাথীর তার নিজের চলা ফেরা উঠা বসায় ভাবগাম্ভীর্য থাকবে যেটার দ্বারা কমিটি বা সোসাইটির উপর একটা ভাল তাছির (প্রভাব) পড়তে পারে। আমার কথা শেষ না হতেই স্যার আমার রায় ধরেই বললেন, তুমি কি সাথীদেরকে মুখোশ পড়িয়ে মহনত করাতে চাও? যার বয়স কম, যার চলাফেরার মধ্যে কোন ভাব নাই, তাকে কোথা থেকে তুমি ভাবগাম্ভীর্য আনবে? নওযোয়ান ছেলে, তার চলা ফেরা উঠা বসার মধ্যে নওজোয়ান, এরই প্রকাশ পাবে সেটাই স্বাভাবিক, তাকে ভাবগাম্ভীর্যের অভিনয় বা মুখোশ পড়িয়ে তো কোন লাভ নাই, ঐটার দ্বারা কোন ভাল তাছির হবে না।

🎤 ২৬

কিছু সাথি কথা বলার এক পর্যায়ে একজন সাউথ আফ্রিকার জামাত সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা বলতে যেয়ে বলেন যে এরা সারা দিন খালি খেতেই থাকে। পাশে থেকে স্যার এই কথাটা শুনছিলেন। কিছুক্ষন পর যখন স্যার আমাদের সাথে মোজাকারায় বসলেন তখন স্যার বললেন, কোন বাক্তির সম্পরকে তার অগোচরে গীবত করা বা তার বদনাম করা যেমন খারাপ অনুরুপভাবে কোন জাতির বা কোন এলাকার বদনাম বা গীবত করাও খারাপ।

🎤 ২৭

স্যার এক বয়ানে বলছিলেন, প্রত্যেক জমানায় ওলীআল্লাহ দের জীবন যদি দেখা যায়, কোন ওলীআল্লাহকে জীবনে একটাবার পেরেশান পাওয়া মুশকিল। খুব তাড়াহুড়া করে, দৌড়ের মধ্যে আছেন, এমন। বড় ব্যস্ত, ব্যবসায়ীদের মধ্যে যেরকম থাকে। বড় নেতা, এখনই দৌড়, যেতে হবে, ‘ভাই এক্ষনি মিটিং আছে যেতে হবে’। সব সময়, সকালে আর বিকালে, রাতে হোক আর দিনের বেলা হোক, ব্যস্ত। সারা জীবন ব্যস্ত থেকে কি করলো? মরবার সময় দেখা যায় যে কিছু নাই! সারা জীবন বকবক করলো, মরার পরে যদি উনার আপন লোককে বা পরিবারের কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে উনার জীবনে বলেছেন কিছু মূল্যবান কথা আমাকে শোনাও। ছোট বেলা থেকে ৬০-৭০ বছর বয়স পর্যন্ত অনর্গল বকেছে, জীবন শেষ হয়েছে, একটা মূল্যবান কথা শোনাও। তো নিজের ছেলেও একটা মূল্যবান কথা বাপের পক্ষ থেকে বলতে পারে না যে আমার বাপ এই কথা বলে গেছেন। বকবক করলো সারা জীবন, ভাল একটা কথা বলতে পারলো না। ব্যস্ত থাকলো সারা জীবন, কিছু করে গেল না। আর এর মোকাবেলায় আল্লাহওয়ালারা জীবনে কখনো ব্যস্ত পাওয়া যায়নি, আর করে গেছেন বহুত কিছু। কখনো বকবক করেননি, কিন্তু জীবনের শেষে মূল্যবান কথার ভাণ্ডার পাওয়া যায়।

🎤 ২৮

এক মোজাকারায় স্যার বলছিলেন বর্তমান সভ্যতার উন্নতির অন্যতম মাপকাঠি হলো বিলাসিতা। আর এর শেষ পর্যায় হলো আত্মহত্যা। নিজের জীবনের মূল্য না জেনে আজ পুরা দুনিয়ার মানুষ নিজের জীবনকে অতি সচেতনভাবে শেষ করে ফেলছে। পৃথিবীতে আত্মহত্যার সংখ্যা কম নয়। আবার এক অংশ আত্মহত্যা না করলেও নেশা অবস্থায় পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টার জন্য নিজেকে আত্মহত্যা করে রাখে। আবার একাংশ পেপার পড়া, নাটক পড়া, টিভি, বিনোদনের মধ্যে লেগে থাকা, নিজের জীবনের ডাইরি লেখা ইত্যাদিভাবে সে তার জীবনকে আত্মহত্যা (জীবনের মূল্যবান সময়কে হত্যা) করে থাকে অর্থাৎ নষ্ট করে থাকে। প্রতিটি মুহূর্ত এভাবে নষ্ট না করে, জীবনের মূল্য দেওয়া শিখে, নেক আমলের দ্বারা নিজের জীবনকে আত্মহত্যা করা থেকে রক্ষা করা এবং পুরা দুনিয়ার মানুষকে রক্ষা করা।

🎤 ২৯

কিছু সাথি কথা বলার এক পর্যায়ে একজন সাউথ আফ্রিকার জামাত সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা বলতে যেয়ে বলেন যে এরা সারা দিন খালি খেতেই থাকে। পাশে থেকে স্যার এই কথাটা শুনছিলেন। কিছুক্ষন পর যখন স্যার আমাদের সাথে মোজাকারায় বসলেন তখন স্যার বললেন, কোন বাক্তির সম্পরকে তার অগোচরে গীবত করা বা তার বদনাম করা যেমন খারাপ অনুরুপভাবে কোন জাতির বা কোন এলাকার বদনাম বা গীবত করাও খারাপ। [২৬ আর ২৯ রিপিট হয়ে গেছে]

🎤 ৩০

প্লেনে একবার আসার সময় শীত লাগলে প্লেনের কম্বল গায়ে দেই, রঙিন কম্বল দেখতে হয়তো ভালো লাগছিলো। প্লেন নামার আগদিয়ে একজন বিমান বালা কম্বল নিতে আসলে পাশে থাকা মাহফুজ ভাই বললেন কম্বলটা ওকে দিয়ে দেন, ওকে সুন্দর দেখা যাচ্ছে, কম্বল ওর কাছে থাক। সেতো কম্বল নিয়ে চলে গেলো, কিন্তু চলে যাওয়ার পর স্যার একটু রাগের সাথে বললেন মেয়েদের সাথে যেখানে কথাবলাতেই সতর্কতা, সেখানে রসিকতা করলে?

🎤 ৩১

চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে কোন এক ডিপার্টমেন্ট থেকে মসজিদে আসার সময় সেখানে মসজিদে যাবার দুটো রাস্তা, একটা একটু সর্টকাট আরেকটা একটু লম্বা রাস্তা। মাহফুজ ভাই বললেন স্যার এই রাস্তা দিয়ে চলেন, ছোট রাস্তা। স্যার বললেন না ঐ (তুলনামূলক বড়) রাস্তা দিয়ে যাবো। মাহফুজ ভাই জিজ্ঞেস করলেন স্যার এই ছোট রাস্তায় না গিয়ে ঐ রাস্তায় কেনো যাবেন, এদিক দিয়ে তারাতারি যাওয়া যাবে। স্যার বললেন এই রাস্তায় মেয়েরা আছে। মাহফুজ ভাই বললেন স্যার ঐ রাস্তায়ও তো মেয়েরা আছে, ইউনিভার্সিটির কোন রাস্তা মেয়ে থেকে খালি থাকবে। স্যার বললেন ঐ রাস্তায় কম মেয়ে আছে। তখন স্যার ‘ওয়াত্তাকুল্লাহা ওয়াসতা তা’তুম’ বলে বললেন জীবনের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে এটা দরকার যে যেই রাস্তায় তুলনামূলক সমস্যা কম সেই রাস্তা এখতিয়ার করা।

🎤 ৩২

ধানমন্ডির কফিল উদ্দিন মাহমুদ সাহেবের কথা বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেছিলেন উনি চিল্লায় বের হবার পূর্বে আমি উনার বাসায় ৬০ বারের ও বেশী বার বার গিয়েছি। অনেক বড় অফিসার কিন্তু বড় আখলাক ওয়ালা মানুষ ছিলেন, স্যারকে মহব্বতও করতেন। স্যার উনার বাসায় গেলে বাসা থেকে বের হবার সময় উনি উনার ড্রাইভারকে বলতেন উনাকে (স্যারকে) রেখে আসো। উনার ড্রাইভার একবার বলেন এইটুকু রাস্তা উনাকে গাড়ীতে রেখে লাভ কি, উনাকে তো সবসময় হাঁটতেই দেখি, এই ধানমন্ডির এমন কোন রাস্তা নেই যেখানে আমি উনাকে হাটতে দেখি নাই।

🎤 ৩৩

স্যার একবার বলছিলেন, আল্লাহ তায়ালা যে নেয়ামত দেন সেটা ফিরিয়ে নেন না। কালামে পাকের আয়াতের কথা উল্লেখ করে বলছিলেন, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত আযাব দেবো না যতক্ষণ পর্যন্ত নবী তাদের মধ্যে আছেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তারা এস্তেগফার করবে। এস্তেগফার হলো নবীর বদল, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থাকা অবস্থায় আযাব দেবেন না, কিন্ত এখন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামতো নাই। নবী নাই এখন আমরা কি করবো, আমরা এস্তেগফার করবো। এস্তেগফারের দ্বারা আযাব বন্ধ হয়ে যাবে, এস্তেগফার হলো নবীর বদল।

🎤 ৩৪

পুরানাদের মজমায় বহুবার স্যারকে বলতে শুনেছি, অনেককে পরামর্শ দিতে শুনেছি যে (১) দ্বীনি দাওয়াত (ইলিয়াস র: এর), (২) মলফুযাত (ইলিয়াস র: এর), এবং (৩) হিসনে হাসিন কিতাবগুলো যেনো বার বার পড়া হয়। এই বইগুলোর ব্যাপারে স্যারের তাকীদ দেখে মনে হয় এই বইগুলো স্যার আমাদের জন্য নেসাবভূক্ত করে দিয়েছেন। স্যার বলতেন এই কেতাবগুলো যেনো আমাদের সামনে থাকে, কারণে অকারণে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে এই বইগুলোর পাতা যেনো আমরা উল্টাতে থাকি।

🎤 ৩৫

স্যারের পৈত্রিক বাড়ী বিক্রির ১০ লাখ টাকা পেয়েছিলেন। এটা এসেছিল স্যারের অংশে, বোনেরা ৫ লাখ করে, ভাইয়েরা ১০ লাখ করে। স্যারের টাকা ভাবী নিয়ে ল্যান্ড ডেভেলপারকে দিয়েছিলেন যা কোন খারাপ ব্যাক্তির হাতে পড়েছিল। সেই টাকাও ফেরত পাননি, জমিও পাননি। রাজশাহী থেকে ঢাকা আসার পথে এই কথা কোন এক কথা প্রসঙ্গে স্যার বলছিলেন। একথা শুনে মাহফুজ ভাই বললেন, স্যার এতোগুলো টাকা, ১০ লাখ টাকা খোয়া গেল আপনি খোজ নেননি, কোন খোজঁখবর করেন নাই? তখন স্যার হেসে দিয়ে বললেন, টাকা গেছে ঐটাই ভাল, তখন আবার শ্রমও যাবে।

🎤 ৩৬

স্যার একবার বলেন, একহাজার বিঘা জমির মধ্যে আমার ৯৯৯ বিঘা জমি উর্বর জমি, আর এক বিঘা জমি খুবই শক্ত। আমি চাষ কোনটা করবো? ৯৯৯ বিঘা চাষ করতে যাবো নাকি এক বিঘার পেছনে লেগে যাবো? আমার হাজার মানুষ আছে কথা নেওয়ার জন্যে, ২/৪ জন যারা কথা নিবে না, লিডার, এরা আমার কথা নিবে না, আরো বড় বড় মুরব্বীর কথা নেয় নাই, তার পেছনে তার সংশোধনের পেছনে পড়ার দরকার কি? এর বাইরে অনেক বড় মজমা আছে যাদের কাছে আমি আমার কথা চালাতে পারবো, যারা কথা নিবে, সেখানে যাই।

🎤 ৩৭

একবার স্যার কাউকে উসূল করতে গেছেন, রাত্রে বেলা এশার পড়ে গেছেন উসূল করতে। কিন্তু ঐ ব্যক্তি স্যারকে বলে যে স্যার আপনি দাঁড়ান, আমি ভেতর থেকে আসি। তো ঐ ব্যাক্তি বাড়ির ভেতরে যে গেছে আর বের হয়নি, স্যারও আর তাকে ডাকে নাই। স্যার সারা রাতই ঐ ব্যাক্তির বাড়ির সামনে অপেক্ষায় থাকলেন। যখন ফজরের আযান হলো, তখন ঐ ব্যাক্তি, যেহেতু আর কেউ তাকে ডাকাডাকি করে নাই, সেতো ভেবেছে যে স্যারতো চলে গেছে। কিন্তু ফজরের নামাজ পড়তে যাবার জন্য যখন দরজা খুলে দেখে যে স্যার দাঁড়িয়ে, তো স্যারকে বললেন যে আপনি এতো সকালে? তখন স্যার উনাকে বললেন যে আপনে রাতে আমাকে বললেন যে একটু দাঁড়ান, আমি আসছি। সেজন্য আমি দাঁড়িয়ে আছি। তখন উনি আর কোন কথাবার্তা না বলে উনার ছামানা নিয়ে স্যারের সাথে সোজা মসজিদে চলে আসে।

🎤 ৩৮

একবার স্যার বলেন, ইসলাম কোন ব্র্যান্ডের নাম না, দ্বীন কোন কোন ব্র্যান্ডের নাম না। যেমন বিভিন্ন পন্যের বিভিন্ন ব্র্যান্ড থাকে, তিব্বত সাবান, মাম ওয়াটার ইত্যাদি। মাম ওয়াটারের বোতলে যদি মাছি পাওয়া যায়, তবে তার ব্র্যান্ড ভ্যালু কমে যাবে, পণ্যের মূল্য কমে যাবে, মানুষ ওইটা কিনবে না। ইসলাম, সামগ্রীক ইসলাম, বা তার কোন অংশ যেমন জিকির, তেলাওয়াত, হজ্জ্ব, তাবলীগ, এসব কোন ব্র্যান্ডের নাম না। ইসলামের ভেতরের মানুষ যদি ইসলাম না মানে, মুসলমান যদি কোন অন্যায় করে তো ইসলামের ভ্যালু কমবে না। জাকের জিকির না করলে, তেলাওয়াত না করলে, জিকিরের দাম কমবে না, কোরআন শরীফের দামও কমবে না। জাকের অন্যায় করলে, আলেম অন্যায় করলে তার ভ্যালু কমবে, কমতে পারে, কিন্তু তাদের অন্যায়ের কারনে জিকিরের দাম, এলমের দাম কমবে না, দ্বীনের দাম কমবে না। অনুরূপ তাবলীগওয়ালারা যদি সব মুরতাদ হয়ে যায়, তো তবলীগের দাম কমবে না। এমনকি কিতাবের মধ্যে আছে যে দুনিয়ার সমস্ত মানুষ যদি ঐ দ্বীলওয়ালা ব্যাক্তির মতো হয়ে যায়, যার দ্বীল সবচেয়ে সুন্দর তো আল্লাহ তায়ালার রাজত্যের মর্যাদা একটুকুও বাড়বে না। ঐ রকম তবলীগওয়ালারা যদি তবলীগ ছেড়ে দেয় বা অন্যায় করে তো তাবলীগের দাম কমবে না।

🎤 ৩৯

বগুড়া জামিল মাদ্রাসার এক মুহাদ্দিস সাহেব একবার স্যারের সাথে খুব বদআখলাকি করেছিলেন। স্যার জামিল মাদ্রাসায় অনেকবার গিয়েছেন, মাদ্রাসায় থেকেছেন, এতেকাফ করেছেন, ৭ নম্বর হুজুরের সাথে খুব মহব্বতের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু উল্লিখিত মুহাদ্দিস সাহেবের আচরণ বরাবরই ভাল ছিল না। তবে এবারের বদআখলাকি টা মাত্রাতিরিক্ত ছিল। সাথীরা যারা সেখানে নিয়ে গিয়েছিলো, তারাও একটু বিব্রত হলো। ফিরে আসার সময় স্যার যখন বাসে উঠছিলেন তখন ওজর হিসাবে এক সাথী বলছিলো, ডাক্তার ... ... ... (তথাকথিত তাবলীগি এক ডাক্তার, মাদ্রাসার প্রতিবেশী) মাওলানা ... ... ... কে অনেক কিছু বুঝিয়েছে। তার এই কথা শুনে স্যার অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বললেন (স্যারকে এতো রাগান্বিত হতে স্বাভাবিকভাবে দেখা যেতো না, এবং রাগান্বিত হয়ে কোন খারাপ শব্দ বলা স্যারের আচরনের খেলাফ ছিল), মাওলানা ... ... ... কি ... ... ... রের (ঐ ডাক্তার) পোষা কুকুর, যা বলবে তাই শুনবে, যা শুনবে তাই বিশ্বাস করবে (তার এলম, তার শিক্ষা কোথায় গেলো)?

🎤 ৪০

নূর মোহাম্মদ ভাই শূরা হবার পরে মাহফুজ ভাই একবার কথাপ্রসঙ্গে স্যারকে বলছিলেন, উনি শূরা হলো ভালোই হলো, আপনি তার সাথে সংশোধনের এতো মেহনত করলেন, এখন উনি ভেতর থেকে সংশোধনের ফিকির করতে পারবেন। তখন স্যার হালকা হাসতে হাসতে বললেন, যে সংশোধন করতে চায় আল্লাহ তার দ্বারা একাজ নেয় না। মাহফুজ ভাই স্যারকে বললেন উনাদের (কাকরাইলের মুরব্বীদের) এই অবস্থায় আপনি বাইরে কেনো, আরেকটু কাছে থাকলে ভাল হতো। তখন স্যার বুকের সাথে হাত লাগিয়ে বললেন, এখান থেকে তোমাকে যদি ঘুসি দেই তো অতো লাগবে না, দূর থেকে দিলে লাগবে, দূর থেকে কাজ করাও সহজ, দূর থেকে হিট করাও সহজ। মাহফুজ ভাই আবার বললেন স্যার বর্তমানের কাকরাইলের (আমাদের মুরব্বীদের, কাজের তরতীবের, এতো এতো হালাত, এতো অনিয়ম বিশৃংখলা, এতো স্বেচ্ছাচারিতা) এই অবস্থায় আমাদের কি হবে, কিভাবে এর উত্তরন সম্ভব? তখন স্যার খুব দৃঢ়তার সাথে বললেন, আল্লাহ অক্ষম হয়ে পড়েননি।

🎤 ৪১

একবার এক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যার বলেন, অযোগ্যদের অস্ত্র হলো পাংচুয়ালিটি (সময়ানুবর্তীতা, নিয়মানুবর্তীতা ইত্যাদি)। ওরা পাংচুয়াল থেকে কাজ করতে চায়, জিসিয়াসরা পাংচুয়াল হতে পারে না। সাহাবায়ে কেরাম, তাদের কোনো রুটিন লাইফ ছিল না, কি করতেন আলী (রা:), তাদের ডেইলি লাইফ, রুটিন লাইফ বলা মুসকিল। ওমর (রা:) ডেইলি কি করতেন তার রুটিন পাওয়া মুসকিল। বিভিন্ন বয়ানে স্যারের একটা কমন উদাহরন ছিল, আল্লাহ তায়ালা যদি আসমানের তারা মানুষকে সাজাতে বলতো তো মানুষ সোজা লাইনে সাজাতো, সব একই রকম বাল্ব দিয়ে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা আসমান সাজিয়েছেন তারকারাজী দিয়ে, কোনটা ছোট কোনটা বড়, কোনটা দূরে কোনটা কাছে, সব এলোপাথারী, এর মধ্যে সৌন্দর্য আছে। বন সুন্দর, সেখানে কোন রুটিন নাই, এলোপাথারী। মানুষের তৈরী রাস্তা সোজা হয়, কিন্তু মেঠোপথ নদী সব আকাঁবাকা হয়, বন জঙ্গলের গাছপালা, পাহার পর্বতের সারিবদ্ধতা, সমুদ্রের গভীরতা ইত্যাদির কোন নির্দিষ্ট মাপ, কোন নির্দিষ্ট রুটিন নাই।

🎤 ৪২

ডাক্তার মোয়াজ্জেম ভাই, ডাক্তার জিয়া ভাই, ডাক্তার আফতাব ভাই উনারা তখন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র, সম্ভবত তখন শেষ বর্ষের ছাত্র ছিল। এস্তেমার ময়দানে তাদের জামাতের কাছে স্যারকে নিয়ে গিয়েছিলেন একটু কথাবার্তা বলার জন্য, তশকীল করার জন্য। স্যার ঐ মেডিকেলের ছাত্রদের মধ্যে, যেখানে আরো জুনিয়র সিনিয়র ছাত্ররা ছিল, স্যার বয়ান শুরু করলেন এই কথা দিয়ে যে পৃথিবীতে যতো পেশা আছে তার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট পেশা হলো ডাক্তারী পেশা। কারন মানুষের একটা অসহায়ত্বকে পুজিঁ করে তারা টাকা উপার্জন করে, একজন কাউকে কোন সুপরামর্শ দিয়ে টাকা দাবী করতে পারে না। এজন্য পেশা হিসাবে যদি দেখা হয়, সবচেয়ে জঘন্য পেশা হলো ডাক্তারী পেশা। আর এর রুহানী দিকটা আরো গভীর, ডাক্তাররা অবচেতনভাবে চায় মানুষ বেশী অসুস্থ হোক, তাহলে তার প্রফিট বাড়বে, এটা আরো মারাত্বক।

🎤 ৪৩

অনেক সময় আমরা যে কোন একটা হক্ক কথা বলাকে ফেতনা মনে করি। হক্ক¦ কথাটা এই পরিস্থিতিতে বলে ফেললে এটা প্রতিক্রিয়া আসবে, মানুষের মধ্যে মনমালিণ্য সৃষ্টি হবে, আমার সাথে তার সম্পর্কটা খারাপ হয়ে যাবে, বা মেহনত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা খারাপ হয়ে যাবে। এই কারণে আমরা অনেক সময় হক্ক¦ কথাটা না বলে বিষয়টা এড়িয়ে যাই, এবং আমরা হক্ক¦ কথাটা না বলার জন্য আমরা যুক্তি দেখাই যে এই কথাটা এখন বললে ফেতনা হবে। এপ্রসঙ্গে স্যারের কথা শুনেছি এটাতো আসলে ফেতনা না, ফেতনা হলো এমন একটা অবস্থা যে অবস্থায় মানুষ কোন বিষয়ে চুপ থাকা দরকার আর কোন বিষয়ে কথা বলা দরকার, কোনটা গ্রহণীয় কোনটা বর্জনীয়, কোনটা হক্ক¦ কোনটা বাতিল এর মধ্যে তফাৎ করতে পারবে না। অর্থ্যাৎ ফেতনা হলো ঐ অবস্থা যেঅবস্থায় মানুষ হক্ক¦ বাতিলের পার্থক্য বুঝবে না।

🎤 ৪৪

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনের একই রুমে কাজল ভাই এবং স্যার একটা দীর্ঘ সময় থেকেছেন। কাজল ভাই বলেন, ঐসময় নামাজের জন্য বেশীরভাগ সময় নিকটবর্তী কাজলা গেট মসজিদে যাওয়া হতো, টিন শেডের ছোট মসজিদ ছিল। আমি প্রায় সময়ই মসজিদে ঢোকার সময় ডান হাতে সেন্ডেল নিয়ে ঢুকতাম, ভেতরে রাখতাম। স্যার সেটা হয়তো অনেকবার লক্ষ্য করেছেন, কিন্তু স্যার আমাকে তাৎক্ষণিক কিছু বলেননি। এর দীর্ঘদিন পরে, প্রায় মাস দুয়েক পরে একদিন সাহেব বাজার থেকে এক রিক্সায় স্যারের সাথে আসছিলাম। রিক্সায় চড়ে স্যার কথা শুরু করলেন, কথা এভাবে শুরু করলেন যে একজন সাহাবী মসজিদে ঢুকলে রসূল (সা:) উপস্থিত সাহাবীদের বললেন, তোমরা কি জান্নাতী লোককে দেখতে চাও? কিছু সাহাবী বললেন, ইয়া রসূলুল্লাহ আমরা দেখতে চাই। তো রসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, ঐব্যাক্তিকে দেখো যার বাম হাতে সেন্ডেল আর দাড়ি থেকে টপ টপ করে ওজুর পানি ঝড়ছে। কাজল ভাই বলেন, আমি তখন বুঝতে পারলাম যে এখন স্যারের এই কথার মানে কি, আমি বাম হাতে সেন্ডেল নিতাম না আর ডান হাতে সেন্ডেল নিয়ে মসজিদে ঢুকতাম। কিন্তু এটা স্যার দেখে আসছেন দুই মাস আগে থেকে, আমার সংশোধন হিসাবে স্যার এই কথা এতোদিন পড়ে বলছেন। এবিষয়ে স্যার যে হেকমত অবলম্বন করলেন, যে আমার একটা সংশোধন দরকার ছিল, একটা আমল সুন্দরভাবে হওয়া দরকার, সেব্যাপারে স্যার তাৎক্ষণিক বলেননি, দুইমাস পড়ে বললেন আর একটা ঘটনা দিয়ে এই কথা বুঝালেন যা থেকে আমি বুঝে নিলাম যে আমি যে কাজটা করি সে কাজটা শুদ্ধ ছিল না, সেটা ভূল ছিল।

🎤 ৪৫

জুবেরী ভবন থেকে বের হয়ে মসজিদে যাবার পথে একটা ড্রেনের মতো ছিল। সরু রাস্তায় ঐ ড্রেনটা পার হয়ে মসজিদে যেতে হতো। কাজল ভাই বলেন, একবার আমরা একসাথে বের হয়ে আমি ডান দিকে এবং স্যার বাম দিকে একসাথে হাঁটছিলাম। সাধারণত আমরা যেটা বুঝে থাকি যে বয়োজোষ্ঠ বা বয়স্ক থাকলে তাকে আগে পার হতে দেই। আমি স্যারের ডান দিকে, আর স্যার বাম দিকে ছিলেন। সরু পথে একটু বড় কদমে ঝাপ দিয়ে ড্রেনটা পাড় হতে হবে। আমি স্যারকে বললাম যে স্যার আপনি আগে পাড় হন। তখন স্যার বললেন, না, যে ডানে থাকে তারই হক্ক বেশী থাকে। তুমি আগে পার হও, তারপরে আমি পার হচ্ছি। কাজল ভাই বলেন, এতো ছোট ব্যাপারও যে একটা দ্বীনি ব্যাপার হতে পারে, আর একসাথে চলতে গেলে যে ডান বামের ও একটা আমল আছে, সেটা স্যারের কাছ থেকে তখন আমি শিখলাম।

🎤 ৪৬

কথা প্রসঙ্গে স্যার একবার বলছিলেন, তিন ভাই, দুই ভাই শহরে থাকেন আর ছোট ভাই গ্রামে থাকেন। ঐ তিন ভাইয়ের মধ্যে সম্পত্তি বন্টন হবে বাড়ীতে। পড়ের দিন বাড়ীতে আসবেন শহরের ঐ দুই ভাই। এক ভাই সারা রাত তাহাজ্জুদ পড়লেন, আল্লার কাছে কান্নাকাটি করলেন, তেলাওয়াত করলেন, দোয়া খায়ের করলেন যে আয় আল্লাহ, সম্পত্তি বন্টনের ব্যাপারে কাল যাবো, আমি যেনো আমার ভাগটা ঠিক মতো পাই, বাপের জমি ভিটার ভাগ, আমি যেনো না ঠকি, গ্রামের সালিশ মোকদ্দমার ব্যাপার, আমার পৈত্রিক নেক হালাল অংশ আমি যেনো বের করতে পারি, আমি যেনো তা সুন্দরভাবে বুঝে পাই, সারা রাত নামাজ এবাদতের মধ্যে ও দোয়ার মধ্যে কাটালেন। তার নিয়্যত আমি আমার পাওনার অংশটা বুঝে নেবো, পৈত্রিক ভিটা পরিচয়টা থাকবে। শস্য আবাদ বা সেখান থেকে হয়তো কিছু আয় উপার্জন হবে, সেই আয় থেকে কিছু দান ছদকাও করবো। কিন্তু আরেক ভাই, তার নিয়্যত অন্য রকম। সে সারারাত ঘুমালো, বন্টন পাওনা ইত্যাদির ব্যাপারে তার অতো টেনশন নাই, তাহাজ্জুদ কান্নাকাটি কোনটাই করলো না, ঘুমিয়েই রাত পার করলো। তার নিয়্যত যে আমি কালকে বাড়ীতে যাবো, বাড়ীতে যেয়ে আমার সম্পূর্ণ অংশ আমি ছোট ভাইকে দলিল করে দিয়ে আসবো। মৌখিক না, মৌখিক দিলে হয়তো তার মনের মধ্যে একটা সংকোচ থাকবে, সম্পূর্ন তাকে দলিল করে দিয়ে আসবো। এই ভাই যে দলিল করে দিয়ে আসতে চাচ্ছে, সে সারা রাত ঘুমালো। এই ভাইয়ের সারারাত ঘুম আর আরেক ভাইয়ের সারারাত নামাজ এবাদত, স্যার জিজ্ঞেস করলেন, এই দুইজনের মধ্যে আল্লার কাছে মাহবুব কে, কে আল্লাহ পাকের কাছে বেশী প্রিয় হবে, ঐ তাহাজ্জুদগুজার নাকি ঐ ঘুম পাড়নেওয়ালা? স্যার বললেন, আমাদের কথা হলো এই ঘুমপারনেওয়ালাই আল্লাহর কাছে বেশী প্রিয় হবে, আল্লার বেশী নৈকট্য সে পাবে, এরদ্বারা সে আল্লাহকে আরো বেশী রাজী করতে পারবে।

🎤 ৪৭

কাজল ভাই বলেন, একদিন রিক্সা থেকে নেমে আমি রিক্সাওয়ালাকে ভূল করে ১৫ টাকার ভাড়া ২০ টাকা দিয়ে বলি নেন। তখন আমার আবার মনে পড়লে, আমি বলি ভাড়াতো ১৫ টাকা, ৫ টাকা দেন। তখন স্যার বললেন যেহেতু তুমি বলেছো নেন, অতএব এই টাকা তার হয়ে গেছে, এখন এটা আর তোমার টাকা না, এখন তুমি আর ৫ টাকা পাবে না। কাজল ভাই বলেন, এতো ছোট ব্যাপারও যে একটা শেখার ব্যাপার ছিল, এটাও যে একটা দ্বীনি ব্যাপার, লেনদেনের ব্যাপার সেটা এর পূর্বে আমার মাথায় ছিলো না।

🎤 ৪৮

একবার স্যার বলেন, দুনিয়ার সব কাজ চলে দুইটা জিনিষের দ্বারা, ‘জোর’ আর ‘জুরি’। আর দ্বীনের মেহনত চলে ‘জারি’ তে। জোর হলো শক্তি, ক্ষমতা, যোগ্যতা ইত্যাদি, আর জুরি হলো সোনাদানা, টাকাপয়সা, সম্পদ ইত্যাদি। দ্বীনের কাম শক্তি, ক্ষমতা আর সম্পদের দ্বারা চলে না, দ্বীনের কাম চলে কান্নাকাটি আর দোয়ার দ্বারা।

🎤 ৪৯

বিভিন্ন সময় মোজাকারায় স্যারের কাছে শুনেছি, সময়ের ব্যবহারের দিক থেকে তাবলীগের কাজ দুই ধরণের। এক ধরণের তাবলীগওয়ালার সম্পর্ক থাকে সাধারণ মানুষের সাথে ও সাধারণ দাওয়াত তালিমের কাজের সাথে, আরেক ধরনের তাবলীগওয়ালার সম্পর্ক থাকে প্রশাসনিক কাজের সাথে। স্যার উদাহরণ দিতেন, ডাক্তারদের মধ্যে দুই ধরণ আছে, কিছু ডাক্তার রুগী দেখেন আর কিছু ডাক্তার প্রশাসক হিসাবে কাজ করেন। যেমন সিভিল সার্জন পদটা রুগী দেখার জন্য না, প্রশাসক পদ, ডাক্তারদের ব্যবস্থাপনায় সে থাকে। মূল ডাক্তার যারা, যারা রুগী দেখে, যতদিন যায় তারা ডাক্তারি বিদ্যায় পারদর্শী হতে থাকে, আর যারা সিভিল সার্জন বা এধরনের প্রশাসন লেভেলে চাকরী করে তারা ডাক্তারী বিদ্যা ভূলতে থাকে আর ম্যানেজমেন্টে পারদর্শী হতে থাকে। এমন অনেক প্রশাসক ডাক্তার আছেন যারা বছর চলে যায় কিন্তু একজন রোগীও দেখেননা, অথচ তারা খুব ব্যাস্তও থাকেন রোগী ও ডাক্তারদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে। বডি শো, মাশোয়ারায় নিজের ভুমিকার নিশ্চিত করা, জোড়, পরিসংখ্যান কালেকশান ইত্যাদির নামে অতো বেশী সময় দেয় না কিন্তু মূল দাওয়াতের কামের সাথে সময় দেয়, মূল তাবলীগে, গাসত তালীমে বেশী বেশী সময় দেয়, তাদের ভেতরে তাবলীগের ছিফতগুলো বাড়তে থাকে, আল্লার মহব্বত, সাধারণ মানুষের মহব্বত, দ্বীনের প্রতি মহব্বত বাড়তে থাকে, আল্লার ভয় বাড়তে থাকে, আল্লার কাছে নিজেকে কবুল করানোর জজবা বাড়তে থাকে। অন্যদিকে যারা বেশী বেশী তবলীগের প্রশাসনিক কাজ করতে থাকে, মূল কাজ ছেড়ে বেশী দিন তাবলীগের ব্যবস্থামূলককাজে নিজেকে ব্যাস্ত রাখে তাদের মধ্যে তাবলীদের একটা সর্দারী মাতব্বরী চলে আসে, নিজে অনেক বড় কিছু করছে ভাবতে শুরু করে, দ্বীনি ছিফতের পরিবর্তে তার মধ্যে মাতব্বরীর ছিফত আসতে থাকে। এখন আমরা কোনটা চাই? আমি কি তাবলীগের সর্দার হতে চাই নাকি সাধারণ মুসলমান হিসাবে, গাসত তালিত ও মূল তাবলীগের কাজের সাথে নিজেকে ব্যাস্ত রেখে আল্লার সাথে সম্পর্ক বাড়াতে চাই? আমাদের এসলাহটা এই জায়গাতে দরকার, আমাদের দ্বীলটা পাক হয়, মাতব্বরীর জজবা দ্বীলে না থাকে, তাবলীগের মূল কাজগুলো, দাওয়াত, তালিম, এবাদত, খেদমত, জিকির ইত্যাদি খুব গুরুত্বের সাথে করবো, প্রশাসনিক কাজে কমই থাকলাম তাতে অসুবিধা কি, কোনভাবে দ্বীলে না চেয়ে কোন প্রশাসনিক কাজ চলে এসেছে, তা তো ফেলে দেওয়ার না কিন্তু তাবলীগের মূল কাজগুলো ভূলে গিয়ে দিনের পর দিন তাবলীগের ব্যবস্থাপনায় নিজেকে জড়িত রাখা বেশীরভাগ সময় আমাদের লক্ষ্যভ্রষ্ট করে অন্যদিকে নিয়ে যায়।

🎤 ৫০

একবার স্যার বলছিলেন, ডাস্টবিনে ময়লা পরে আছে, আর একজন গরীব লোক সেই ময়লা খাচ্ছে। তখন লোকটার এ অবস্থা দেখে আফসোস লাগে, হায়রে বেচারা গরীব অসহায়, এই ডাস্টবিনের ময়লা তুলে খাচ্ছে। আরেকজন ঘুষ খাচ্ছে, তার এই ঘুষ খাওয়া দেখে তার প্রতি রাগ হয়, এই ঘুষখোরের প্রতি ঐরকম আফসোস লাগে না। তার প্রতি রাগ হয়, এই ব্যাটা ঘুষ খাচ্ছে, খারাপ লোক, জুলুম করছে ইত্যাদি। এর প্রতি আফসোস না হয়ে রাগ হয় কেন, কারণ হলো ঐটার প্রতি আমারও ঝোক আছে, আমি পারছি না আর সে পারছে। কেন রাগ হলো? ঐ যে ডাস্টবিনের ময়লা আবর্জনা খাচ্ছে, সে তো ওই ঘুষখোরের চেয়ে ভালো আবস্থায় আছে, যে ঘুষ খাচ্ছে সে তো জাহান্নামের আগুন খাচ্ছে, যে ময়লা খাচ্ছে সে তো জাহান্নামের আগুন খাচ্ছে না। এর প্রতি মায়া লাগলো আর যে ঘুষ খাচ্ছে তার প্রতি রাগ লাগলো কেন, ময়লাখানেওয়ালার প্রতি রাগ হলো না? স্যার বলেন, একজনের তাবলীগ চালানো, মেম্বারের সামনে বডি শো করা, মাশোয়ারা নিজের আয়ত্বে নেয়া, মুরব্বীগিরী, তাবলীগের কাজে নিজের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি দেখে তার প্রতি রাগ আসলো কিন্তু তার প্রতি মায়া আসলো না, আমার চোখে পানি আসলো না কেন? মানে আমারও মনে চায় আমি একটু বড় হই, লোকজন আমাকে চিনুক, আমি একটু মাতব্বর হই, কিন্তু হতে পারছি না বলে আমার রাগ। তার এই হালতে তার প্রতি মায়া থেকে আমার চোখে পানি আসে না। অন্যের সামনে বড় হই তা আমিও চাই, কিন্তু আমি পারছি না যার কারনে তার প্রতি রাগ আসে। মন্ত্রী তো আমিও হতে চাই, আমি তো নিজেকে মন্ত্রী হওয়ার প্যানেলের একজন মনে করতাম কিন্তু আমি হতে পারি নাই, তো যে মন্ত্রী হয়েছে তার প্রতি তো রাগ হবেই। মন্ত্রীর দুষ্কর্মে তার প্রতি মায়া আসবে না, রাগ আসবে মন্ত্রীর কাজে, কারণ আমার তো ঐ একই জজবা।

🎤 ৫১

এক মোজাকারায় স্যার বলছিলেন, ওরা বলে মুসফিক খারাপ, মুসফিক খারাপ, মুসফিক খারাপ, আর তুমি বললে মুসফিক ভালো, মুসফিক ভালো, মুসফিক ভালো, তাদের এই খারাপ বলার দ্বারা খারাপ কি হলো আর তোমার এই ভালো বলার দ্বারা তোমার নিজের ভালো কি হলো? এই ভালো ভালো ভালো জিকির করার দ্বারা তোমার লাভ কি হবে যদি নিজের করনীয় কাজ না করো?

🎤 ৫২

আব্দুল ওয়াহাব ভাইয়ের কথা উল্লেখ করে স্যার একবার বলছিলেন, আমরা সোহবত থেকে উপকৃত হওয়ার যোগ্য নই। সোহবতের যে একটা সাধারন ব্যাখ্যা আমরা বুঝি যে কারো কাছে পড়ে থাকা বা কারো বুজুর্গী বা কারো ফয়েজে চলা, স্যার এটা একটু ভিন্নভাবে দেখতেন। কারো কাছে পড়ে থাকার অর্থ হলো তার সোহবতের দ্বারা আমল করা বা তার আদেশ প্রতিপালন করা। কার্যত তার আদেশকে বাস্তবায়ন করা, তার আদেশ প্রতিপালন করাটাই হলো সোহবত। তার আদেশ মানলাম না, কাছে থাকলাম, এইটা সোহবত না। সোহবতের মানে এটা না যে তার ফয়েজ বরকতে আমি চলবো, মানে গাড়ী আরেকজন চালাচ্ছে আর আমি সেই গাড়ীতে পার হয়ে যাবো, ব্যাপারটা এরকম না। বা তার গাড়ীর পেছনে ফুটো করে তার পেট্রোল চুরি করে নিলাম আমার গাড়ীতে ভরবো বলে, এইটাও সোহবত না, সোহবত হলো তার আদেশের কার্যকরী প্রতিপালন ।

🎤 ৫৩

নিজের ব্যাপারে বলতে গিয়ে স্যার একবার বলেন, আমার গোসল প্রীতি নাই আর সফর ভীতি নাই। আমরা যে নিয়মিত গোসল করি, দৈনিক গোসল করতেই হবে, এটা স্যারের অভ্যাসের মধ্যে ছিল না। আর সফরের ব্যাপারে স্যারের কোন ক্লান্তি ছিল না। দিন রাত, সকাল দুপুর, শীত গরম বর্ষা, মাসের পর মাস সফর করতেন। সফরে স্যার ক্লান্ত হতেন না।

🎤 ৫৪

স্যারকে একপায়ে ভর দিয়ে দাড়াঁনো, বা কোন কিছুর সাথে হেলান দিয়ে দাড়াঁনো আবস্থায় দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য়, ৩য় বা ৪র্থ বিজ্ঞান ভবনে সিড়িঁ বেয়ে উপরে উঠার সময়ে বা সফরে বা গাসতে স্যারকে কখনোই সিড়িঁর রেলিং ধরে উপরে উঠতে দেখি নাই। সিড়িঁর মাঝ দিয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠতেন। উপরে উঠতে পারাপারি করতেন না, এবং সিড়িঁর ধাপ ছোট হলেও একসাথে দুইধাপ উঠতেন না, সিড়িঁ বেয়ে নামার সময়ও তাড়াহুড়া করতেন না, ধীরে ধীরে এক ধাপ এক ধাপ করে নামতেন। লিফটে উপরে উঠার সময়ও স্যারকে লিফটের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাড়াঁতে দেখি নাই। বাসে ট্রেনে প্লেনে সফরে চলন্ত অবস্থায় স্যার এতো জোরে কথা বলতেন না যে সামনের বা পেছনের যাত্রীরা শুনতে পায়। গাড়ীতে বা লিফটে অনেকের মধ্যে স্যার নিজের সাথীর সাথে বা পরিচিত জনের সাথে নিজেও জোরে কথা বলতেন না, অন্য কারো জোরে জোরে ব্যাক্তিগত কথা বলাও পছন্দ করতেন না।

🎤 ৫৫

ফেনীতে চিল্লার জামাতে, ২০০১ সালে, সেখানকার মুরব্বী সূফী আব্দুল গণী সাহেব ৫০০ টাকা দিয়েছেন, জামাতের মেহমানদারীর জন্য। আমীর সাহেব ইতস্থত করছে যে মাশোয়ারা করে নিবো। এই কথাতে স্যার মারাত্মক মন খারাপ করে বললেন, এটা চরম বেয়াদবী, উনি আমাদের সবার মুরব্বী, উনার এই ৫০০ টাকা দেওয়া এটা উনার আদেশ সমতূল্য। স্যার নিজে দুই হাত পেতে খুব সম্মানের সাথে মহব্বতের সাথে সেই টাকা নিলেন আর বললেন, আপনার আদেশ হিসাবে আমরা এটা গ্রহন করলাম। আর সেই টাকা দিয়ে জামাতের মেহমানদারী করা হলো।

🎤 ৫৬

খুলনার হাফেজ মামুন ভাই বলেন, স্যারকে প্রথম আমি যখন দেখেছি আমি তখন হেফজ পড়ি। ঐ সময় আমি কতবড়, নাইন পাস করে হিফজ খানায় ভর্ত্তি হয়েছি। ঐ সময় স্যারের সাথে আমার প্রথম পরিচয়ে স্যার আমাকে যে সম্মান দিয়েছেন, আমার কাছে মনে হয়েছিল যে উনি আমার ছাত্র আর আমি তার উস্তাদ। এই ধরনের আচরণ আমি আর কারো কাছে পাই নাই। স্যারের প্রচন্ড জ্বর ছিল, বনানীর এক মসজিদে জামাতে ছিলেন, স্যার শুয়ে ছিলেন, আমি গিয়ে স্যারের কাছে বসেছি, স্যার শুয়ে থেকে আমার সাথে কথা বলতে পারতেন কিন্তু উনি উঠে বসলেন, পাগড়ী মাথায় দিলেন, আমার সাথে কথা বললেন। মুসাফা করেননি আমার সাথে ঐদিন, হাত পেছনে ঠেক দিয়ে বসেছিলেন, আচরনের দ্বারা স্যার আমাকে বুঝতে দেন নাই যে স্যারের জ্বর। আমার কথা শেষে স্যার আমাকে বললেন, আমার খুব জ্বর জ্বর লাগছে, আমি কি একটু শোবো? তারপর পাগড়ী খুললেন মাথা থেকে, তার আগ পর্যন্ত পাগড়ীও খুলেননি মাথা থেকে। বয়সের দিক থেকে হোক, যোগ্যতার দিক থেকে হোক, পড়ালেখার দিক থেকে হোক, মর্যাদার দিক থেকে হোক, কোন দিক থেকেই আমি নিজেকে স্যারের ধারে কাছের কল্পনাও করতে পারি না, এভাবে একজন মানুষকে সম্মান করা আমি আর কাউকে কখনো দেখেনি।

🎤 ৫৭

একবার স্যার বলেন, দ্বীনের যে মেহনতই করি না কেনো যদি তার দ্বারা দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি পয়দা না হয় আর আখেরাতের প্রতি আসক্তি না বাড়তে থাকে তো আমি ভুল পথে আছি, বা আমার দ্বারা দ্বীনের মেহনত ঠিক হচ্ছে না। অথবা আমি যাকে অনুসরণ করছি বা যাদেরকে সামনে রেখে চলছি তারা ঠিক পথে নাই। দ্বীনের মেহনতের বৈশিষ্ট্য হলো দুনিয়ার প্রতি একটা তাচ্ছিল্য নিয়ে আসবে, যদি এটা না আসে তাহলে দ্বীনের নামে যে মেহনত আমি করছি সেটা হাক্বীকতের দ্বীনের মেহনত না, অন্য কিছু মিশ্রিত হয়ে গেছে। মেহনতের নামে আমি যে পথে চলছি, সেটা ভুল পথ অথবা আমি যাকে অনুসরণ করছি তিনি ভুল পথের পথিক। আব্দুর রহমান (রাঃ) তাবেয়ীদেরকে বলছেন, তোমরা সাহাবীদের থেকে আমল বেশী করো, কিন্তু তারা তোমাদের থেকে উত্তম ছিলেন। তখন এক তাবেয়ী বলেন, যদি আমরা আমলই বেশী করি তাহলে তারা আমাদের থেকে কেমন করে ভালো ছিলেন? তখন উনি বলেন সাহাবারা তোমাদের থেকে অনেক বেশী দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত এবং আখেরাতের প্রতি আগ্রহী ছিলেন।

🎤 ৫৮

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন বিভাগ ভিত্তিক ভর্ত্তি পরীক্ষা হতো। কাজল ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার পরে তখন এই ভর্ত্তি পরীক্ষা শুরু হয়। যোগদানের পরে আল্লার রাস্তায় সফর করার নিয়্যত ছিলো। ভর্ত্তি পরীক্ষার এই সুযোগে বিভাগের সিনিয়র প্রফেসরের সাথে ছুটির ব্যাপারে পরামর্শ করছিলেন। লম্বা সময়ব্যাপী ভর্ত্তি পরীক্ষা, তার সাথে যদি কিছু অর্জিত ছুটি নেয়া যায় তাহলে পুরা চিল্লার সফর হতে পারে। তো সিনিয়র ঐ প্রফেসর পরামর্শ দিলেন যে তুমি কেবলমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করলে, এখন টাকা পয়সারও দরকার, এই মুহুর্তে ছুটি না নিয়ে ভর্ত্তি পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন করলে বড় একটা টাকা পাওয়া যাবে, তুমি এই মুহুর্তে ছুটি না নিয়ে বরং গ্রীষ্মের ছুটিতে চিল্লায় যেয়ো। কাজল ভাই উনার সিনিয়রের পরামর্শ স্যারকে জানালে স্যার বিস্তারিত কথা শুনে বললেন, আমাদের নফস এটা চায়না যে উপার্জনকে আমরা কম করে দিবো, বরং নফসতো এটা চায় যে উপার্জন বেশী করবো আর দান ছদকা করবো, অসুবিধা কি। এব্যাপারে একটু বিস্তারিত বলতে গিয়ে স্যার বললেন, মনে করা যাক কেউ প্রমোশন পেতো কিন্তু প্রমোশন নিলো না, বা বর্তমান ব্যবসার পাশাপাশি আরেকটা ব্যবসা শুরু করতে পারতো কিন্তু করলো না, ইচ্ছাকৃতভাবেই উপার্জনকে কম করে দিলো, এটা দান ছদকা করার চেয়ে আ’লা দরজার। আর এটা নফস চায় না, নফসতো দান ছদকা করা, ভাল কাজে পয়সা খরচ করা ইত্যাদির কথা মনে জাগিয়ে উপার্জন বেশী করার দিকেই মনোযোগ ফেরাতে চায়।

🎤 ৫৯

কাজল ভাই বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার শুরুর দিকে একটা বড় সময় স্যারের সাথে জুবেরী ভবনে একরুমে থেকেছি। আবার এরপর কাজলায়ও লম্বা সময় স্যারের সাথে একত্রে থাকার সুযোগ হয়েছে। খুব কাছে থেকে স্যারকে দেখতে পেরেছি, স্যারের জীবনে স্যারের কথার বাস্তবায়ন থাকতো। যেহেতু আমি তখন একা আর স্যারের সাথে থাকি, স্যারকে কেউ দাওয়াত করলে স্যার বলতেন আমার সাথে কাজলও আছে, সেই সুবাদে স্যারের সাথে অনেক জায়গায় যাবার সুযোগ হয়েছিলো। এরকম এক দাওয়াতে আব্দুস সোবহান স্যার (তখনকার সিন্ডিকেট মেম্বার) এর বাসায় গেলে দেখি সেখানে ওসমান গনী স্যারও আছেন। খানা শুরুর আগেই স্যারকে ওসমান গনী স্যার বললেন, আজকে আমরা কেনো আপনাকে দাওয়াত করেছি জানেন স্যার? স্যার হেসে বললেন কেনো, খাওয়ার জন্য দাওয়াত করেছো। উনি বললেন না স্যার, আজকে খাবার আগে একটা শর্ত আছে। আপনার অবসর গ্রহনের প্রায় সময় হয়ে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তো সহকারী অধ্যাপক হিসাবেই আপনি চাকরী জীবন শেষ করলেন, আজকে আমাদের একটা কথা দিতে হবে যে আপনি সহযোগী অধ্যাপকের জন্য আবেদন করবেন। আব্দুস সোবহান স্যার, ওসমান গনী স্যার উনারা দুজনেই স্যারের ছাত্র, উনারা অনেক আগেই পূর্ণ অধ্যাপক হয়ে গেছেন, অথচ স্যার তখনও সহকারী অধ্যাপক। কাজল ভাই বলেন, আমার চাকরীর কেবল তিন বছর, আমিও তখন সহকারী অধ্যাপক, অথচ স্যারের চাকরীর শেষ প্রান্তে এসেও স্যার সহকারী অধ্যাপকই রয়ে গেছেন, নিজে থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদের জন্য কখনো আবেদন করেননি। আব্দুস সোবহান স্যার তখন স্যারকে বললেন, দরখাস্ত আমরাই করবো, ফর্মগুলো আমরাই পূরণ করবো, শুধু আপনার কিছু কাগজপত্র লাগবে, আপনি সেগুলো দিবেন আর স্বাক্ষর করবেন। স্যার মুচকী হেসে বললেন ঐসব কাগজগত্র আমার কোথায় আছে আর কোথায় খুজঁবো। উনারা নাছোর বান্দা হয়ে বললেন, না স্যার আমাদের কথা দিতে হবে, আপনি সেগুলো দিবেন আর স্বাক্ষর করবেন। কাজল ভাই বলেন, আব্দুস সোবহান স্যার ও ওসমান গনী স্যার সব ব্যাবস্থা করেন, এবং স্যার স্বাক্ষর দেন ঠিকই, কিন্তু এটা আব্দুস সোবহান স্যার ও ওসমান গনী স্যাররাই করান, এটা ছিলো স্যারের অবসরের বছর খানেক আগের কথা। আর যেদিন সহযোগী অধ্যাপকের জন্য স্যারের আবেদন বিভাগীয় সুপারিশের জন্য স্যারের ডিপার্টমেন্টে যায়, ডিপার্টমেন্টের তখনকার সিনিয়র অধ্যাপক অরুন কুমার বসাক বলেন, আমাদের ডিপার্টমেন্টের জন্য আজকে খুব ভাল একটা খবর যে ডিপার্টমেন্ট মুসফিক আহমাদকে প্রমোশন দিতে পারলো। স্যার অনেক আগেই ফুল প্রফেসর হতে পারতেন, স্যারের বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরী জীবনের একেবারে শেষ সময়ে, একটু আবেদন করলেই প্রমোশন হয়, প্রতি মাসে বেতন অনেক বেশী পেতে পারতেন, চাকরী শেষে অবসরের সময়ও বেশী আর্থিক সুবিধা পেতে পারতেন, কিন্তু স্যার নিজে থেকে সেটা করেননি। এব্যাপারে কাজল ভাই বলেন, স্যারের জীবন স্যারের ঐ কথার বাস্তব উদাহরণ যে, দান ছদকার চেয়ে আ’লা দরজা হলো উপার্জনকে কম করে দেওয়া।

🎤 ৬০

বাঘার শহীদুল ইসলাম ভাই বলেন আমি একবার স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, এখন আমরা ব্যাক্তিগত ও বিভিন্ন ব্যাপারে আপনার সাথে পরামর্শ করি, আপনার সাথে থাকি, আপনি যদি আমার আগে চলে যান তাহলে কার সাথে থাকবো, কার সাথে চলবো? সংক্ষিপ্ত উত্তরে বললেন ‘জামাতের সাথে’। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, কোন জামাতের সাথে? স্যার এবারও একটা শব্দ বললেন, “জিকির”। এর বিস্তারিত আমি ঐ সময় স্যারকে কিছু জিজ্ঞাসা করি নাই, আর স্যারও এব্যাপারে এতটুকুই বলেছেন, বিস্তারিত কিছু বলেন নাই।

🎤 ৬১

স্যার একবার বলেন, যে দ্বীন বুঝে তার জন্য অন্যকে দ্বীন বোঝানো সহজ, এক্ষেত্রে ভাষা জানা, তার সংস্কৃতি জানা জরুরী না, জরুরী হলো সে নিজে দ্বীনকে বুঝে কিনা। যে কোন বিষয় যদি কেউ নিজে বুঝে থাকে তার জন্য সেটা অন্যকে বুঝানো অত্যন্ত সহজ। আসল হলো নিজে বুঝতে পারা, যে নিজেই বুঝে না সে অন্যকে আর কি বুঝাবে। আমি যদি দ্বীন বুঝে থাকি যে কোন লোককে আমি দ্বীন বুঝাতে পারবো, ভাষা এখানে মূল ফ্যাক্টর হবে না, এর বাস্তব উদাহরণ হলো সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, নিজের বুঝাটাই মূল, যে নিজে দ্বীনকে নিজে থেকে অনুধাবন করতে পারে, সে সমস্ত ভাষাভাষিদেরকেই দ্বীন বুঝাতে পারবে যদিও তাদের ভাষা সে নিজে না জানে।

🎤 ৬২

মাদানীনগর মাদ্রাসায় রমজানে এতেকাফে থাকাকালীন এক মোজাকারায় স্যার বলছিলেন, গরীবদের মাঝে বেশী সময় ব্যয় করার মধ্যে নিজের অনেক ফায়দা আছে, নিজের ব্যাপারেও গরীবিকে পছন্দ করা, সাথে সাথে গরীবদেরকেও মহব্বত করা। ঐসব গরীবদের মাঝে বেশী বেশী গাসত করা, মানুষ যাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে থাকে। আবার ঐ সমস্ত সাধারণ মানুষ, গরীব মানুষ, যাদের কাছে গাসতে গেলে অনেক সময় তারাই আমাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, তাদের মাঝেও বেশী বেশী গাসত করা দরকার। আর বিলাসিতাকে এড়িয়ে চলা, মনে চাচ্ছে এমন কিছু, সাধারণ মানুষ যেটা করতে বা পেতে পছন্দ করে থাকে, এরকম বিলাসিতার আসবাবকে দ্বীনের খাতিরে পরিত্যাগ করা। আসবাবকে জীবনের মাকসাদ না বানানো, স্যার বলছিলেন আমালের মোকাবেলায় আসবাবকে তুচ্ছ করা দ্বীনের একটা বুনিয়াদী জিনিষ। এই গরীবদের সোহবতে নিজেকে হাজীর করার দ্বারা, এদের মাঝে বেশী বেশী গাসত করার দ্বারা এবং আসবাবকে ছোট বানানোর দ্বারা অনেকগুলো উপকার পাওয়া যায়, যার একটা উপকার হলো আমীর বনার ইচ্ছা, শায়েখ হবার ইচ্ছা কেটে যায়।

🎤 ৬৩

মাহফুজ ভাই একবার কথা প্রসঙ্গে স্যারকে জিজ্ঞেস করেন যে সব সন্তানের প্রতিই কি পিতা মাতার সমান ভালবাসা থাকে? স্যার উত্তরে বলেন, হ্যাঁ সব সন্তানের প্রতিই পিতামাতার ভালবাসা সমুদ্রের মতো গভীর, উপরের ঢেউটা কোথাও একটু বেশী কোথাও একটু কম দেখা যায়। সমুদ্রের গভীরতার মোকাবেলায় এই ঢেউ কোন গণার মধ্যেই পড়ে না, সমুদ্রের ঢেউযে কতো গভীর তা কেউ হয়তো জানেই না। আর ঢেউটাই বাইরে থেকে দেখা যায়, কিন্তু গভীরতা দেখা যায় না।

🎤 ৬৪

ভাই আমিনুল ইসলাম পড়াশুনার জন্য মালয়েশিয়ায় যাবার পূর্বে স্যারের কাছে বিদায় নেবার সময় স্যার কিছু নসীহত করেন, তার মধ্যে এটা একটা নসীহত ছিল যে দৈনিক কোরআন শরীফ এহতেমামের সাথে তেলাওয়াত করবে। ভাই আমিনুল ইসলাম জিজ্ঞেস করেন, কতটুকু করে পড়বো? স্যার বলেন, যতটুকু পারা যায়, বেশী থেকে বেশী, তবে দৈনিক গুরুত্বের সাথে করা চাই।

🎤 ৬৫

ভাই ওবায়দুল্লাহ অভি অস্ট্রেলিয়ায় যাবার পূর্বে স্যারের কাছে কিছু নসীহত চান। স্যার বলেন, যাচ্ছো অমুসলিমদের দেশে, ইহুদী খ্রীস্টানরা পাশাপাশি থাকবে, ওদের সাথে চলার একটা নীতি এরকম, রেশমের মতো কোমল, কিন্তু ছেড়ে না। মানুষের সঙ্গে থাকবে নরমভাবে, কিন্তু নীতির জায়গায় থাকবে শক্তভাবে। স্যার তুলে ধরেন, বিদেশে গিয়ে দুইটা জিনিস হারালে চলবে না: আচরণের সৌন্দর্য আর ঈমানের দৃঢ়তা। মানুষের সাথে এমনভাবে চলবে যেন তারা ইসলামের সৌন্দর্য তোমার ব্যবহারেই দেখে। কিন্তু এমনও না, মানুষকে খুশি করতে গিয়ে নিজের পরিচয়টাই মুছে ফেললে। অমুসলিম দেশ, বিভিন্ন ধর্ম- সংস্কৃতির মানুষ থাকবে। তাদের সঙ্গে কথা বলবে ভালোভাবে, ন্যায্য ও সাহায্যপ্রবণ হবে, ঝগড়া বা তাচ্ছিল্য করবে না। ব্যবহার যদি সুন্দর হয়, মানুষ তোমাকে সম্মান করবে, তোমার কথাও শুনবে। রেশমের মতো কোমল, রেশম যেমন ছুঁতে নরম, আচরণ হবে ভদ্র, নরম, সম্মানজনক। কিন্তু ছেড়ে না, টান দিলে সহজে ছিঁড়ে যায় না- নিজের ঈমান, মূল্যবোধ আর নীতিতে কোনো ছাড় দেবে না। মুসলমানের স্বভাব হবে কোমল, কিন্তু তার ঈমান থাকবে অটুট (এটার মানে, নামাজ, হালাল-হারাম, সততা, লজ্জাশীলতা, নৈতিক সীমা- এগুলোতে কম্প্রোমাইজ করবে না; পরিবেশ বা চাপ থাকলেও নিজের পরিচয় আর নীতির জায়গাটা শক্ত করে ধরে রাখবে)। আচরণে মিষ্টি, কিন্তু আদর্শে অটল। মিশবে সবার সাথে, তবে গলে গিয়ে নিজেরটা হারাবে না।

🎤 ৬৬

ভাই সোহেল স্যারের সাথে হজ্জ্বের সফরের কারগুজারী বলতে গিয়ে বলেন, রাতে মোজদালিফায় অবস্থান শেষে সকালে যখন আমরা পায়ে হেঁটে মিনার দিকে ফিরে আসতেছিলাম, আসার পথে মিনার কাছাকাছি বর্ডারে এক জায়গায় আমরা একটু বিশ্রামের জন্য বসলাম, জামাতের ১৫/১৬ জন সবাই একত্রেই ছিলাম। রাস্তার পাশে একটা বড় অংশ জুড়ে পানি ভরা বোতল, খাবারের প্যাকেট, ও অন্যদের ফেলে দেওয়া বিভিন্ন জিনিষসহ আবর্জনায় ভরা ছিল। সেখান থেকে আমরা কয়েক জন খুঁজে খুঁজে চকলেট, বাদাম, এবং খাবারের মতো বিভিন্ন শুকনা জিনিষ পাওয়া যাচ্ছিল, সেগুলো আমরা আনলাম। আমরা সবাই মিলে খেলাম, স্যারও খেলেন। স্যার তখন বলেন, এই ধরনের খানার মধ্যে গভীর একটা ফায়দা আছে, সেটা হলো অহংকার দূর হয়ে যায়।

🎤 ৬৭

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানকালীন জোহরের নামাজ সাধারণত কেন্দ্রীয় মসজিদে পড়তেন। একদিন ঢাকা থেকে এক ব্যাক্তি স্যারের সাথে দেখা করতে আসে। তাকে খুব পেরেশান দেখাচ্ছিল, নামাজের পর ব্যক্তিগতভাবে কিছু পরামর্শের জন্য বসে। দুপুরের খাবারের সময় ছিল, কাজল ভাই উনাকেও দাওয়াত দিলে স্যারের সাথে উনিও কাজল ভাইয়ের বাসায় যান। কাজল ভাই বলেন, উনার চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল বড় ধরনের কোন সমস্যার মধ্যে পড়েছেন। খানার পরে উনি বললেন, আমার কিছু ব্যাক্তিগত পরামর্শ আছে। উনার কথা শুনে কাজল ভাই স্যারকে বললেন, আমি ভেতরে (বাসা) যাচ্ছি। তখন স্যার বললেন না তুমিও থাকো। ঐ মেহমান উনার বিভিন্ন হালত বলতে গিয়ে বলেন যে স্যার আমি এতা বড় সমস্যার মধ্যে পড়েছি যে মাঝে মাঝে মনে হয় যে আমি আত্মহত্যা করি। সমস্যার আলোচনায় তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় রোজগারের জন্য বিভিন্ন পথ অবলম্বন করেছি, চাকরি, বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা, বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ ইত্যাদি কিন্তু কোন জায়গায় সুবিধা করতে পারিনি। বিভিন্ন ব্যবসা করেছি লোকসান হয়েছে, নতুন করে টাকা বিনিয়োগ করেছি আবার লোকসান হয়েছে, বিভিন্ন জনের নিকট থেকে টাকা ধার করে বিনিয়োগ করেছি আবারও লোকসান হয়েছে, চাকরীতে ঢুকেছি তাও ধরে রাখতে পারিনি। এভাবে এতোবেশী ধার কর্জের বোঝা মাথার উপরে যে এখন আমার মহল্লায় থাকাই মুসকিল। বিভিন্ন পাওনাদারের নিকট থেকে কর্জ পরিশোধের পিড়াপিড়ি, বড় ধরনের সমস্যা, কর্জ পরিশোধের কোন উপায় অবলম্বন নাই, আবার নিজের পারিবারিক চাহিদা, বাড়িতে থাকতে পারছি না। তার এই হালতের উপর কাজল ভাই বলেন যে আমি তখন ভাবলাম স্যার এখন কি পরামর্শ দেন দেখবো, একদিকে তো বিভিন্ন জনের কাছে বড় ধরনের কর্জ, আবার তার ব্যাক্তিগত এই হালত। তো স্যার খুব সহজভাবে বললেন যে তুমি তোমার ঐ মহল্লা ত্যাগ করো, আর এমন জায়গায় চলে যাও যেটা তোমার একেবারে অপরিচিত জায়গা, কেউ তোমাকে চিনে না। আর ঐ জায়গায় গিয়ে ছোটখাটো কাজ করো, প্রয়োজনে রিক্সা চালাও, আর একটা টিনের কৌটা কিনে নাও, কৌটার ঢাকনায় ছিদ্র করে নিবে, আর কর্জ পরিশোধের নিয়্যতে দৈনিক কিছু ঐ কৌটায় ফেলবে, আটআনা, চারআনা, একটাকা, দুইটাকা যেটা তোমার জন্য সহজ হয় দৈনিক কিছু করে তোমার এসব ধার পরিশোধের জন্য জমাবে। কাজল ভাই বলেন, তার এতোবড় সমস্যার সমাধান ঐসময় স্যার এতো সহজ করে দিলেন যে আমার কাছে এখন ভাবতেও অবাক লাগে, স্যারের এই পরামর্শের পর আমি দেখলাম যে ঐ মেহমানের আগের চেহারা আর পরের চেহারার মধ্যে অনেক পরিবর্তন, চেহারার পেরেশানী নাই, মনে হচ্ছিল তার বোঝা অনেক হাল্কা হয়ে গেলো।

🎤 ৬৮

একবার স্যার বলেন, আমরা যে খাদ্য গ্রহন করি, আমাদের শরীরের জন্য, সুস্থ থাকার জন্য আমাদের যা কিছু প্রয়োজন, আমাদের শরীর আমাদের খাদ্য থেকেই সেগুলো গ্রহন করে থাকে। একজন সুস্থ রোগীর রক্ত গ্রহনের দরকার হয় না, তার আয়রনের টেবলেট খাবার দরকার পরে না, ভিটামিন, আয়োডিন, মিনারেল ইত্যাদি যা কিছু শরীরের জন্য দরকার হয়, শরীর তা খাদ্য থেকেই গ্রহন করে থাকে, একজন সুস্থ মানুষের জন্য আলাদাভাবে এগুলো গ্রহন করার দরকার হয় না। যার আয়রনের অভাব, খাদ্য থেকে সে আয়রন নিতে পারছে না, তাকে আয়রনের টেবলেট খেতে হচ্ছে। আমাদের রুটিন জিকির অনেকটা এই রকম। সাহাবায়ে কেরাম এরকম রুটিন জিকির করতেন না, এবাদত থেকেই তাদের জিকির আযকার হয়ে যেতো, সেখান থেকেই তারা জীবনের প্রয়োজনীয় সিফাত গ্রহন করতে পারতেন। আমরা যেহেতু পারছি না, জীবন চলার সর্বক্ষেত্রে, আল্লাহ পাকের স্মরণ কাজ করছে না, চব্বিশ ঘন্টার কাজ কর্ম, লেনদেন, কথা বার্তা, ব্যবসা চাকরি, ইত্যাদিতে, আল্লাহ পাক আমাকে দেখছেন, একথার স্মরণ আমার কাজ করে না। এমনকি দ্বীনি কাজে, দ্বীনি আমালের ক্ষেত্রে, দ্বীনি তাকাজা পুরা করতে গিয়ে ও অনেক সময় আল্লাহ তায়ালার স্মরণ থেকে গাফেল হয়ে যাই, তাই আমাদের রুটিন জিকিরের দরকার পরে। আমাদের নিয়মিত আমাল থেকে, নিত্যদিনের মেহনত কাজকর্ম থেকে আল্লাহর ভয়, আল্লাহর উপর ভরসা, বিনয়, একমাত্র আল্লাহকেই রাজী করার জজবা, আল্লাহর স্মরণ, ইত্যাদি, আমরা রিসিভ করতে পারছি না, তাই আমাদের রুটিন জিকিরের দরকার হয়, তিন তসবিহ, বারো তসবিহ ইত্যাদি, তেত্রিশ বার এটা পর, একশ বার এটা পর, একহাজার বার এটার অজিফা করো, নির্দিষ্ট সময় নির্দিষ্ট পরিমান কোরআন শরীফের তেলাওয়াত ইত্যাদি।

🎤 ৬৯

স্যার বলেন, এই প্রানী জগতে মানুষই একমাত্র প্রানী যে সর্ম্পকে ধরে রাখতে পারে, সম্পর্ককে বাড়াতে পারে, এস্তেমায়ী সম্পর্ক গড়তে পারে। অন্যান্য প্রানীদের সম্পর্ক এনফেরাদী, এস্তেমায়ী সম্পর্ক ধরে রাখতে পারে না। কুকুর, গরু ইত্যাদি জন্মের পরে তারা মা’কে চেনে, মায়ের সাথে সম্পর্ক থাকে, কিন্তু ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক তারা হারিয়ে ফেলে। তাদের জীবন ব্যাক্তিগত জীবন হয়ে যায়, ধীরে ধীরে তারা মাকে আর চিনতে পারে না, মায়ের পরিচয় আর থাকে না, সম্পর্কও থাকে না। এর বিপরীতে মানুষ সম্পর্ককে ধরে রাখতে পারে, বাড়াতে পারে, নতুন সম্পর্ক তৈরী করতে পারে। মানুষকে আল্লাহ তায়ালা এস্তেমায়ী জীবন দিয়েছেন

🎤 ৭০

স্যারের বলতেন, জোড় করে বেশী দিন কোন এবাদত করতে পারা যায় না, যদি ভালবাসা না জমানো যায়। উদাহরণ স্বরূপ স্যার বলতেন, গ্রামকে না ভালবাসলে চাষী হওয়া যায় না। হঠাৎ করে গ্রামে গেলো, বেশীদিন টিকতে পারবে না, হয়তো দেখবে বিদ্যুৎ নাই, কাঁদা মাটি, রাস্তা ভাল নাই, হাসপাতাল নাই, বিনোদনের জায়গা নেই, তো বেশীক্ষণ ভাল লাগবে না। গ্রামের প্রতি যদি ভালবাসা জন্মানো যায় তো তখন ঐ কাঁদামাটিতে হাটতেই মজা লাগবে। কাজ হয়তো একই করছে, কাজের বুয়া, অন্যের বাচ্চার দেখাশুনা করছে, বাচ্চার খাবার তৈরী করছে, তাকে খাওয়াচ্ছে, তার সাথে খেলতে হচ্ছে, তার পেশাব পায়খানা ছাফ করছে, তার কেথা কাপড় ধুয়ে দিচ্ছে, এভাবে মালিকের বাচ্চার জন্য কাজ করতে করতে ক্লান্তি নিয়ে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরছে। বাসায় হয়তো তার নিজেরও বাচ্চা আছে, বাসায় ফিরে নিজের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে তার ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। বাসায় ফিরে এসে হয়তো নিজের বাচ্চার জন্য ঐ কাজগুলো করছে যে কাজগুলো অন্যের বাচ্চার জন্য করে ক্লান্ত হয়ে সে বাসায় ফিরলো। কিন্তু নিজের বাচ্চার জন্য করা ঐ একই কাজ তার ক্লান্তিকে দূর করছে। দায়িত্ব মনে করে করছে, ক্লান্তি বাড়ছে, মহব্বতের জন্য করছে ক্লান্তি দূর হয়ে যাচ্ছে। স্যার বলতেন, ঈমান যেনো আমাদের মহব্বতের হয়। ঈমান, ঈমানী ছিফাত, ঈমানী আমাল যেনো আমার কাছে মহব্বতের হয়। স্যারের বিভিন্ন বয়ানে এই দোয়া শুনেছি, .اللّٰهُمَّ حَبِّبْ إِلَيْنَا الْإِيمَانَ وَزَيِّنْهُ فِيْ قُلُوْبِنَا، وَكَرِّهْ إِلَيْنَا الْكُفْرَ، وَالْفُسُوْقَ، وَالْعِصْيَانَ، وَاجْعَلْنَا مِنَ الرَّاشِدِيْنَ

🎤 ৭১

যতো ক্লান্তির সফর হোক, বা যতো শীত বা বৃষ্টির মধ্যেই হোক, বা যতো রাতেই মনজিলে পৌঁছা হোক, স্যার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিতেন। সফরে জামাত পায়ে হেঁটে এসেছে, বা অনেক রাতে মসজিদে পৌঁছেছে, মসজিদে পৌঁছার পর দেখা যেতো, ছামানা রেখে কেউ হয়তো ফ্যান দিতো, জামার বোতাম কয়টা খুলে ফ্যানের নিচে দাঁড়াতো, কেউ ব্যাগের সাথে ঠেস দিয়ে বসেছে, কেউ ব্যাগ মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়েছে, কেউ হয়তো টয়লেটের জন্য বের হয়েছে। কিন্তু সব সময়ই মসজিদে প্রবেশ করার পর স্যারকে নামাজে দাড়াঁতে দেখেছি, এটার বিপরীত কখনো স্যারকে দেখিনি। এব্যাপারে বলতে গিয়ে হাফেজ মামুন ভাই বলেন, যতটুকু স্যারকে পেয়েছি, দেখেছি, আমার কাছে মনে হয় আমি স্যারের কাছে এটার জীবন্ত দেখেছি। “নামাজ আমার চক্ষুর শীতলতা”, মানে নামাজে আমি শান্তি পাই। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজে দাঁড়ালে শান্তি পেতেন। আমাদের স্বাভাবিক অবস্থা হলো, গাসত করে আসি, পরিশ্রমের কোন কাজ করে আসি, বা দুনিয়াবী কোন কাজের পরে, আমরা একটু বিশ্রাম নেই, শুই, হাত মুখ ধুঁয়ে আরাম করে ক্লান্তি দুর করে নেই তার পরে যদি দ্বীল যদি ভাল থাকে তো দুই রাকাত নামাজ পড়ে নেই। স্যারকে দেখতাম কোন গাসত থেকে ফিরেই বা কোন সফরে কোথাও গেলে বা কোন মনজিলে পৌঁছলে যদি ওয়াক্ত থাকতো তো আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিতেন। স্যারকে দেখে মনে হতো এটার মধ্যে উনি শান্তি পেতেন। অনেক সময় অনেক ক্লান্তির পায়ে হাঁটা সফর থেকে মসজিদে ফিরে এসে বসার আগেই স্যার নামাজে দাড়াঁতেন, ঐসময় নামাজে দাঁড়ানো স্যারকে দেখে মনে হতো উনি শান্তি পাচ্ছেন। এভাবে একটা লোককে দায়েমী আমল করতে দেখে এটা যে তার শান্তির আমল সহযেই অনুমান করা যেতো।

🎤 ৭২

স্যার বলতেন, পড়াশুনা করছি টাকার জন্য, চাকরীর জন্য, হালাল উপার্জনের জন্য, এই জন্য পড়াশুনা করা জায়েজ আছে। সম্মানের জন্য পড়াশুনা করছি এইটা জায়েজ নাই। পড়াশুনাকে সম্মানের সাথে জড়িত করা যাবে না। " وَلِلَّهِ ٱلْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِۦ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَٰكِنَّ ٱلْمُنَٰفِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ ........." এব্যাপারে স্যার এই আয়াত পড়তেন। সম্মান শুধু দ্বীনের সাথে জড়িত। আমি হালাল উপার্জনের জন্য পড়াশুনা করছি, ডিগ্রী নিচ্ছি, এই নিয়্যতে পড়াশুনা ঠিক আছে, জায়েজ। আবার টাকা বাড়ানোর জন্য, বেশী বেতন পাবার জন্য প্রমোশন নেওয়া জায়েজ, কিন্তু সম্মানের জন্য চাকুরীতে প্রমোশন নেওয়া জায়েজ নাই। আমি এখন বেতন পাই ৩০,০০০ হাজার, প্রমোশন পেলে বেতন পাবো ৫০,০০০, টাকা বাড়বে এই জন্য প্রমোশন নেওয়া ঠিক আছে, এটা জায়েজ। সম্মানের জন্য প্রমোশন নেওয়া জায়েজ নাই। চাকুরীর পদোন্নতিতে সম্মান বাড়বে, বড় চেয়ারে বসতে পারবো, অনেকের চেয়ে বড় হবো, সম্মান বাড়বে, এইটা জায়েজ নাই। সম্মানকে পড়াশুনার সাথে, চাকরীর সাথে, উপার্জনের মাধ্যমের সাথে, চাকরীর পদোন্নতির সাথে জড়িত করা যাবে না। স্যার বলতেন, এটা মুনাফিকির আলামত। চাকরী, ব্যবসা, কাজকর্ম করছে হালাল উপার্জনের জন্য তা ঠিক আছে, সম্মান এখানে দেখা যাবে না।

🎤 ৭৩

স্যার বলতেন, ধনী হতে তিন জিনিস লাগে। কুছ আপকা, কুছ বাপকা, আওর কুছ পাপকা। কিছু নিজের, কিছু বাপের, আর কিছু পাপের, মানে কিছু পাপও করতে হয়। ধন বাড়াতে চাই, অনেক মাল সম্পদের মালিক হতে চাই, ধন সম্পদে উপরে উঠতে চাই, এই নিয়্যত ও প্রচেষ্ঠার সাথে প্রায়ই পাপ যুক্ত হয়ে যায়।

🎤 ৭৪

কাজল ভাই বলেন, একদিন দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর স্যার শুয়ে ছিলেন। তখন জুবেরী ভবনে থাকতাম, স্যার এবং আমি এক রূমে থাকতাম। খাবার শেষে স্যার শুয়ে পড়লেন আর আমি বসে থাকলাম। স্যার আমাকে বললেন, কি ব্যাপার তুমি শুচ্ছনা? আমি বললাম, না স্যার আমি ঘুমাবো না। স্যার তখন মুচকি হেসে বললেন, শয়তান ঘুমায় না। কাজল ভাই বলেন যে আমি তড়িঘড়ি করে তখন শুয়ে পড়লাম।

🎤 ৭৫

একবার স্যার বলেন, সাহাবীদের জামানায় যখন দুভিক্ষ ছিল, ঐ সময়কার সবচেয়ে ধনী সাহাবী যে ছিল, ঐ সাহাবীকে যদি বাংলাদেশে এনে এদেশের সবচেয়ে গরীব পরিবারে বসবাস করতে দেওয়া হয়, তো সে তো এই কথাই বলবে যে বড্ড বিলাসিতার মধ্যে আছি। যে দেশে এতো কলাগাছ পাওয়া যায়, এতো কচুগাছ পাওয়া যায়, সে দেশে আবার কিসের অভাব।

🎤 ৭৬

আমরা অনেক সময় আলেম ওলামাদের নিকট যাকাতের মাসয়ালা, হজ্জ্বের মাসয়ালা জিজ্ঞেস করি। আমার যাকাতের পরিমান কতো হবে, হজ্জ্ব কিভাবে শুদ্ধ ও সুন্দর হবে ইত্যাদি হুজুরকে জিজ্ঞেস করি। স্যার বলেন, আমরা কি কখনো আলেম ওলামাদের খেদমতে গিয়ে এই মাসয়ালা জিজ্ঞেস করেছি যে আমি কি করলে আমার উপর হজ্জ্ব যাকাত ফরজই হবে না, কিভাবে আমার উপর যাকাত ফরজ না হয়, হজ্জ্ব ফরজ না হয়। আমার উপর হজ্জ্ব ফরজ হয়, যাকাত ফরজ হয়, আমি হজ্জ্ব করতে পারি, বারবার হজ্জ্ব ও ওমরা করতে পারি, অনেক অনেক যাকাত দিতে পারি, এই জজবা, এই নিয়্যত, এই প্রচেষ্ঠা তো আমি নিজেকে দ্বীনদার মনে করে করেই থাকি। কিন্তু আমার উপর হজ্জ্ব ফরজই না হয়, আমার উপর যাকাত ফরজই না হয়, এই নিয়্যত, এই প্রচেষ্ঠা, এরজন্য তদবীর কি আমি কখনো করেছি। মাল হলে তো হজ্জ্ব করবো, যাকাত দিবো, তা ঠিক আছে, কিন্তু দ্বীনদার হিসেবে এই জজবা কি আমার কখনো এসেছে যে আমার উপর হজ্জ্ব যাকাত ফরজই না হয়। অনেক মাল হলে অনেক যাকাত দিতে পারবো, অনেকের উপকার করতে পারবো, দান ছদকা করতে পারবো, অনেক অনেক হ্জ্ব করতে পারবো, বিদেশে চিল্লা দিতে পারবো, বারবার বিদেশ সফর করতে পারবো, অনেক অনেক নেক আমল করতে পারবো, এরকম জজবা নিয়ে চেষ্ঠা তদবীর হয়েই থাকে। কিন্তু মাল বাড়ানোর নিয়্যত না করে, মাল কমানোর জজবা নিয়ে, মাল কমানোর জন্য তদবীর কি আমাদের দ্বারা হয়।

🎤 ৭৭

স্যার বলতেন, একই নদীতে মাছও থাকে, সাপও থাকে। একই জায়গায় থেকে, একই ধরণের খাবার খেয়ে সাপ বিষ আহরণ করে, আর মাছ বড় হয় তার চর্বি হয় মানুষের জন্য খাওয়ার উপযোগী হয়। তেমনি একই ফুলে মৌমাছিও বসে আবার ভ্রমর ও বোলতা বসে। মৌমাছি আহরণ করে মধু আর ভ্রমর বা বোলতার পেটে গিয়ে তা হয় বিষ। একই জায়গা থেকে একজন মধু খোজে, আরেকজন নেয় বিষ। নির্ভর করে কার নিকট থেকে কে কি হাসিল করছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি পাশে না থাকতেন, আবুল হাকাম হয়তো আবু জেহেল হতো না, এতোবড় কাফের হতো না। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে থেকে ওমর ইবনে খাত্তাব ওমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হয়েছেন আর এই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে থেকেই আবু জেহেল এতোবড় কাট্টা জাহেল হয়েছেন। মক্কার কাফেরদের কুফুরী, মদীনার মুনাফেকদের মুনাফেকি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে থেকেই বেড়েছে, আবার মুহাজের আনসাররা, তারাও আল্লার নবীর পাশে থেকেই আনসার মুহাজির হয়েছেন, আল্লাহ পাকের নিকট থেকে সুসংবাদ পেয়েছেন। এমন না হয় যে আমি বড় কোন আল্লাহওয়ালার কাছে গেলাম, সেটা আমার অহংকারের সামান হয়ে গেলো, আর সারা জীবন আমি সেটা নিয়ে অহংকার করবো, অথচ সেখান থেকে সম্পূর্ন ভিন্ন ও অনেক ভালো জিনিষও হাসিল করতে পারতাম। হজরতজ্বীর খেদমত করে আমিকি আল্লাকে পাচ্ছি, নাকি অহংকারি হচ্ছি, একজন আল্লাহ ওয়ালার নিকটে থেকে, আল্লাহওয়ালার সাথে সফর ও সোহবত থেকে আমি অহংকার শিখছি, নাকি বিনয় শিখছি, সেটা নির্ভর করে নিজস্ব জজবা, নিজস্ব ব্যাক্তিসত্তার উপর, কি আহরণ করছি সেখান থেকে।

🎤 ৭৮

শামস গ্রুপের মালিক ও চেয়ারমান শামসুল হক সাহেব, স্যারের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল, তিনদিন চিল্লার জন্য স্যার উনাকে তাশকিল করতেন, পরবর্তীতে উনি তিন চিল্লাও দিয়েছিলেন। চিল্লার সফরে একবার উনি গাইবান্ধায় এসেছিলেন। স্যার উনার জামাতের নুসরতে গাইবান্ধা মার্কাজে জামাতের খোঁজে গেলে সেখানকার এক সাথি স্যারকে জিজ্ঞেস করেন যে স্যার আপনি কি ওই ভি.আই.পি জামাতটার নুসরতে এসেছেন? স্যার উত্তর করলেন, আমি চিল্লার জামাতের নুসরতে এসেছি। ওই ব্যক্তি আবার জিজ্ঞেস করেন যে আপনি কি ওই ভি.আই.পি জামাতটার নুসরতে এসেছেন? স্যার আবারও বললেন, আমি চিল্লার জামাতের নুসরতে এসেছি। উনি বারবার একই কথা, ভি.আই.পি জামাতটার নুসরতে এসেছেন? স্যার এভাবে কয়েকবার একই উত্তর দেন যে আমি চিল্লার জামাতের নুসরতে এসেছি। এই প্রসঙ্গে স্যার একবার বলছিলেন ভি.আই.পি রাও যে চিল্লায় এসে সাধারন মুসলমান হতে পারে, সাধারন হবার চেষ্ঠা করতে পারে, মনে হয় এই ধারণাটাই অনেকের নাই বা ভুলে গেছেন।

🎤 ৭৯

চট্রগ্রাম থেকে সফর শেষে জামাত ঢাকায় কাকরাইলে আসছিল, বৃহস্পতিবার শবগুজারীর দিন ছিল। পথে মাহফুজ ভাই স্যারকে প্রস্তাব দেন, আজতো শবগুজারীর দিন, কাকরাইলে অনেক ভীড় হবে, শোবার জায়গা পাওয়া কঠিন হবে, পথে মাদানীনগরে রাতটা কাটিয়ে পরদিন সকালে কাকরাইলে যাওয়া যায় কিনা। হজরতের সাথে (সন্দীপের পীর সাহেব, হজরত মাওলানা ইদ্রীস সাহেব রহমতুল্লাহ) দেখাও হবে, রাতটাও কাটানো হবে। এই প্রস্তাবে স্যার খুব রাগান্বিত হয়ে বললেন হজরতের কাছে যাওয়া কি এতো তুচ্ছ ব্যাপার, শোয়ার জায়গা পাওয়া যাবে না বলে রাত কাটানোর জন্য সেখানে যাওয়া, এটা হজরতের বেএহতারামি। বরং নিয়্যত করে, ইজ্জ্বতের সাথে, তার মহব্বতের সাথে, তার নিকট থেকে ফায়দা হাসিলের নিয়্যতে উনার কাছে আসা। আল্লাহ ওয়ালাদের সাথে মোলাকাতের জন্য ইজ্জ্বত একরামের সাথে, দ্বীলে ক্বদর নিয়ে, নিয়্যত করে আসা চাই। সময় পেলাম তো দেখা করে নিলাম বা রাত কাটাতে এলাম দেখা করে নিলাম এরকম না হয়, আলাদা নিয়্যতের সাথে হওয়া দরকার।

🎤 ৮০

মদীনা মুনাওয়ারার মসজিদে, নামাজের জন্য অপেক্ষায়, নামাজের তখনো অনেক দেরী আছে, অনেক আগেই মসজিদে আসা হয়েছে। মাহফুজ ভাই বলেন, আমি স্যারকে বললাম সময় যখন আছে তো জিয়ারত করে নেই। মাহফুজ ভাইয়ের এই প্রস্তাবে স্যার একটু রাগের সাথে বলেন, সময় যখন আছে, তাই জিয়ারত করা এটা বেএহতারামি হলো, ইজ্জ্বত হলো না, নিয়্যত করে, এখলাসের সাথে, মহব্বতের সাথে জিয়ারত করা। মাহফুজ ভাই বলেন, স্যারের কথায় আমি লজ্জ্বিত হয়ে চুপ হয়ে গেলাম, এভাবে জিয়ারতে যেতে চাওয়া ঠিক হয়নি বলে একটু অনুশোচনাও করেছি। কিছুক্ষণ পর স্যার বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামীকাল জিয়ারত করবো। মাহফুজ ভাই বলেন, এই ইনশাআল্লাহ আগামীকাল জিয়ারত করবো, এইটার জন্য হয়তো স্যার রাতে প্রস্তুতি নিয়েছেন, নিয়্যত করে প্রস্তুতি নিয়েছেন। দোয়া ফিকির কান্নাকাটি করে প্রস্তুতি নিয়েছেন পরদিন জিয়ারতে আসার আগে।

🎤 ৮১

এয়ার মার্শাল জামাল উদ্দীন আহামেদ, উনি পরবর্তীতে বিমান বাংলাদেশের বোর্ড অব ডাইরেক্টরস এর চেয়ারম্যান ও ছিলেন। স্যারের সাথে আগে থেকেই পরিচয় ছিল, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বিমান বাহিনী থেকে অবসরের পর বিমান বাংলাদেশে চেয়ারম্যান হিসাবে যোগদানের পর একদিন গাসতে স্যার উনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন ডি.ও.এইচ.এস. এর বাসায়। রুমি ভাই ও মাহফুজ ভাই স্যারের সাথে ছিল। রুমি ভাইয়ের আব্বা উনার বন্ধু ছিলেন। স্যার উনার সাথে কথা বার্তার এক পর্যায়ে অত্যন্ত ফ্রিভাবে হাসিমুখে বললেন, মানুষ চাকরী করে হয় টাকার জন্যে, না হয় সম্মানের জন্যে, আপনারতো কোনটারই ঠেকা নেই, তো এই আলকাতরা গিল্লেন কেন? মাহফুজ ভাই বলেন, বড় ভদ্র মানুষ, খুব বিনয়ের সাথে বলছিলেন, মুসফিক ভাই কি করি, বসে বসে থেকে, একটা রুটিন লাইফে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। চেয়ারম্যান হিসেবে বড় কোন দায়িত্ব পালন করছি, এজাতীয় কথা উনার ছিল না। একটা দায়িত্ব নিয়ে সময়তো কাটছে, উনার কথার ধরণ এরকম ছিল। স্যারের কথার ধরণ মনে হয় এরকম ছিল যে, একদিকে মর্যাদায় আপনি বাহিনীর চীফ ছিলেন, অন্যদিকে টাকা পয়সার বা বেতনের আপনার এখন খুব দরকার, তাও তো না। বাহিনী থেকে এই অবসরের পর, শেষ জীবনে, নতুন এই ঝামেলার চাকরী না নিলেও তো হতো।

🎤 ৮২

গাইবান্ধার মামুন ভাই বলেন, তিন চিল্লার শেষ চিল্লায় স্যার আমাদের জামাতের নূসরতে গিয়েছিলেন, শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাটে। জামাতে আসার পর আমার সাথে স্যারের প্রথম সাক্ষাতেই স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করেন, বাসায় যোগাযোগ করেছি কিনা? আমার পাশ থেকে জামাতের এক বড় ভাই আমার উত্তর এইভাবে দেন যে ও ওর আম্মাকে বাসায় রেখে এসেছে, বয়স্ক মাকে, মায়ের সাথে মাঝে মাঝে যোগাযোগ করেছে। একথায় স্যার তখন আর কিছু বললেন না। পরে দুপুরে খাবার সময় আমি স্যারের সাথে এক প্লেটে খেতে বসি। খেতে খেতে আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, চিল্লা থেকে বাসায় যোগাযোগ করলে অসুবিধাটা কি, সমস্যাটা কি হবে, আপনি কেন এই প্রশ্নটা করলেন যে বাসায় যোগাযোগ করেছি কিনা? স্যার খুব অল্প কথায় সুন্দর জবাব দিলেন, আমার সারাজীবন মনে থাকবে, স্যার বললেন, কেউ যদি দই বসায় (দই বানানোর জন্য), আর সেটা যদি বার বার টোকা দিয়ে দেখে, তাহলে দইতো আর বসবে না। ভাই বলেন, স্যারের এতোটুকু কথায় আমি উত্তর পেলাম, আমারাতো চিল্লায় এখানে আল্লাহ পাকের সাথে সম্পর্ক গড়ার জন্য এসেছি, এখানে আসার পর অন্যান্য বিভিন্ন সম্পর্কগুলোর সাথে যদি আমার যোগাযোগ থাকে, তাহলে তো এই সম্পর্ক গড়বে না।

🎤 ৮৩

ভাই ওয়াহিদুল হক (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের স্টাফ ছিলেন) স্যারের কথা বলতে গিয়ে বলেন, এক দিন উপশহর মার্কাজে আমি স্যারের সাথে শবগুজারীতে গিয়েছিলাম। মার্কাজের আমল শেষে খানাপিনার পর আমাদের সাথীরা শুয়ে পড়ে এবং কিছু সাথী যার যে দায়িত্ব ছিল, সে সেই জিম্মাদারীতে চলে যায়। আমার খুব মনে পরে যে স্যার রাতে দুইটার দিকে উঠে স্যারের ব্যাগ থেকে একটা কালো কলা বের করে খেয়ে নিলেন, অতি মজে যাবার কারণে বা ব্যাগে রাখার কারনে যে কলাটা নরম ও চোচা কালো হয়ে গিয়েছিলো। আমি স্যারকে বললাম স্যার কিছু খানা আছে, বেড়ে দিবো কি? স্যার বললেন, ভাই আলহামদুলিল্লাহ, আমার খানা হয়ে গেছে। এরকম খুবই অল্প ও সাধারণ খানা খেয়ে দিনের পন দিন স্যার রোজা রাখতেন।

🎤 ৮৪

ওয়াহিদুল হক ভাই বলেন, কেন্দ্রিয় মসজিদে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জোড় বা অনুষ্ঠানে প্রায়ই ছাত্রদের সাথে খেদমতে থাকা হতো। এরকম এক ছাত্রদের জোড়ে মসজিদের আমতলায় আমরা খেদমতের এন্তেজাম করছিলাম, খেদমতের সাথীরা সবাই ছিল। স্যার খেদমত দেখতে এসে বললেন, ওয়াহিদুল হক ভাই মসলা কম ব্যবহার করেন, খানাতে আল্লাহ পাক বরকত দিয়ে দিবেন।

🎤 ৮৫

ওয়াহিদুল হক ভাই বলেন, আমি, রফিক ভাই, আজিজুল ভাই আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের মধ্যে তিন চিল্লার সাথী ছিলাম। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব সাধারণ কর্মচারী ছিলাম। বিভিন্ন সময় স্যারের খেদমত করতে চেয়েছি, স্যার কখনো আমাদের দ্বারা কোন রকম শারীরিক খেদমত নেননি। বিভিন্ন সময় জামাতে বা বিভিন্ন প্রোগ্রামে ক্যাম্পাসের ভেতরে বা বাইরে স্যারের সাথে থেকেছি। আমাদের অনেক সময় ভূল ত্রুটি হয়েছে, কিন্তু কোন ব্যাপারে স্যার কোন সময় আমাদের উপর রাগ হননি। এরকম কোন আচরণ আমরা কোন দিন স্যারের কাছ থেকে পাইনি, যার দ্বারা মনে একটু কষ্ট লেগেছে। আমাদের বিভিন্ন সমস্যায় আমরা স্যারের কাছে খুব সহজে যেতে পারতাম, বসতে পারতাম, দ্বীল খুলে স্যারের সাথে কথা বলতে পারতাম। একবার আমার আম্মা অসুস্থ হলে পার্বতীপুর থেকে উনাকে এনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্ত্তি করি। আমি এতো ছোট কর্মচারী, উনার মতো একজন মুরব্বী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমার মায়ের খোঁজ খবর নিতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন।

🎤 ৮৬

হাফেজ শাহজুল ইসলাম সাহেব বলেন, একদিন আছরের পর মাগরিবের কিছু পূর্বে স্যার মরহুম জামাল উদ্দিন হুজুরের (বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পেশ ইমাম ছিলেন) বাসায় যান। হুজুর মেহমানদারী হিসাবে নাস্তা পেশ করলে, স্যার খেয়ে নেন। খানা শেষে আযানের সময় হলে স্যার একটু হাসি মুখে বললেন, এই একটু হলে রোজাটা হয়ে যেতো। স্যার খানা শুরুর আগে রোজার কথা বলেননি, খানা খাওয়া শেষ হলে বললেন। তখন জামাল উদ্দিন হুজুর জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি বললেন না কেন, একটু পরেই দেয়া যেতো। স্যার বললেন, আমি রোজা ছিলাম “নফল”, আর সামনে যে খানা এসেছিল সেটা গ্রহন করা ছিল “সুন্নত”, কোনটাকে নেবো।

🎤 ৮৭

একবার এক আলেমের সাথে দেখা করার জন্য বিকেল বেলা উনার বাসায় স্যার গিয়েছিলেন। আলেম সাহেব বড় আখলাকওয়ালা ও সাদাসিদে স্বভাবের ছিলেন, বাসায় মেহমানদারী করার মতো বিশেষ কোন খাবার ছিল না। পানি ছিল, ঐ পানিই উনি স্যারের সামনে পেশ করলেন। স্যার রোজা ছিলেন, সময়টা ছিল ইফতারীর অল্প কিছু পূর্বে, ঐ পানিই স্যার খেয়ে নিলেন। আর অল্প সময় পর পানিটা খেলেই তো রোজাটা হয়ে যেতো, পরে স্যারকে এব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে স্যার বললেন, আমি যদি তখন পানিটা না খেতাম তাহলে উনি বুঝতে পারতেন যে আমি রোজা আছি, আর আমার ইফতারীর ব্যবস্থা করার জন্য পেরেশান হয়ে যেতেন, ঐ পেরেশানীটা আমি উনাকে দিতে চাইনি।

🎤 ৮৮

মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব (বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রিয় মসজিদের সাবেক পেশ ইমাম) বলেন, এই মুহুর্তে আমার কি করণীয়, কোন সময়ে আমার উপর কি হুকুম, কোন হালতে আমার কি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোন সময়, কোন অবস্থা আল্লাহ পাকের কোন হুকুমের দিকে ইংগিত করে, এসব ব্যাপারে স্যার সবসময়ই সচেতন থাকতেন। এপ্রসঙ্গে বলতে গিয়ে উনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে সহকারী ইমাম নিবে, সার্কুলার হয়েছে জেনে আমি ১৯৭৪ সালে পাবনা থেকে রাজশাহী আসলাম। আমি দরখাস্ত করার আগেই দেখতে এলাম যে পরিবেশ কেমন, কেমন লাগবে ইত্যাদি। মসজিদে এসে পৌঁছার পরে মাওলানা জামাল উদ্দিন সাহেব (কেন্দ্রিয় মসজিদের তৎকালীন পেশ ইমাম) এবং স্যারের সাথে মসজিদেই দেখা ও পরিচয় হয়। এশার নামাজের সময় হলে মাওলানা জামাল উদ্দিন সাহেব আমার ক্বেরাত শুনার জন্যই হোক বা যে জন্যই হোক আমাকে নামাজ পড়াতে বললেন। আমি কেবল পাবনা থেকে রাজশাহী এসেছি, মুসাফির, আবার এশার নামাজ চার রাকাত, নামাজ পড়াতে (ইমামের মসল্লায় যেতে) একটু ইতস্তত করছিলাম। এই মুহুর্তে স্যার আমার পাশে থেকে বললেন, উনি তো পাবনা থেকে এসেছেন। তখন মাওলানা জামাল উদ্দিন সাহেব বললেন, ও উনিতো মুসাফির, বলে উনিই নামাজ পড়ালেন, আর আমাকে নামাজ পড়াতে হলো না, আমি রেহাই পেলাম।

🎤 ৮৯

মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব বলেন, কেন্দ্রিয় মসজিদে অনেক সময় নামাজের ওয়াক্তে এস্তেঞ্জা ও ওজুর জায়গায় ভীড় জমে যেতো। এরকম ভীড় থাকলে স্যার প্রায়ই আমার বাসায় (মসজিদ চত্তরে পেশ ইমাম সাহেবের বাসা) চলে আসতেন। আমার বাসায় স্যার গোসলের দরকার থাকলে গোসল করে নিতেন, বা এস্তেঞ্জা ওজু সেরে নামাজে শরীক হতেন। এরকম একদিন স্যারের ওজু শেষ হতে হতে আমি একটু চায়ের ব্যবস্থা করেছি। ওজু সেরে চায়ের দস্তরখান দেখেই স্যার একটু মিষ্টি হেসে বললেন, এটাকি ওজুর বরকত?

🎤 ৯০

মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহেব বলেন, একবার পারিবারিক কিছু ব্যাপারে বড় ধরণের কিছু সমস্যার মধ্যে পড়েছিলাম, খুব পেরেশান ছিলাম। স্যারকে হালত বলে দোয়ার দরখাস্ত জানালাম, বললাম খুব সমস্যার মধ্যে পড়ে গেছি। আমার বিস্তারিত অবস্থার কথা শুনে স্যার বললেন, “মুসিবত আসার আগে সতর্ক হতে হয়, আর মুসিবত এসে গেলে তখন ছবর করতে হয়”। উনি বলেন, বিভিন্ন ব্যাপারে আগে থেকেই সতর্ক ও সচেতন হওয়া, বা কোন মুসবতের হালতে বিচলিত না হওয়া, ধৈর্য অবলম্বন করার ব্যাপারে স্যারের ওই উপদেশটা আমার জীবনের জন্য বড় মূল্যবান ছিল।

🎤 ৯১

মাদানীনগর মাদ্রাসায় (২০০৬ সালে) এতেকাফের জামাতে এক বয়ানে স্যার বলেন, আল্লাহ তায়ালা উমুমী কাজকে আফজাল বলেছেন। وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَآ إِلَى ٱللَّهِ وَعَمِلَ صَٰلِحًا وَقَالَ إِنَّنِى مِنَ ٱلْمُسْلِمِينَ বিভিন্ন হাইছিয়্যতে দাওয়াত দেওয়া যায়, আলিম হিসেবে, পীর হিসেবে, বাপ হিসেবে, আরো বিভিন্ন হিসেবে। কিন্তু আহসান ক্বওল, ঐটার সম্পর্ক করা হয়েছে যেটা একজন মুসলিমিন হিসেবে। আলিমও না, পীরও না, কিছুই না, একজন সাধারণ মুসলমান। ঐটার সম্পর্ক আহসানের সাথে। আল্লাহ তায়ালা ঐখানে ফায়দাও বেশী দিয়ে থাকেন। রসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আল্লাহ তায়ালা উনার দ্বারা মু’জেজা জাহির করেছেন। এটার দরকারও ছিল, নবী হিসেবে একটা দলিল পেশ করার জন্য মু’জেজা। কিন্তু মানুষ যে দ্বীন গ্রহণ করেছে, ঐটা মু’জেজা ইত্যাদির দ্বারা কম। বরং একেবারে সাদাসিদে কথা, একজন সাধারণ মানুষ যে কথা বলতে পারে, إِنَّنِى مِنَ ٱلْمُسْلِمِينَ, এর বুনিয়াদের উপর। সেই ধরনের কথার দ্বারা রসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছেও বেশী মানুষ মুসলমান হয়েছে। চাঁদ দুই টুকরা হয়ে গেলো, ঈমানতো আনলোই না, বললো যাদুকর। অথচ হিজরতের সময় দেখা যায় যে বললেন, একটা ভালো কথা বলবো? বলেন। বলো, لآ اِلَهَ اِلّا اللّهُ, বলে নিল, সহজেই ইসলাম কবুল করলেন। অতি সাধারণ কথার দাওয়াত, বলো আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই, তোমার জীবন সুন্দর হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা এই দাওয়াতকে সহজ করেছেন, মানুষ স্বাভাবিকভাবে, সাধারণ হয়ে যখন দাওয়াত দেবে আল্লাহ তায়ালা এর ভেতর শক্তি দিয়ে দিবেন।

🎤 ৯২

সাথীদের ব্যাক্তিগত যোগ্যতার ক্বদর করার ব্যাপারে স্যার উৎসাহ দিতেন। স্যার বলতেন প্রত্যেক মানুষ যদি বলে যে আমি এক ও অদ্বিতীয়, তার মতো পৃথিবীতে কেউ নাই, তার এই কথা শুদ্ধ। এই দ্বীনের ময়দানে যারা মেহনত করেছেন তাদের প্রত্যেককেই আল্লাহ তায়ালা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। আনোয়ারুল আযীম সাব একবার এক হতাশার কথা বললে স্যার উনাকে বললেন, এতোদিন আপনি ছিলেন উনার (অন্যের) লোক, এখন আপনি একজন স্বতন্ত্র ব্যাক্তি। স্যার এই আয়াত- فَلَآ أُقْسِمُ بِمَوَٰقِعِ ٱلنُّجُومِ, পড়ে বিভিন্ন সময় বলতেন, প্রত্যেক তারকার নিজস্ব কক্ষপথ আছে। ঐ কক্ষপথেই যদি সে থাকে, তবে সে সুন্দরও থাকে নিরাপদও থাকে। হাসসান বিন ছাবেত রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু, খন্দকের সময় উনাকে বলা হলো এই ইহুদীকে কতল করো, উনি আগ্রহ দেখালেন না, উনার জামা কাপড় খুলে আনো, আমি এসব পারবো না। আমরা হলেতো উনাকে গালি দিতাম। স্যার এপ্রসঙ্গে বলেন, উনি এই ময়দানের নয়ই, উনি ছিলেন কবি, এমনকি উনার জন্য আলাদা মেম্বর ছিল মসজিদে নববীতে। তখন কবিতার খুব চর্চাও ছিল, দামও ছিল। কাফেররা আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরূদ্ধে কবিতা লিখতো, তার মোকাবেলায় উনি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রসংসায় কবিতা দিয়ে উত্তর দিতেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন উনাকে দিয়ে যুদ্ধ হবে না, কবিতার লেখার উৎসাহ দিতেন, তুমি এটা লেখো, জিবরীল আমীন তোমাকে সাহায্য করবে। আল্লাহর নবী তার কোন দোষারোপ করেননি, এখানে তাকে কতো উপরে তুললেন। স্যার বলতেন, আমরা সব মরিচ এক শীল পাটায় পিশতে চাই, কিন্তু সবাই স্বতন্ত্র, ব্যাক্তিত্বের, যোগ্যাতার পার্থক্য আছে। স্বাতন্ত্রতা অনুযায়ী সাথীর রেয়ায়েত করতে হবে, তার মূল্য দিতে হবে। যাকে আমাদের তাবলিগের ভাষায় বলে যোগ্যতার ক্বদর করা।

🎤 ৯৩

স্যার বলতেন আমাদের মুরব্বীরা নিজেরা এসলাহ ওয়ালা ছিলেন, খামাখাই অন্যের এসলাহের পেছনে লাগা তাদের মেজাজের মধ্যেই ছিল না। একবার স্যার বলেন, আমি একবার নিযামুদ্দিনে জোড়ে গেছি, একই সময় জামেয়া মিল্লিয়াতে একটা সেমিনারও ছিল। আমি খুবই সংকোচে ছিলাম যে যাবো কিনা, এসেছি তাবলিগের কাজে, থাকছি মারকাজে, আর এখান থেকে বাইরে ইউনিভার্সিটিতে সেমিনারে যাবো, কেমন হবে, ইত্যাদি। আমি মাওলানা আহমদ লাট সাহেবকে বললাম, যে যাবো কিনা। উনি এমনভাবে এর উত্তর দিলেন যে এটা যেনো মহান এক কাজে যাবো আমি, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, জরুর জরুর, জরুর যানা পরে, জরুর যানা পরে”। উনার কথায় আমি ভাবছি, এসেছি নিযামুদ্দিনে, দ্বীনের ফিকিরের মারকাজ থেকে আমি যাবো ফিজিক্স এর সেমিনার করতে, এটা আবার ‘ জরুর যানা পরে ’ কিভাবে হলো। এটা বলে উনি বললেন, যাবার সময় হজরতজ্বীকে বলে যেয়ো। হজরতজ্বীকে যখন বললাম, হজরতজ্বী বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, জরুর”। এই ছিলো উনাদের মেজাজ। আমাদের এক জামাত নিযামুদ্দিন থেকে রোক হয়ে গেছে, জামাতের সাথীরা সেখানকার এন্তেজামের সাথীদের বলেওনি, নিজেদের মধ্যে একটু আলোচনা করেছিলো, যাতে কোন বিশেষ জায়গায় যাওয়ার একটু আগ্রহ প্রকাশ পায়। একথা কোনভাবে হজরতজ্বীর কানে পৌঁছে, তো সেই জামাতের হওয়া রোক বাতিল করে তাদের আগ্রহের জায়গায় নতুন করে রোক করা হয়। স্যার বলতেন আমাদের মুরব্বীরা সাথীদের এসলাহের পেছনে লাগতো না, যে এর এসলাহ দরকার, এর এসলাহ করেই ছাড়বো ইত্যাদি।

🎤 ৯৪

ক্বারীদের ক্বেরাতের নকল করা, অন্যের বয়ানের নকল করা, ইত্যাদির চেয়ে এক্ষেত্রে প্রত্যেকের ব্যাক্তিগত স্বকীয়তাকে স্যার বেশী পছন্দ করতেন। স্যার বলতেন, অন্যের ক্বেরাত অন্যের বয়ানতো সামনে থাকবেই, কিন্তু সেটা যেনো নিজের থেকে বের হয়। রাজশাহী উপশহরে এক মাদ্রাসায় স্যারকে দাওয়াত দিয়েছিলেন, ক্বেরাতের জন্য মাদ্রাসার বেশ সুনাম ছিল, স্যার গেলে সেখানকার ওস্তাদ স্যারকে হিফজ খানার কিছু ছাত্রদের ক্বেরাত শুনান, ছোট ছোট ছাত্ররা সুন্দর শুদ্ধভাবে মিসরের, সৌদি আরবের প্রসিদ্ধ কিছু ক্বারীর ক্বেরাত হুবহু শুনিয়েছিল। পরে সেখানে নাস্তার সময় মাদ্রাসার মুহতামিম ও হিফজখানার ওস্তাদদের মধ্যে মুজাকারায় স্যার ছাত্রদের ক্বেরাতে প্রসিদ্ধ ক্বারীর হুবহু নকল করার জন্য উৎসাহ দান করতে নিষেধ করেন। ক্বেরাতকে শুদ্ধ করতে হবে, এব্যাপারেতো তোন ছাড় নাই, কিন্তু অমুক অমুক ক্বারীর মতো সুর করা চাই, এই জজবা ছাত্রদের না হলেই ভালো। এপ্রসঙ্গে স্যার উদাহরণ দিতেন, একটা ফুল গাছের একটা ডাল ছিড়লাম। সেই ডালে একটা ফুল আছে, এই ফুলটা সেই ডালের নিজস্ব ফুল নয়, আগের গাছের ডালের ফুল। এই ডালটা যদি আমি মাটির মধ্যে পুঁতে দেই তো প্রথমে ডালের পাতাগুলো মরে যাবে, ছালগুলো শুকিয়ে যাবে, কিন্তু কিছু দিন পর সেই ডাল থেকে আস্তে আস্তে আরেকটা ফুলগাছ হয়ে যাবে, ঐ ফুল গাছের ডালেও ফুল হবে যেটা অবিকল ঐ আগের গাছের মতই একই ফুল, কিন্তু সেটা ঐ ডালের নিজস্ব ফুল, ঐ আগের গাছের ফুল নয় এটা।

🎤 ৯৫

অন্যের হুবহু অনুকরণের বিপরীতে নিজস্ব স্বকীয়তার কথা বলতে গিয়ে স্যার একবার জাপানীদের ফুল ডিজাইনের প্রশংসা করেন। স্যার বলেন, এই ব্যাপারে ওরা সারা দুনিয়াতে বিখ্যাত, সব পাতা সব ফুল ডাল থেকে ঝেড়ে ফেলে দিবে, একটা পাতা আর একটা কলি রাখবে। বড় নিষ্ঠুরভাবে সব ফুল সব পাতা ঝেড়ে ফেলবে, মাত্র একটা ফুল আর একটা পাতা রাখে। এই ডিজাইন সবাই পারবে না, ডালের সব ফুল রাখবে, সব পাতা রাখবে, আসলে ওটা দেখার মতো কিছু থাকবে না। ডালের একটা ফুল আর একটা পাতা এমনভাবে রাখে যেটা দেখার মতো থাকবে।

🎤 ৯৬

স্যার ক্লাস শেষে বেশীরভাগ সময় কোন জামাত, মারকাজ বা কোন তাকাজা থাকলে সেখানে চলে যেতেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটা বড় সময় স্যারের বাসা ছিল না, স্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে থাকতেন। সফর, তাকাজা বা জামাত থেকে ফিরে মসজিদে এসে রাতে থাকতেন। স্যারের একটা ছোট সবুজ রংয়ের ব্যাগ ছিল, স্যারের লুঙ্গি, জামা, ছোট কালো একটা বিছানার হোল্ডার, জায়নামাজ, মশারী ঐ ব্যাগে থাকতো (যা ছিল স্যারের থাকার সম্বল ও ছামান)। জামাতে সফরে গেলে ব্যাগটা সঙ্গে নিয়ে যেতেন, কোন তাকাজায় গেলে স্যারের ব্যাগটা কখনো মসজিদের ভেতরে পূর্ব পার্শ্বে থাকতো আবার কখনো হাফেজ শাহজুল ইসলাম সাহেবের রুমে (কেন্দ্রীয় মসজিদের ওজুখানার সাথে পশ্চিম পার্শ্বের রুম) থাকতো। হাফেজ সাহেব বলেন, একদিন মাঝরাতে স্যার মসজিদে ফিরেন, মসজিদে তালা ছিল, হয়তো স্যার ব্যাগ বের করার জন্য মসজিদে ঢুকতে পারেননি, বাইরে গার্ডরা যেখানো শুয়ে থাকে, সেখানে শুয়ে ছিলেন। আমাকে বা গার্ডদের কাউকে স্যার ডাকেননি ব্যাগ বের করার জন্য। রাত দুইটা আড়াইটার দিকে দেখি মসজিদে সামান্য ছোট একটা জায়নামাজের মতো, ঐটা বিছিয়ে স্যার শুয়ে আছেন, কোন বালিশ বা আর কিছু ছিল না। আমি দেখেই দৌঁড়ে রুম থেকে বালিশ মশাড়ি নিয়ে এসে বিছানা করে দিলাম। স্যারের একটা অভ্যাস ছিল, স্যার না করতেন না, লাগবে না, বা না হলে চলবে এরকম বলতেন না। মাঝে মাঝে আমার খুব খারাপ লাগতো যে স্যার দূর থেকে এসে আমি এখানেই আছি স্যার ডাকতে পারতো, কিন্তু রুমের দরজা বন্ধ দেখলে ঘুমিয়ে গেছি মনে করে ডাকতেন না। স্যারকে খানার জন্য ডাকলে, কোথাও খেয়ে আসলে বলতেন যে খেয়ে এসেছি, না খেলে রুমে চলে আসতেন। বেশিরভাগ সময় আমার একার জন্য পাক করতাম, দুজনে খেয়ে নিতাম, স্যার খুব অল্প খেতেন, আমার খানা কম মনে হতো না। সকালে বেশিরভাগ দিন আলু ভর্ত্তা আর ভাত দিয়ে নাস্তা করতাম, মসজিদে গিয়ে স্যারকে বলতাম, স্যার নাস্তা, স্যার রোজা না থাকলে চলে আসতেন, একত্রে নাস্তা করতাম। বেশীরভাগ সময় সোমবার বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন। কখনো কখনো হল থেকে ছাত্ররা নাস্তা বা খানা নিয়ে এলে, স্যার আমাকে বলতো এখন খানা লাগবে না।

🎤 ৯৭

এক বয়ানে স্যার বলেন, আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য তকদীরের একটা রাস্তা দিয়েছেন। আর মানুষ নিজেও কিছু চিন্তা করে। মানুষ নিজে যেগুলো চিন্তা ও পরিকল্পনা করে সেগুলো যদি তকদীরের সাথে না মেলে তাহলে সে ব্যাথা পায়। আমাদের দেশে শহরে গ্রামে পুরোনো গল্প আছে, যে একজন গরীব মানুষ মাথায় ঝুড়িতে করে একহালি ডিম নিয়ে যাচ্ছে, আর সেই ডিম মাথায় রেখেই সে কল্পনা করছে, এই ডিম ফুটবে তো বাচ্চা হবে, তারপর মুরগী বড় হবে তো আরো ডিম দিবে, তারপর এভাবে অনেক ডিম মুরগী বিক্রি করবে তো আরো ধনী হবে, তারপর ছাগল কিনবে, তারপর গরু কিনবে, ইত্যাদি, ইত্যাদি, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তার কল্পনার মধ্যে বিরাট ধনী হয়ে গেলো। এতোক্ষণে হোচট খেয়ে পড়েছে আর তার ডিমগুলো পড়ে ভেঙ্গে গেল, তো সে মনে বড় ব্যাথা পায় যে জীবনের পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে গেলো, সব আশা ভেঙ্গে গেলো। এই ব্যাথার কারণটা কি? বাস্তব, বাস্তবতা এক জিনিষ আর তার কল্পনা আরেক জিনিষ। বাস্তবতার সাথে যদি কল্পনা মিলে যায় তাহলে ব্যাথা হয় না। আর যদি কল্পনা ভিন্ন আর বাস্তবতা ভিন্ন হয় তো তখন ব্যাথা পায়। দুনিয়ার মানুষ যে হর হামেশা বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন হালতে মনে ব্যাথা পায় তার কারণ হলো যে তার মনের কল্পনা আর আল্লাহ তায়ালার ফায়সালা মিলেনি। আল্লাহ তায়ালা তাকে যে হালত দিয়েছেন, যে ঘটনাগুলো তার জন্য দিয়েছেন সেগুলোর সাথে তার কল্পনাগুলো মিলছে না, সেগুলো সে আশা করে নাই। ধারণা করেছিলো কিছু, আশা করেছিলো কিছু, আর হয়েছে অন্য কিছু, ঘটেছে বিপরীত কিছু। যেটা ঘটে গেছে বা যেটা হওয়ার ওইটাই যদি সে আশা করতো, তার চাহিদা ঐটাই হতো, তাহলে তার আর কষ্ট হতো না।

🎤 ৯৮

স্যার বলতেন, শরীয়তের হুকুমের সাথে আমাকে নিজেকে মেলাতে পারলে আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা আমার ইচ্ছাকে আমার তকদ্বীরের সাথে মিলিয়ে দিবেন। আমার কাজ শরীয়তের হুকুমের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেয়া। যদি আমার বাহ্যিক আমলকে আল্লাহ পাকের হুকুমের সাথে শরীয়তের আহকামের সাথে মেলাতে পারি, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তায়ালা মেহেরবানী করে আমার দ্বীলকে আমার তকদ্বীরের সাথে মিলিয়ে দিবেন। আর যার দ্বীল তার তকদ্বীরের সাথে মিলে যাবে সে কখনো এমন অবস্থা পাবে না যে চেয়েছিলাম কিছু আর হলো অন্য কিছু। বরং সে সবসময় সেটাই চাইবে যেটা তার হওয়ার, অন্য ভিন্ন কিছু সে চাইবেই না। মূসা আলাইহিস সাল্লাম দোয়া করেন- رَبِّ إِنِّى لِمَآ أَنزَلْتَ إِلَىَّ مِنْ خَيْرٍۢ فَقِيرٌۭ আয় আল্লাহ তুমি আমাকে যা দিতে চাও মেহেরবানী করে ঐটা দিয়ে দাও। এমন দোয়া করলেন যে রদ হওয়ার কোন উপায়ই নেই। তুমি আমাকে যা দিতে চাও ঐটা দিয়ে দাও, ঐটাতো আল্লাহ তায়ালা দেবেনই, ঐটার জন্যই দোয়া করছেন। আর যখন ঐটা হয়ে যাবে তো নিশ্চয়ই শুকরিয়া আদায় করবে, যে আয় আল্লাহ তুমি আমাকে মেহেরবানী করে যেটা দিতে চেয়েছিলে সেটা দিয়েছো, আমার উপর বড় মেহেরবানী করেছো। এজন্য নবীদের জীবনে, ওলী আল্লাহদের জীবনে কখনো কোন ঘটনা পাওয়া যাবে না যে হায় হায় করছে। বরং সুস্থ আলহামদুলিল্লাহ, অসুস্থ আলহামদুলিল্লাহ, খেতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ, উপবাস আলহামদুলিল্লাহ, আর এই আলহামদুলিল্লাহগুলো যে বলছে তা কৃত্রিমভাবে বানিয়ে বলছে তাও নয়, দ্বীল থেকে বলছে। কারণ আল্লাহ তায়ালার নিকট থেকে যা আসছে তার কাছে এমন প্রত্যেক জিনিষ প্রত্যেক হালত তার কাছে ভাল লাগছে।

🎤 ৯৯

সূরা সাজদাহ ও সূরা মূলক রাতে তেলাওয়াত করা স্যারের জীবনের একটা নিয়মিত আমল ছিল। বেশীরভাগ সময় এই দুই সূরার আমল দুই রাকাত নামাজে মাগরীব ও এশার মাঝখানে স্যার করার চেষ্ঠা করতেন। মাগরীবের পর বয়ান বা কোন এস্তেমায়ী আমলে থাকলে স্যার আমল বা বয়ান শেষে সাথে সাথেই দুই রাকাত নামাজে দাড়িয়ে যেতেন এবং এই দুই সূরা দিয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিতেন। এশার জামাত শুরু হবার পূর্বে কিছু সময় থাকলেই স্যার এই আমল করার চেষ্ঠা করতেন। কোন দিন এশার আগে সম্ভব না হলে এশার পর পরেই পরে নিতেন। রাজশাহীতে থাকাকালীন, সফরে থাকাকালীন, বয়ান মজমা এস্তেমার ব্যাস্ততার মধ্যেও স্যারকে এই আমলের বড় এহতেমাম করতে দেখেছি। প্রথম রাকাতে সেজদা দেখে বুঝতাম স্যার এই দুই সূরার আমল করছেন। সফর তাকাজা বয়ান ইত্যাদির কারণে এশার পর পরেই সম্ভব না হলে শোবার পূর্বে অবশ্যই পড়ে শুতেন। সফরে চলন্ত সওয়ারীতে ট্রেনে, প্লেনে স্যারকে এই আমল করতে দেখেছি। কাজল ভাইয়ের বাসায় বহু দিন রাতে শোবার পূর্বে স্যারকে এই আমল করতে দেখেছি।

🎤 ১০০

স্যার একবার এক মোজাকারায় বলেন, মানুষ প্রতি মুহুর্তে পরিবর্তন হতে থাকে, ঈমান বাড়ে ও কমে, বৃদ্ধি পায় আবার হ্রাস পায়। الإيمان يزيد وينقص এক মুহুর্তের আগের এক ব্যক্তি এবং এক মুহুর্তের পরের এক ব্যক্তি এক নয়, তার সম্পূর্ণ সেল (রক্তের সেল) পরিবর্তন হয়ে যায়। একজন লোক নামাজ পড়লো, নামাজ পড়ার আগের ঐ ব্যক্তি এবং নামাজ পড়ার পরের ঐ ব্যক্তি যদি এক হয়, ওলামারা বলেন যে নামাজ থেকে ঐ ব্যক্তি ফায়দা পায়নি। আল্লাহ ওয়ালাদের এরকম কথা পাওয়া যায়, যে কারো তিন দিন যদি একই অবস্থার মধ্যে যায় তবে সে ধংসের মধ্যে আছে। তিন দিনের মধ্যে যেনো তার কিছুটা পরিবর্তন হয় (ঈমান বাড়ে)। গত পরশুর ফজরের নামাজ, গত কালের ফজরের নামাজ ও আজকের ফজরের নামাজ যদি এক হয়, তবে ও গাফলতের মধ্যে আছে। মানুষ পরিবর্তনের মধ্যে থাকবে, বাড়ার মধ্যে থাকতে হবে।